, ২০ জুন ২০২১; ৫:১১ অপরাহ্ণ


আমাদের রাজনীতিবিদদের কাছ থেকে হরহামেশাই শোনা যায়, ‘দেশ উন্নয়নের জোয়ারে ভাসছে’, ‘আমরা যখন ক্ষমতায় থাকি তখন দেশের উন্নয়ন হয়, আর অন্যেরা যখন থাকে তখন কিছু মানুষের উন্নয়ন হয়’… এইরূপ শুনতে শুনতে জনমনে স্বাভাবিকভাবেই আগ্রহ জন্মাবার কথা উন্নয়ন মানেটা কি? আবার আরেকটু এগিয়ে বললে অর্থনৈতিক উন্নয়নের অর্থ কি? এই অর্থনৈতিক উন্নয়ন বা ‘Economic Development’ শব্দটির ইতিহাস খুব একটা নতুন না হলেও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে উন্নয়নকে লক্ষ্যবস্তু করার ইতিহাস নতুনই বটে; দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকেই মূলত এর সূচনা।

এর আগে আমরা আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে ‘ডেভেলাপমেন্ট’ বা ‘উন্নয়ন’ শব্দের প্রথম ব্যবহার দেখি কার্ল মার্ক্স এবং লেরয় বিয়েলিও’র ‘স্টেজেস অভ ডেভেলাপমেন্ট’ শীর্ষক লেখায়। ১৮৯৯ সালে প্রকাশিত হয় ভি আই লেনিনের ‘দি ডেভেলাপমেন্ট অভ ক্যাপিটালিজম ইন রাশিয়া’। এর ১২ বছর পর প্রকাশিত হয় জোসেফ শুমপিটারের ‘থিওরি অব ইকোনোমিক ডেভেলাপমেন্ট’। আর ১৯২০ সালের জাতিপুঞ্জ বা ‘লিগ অব নেশান্সে’র আর্টিক্যাল ২২ এ উন্নয়ন শব্দটির প্রয়োগ দেখা যায়। তারপর দেখতে পাই ১৯৪৪ সালে প্রকাশিত রোজেনস্টাইন এবং রোডেনের ‘দি ইন্টারন্যাশানাল ডেভেলাপমেন্ট অভ ইকোনোমিক্যালি ব্যাকওয়ার্ড এরিয়াস’  এবং ১৯৪৮ এর ডিসেম্বরে জাতিসংঘ কর্তৃক আত্তীকৃত দুইটি রেজোল্যুশন যথা ‘ইকোনোমিক ডেভেলাপমেন্ট অব আন্ডারডেভেলাপড কান্ট্রিজ’(১৯৮-৩) এবং ‘টেকনিক্যাল এসিস্ট্যান্স ফর ইকোনোমিক ডেভেলাপমেন্ট’(২০০-৩) যেগুলোতে অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়া হল এবং বলা যায় এর পর থেকেই পৃথিবীর ইতিহাসে অর্থনৈতিক উন্নয়ন বলে একটা নতুন অধ্যায় শুরু হল।

প্রশ্ন উঠতে পারে, তাহলে এর আগে পৃথিবীতে উন্নয়ন প্রক্রিয়া বিদ্যমান ছিল কিনা? উত্তরটা অবশ্যই হ্যাঁ। কিন্তু উন্নয়ন যেটি এক ‘সকর্মক ক্রিয়া’ যাকে প্রসব করাতে হবে এবং সব কর্মকান্ডের লক্ষ্যই হবে এই উন্নয়ন, এই ধারণাটা ছিল না। এই প্রবন্ধে আমি উন্নয়ন বলতে আদতেই কি বুঝায় এবং অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিয়ে ভাবনার ডিসিপ্লিন ‘উন্নয়ন অর্থনীতি’ শাস্ত্রটা আজকাল উন্নয়ন নিয়ে ভাবনার কোন স্তরে আছে সেটাই একটু তুলে ধরার চেষ্টা করব।

কথা হল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর কী এমন ঠেকাটা পড়ল যে অর্থনৈতিক উন্নয়ন নামের একটা নতুন ডিসিপ্লিন আবিস্কার করার দরকার পড়ল? এই জিজ্ঞাসাটাই আজকের দুনিয়ায় উন্নয়ন বলতে কি বুঝায় তার অনেকটা স্পষ্ট করে দিবে।

এই প্রশ্নের উত্তর দেয়ার জন্য আমাদের একটু প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর দুনিয়া থেকে ঘুরে আসতে হবে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ সমাপ্তির প্রাক্কালে আটলান্টিকের রণতরীতে বসে প্রেসিডেন্ট চার্চিল আর প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট যে সনদ রচনা করেছিলেন এবং যার প্রেক্ষিতে পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথমবারের মত ‘জাতিপুঞ্জ’ নামে একটি আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান তৈরি হয় তার ২২ নম্বর ধারায় উল্লেখ ছিল ‘ম্যান্ডেট সিস্টেম’ যেটি দিয়ে জার্মানি আর সদ্য বিলুপ্ত  অটোম্যান সাম্রাজ্য থেকে মুক্ত অঞ্চলগুলোর উপর বিজয়ী শক্তির ম্যান্ডেট বা হুকুমাতের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়।

এই হুকুমাতের অজুহাত হিসেবে সাহায্য বা তাদের উন্নয়নের ফিরিস্তি দেয়া হয়। আর এর মাধ্যমেই মানব ইতিহাসে প্রথমবারের মত কোন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান কর্তৃক নব্য উপনিবেশবাদ বা সাম্রাজ্যবাদের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়া হয়। তারপর থেকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পূর্ব পর্যন্ত উপনিবেশগুলোতে স্বাধীনতার দাবি বাড়তেই থাকে আর তাই যখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হল তখন ব্রিটিশ ভারতে দেখা গেল স্বাধীনতার প্রশ্নে কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্বে মতভেদ দেখা দিয়েছে। মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর সাথে দ্বিমতপূর্বক গোলামির স্বাধীনতার পথ অস্বীকার করে সুভাষচন্দ্র বসু কংগ্রেস ছেড়ে ব্রিটিশবিরোধী জাপান ব্লকের পক্ষ নিয়ে ২৪ লক্ষ সৈন্যের ‘আজাদ-হিন্দ-ফৌজ’ গঠন করলেন। আর এদিকে মূলধারার নেতৃত্ব যুদ্ধে জয়লাভ করলে স্বাধীনতা দিয়ে দিতে হবে শর্তে ‘মাদার কলোনি’র পক্ষেই লড়াই করলেন। এটি বিদ্যমান সব উপনিবেশের জন্যই নীতি হয়ে দাঁড়াল।  জাপানের পতনের পর শেষ পর্যন্ত মিত্রপক্ষ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিজয়ের ঝান্ডা উড়াল ঠিকই কিন্তু দেখা গেল এর মধ্যেই ইউরোপ কেবল একটি ধ্বংসস্তূপ মাত্র। অন্যদিকে আটলান্টিকের ওপারে থাকা যুক্তরাষ্ট্র ছিল অক্ষত এবং যুদ্ধকালীন সরঞ্জাম ও অস্ত্রশস্ত্র বিক্রয়ের অর্থে পরিপূর্ণ।

আর তাই বিজয়ী শক্তির নেতৃত্বে থাকা যুক্তরাষ্ট্র আর মিত্রপক্ষের অনিবার্য দায় হয়ে দাঁড়াল ইউরোপজুড়ে এই ধ্বংসস্তূপের পুণর্গঠন এবং যুদ্ধকালীন প্রতিশ্রুত কলোনিগুলো ছেড়ে দিয়ে ইউরোপ নতুন বিশ্বব্যবস্থায় কিভাবে আবার যুক্তরাষ্ট্রের সম্পূরক শক্তি হয়ে মাথা তুলে দাঁড়াবে সেই ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। তার অংশ হিসেবে জন ম্যানার্ড কেইনস যুদ্ধ শেষ হবার পূর্বেই যুদ্ধোত্তর বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থা কিভাবে চলবে তার এক খসড়া দাঁড় করিয়ে ১৯৪৪ সালেই ইহলোক ত্যাগ করেছেন।

তাই যুদ্ধ শেষ হবার পর প্রথম কাজ হয়ে দাড়াল এই প্রতিষ্ঠানগুলোর এজেন্ডা ঠিক করা। এর মধ্যেই প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যান তার অভিষেকের দিন ২০ জানুয়ারি, ১৯৪৯ সালে মার্কিন সিনেটে তার পরিকল্পনা নিয়ে চার দফা বা চারটি পয়েন্ট উপস্থাপন করেন। যার মধ্যে প্রথমটি ছিল জাতিপুঞ্জের স্থলে একটি নতুন জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠা করা, যেটিকে অন্য অর্থে বলা যায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জাতিপুঞ্জে ফিরে যাওয়া। দ্বিতীয় পয়েন্ট ছিল ‘মার্শাল প্লান’এর মাধ্যমে ইউরোপের পূনর্গঠন শুরু করা।  তৃতীয় পয়েন্ট ছিল ইউরোপজুড়ে সোভিয়েত হুমকি মোকাবিলার জন্য আমেরিকা এবং ইউরোপের যৌথ সেনাবাহিনী বা ‘ন্যাটো’ প্রতিষ্ঠা এবং সর্বশেষ চার নম্বরে বিশ্বজুড়ে বঞ্চিত ও ভাগ্যহত মানুষদের জন্য আমেরিকার ইতিমধ্যেই পুঞ্জিকৃত প্রযুক্তি এবং পুজির বিস্তার যাকে ‘টেকনিক্যাল এসিস্টেন্স’ বলে ডাকা হয় সেটার জন্য কাজ করা।

এই চার নাম্বার  পয়েন্টের শেষ লাইনটি ছিল- “The old imperialism- exploitation for foreign profit- has no place in our plans. What we envisage is a program of development based on the concepts of democratic fair dealing.” এর আগে অবশ্য তারা বলে নিয়েছেন কোন গ্রুপকে তারা টার্গেট করেছেন- “Our main aim should be to help the free peoples of the world, through their own effort…”

অর্থাৎ দুনিয়ার ‘ফ্রি’ লোকজনদের সাহায্য করা এবং তাদের গণতন্ত্রায়ণ প্রকল্পের বাস্তবায়নের উপায় হিসেবে শুরু হল ‘উন্নয়ন’ প্রকল্পের। এই প্রকল্পকে ‘উন্নয়ন’ বলে আখ্যা দিলেও তারা সুস্পষ্টভাবেই স্বীকার করে নিয়েছেন এই প্রকল্প তাদের উদ্ধৃত্ত্ব পুঁজি এবং প্রযুক্তির বাজার সম্প্রসারণের কৌশল।

(চলবে)

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন