, ১ জানুয়ারি ২০২১; ৪:২৭ অপরাহ্ণ


“ওঠো দুনিয়ার গরীব ভুখারে জাগিয়ে দাও।
ধনিকের দ্বারে ত্রাসের কাঁপন লাগিয়ে দাও॥
কিষাণ-মজুর পায়না যে মাঠে শ্রমের ফল।
সে মাঠের সব শস্যে আগুন লাগিয়ে দাও॥”

দুনিয়ার অন্যায়, অবিচার আর অজ্ঞানতার অন্ধকারে নিমজ্জিত বস্তুবাদী সভ্যতার খড়কুটায় আগুন লাগিয়ে দেওয়া কবির নাম আল্লামা মুহাম্মদ ইকবাল। একাধারে কবি, দার্শনিক ও রাজনীতিবিদ পরিচয়ে ব্যাপকভাবে সমাদৃত এ বিশ্বজনীন ব্যক্তিত্বকে নিয়ে প্রাচ্য এবং প্রাশ্চাত্যে আজো আগ্রহের কমতি নেই। তাঁর ফার্সি ও উর্দু কবিতা আধুনিক যুগের ফার্সি ও উর্দু সাহিত্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ইকবাল তাঁর ধর্মীয় ও ইসলামের রাজনৈতিক দর্শনের জন্যও বিশেষভাবে সমাদৃত ছিলেন। তাঁর একটি বিখ্যাত চিন্তা দর্শন হচ্ছে ভারতের মুসলমানদের জন্য স্বাধীন রাষ্ট্র গঠন। এই চিন্তাই বর্তমান পাকিস্তান রাষ্ট্রের সৃষ্টিতে ভূমিকা রেখেছে। তাঁর নাম মুহাম্মদ ইকবাল হলেও তিনি আল্লামা ইকবাল হিসেবেই অধিক পরিচিত। তাঁর ফার্সি সৃজনশীলতার জন্য ইরানেও তিনি ছিলেন সমধিক প্রসিদ্ধ; তিনি ইরানে ইকবাল-ই-লাহোরী নামে পরিচিত।

***

১৮৭৭: ১৮৭৭ সালের ৯ই নভেম্বর মাসের রোজ শুক্রবার ব্রিটিশ ভারতের শিয়ালকোটে ইকবাল জন্মগ্রহণ করেন যা বর্তমানে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত। তার পূর্বপুরুষরা কাশ্মিরের অধিবাসী ছিলেন।

১৮৯৩১৮৯৫: শিয়ালকোটে স্কচ মিশন স্কুলে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকে পড়াশোনা করেন।

১৮৯৭: লাহোর গভমেন্ট কলেজ থেকে বিএ( B.A) ( আরবী, ইংরেজি সাহিত্য এবং দর্শন) পাশ করেন। আরবীতে সর্বোচ্চ রেকর্ড মার্কস পাওয়ার জন্য জামালুদ্দীন স্বর্ণ পদক লাভ করেন। ইংরেজিতে রেকর্ড মার্কস অর্জন করায় আরেকটি স্বর্ণ পদক লাভ করেন।

১৮৯৯: লাহোর গর্ভমেন্ট কলেজ থেকে দর্শন বিভাগে এমএ(M.A) ডিগ্রি লাভ করেন। পাঞ্জাব প্রদেশে প্রথম স্থান অধিকার করেন এবং স্বর্ণপদক লাভ করেন। লাহোর ইউনিভার্সিটিতে “মাকলয়েড আরাবিক রিডার” হিসাবে সম্মানিত হন।

১৯০০: লাহোরে আঞ্জুমানে হেমায়েত-ই ইসলামের বার্ষিক সম্মেলনে তাঁর “নালা-ই-ইয়াতিম” (এতিমের বিলাপ) কবিতা পাঠ করেন।

১৯০১: “হিমালা”(হিমালয়) কবিতা মাখজানে প্রকাশিত হয়।  সহকারী কমিশনারের পরীক্ষায় মেডিকেল সমস্যার কারণে উত্তীর্ণ হতে ব্যর্থ হন।

১৯০৩: সহকারী অধ্যাপক, গর্ভমেন্ট কলেজ, লাহোর। লাহোর থেকে অর্থনীতির উপর তাঁর প্রথম গ্রন্থ “ইলম আল-ইকতেসাদ” ( অর্থনীতি বিদ্যা) প্রকাশিত হয়।

১৯০৫: উচ্চ শিক্ষার জন্য ইংল্যান্ড ভ্রমণ করেন।

১৯০৭: জার্মানীর মিউনিখ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শনশাস্ত্রে পিএইচডি(PHD) ডিগ্রি লাভ করেন। পিএইচডি বিষয় ছিল- “The development of metaphysics in Persia.” (প্রজ্ঞান চর্চায় ইরান)

১৯০৭১৯০৮: অধ্যাপক, অারবী বিভাগ, লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়।

১৯০৮:

  • বার-এট-ল (ব্যারিস্টার), লন্ডন
  • ভারতে প্রত্যাবর্তন
  • ২২ ই অক্টোবর, ১৯০৮ আইন প্রাকটিস শুরু করেন।
  • দর্শন এবং ইংরেজি সাহিত্যের খন্ডকালীন অধ্যাপক হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন।

১৯১১:

  • লাহোরে বিখ্যাত কবিতা “শিকওয়া” (অভিযোগ) লেখেন এবং পাঠ করেন।
  • লাহোর গর্ভমেন্ট কলেজের দর্শনের অধ্যাপক নিয়োগপ্রাপ্ত হন।

১৯১২: আলোড়ন সৃষ্টিকারী কবিতা “জবাব-ই-শিকওয়া” বা অভিযোগের উত্তর লিখেন।

১৯১৩: মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য “ভারতের ইতিহাস” লিখেন।

১৯১৫: “আসরারে খুদি” বা “আত্মর রহস্য” নামক দীর্ঘ ফারসি কবিতা লিখেন। ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্য অধ্যাপনা ছেড়ে দেন।

১৯১৮: ফারসি ভাষায় আসরারে খুদির যুগল গ্রন্থ “রুমিজে বেখুদি” বা “আত্মলোপের রহস্য” লিখেন।

১৯২০:

  • আর. এ নিকলসন কর্তৃক আসরারে খুদির ইংরেজি অনুবাদ “Secret of tthe self” নামে প্রকাশিত হয়।
  • কাশ্মীর ভ্রমণ করেন এবং শ্রীনগরে তাঁর বিখ্যাত কবিতা “সাকি নামা” পাঠ করেন।

১৯২৩:

  • বৃটিশ সরকার কর্তৃক “আসরারে খুদি” কাব্যের জন্য নাইট উপাধি লাভ করেন।
  • ফারসি ভাষায় “পাইয়াম-ই-মাশরিক” বা “প্রাচ্যের বার্তা” নামক বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়। ইকবাল এই কাব্যগ্রন্থ লিখেন জার্মান কবি গ্যাটের কাব্যগ্রন্থ “ওয়েস্ট ইস্টার্ন দিওয়ান” এর প্রত্যুত্তরে।

১৯২৪:

  • লাহোরে ষষ্ঠ থেকে সপ্তম শ্রেণীর ছাত্রদের জন্য উর্দু পাঠ্যক্রম প্রস্তুত করেন।
  • উর্দু ভাষায় বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ “বাঙ্গে দারা” বা “কাফেলার ঘন্টাধ্বনি” প্রকাশিত হয়।

১৯২৬: পাঞ্জাব লেজেসলেটিভ কাউন্সিলের সভাপতি(১৯২৬-১৯২৯) নির্বাচিত হন।

১৯২৭: ফার্সি ভাষায় “জবুর-ই-আজম” বা “পারস্যের প্রার্থনাসংগীত” নামক কাব্য প্রকাশিত হয়।

১৯২৯: মাদ্রাজ, হায়দ্রাবাদ এবং আলিগড়ে ছয়টি স্বতন্ত্র বিষয়ে বক্তৃতা প্রদান করেন। তিনি বিংশ শতাব্দীর সর্বশেষ বৈজ্ঞানিক এবং দার্শনিক উন্নয়নের উপর ইসলামি শিক্ষার আলোকে মন্তব্য প্রদান করেন।

১৯৩০: নিখিল-ভারত মুসলিম লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। এলাহাবাদে তাঁর সভাপতির ভাষণে একটি স্বাধীন মুসলিম রাষ্ট্রের ধারণাকে বর্ণনা করেন।

১৯৩১: লাহোর থেকে ছয়টি বক্তৃতার সংকলন “ইসলামে ধর্মীয় চিন্তার পূনর্গঠন” নামে গ্রন্থ আকারে প্রকাশিত হয়। অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকেও প্রকাশিত হয়।

১৯৩২:

  • প্যারিস ভ্রমন করেন এবং ফ্রান্সের দার্শনিক বার্গসন এবং ম্যাসিগনন এর সাথে সাক্ষাত করেন। ইকবালের কাছ থেকে ইসলামে সময়ের ধারণা শুনে বার্গসন বিস্মিত হন।
  • দান্তের ডিভাইন কমেডির প্রত্যত্তরে ইকবালের পারসি ভাষায় রচিত “জাভিদ নামা” বা “অমরত্বের পত্র” কাব্য প্রকাশিত হয়।
  • ডিসেম্বরে লন্ডনে তৃতীয় গোল টেবিল বৈঠকে(Third Round Table Conference) অংশগ্রহণ করেন।

১৯৩৩:

  • রোমে মুসোলিনির আমন্ত্রণে তার সাথে সাক্ষাত করেন।
  • স্পেনের কর্ডোভা ভ্রমণ করেন এবং সেখানে তাঁর বিখ্যাত কবিতা “দুয়া” (প্রার্থণা) এবং “মসজিদে কুর্তবা” রচনা করেন।
  • আফগানিস্তান সরকারের উচ্চ শিক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন।
  • পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক ডি লিট ডিগ্রি লাভ করেন।

১৯৩৪: পারসি ভাষায় মুসাফির নামক কবিতা রচনা করেন।

১৯৩৫: উর্দু ভাষায় “বাল-ই-জিব্রিল” বা জিব্রাইলে ডানা কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ।

১৯৩৬:

  • উর্দু ভাষায় বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ “জরবে কলিম” বা “মুসার লাঠি” প্রকাশ।
  • ফার্সি ভাষায় “পাস চে বেয়াদ কার্দ” বা “প্রাচ্যের জনগণের কি করা উচিত” কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ।

১৯৩৭: মিশরের আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের উলামারা লাহোরে তাঁর সাথে সাক্ষাত করেন।

১৯৩৮:

  • লাহোরে জওহরলাল নেহেরু ইকবালের সাথে সাক্ষাত করেন।
  • ১৯৩৮ সালের ২১ শে এপ্রিল ইকবাল লাহোরে পরলোকগমন করেন।
  • উর্দু এবং ফার্সি কবিতার সংকলন “আর্মাগানে হিজাজ” বা “হিজাজের সওগাত” কাব্যগ্রন্থ তার মৃত্যুর পর প্রকাশিত হয়।

 

তথ্যসূত্র: Allammuhammadiqbal.com

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন