বুধবার, ১৫ জুন ২০২১; ৯:০৪ অপরাহ্ণ


তাজউদ্দীন আহমদ বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতাযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ও নেতৃত্বদানকারী, বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী, যার হাত ধরেই স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সুলিখিত বাজেট ও প্রথম পঞ্চ-বার্ষিক পরিকল্পনা প্রণীত হয়। আজ ২৩ শে জুলাই, ২০১৮ এ মহান নেতার ৯৩তম জন্মদিন। ১৯২৫ সালের এ দিনেই তিনি গাজীপুর জেলার কাপাসিয়া থানার দরদরিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।

ছাত্রজীবন থেকেই তাঁর রাজনীতিতে হাতেখড়ি হয়। দেশ বিভাগের পর ভাষা আন্দোলন, ছয় দফা- স্বাধিকার, অর্থনৈতিক মুক্তির আন্দোলন ও সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী আন্দোলনসহ প্রত্যেকটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনেই তাঁর নিজস্ব চিন্তা ও কর্মের স্বাক্ষর ছিল। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান ও সত্তরের নির্বাচনে কাজ করে গেছেন নিরলস ভাবে।

আর এ জন্যেই পরবর্তীতে মুজিবনগর সরকার গঠিত হলে সর্বসম্মতিক্রমে তিনিই হন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ও জাতির ক্রান্তিলগ্নে হাল ধরেন নিরাবেগ যুক্তি সম্পন্ন, সুস্পষ্ট সপ্নদর্শী ও আপোষহীন এ নন্দিত নেতা। অন্তর্দন্ধসহ চরম প্রতিকূলতার ভিতর দিয়েই অতি অল্প সময়ে তিনি মুক্তিযুদ্ধের সামরিক, রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বিষয়াদি সবদিক থেকে সুসংগঠিত করে তুলেন।

একথা অস্বীকার করার সুযোগ নেই যে, তাঁর সফল নেতৃত্বেই মাত্র নয় মাসে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে। মুক্তিযুদ্ধকালীন ও স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশে তাঁর সীমাহীন ত্যাগ, নিষ্ঠা, দক্ষতা ও স্বজাত্য বোধের জন্য ইতিহাসে তিনি থাকবেন চিরস্মরণীয় ও চিরবরণীয়।

একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ যতটা রাজনৈতিক ছিল, তার কোন অংশেই কম ছিল না অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট যা স্পষ্টত প্রতিভাত হয়েছে ছয়দফা কর্মসূচী ও দলের গঠনতন্ত্রে অর্থনৈতিক উন্নয়নের অঙ্গীকার ব্যক্ত করার মাধ্যমে।

পাকিস্থানের বেনিয়া শাসক বাংলায় যে বৈষম্য সৃষ্টি করেছিল তা দূর করে উন্নত আর্থিক জীবন যাপনের ব্যবস্থা করা তথা আপামর জনতাকে অর্থনৈতিক মুক্তির দীর্ঘ পথে এগিয়ে নিতে ১৯৭৩ সালের পহেলা জুলাই তিনি অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী থাকাকালীন প্রণীত হয় প্রথম পঞ্চ-বার্ষিক পরিকল্পনা। উদ্দেশ্য ছিল জাতির সংখ্যাগরিষ্ঠের অংশের ন্যায্য হিস্যা সুনিশ্চিত করে আত্মনির্ভরশীল ও শোষণহীন আর্থসামাজিক ব্যবস্থা বিনির্মাণ করা। যার ব্যপ্তি হবে গ্রাম থেকে শহর, কৃষি থেকে শিল্পের সর্বত্রই। আমূল পরিবর্তন আনা হয়েছিল ভূমি সত্ত্ব ব্যবস্থায়, কৃষি জমির খাজনা মওকুফ করা হয়েছিল। সামরিক ব্যয় কমিয়ে ও দাতা নির্ভর অর্থনৈতিক ব্যবস্থা থেকে আত্মনির্ভরশীল বিকাশমান অর্থনীতির কথা গুরুত্বের সাথে বিবেচিত হয়।

তিনি জাতির জন্য যে তিনটি বাজেট প্রণয়ন করেন, তাতে তিনি জেলাভিত্তিক বরাদ্দের ব্যবস্থা রেখে সুষম আঞ্চলিক উন্নয়নের চেষ্টা অব্যাহত রাখেন। তাঁর বাজেটগুলো সুলিখিত, উপস্থাপন গুণে অত্যন্ত চমৎকার এবং ভারসাম্যপূর্ণ সুষম উন্নয়নের ঐতিহাসিক দলিলে পরিণত হয়েছে। তিনি তাঁর অর্জিত তত্ত্বীয় জ্ঞানের সাথে মানুষের প্রতিদিনকার জীবনে জীবন মেলাবার আয়োজন করে গেছেন অবিরাম অনুশীলনের মধ্য দিয়ে। আর এ জন্যই সর্বাত্মক ধংসস্তুপের উপর দাড়িয়ে উৎপাদনের প্রায় সকল প্রতিকূল অবস্থার মধ্যদিয়েও বাংলাদেশের অর্থনীতির ভিত রচনা করা সম্ভবপর হয়।

তিনি সুশাসনকে উন্নয়নের অনুসঙ্গ হিসেবে ভাবতেন যা ছাড়া উন্নয়ন অর্থহীন। তিনি অবাধ মত প্রকাশের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী ছিলেন, যেন ভেতরের অসঙ্গতি ও দুর্বলতা জেনে অকস্মাৎ ও বিস্ময়কর পতন ঠেকানো যায়।

প্রচারবিমুখ এ নেতা নিজের ব্যর্থতাকে মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে অস্বীকার না করে স্বীকার করে গেছেন অকপটে যা উন্নয়ন প্রক্রিয়াকে টেকসই করতে অপরিহার্য। দেশ স্বাধীন হবার পর যদি আরও কিছুকাল স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে তাঁর প্রভাব অক্ষুন্ন থাকতো এবং বঙ্গবন্ধু-তাজউদ্দিন সহযোগিতা দীর্ঘস্থায়ী হতো বাংলাদেশ আজ কোথায় দাঁড়াত? প্রশ্ন রাখছি বিদগ্ধ পাঠকের কাছে।

কেবল  শ্লোগান ধরে, সোশ্যাল মিডিয়া সরগরম রেখে, চাটুকারিতা বা কথা দিয়ে কোন জাতি বড় বা জয়ী হতে পারে না; বরং সব মানুষের চিত্তে আদর্শিক অভিন্ন ভাব চাই। আঘাত, মান-অভিমান,সংক্ষুব্ধতা সত্ত্বেও কাজ করার মানুষিকতা চাই। যার পুরোধা ছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ। তবেই সম্ভব টেকসই উন্নয়ন।

তাজউদ্দীন বলতেন- ‘আমরা এমন-ভাবে কাজ করবো… যেন এদেশের ইতিহাস লেখার সময় সবাই এদেশটাকেই খুজে পায়… কিন্তু আমাদের হারিয়ে ফেলে

এটাই হোক দেশপ্রেমের মূলমন্ত্র। নির্মোহ, নিলোর্ভ এবং নিরহংকার রাজনৈতিকের জয় হোক।

 

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন