রবিবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২১; ১২:৫৮ পূর্বাহ্ণ


আধুনিক রাষ্ট্রের ক্ষমতা সম্পর্কে সংখ্যাগরিষ্ঠ ‘সাধারণ’ মানুষের অবস্থান একেবারেই নৈর্বক্তিক। এই সাধারণত্ব তৈরি হয় তার দৈনন্দিন চাওয়া-পাওয়াগুলোকে সংজ্ঞায়ণের উপায় দিয়ে। আজকাল বহুমাত্রিক নিরাপত্তাব্যবস্থা ও হিউম্যান সিকিউরিটি ব্যক্তির মৌলিক চাহিদার অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। জাতিসংঘের মতে আলোকে কোন রকম ভয়-ভীতি ছাড়া সমাজে বেঁচে থাকার ব্যবস্থাকেই হিউম্যান সিকিউরিটি বলা হয়।

এখন প‌্রশ্ন হলো ভয়-ভীতি ছাড়া বেঁচে থাকার মানে কি? বাংলাদেশের মতো একটা দেশে চাকরি না পাওয়ার ভয় হলো সবচেয়ে বড় ভয় আর এই ভয় নিয়ে এই দেশের হাজারো তরুন বেঁচে আছে আমার অথবা আপনার মতো। আপনার মতো বলছি কারন আপনি হয়তো চাকরি পেয়ে গেছন এখন কিন্তু একটা সময় আর সবার মতোই ভাবতেন চাকরির কথা। আর এই ভেবে বিনিদ‌্র রাত কাটাতেন  ভয়টা ছিলো চাকরি পাবো তো ভয় এই ভয়!

আরেকটি যে ভয় আমাদের মাঝে বিদ্যমান তা হলো যে কোন সময় চাকরি চলে যাওয়ার ভয়। তাই  যখন কেউ সরকারি চাকরির  পিছনে ছোটে তখন আমরা তাকে দোষ দিতে পারি না কারন সমাজের মানুষদের মধ্যে একটা বিশ্বাস জন্মেছে যে একটা সরকারি চাকরিই শুধু দিতে পারে এই দুই ভয় থেকে মুক্তি। তাই এই দেশের লাখো তরুণ ঝুঁকে পড়েছে সরকারি চাকরি নামের সোনার হরিনের পিছনে। উন্নয়নশীল দেশের প্রেক্ষাপটে জন্ম থেকে পিছনে লেগে থাকা এই ভয়ের জুজু তাড়াতে হবে তো! একটা চাকরি তো পাওয়া লাগবে!

এই প্রেক্ষাপটেই সংগঠিত হয়েছে স্বাধীন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ছাত্র অভ্যুত্থান ২০১৮ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলন। কোটা সংস্কার একটি সর্বজনবিদিত যৌক্তিক আন্দোলন হলেও এই আন্দোলনে আমাদের অনেকের অবস্থান আজ প‌্রশ্নবিদ্ধ। মাওলানা রুমির একটা বিখ্যাত উক্তি আছে-  “Out being of right one and wrong one there is a field. I will meet you there.” এর ভাবানুবাদ করলে দাঁড়ায়, সত্য এবং মিথ্যার মাঝামাঝি একটা জগৎ আছে এবং তোমার সাথে আমার সেখানেই দেখা হবে। রুমিকে ধরে নিয়ে আসলাম কারণ বর্তমান কোটা সংস্কার আন্দোলনে একটা বড় অংশ মধ্যম পথ বেছে নিয়েছেন পক্ষ অথবা বিপক্ষের মাঝ থেকে একটা বেছে নেওয়া হচ্ছে। আর এর মধ্যে আরো এক বড় অংশ নীরব থাকাকে বেছে নিয়েছে এবং এই নীরবতা কীভাবে সমাজে এবং সার্বিক ভাবে কীভাবে পুরো আন্দোলনে প‌্রভাব ফেলছে এবং কীভাবে সমূহ বিপদ ডেকে নিয়ে আসছে তা নিয়ে ভাবনা এখন সময়ের দাবি।

একটা রাষ্ট্র  তার  জন্মলগ্ন থেকে  বিভিন্ন সময়ের মধ্য দিয়ে যায়। কখনো ক্রান্তিকাল আবার কখনো উম্মেষকাল। বাংলাদেশ এখন কোন সময় অতিবাহিত করছে তা পাঠকরাই বিবেচনা করবেন তবে উন্মেষকাল যে নয় এতো সহজেই বোঝা যায়।

সরকার দাবি করছে বাংলাদেশ উন্নয়ণের মহাসড়কে এগিয়ে যাচ্ছে। আমরা যখন উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা করবো তখন আমাদের কে কয়েকটি বিষয় বিবেচনায় রাখতে হবে যে উন্নয়ন মানেই রাস্তাঘাট, ফ্লাইওভার আর অবকাঠামো নয়। অর্থনীতিবিদ এবং দার্শনিক অমর্ত্য সেনের মতে- “উন্নয়ন মানে স্বক্ষমতা ও স্বাধীনতার বিস্তার”। বাংলাদেশের উন্নয়ন আসলে উন্নয়নের সনাতন ধারাতেই পড়ে আছে। এখানে অল্প কিছু মানুষের কাছে রাষ্ট্রের সম্পদ ও সুযোগ-সুবিধা কুক্ষিগত হয়ে পড়ছে। বাকস্বাধীনতা, চিন্তার স্বাধীনতা ও রাজনীতির স্বাধীনতা এখনো সুদূরপরাহত। সরকারের কয়েকটি মেগা প্রজেক্টগুলোও আদতেই কতটুকু ‘সোশাল গুড’ অর্জন করতে পারবে তাও প্রশ্নবিদ্ধ। যেমন মেট্রোরেল স্থাপনা অবশ্যই একটি সময়োপযোগী উদ্যোগ কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বুক চিরে এই রেল যাওয়াটা কতটা ভালো ও কার্যকর তা বোধ হয় নীতিনির্ধারকরা ভেবে দেখেননি।

রাষ্ট্র টিকে থাকে জনগণের মধ্যকার আস্থার উপর। অথচ বর্তমান সময়ে সমাজ ব্যবস্থা ও রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থা কমে আসছে। একজন রাজনীতিবিদের জন্য সবচেয়ে গূরত্বপূর্ন হলো মানুষের আস্থা যেটা আমাদের সিংহভাগ  রাজনীতিবিদই হারিয়ে ফেলেছেন। আমরা এখন আমাদের রাজনীতিবিদদের ভরসা করতে পারি না। আর এই ক্যান্সার ছড়িয়ে পড়ছে সমাজের সর্বত্র যেটা আমাদের সমাজের ভিত্তি কে নাড়িয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ।

ফিরে আসি কোটা সংস্কার আন্দোলনে। লক্ষ লক্ষ তরুণের প্রাণের দাবি ও যৌক্তিক আন্দোলনে আমাদের রাজনীতিবিদদের অবস্থান তাদের প‌্রতি মানুষের অনাস্থা বাড়িয়ে দিয়েছে। শুধু রাজনীতিবিদ নয়, বুদ্ধিজীবীসহ আমাদের শিক্ষকদের একাংশের অবস্থানও আজ প‌্রশ্নে্র সম্মুখীন। আমাদের রাজনীতিবিদরা মনে হয় কোটা সংস্কার আন্দোলনকে শুধু কিছু সংখ্যক শিক্ষার্থীদের আন্দোলন মনে করছে অথচ তারা ভুলে গেছে এই সব শিক্ষার্থীদের পিছনে তাদের পরিবার রয়েছে তারাও এই আন্দোলনের সাথে একাত্মতা ঘোষনা করছে। এখন ভাববার সময় এসেছে রাজনীতিবিদদের তারা কোন পক্ষে অবস্থান নিবেন।

এখন প‌্রশ্ন হলো আমাদের শাসকরাও কি বুঝতে পারছেন না যে তারা জনসমর্থন হারিয়েছেন? বুঝে থাকলে তো আপনাদের সাবধান হয়ে যাওয়ার কথা নাকি আপনাদের জনগণের সমর্থনের দরকার নেই আসলে কোনটা বলুন তো? 

এই নৈতিক আন্দোলনে সমর্থন দেওয়াটা এখন আমাদের সবার জন্যই সময়ের দাবি হয়ে দাড়িয়েছে। বলা হয়ে থাকে আমাদের সবার হৃদয়ই একেকটি মোমবাতি। সময়ে সময়ে আমরাই আসলে নির্ধারণ করি মোমবাতিটি আমরা প‌্রজ্জ্বলিত করবো নাকি নিভিয়ে রাখবো। তাই এখন সময় এসেছে আমাদের ভাবার আমরা আসলে আমাদের হ্নদয়ের মোমবাতিটি নিয়ে কি করবো ! কারন বিবেকের মোমবাতিটি নিভিয়ে রাখলে আপনি তো মেরুদণ্ডহীন আর এটা নিশ্চই শুনেছেন মানুষে মানুষে পার্থক্য হয় এই মেরুদণ্ড দিয়েই – কারন কথায় আছে তুমিও মানুষ আমিও মানুষ তফাৎ শুধু শিরদাঁড়ায়! তাই শিরদাঁড়া উচু করে বেঁচে থাকার নিহিতে জেগে উঠার এখনই সময়।

শেষ করছি রুমির আরেকটি উক্তি দিয়ে। রুমি লিখেছেন-  “আমাদের হৃদয়ই জানে যে কোনটা সত্য আর কোনটা মিথ্যা”। আমরা শুধু নিজেদের প‌্রয়োজনে সত্যকে ছাপিয়ে মিথ্যা কে গ‌্রহন করি। তাই আমাদের এখন উচিৎ মিথ্যাকে সরিয়ে সত্যকে গ‌্রহন করা এবং যেখানে হৃদয়ই চালিত করে সে দিকেই নিজেকে ধাবিত করা কারন একটা চলমান অন্যায় কে কোন ভাবেই সমর্থন দেওয়া যায় না তাই না?

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন