, ১ আগস্ট ২০২১; ১১:২৬ অপরাহ্ণ


বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতীয় সংসদে বক্তৃতায় সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্য করে অপমানসূচক মন্তব্য করেছেন। তবে এই ধরণের বক্তব্য এই প্রথম নয়, অহরহই বিভিন্ন প্রসঙ্গে তুলে ধরে থাকেন।

মন্তব্যের সূত্রপাত চলমান দেশব্যাপী কোটা সংস্কার আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে। সরকারি চাকুরির সর্বোচ্চ ধাপ বিসিএস(বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস) নিয়োগে ৫৬% প্রাধিকার কোটা সংরক্ষণ নিয়ে ২০০৮ সালে প্রথম ছাত্রসমাজ আন্দোলন করেছিল যেটি তখনকার ছাত্রলীগের হামলায় ভেস্তে গিয়েছিল। কিন্তু ২০০৮ সালের পর ২০১৩ সালে আরো বড় পরিসরে সংগঠিত হয় কোটা সংস্কার আন্দোলন। ২০১৩ সালের আন্দোলনের প্রেক্ষাপট ছিল বিসিএস প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় কোটাধারীদের জন্য আলাদা কাট-অফ মার্কস প্রবর্তন নিয়ে। কিন্তু সে আন্দোলনও জামায়াত-শিবিরের আন্দোলন ট্যাগ করে ছাত্রলীগ ও পুলিশ দমন করেছিল। সে আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী ছাত্রদের হুমকি দিয়েছিল এই বলে যে তিনি ক্যামেরায় আসা সবগুলো মুখকে ধরে ধরে শাস্তি দিবেন। কোন সরকারি চাকুরিতে তারা নিয়োগ পাবেন না। সে সময় প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্য ছাত্রসমাজে ক্ষোভের জন্ম দিয়েছিল।

কিন্তু ২০১৮ সালের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। ২০১৪ সালে ভোটারবিহীন একটি নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করে আওয়ামী লীগ তথা শেখ হাসিনা এখন দেশের সর্বময় কর্তা। কার্যত কোন বিরোধী দল কিংবা সিভিল সমাজের অস্তিত্ব চোখে পড়ছে না। কয়েকবছর ধরেই জামায়াত-বিএনপির নেতাকর্মীদের গুম ও ক্রসফায়ারের সাথে ২০১৮ সালের রমজান মাসে যুক্ত হয়েছে ‘মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ যার অজুহাতে হরহামেশাই বিনা বিচারে খুন করা হচ্ছে সন্দেহভাজনদের। এই যুদ্ধের মাধ্যমে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক আদর্শকে প্রতিপক্ষ করার কর্মপন্থা থেকে একটা সামগ্রিক রূপ দেওয়া হয়েছে গুম-খুন-বন্দুকযুদ্ধের।

এই যখন দেশের সার্বিক অবস্থা তখনই দেশের তরুণ ছাত্রসমাজ মাঠে নেমেছে শান্তিপূর্ণ দাবি নিয়ে, কোটা ব্যবস্থার যৌক্তিক সংস্কার যার মাধ্যমে দেশের জনপ্রশাসনকে দক্ষতর করা এবং বিদ্যমান বিশাল সংখ্যক বেকার জনগোষ্ঠীর জন্য সরকারি চাকুরিতে ন্যয্য সুযোগ সৃষ্টি করা। এই আন্দোলন শুরু হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্ট্রাল লাইব্রেরি থেকে। সচেতনমাত্রই অবগত আছেন যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই কেন্দ্রীয় লাইব্রেরিটি একাডেমিক পড়াশোনার চেয়ে চাকুরির জন্য পড়াশোনার কেন্দ্রস্থল হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই আন্দোলন দানা বেঁধেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর লাইব্রেরিকে কেন্দ্র করে। বলাই যায়, এই আন্দোলনে যারা যুক্ত হয়েছে তারা অপেক্ষাকৃত বেশিই সিরিয়াস এই ব্যবস্থার পরিবর্তনে।

শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলনের উপর প্রথম আঘাত হানে ৮ এপ্রিল, ২০১৮ তারিখে শাহবাগে পুলিশের ক্র্যাকডাউনের মাধ্যমে। পরবর্তীতে আন্দোলনকারীরা যখন আতংকিত তখনই ঢাকা কলেজের একদল দুর্বৃত্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির বাসভবনে হামলা চালায়, ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। স্বাভাবিকভাবেই এর দায় চাপানো হয় আন্দোলনকারীদের উপর যে আন্দোলনকারীরা শুরু থেকেই দাবি করছে সিসি ক্যামেরার সাহায্য নিয়ে অপরাধীদের শনাক্ত করতে।

এর পর আমরা দেখতে পাই, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সুফিয়া কামাল ছাত্রী হলে সাধারণ শিক্ষার্থীদের উপর ছাত্রলীগ সভাপতি এশার নেতৃত্বে নির্যাতনের প্রেক্ষাপটে ছাত্রী অভ্যুত্থান। সে অভ্যুত্থানে সাধারণ ছাত্রীরা ছাত্রলীগ সভাপতিকে অবরুদ্ধ করে ও জুতার মালা পরিয়ে দেয়। এই প্রেক্ষাপটে মধ্যরাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি এবং প্রক্টর এশাকে দোষী সাব্যস্ত করে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিস্কার করে ও ৪৮ ঘন্টার মধ্যেই এই বহিস্কারাদেশ প্রত্যাহার করে। অন্যদিকে যে সাধারণ ছাত্রীরা আন্দোলন করেছে তাদেরকে গভীর রাতে হল থেকে বের করে দেওয়া হয়।

এর মধ্যে আরেকটি ঘটনা ঘটে যেটি ছাত্রসমাজকে উস্কে দেয়। জাতীয় সংসদে কৃষিমন্ত্রীর মতিয়া চৌধুরী আন্দোলনকারীদের রাজাকারের বাচ্চা বলে গালি দেন এবং তাদেরকে দেখে নেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। এর প্রতিক্রিয়া ছিল মারাত্মক। ছাত্রদের মধ্যে স্লোগান উঠে “চাইলাম অধিকার, হইলাম রাজাকার”। আবার কেউ কেউ এক ধাপ এগিয়ে বলতে থাকে “তুমি কে, আমি কে; রাজাকার, রাজাকার”। আসলে এই স্লোগানগুলো ছিল মন্ত্রীর কথার প্রত্যুত্তর ও রেঠোরিক। কথার পীঠে কথা।

এই ঘটনাগুলোর প্রেক্ষাপটে সারাদেশের ছাত্রসমাজ উত্তাল হয়ে উঠে ও এক অভিনব ছাত্র অভ্যুথানের সৃষ্টি হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে বেশ বিরক্তির সাথেই প্রধানমন্ত্রী সংসদে কোটা বাতিলের ঘোষণা দেন যদিও ছাত্রসমাজ কখনোই কোটা বাতিল চায়নি, বরং বিশেষজ্ঞদের পরামর্শের ভিত্তিতে একটা যৌক্তিক সংস্কার চেয়েছিল। প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার পর আন্দোলনকারীদের নেতারা প্রধানমন্ত্রীকে ‘মাদার অব এডুকেশন’ বলে অভিহিত করে উৎসাহিত করেন ও আন্দোলন স্থগিত করেন।

কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার পর প্রায় তিন মাস পেরিয়ে গেলেও এই ঘোষণার আইনী রূপ প্রজ্ঞাপন জারি হচ্ছিল না।  এর প্রেক্ষাপটে আন্দোলনকারীরা নতুন কর্মসূচীর ঘোষণা দেয় ও ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন করে যেটি রমজান মাস উপলক্ষ্যে বর্জন স্থগিত করে। পরবর্তীতে ইদুল ফিতরের পর যখন অফিস-আদালত সবকিছুই পুরোদমে চালু হয় কিন্তু কাংখিত প্রজ্ঞাপন আর দেওয়া হয় না তখন আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কমিটি ‘বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ’ সেন্ট্রাল লাইব্রেরির সামনে সংবাদ সম্মেলনের ডাক দেয়। এই সংবাদ সম্মেলনে ছাত্রলীগের নেক্কারজনক হামলা ইতিমধ্যেই দেশবাসীর নজরে এসেছে। এই হামলার প্রতিবাদে ছাত্রসমাজ রাস্তায় নেমে আসলে বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে কয়েকজন ছাত্রীকে নির্যাতন ও মলেস্ট করা হয়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে তরিকুল নামের এক সাধারণ শিক্ষার্থীর মেরুদন্ডের হাড় ও পায়ের হাড় হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে ভেঙ্গে দেওয়া হয়। গ্রেপ্তার করা হয় আন্দোলনের শীর্ষ নেতাদের।

এই প্রেক্ষাপটে দৃশ্যপটে আবারো হাজির প্রধানমন্ত্রীর। জাতীয় সংসদে তিনি আদালতের দোহাই দিয়ে কোটা সংস্কার করা যাবে না বলে মন্তব্য করেন। কিন্তু তিনি যখন বাতিলের ঘোষণা দিয়েছিলেন তখন তাঁর মনে ছিল না আদালতের রায়ের কথা। এ প্রেক্ষাপটে সুপ্রীম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে আদালত কোটা সংস্কারের ক্ষেত্রে কখনোই বাধা নয়।

তাছাড়া প্রধানমন্ত্রী সরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের খোঁচা দিয়েছেন ১৫ টাকায় হল আর ৩৮ টাকায় খাবারের। তিনি দাবি করছেন তিনিই এই ভর্তুকিভিত্তিক সরকারী বিশ্ববিদ্যালয় চালাচ্ছেন। বাস্তবতা হল এই সরকারের আমলে মাশরুমের মতো প্রাইভেট ইউনিভার্সিটির লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে এবং বিশ্বব্যাংকের উচ্চশিক্ষা প্রকল্পের অধীনে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বাজেট কমানো হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় যদি ভর্তুকির টাকায়ও চলে তাহলে সেটা জনগণের ট্যাক্সের টাকাই, যেমন প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন গনভবনও চলে জনগণের ট্যাক্সের পয়সাতেই। প্রধানমন্ত্রী দেশের নিয়োগপ্রাপ্ত সরকার প্রধান হিসেবে এই ব্যায়ের কোন কৃতিত্ব দাবি করতে পারেন না।

কোটা সংস্কার আন্দোলন এখন আর কেবল কোটাতেই সীমাবদ্ধ নেই। এই আন্দোলনকারীদের উপর সরকারের নিপীড়ণ বিভিন্ন ক্ষেত্রেই মানবাধিকার লংঘন করেছে যা এই আন্দোলনটিকে একটি গণআন্দোলনে রূপ দিয়েছে। ঢাকাস্থ ইউরোপিয়ান দেশগুলো এবং মার্কিন দূতাবাস থেকেও বাকস্বাধীনতার উপর হামলা ও মানবাধিকার লংঘনের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। কিন্তু সরকার বোধ হয় এই বিষয়গুলো আমলে নিচ্ছে না।

অবশ্য আমলে নেওয়ার মতো কোন ঘটনাও ঘটেনি। সরকার টিকে আছে বিশ্ব কমিউনিটির সম্মতি নিয়ে নয়, পার্শ্ববর্তী সাম্রাজ্যবাদী ভারতের তল্পিবহ হয়ে। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের একটি বড় সংকট এই আন্দোলনের মাধ্যমে ফুটে উঠেছে। পাশাপাশি ঐতিহ্যগত লেজুরবৃত্তির রাজনীতির বাইরে নতুন তরুণ নেতৃত্ব্বও তৈরি হয়েছে যেটি নিঃসন্দেহে আমাদের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখায়।

 

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন