, ১৩ জুন ২০২১; ৯:১৭ অপরাহ্ণ


ইন্ডিয়াতে বাংলাদেশের যে রেমিটেন্স প্রবেশ করছে তা নিয়ে ইদানিং বাংলাদেশ এবং ইন্ডিয়ার মিডিয়ায় বেশ মাতামাতি হচ্ছে। বিভিন্ন সূত্র বলছে যে ১০ লক্ষ ইন্ডিয়ান বাংলাদেশে কাজ করছে। এই প্রেক্ষাপটে আমার কিছু অবজার্ভেশন এই লেখায় তুলে ধরছি।

এক, আমি ঠিক কনভিন্সড না বাংলাদেশে দশ লক্ষ ইন্ডিয়ান কাজ করে। সংখ্যাটা দশ হাজারের ঘরে (মানে 10000 থেকে 90 হাজারের মধ্যে)। অবশ্য সেটাও একটি বড় নাম্বার। এইটা আমার চোখের দেখায় অব্জারভেশান, যেইটা ভুল হওয়ার চান্স খুবই কম। এবং আমার দেখাতে বাংলাদেশের পোশাক শিল্পে ভারতীয় থেকে শ্রীলঙ্কান বেশী। ছোট্ট একটা ডাটা হাতে আছে, লোক মুখে শোনা।

সেইটা হচ্ছে চট্টগ্রামে কর্মরত শ্রীলঙ্কানদের একটা এসোসিয়েশন আছে, সেই এসোসিয়েশনের সদস্য সংখ্যা, আজকে থেকে দুই বছর আগে ছিল, ৩ হাজার। যেখানে পূর্বের কাজ করে যাওয়া শ্রীলঙ্কানদের সংখ্যাও অন্তর্ভুক্ত। সো সেইটার থেকে রেশিও অনুসারে একটা গেস করা যায়।

দুই, বাংলাদেশে এমন কোন ইন্ডাস্ট্রি নাই যে, সেই খানে দশ লক্ষ সিনিয়র ম্যানেজমেন্টের চাকুরী করার সুযোগ আছে। বাংলাদেশের জব মার্কেট এবং ইন্ডাস্ট্রি গুলো হাতে গোনা। ভারতে বাংলাদেশি রেমিটেন্স যদি চার নাম্বার হয়, তবে এই খানে রেমিটেন্স হিসেবে যে টাকাটা যাচ্ছে তাতে শুধু চাকুরীর টাকা নয়, অন্য টাকাও আছে।

বাংলাদেশের ৯০% সমর্থ মধ্যবিত্ত যে কোন জটিল রোগের চিকিৎসা ভারতে গিয়ে নেয়। এই টাকার বেশীর ভাগ মানুষ দুই ভাবে নিয়ে যায়। এক, হুন্ডি করে ডলারে পকেটে নিয়ে যায়। দুই , ক্রেডিট কার্ডে খরচ করে।

তিন, যেইটা আমি কাউকে করতে দেখি নাই, কিন্ত এইটার সুযোগ আছে এবং অনেকে নিশ্চয়ই করে, সেইটা হচ্ছে, বাংলাদেশের ফরেন এক্সচেঞ্জ গাইডলাইন অনুসারে ৫০০০ ডলার পর্যন্ত ব্যক্তিগত ট্রান্সফার করতে পারে। সেই টাকাও ট্রান্সফারও হতে পারে।

চার, বাংলাদেশে হিন্দু জনগোষ্ঠীর বড় একটা অংশের আত্মীয় স্বজন ভারতে থাকে, তাদের মধ্যে অনেকে স্বজনের জন্যে টাকা পাঠাতে পারে।

কিন্ত, কোন মতেই ভারতে বাংলাদেশের রেমিটেন্স ৪ নাম্বারে উঠার মূল কারনে, ১০ লক্ষ ভারতীয়র এম্পলয়মেন্ট না । সংখ্যাটা আরো অনেক কম। কিন্ত আমি প্রশ্ন করতে চাই, এমনকি দশ হাজারে ঘরেও যদি হয় সেইটাও নির্দেশ করে যে, আমাদের সিনিয়র ম্যানেজমেন্ট লেভেলে ভালো ম্যানেজারের ঘাটতি আছে। এবং সেই জায়গায় ফোকাস করতে চাই।

প্রথমত কেন একজন কোম্পানির মালিক সিদ্ধান্ত নেয় যে, বাঙ্গালী ম্যানেজমেন্টের বদলে একজন ইন্ডিয়ান বা শ্রীলঙ্কানকে নিয়োগ দেবে।

প্রথম কারনটা হয় এথিকাল।
সিনিয়র ম্যানেজার কোম্পানির ডিসিশন মেকিং লেভেল। এবং ডিসিশন একটা পর্যায়ে ফাইনান্সিয়াল ডিসিশন হয়ে দাড়ায়। এই জায়গায় এখন সমাজের এথিকাল অবস্থা যেখানে গ্যাছে, ৯৯% বাঙ্গালী সুযোগ পেলে চুরি করে, অথবা তার নিকট আত্মীয়কে কোম্পানিতে ঢুকায়, অথবা সাপ্লাইয়ে নিজের ভাই বা বন্ধুর কোম্পানিকে ঢুকিয়ে দেয় যেইটাতে তার নিজের পারটনারশিপ থাকে, অথবা সাপ্লায়ারদের কাছ থেকে পয়সা খায়। এইটা সকল লেভেলে এখন স্ট্যান্ডার্ড প্র্যাকটিস।

আমি অনেক কোম্পানিকে চিনি যেইখানে কোম্পানির মালিকেরা এখন এই প্র্যাকটিস গুলো জেনে বুঝে একসেপ্ট করে, চিন্তা করে যে, ওভার অল তো আমার লাভ হচ্ছে। কিছু পেতে হলে কিছু দিতে হয়। বা আমি যাকে নিয়ে আসি, সেও একই কাজ করবে। ফলে এই জায়গায় যে কোম্পানি গুলো এফোর্ড করতে পারে, তারা একটা ইন্ডিয়ান বা শ্রীলঙ্কানকে বসায়।

এই ইন্ডিয়ান বা শ্রীলঙ্কানদের এথিকাল মান, বাংলাদেশিদের থেকে বেশী না কম বলতে পারবো না। আমি দেখেছি , সাউথ ইন্ডিয়ান বাদে অধিকাংশ ভারতীয়র এথিকাল স্ট্যান্ডার্ড আমাদের মতই। তারা চুরির সুযোগ পেলে ছাড়েনা।
কিন্ত যেইটা ডিফারেন্ট সেইটা হলো, একজন ভারতীয় বা শ্রীলঙ্কানের করাপশন করার কানেক্টিভিটিটাই থাকেনা।
এবং তারা হাই স্যালারিতে আসে, ফলে, মালিকেরা তাদের মাধ্যমে করাপশন টা প্রটেক্ট করে।

দ্বিতীয় কারণটা হল, ইংলিশ।

আমাদের ওয়ার্কিং ইংলিশ খুবই দুর্বল। কেউ যদি পাসেবল ইংলিশ লিখতে পারে, তো বলতে পারেনা। একজন ফরেন বায়ার আসলে তোতলায়। অথবা একটা প্রেজেন্টেনশানে নিজেকে লুকায় রাখে।

তৃতীয়, কিন্ত যেইটা মোস্ট ইম্পরট্যান্ট, সেইটা হচ্ছে নলেজ।

গ্লোবালি প্রতিটা ইন্ডাস্ট্রিতে জ্ঞানের প্রতিটা শাখা মোটামুটি স্টান্ডারডাইজ হয়ে গ্যাছে। আপনি ছ্যাঁক খাইছেন। কিভাবে হারানো প্রেমিকা ফিরে পাবেন, সেইটাও যদি পড়ে দেখেন, দেখবেন সেইটার স্ট্যান্ডার্ড নলেজ আছে। আপনি গিটার শিখবেন, গ্লোবালি গিটার শেখার কয়েকটা স্ট্যান্ডার্ড মেথড দাড়ায় গ্যাছে। আপনি যে কোন একটা মেথড ফলো করবেন। কিন্ত আমাদের দেশের কোন লেভেলে এই স্ট্যান্ডার্ড নলেজকে কানেক্ট করে হয় না।

আমাদের দেশে সবাই গুরু থেকে শিখে, গুরু যদি ভুল জানে, সেও ভুল শেখে । এবং গুরুরা বেশীর ভাগই ভুল জিনিষ শিখেছে অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে অথবা পুরান কোন নলেজ মডেলে পরে আছে, যেইটা ৩০ বছর আগে বাতিল হয়ে গ্যাছে। ফলে, একটা ভালো ইন্সটিটিউট থেকে পাশ করে আসা স্মার্ট ইংরেজি জানা, একজন ভারতীয় বা শ্রীলঙ্কান অনেক ক্ষেত্রে একজন ৩০ বছর চাকুরী করা সিনিয়র ম্যানেজার থেকে বেটার পারফর্ম করতে পারে- অনেক ক্ষেত্রে।

আর সিনিয়র ম্যানেজার লেভেলে নলেজের মূল ইস্যু হচ্ছে ডিসিশন মেকিং এবং লিডারশীপ। ডিসিশন মেকিং এর মূল ইস্যু বেশীর ভাগ সময়েই হয় ফাইনান্সিয়াল।

ডিসিশন মেকিং , ফিনান্স এবং লিডারশীপ এই তিনটি জায়গাতেই আমাদের সিনিয়র ম্যানেজারদের বো একটা অংশ আটকে যায়, ট্রেনিং এর কারনে- তাদের অভিজ্ঞতা আর তাদের টেনে নিতে পারেনা। কারন আমাদের দেশে ধরে নেয়া হয়, এই জিনিষ গুলো হচ্ছে শুধু অভিজ্ঞতার অথবা ইন্টুইশানের। কিন্ত এই তিনটার পেছনেই আবার ইওরোপিয়ান নলেজ মডেলের স্ট্যান্ডার্ড নলেজ আছে যেইটা ট্রেনিং নিয়ে শেখা যায়। এবং এইটার সাথে যখন অভিজ্ঞতা যোগ হয় তখন একজন সিনিয়র ম্যানেজার তার সিদ্ধান্তের মাধ্যমে কোম্পানিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।

চতুর্থ কারনটা মালিকদের নিজেদের সমস্যা।

তাদের নিজেদের ট্রেনিং নাই। তারা ভাবেন, তারা সফল হয়েছেন তাই তাদের আর শিখতে হবেনা। ফলে, তারা কন্সটেন্টনলি ভুল সিদ্ধান্ত নেন। সেই দায় চাপান, সিনিয়র ম্যানেজারদের উপরে। তারা ভাবেন একজন ভারতীয় বা শ্রীলঙ্কান কুল বলার মত তাদের প্রবেল্ম সল্ভ করে দিতে পারে। তারাও জ্ঞানের স্ট্যান্ডার্ড মডেলের সাথে পরিচিত না। ফলে একজন ইন্ডিয়ান বা শ্রীলঙ্কান যখন সেই গুলো করে দেখায়, তখন তারা ভাবেন ইন্ডিয়ান বা শ্রীলঙ্কানদের কাছে গোপন কোন সূত্র আছে। এবং এইটা আবার এই ফরেন ওয়ার্কাররা বোঝে, ফলে, তারা সেইটা শেখায় না।

পঞ্চম প্রবলেমটা , চতুর্থ এবং পঞ্চমের সাথে কালেক্টেড। এই দুইটা প্রবলেমকেই সল্ভ করতে পারে, ভালো ট্রেনিং ইন্সটিটিউট যেইটা আমাদের দেশে নাই ।

ইউনিভার্সিটি গুলোর কাছ থেকে আমার কোন প্রত্যাশা নাই। আমি ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির আইটি ডিপারমেন্টের কোর্স রিভিউ করে দেখেছি, সেই খানে ধরে নেয়া হচ্ছে, যে ইউনিভারসিটি এবস্ট্রাক্ট কনসেপ্ট গুলো শেখাবে এবং একটা প্রজেক্ট করে ছাত্রদের জব মার্কেটে ছেড়ে দেবে। তারা শুদু বুনিয়াদি শিক্ষা দেয়, প্র্যাক্টিকাল নলেজ শেখায় না, যেইটা চার বছরে ট্রেনিং এ শেখানোর সম্পূর্ণ সুযোগ ছিল।

যেমন যেসব পারটিকুলার প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজ বা সিএমএস দিয়ে বরতমান ইন্ডাস্ট্রিতে এপ্লিকেশান ডেভেল্পমেন্ট, সেই গুলো তারা শেখায় না। সেই গুলো ইউনিভারসিটির বাহিরে গিয়ে পয়সা দিয়ে শিখতে হয়। যেখানে ব্র্যাকের আইটি ডিপারট্মেন্ট বাংলাদেশের ভালো একটা ডিপার্টমেন্ট বলে পরিচিত।

কথার কথা হিসেবে বলি, সেইখানে এন্ড্রয়েড বা এপলের এপ্স ডেভেলপমেন্টের টুলসগুলো নিয়ে কোন মডিউল নাই। এই গুলো বাহিরে গিয়ে শিখতে হয়। কিন্ত সি বা সি প্লাস প্লাস শিখাইতে শিখাইতে ছাত্রদের যান ফানা ফানা করে দেয়া হয়। এইগুলো নিয়ে আরগুমেন্ট করতে গেলে টিচাররা অফেন্ডেড হন।

তো এই জায়গায়, প্র্যাক্টিকাল এপ্লিকেশনটা শেখানোর জন্যে ভালো প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে যথেষ্ট পরিমাণে নাই। যদি একটা দুইটা থেকে থাকতে, তারা এবনরমাল ফি চার্জ করে, যেইটা ভারতে একটা রাস্তার পাশের নন এসি ট্রেনিং ইন্সটিটিউটে শেখানো হয়।

এই সবগুলো প্রবলেম স্ট্রাকচারাল যার সমাধান আছে। এই খানে সরকারের একটা রোল প্লে করার কথা।

মেডিকাল, আইটি, টেক্সটাইল, সাপ্লাই চেইন, ম্যানেজমেন্ট, বিভিন্ন পর্যায়ে যেখানে বিদেশী কর্মচারিদের উপরে কোম্পানি গুলো নির্ভর করছে সেই খানে হায়ার লেভেল ম্যানেজারের ট্রেনিং এর জন্যে সরকার যদি উদ্যোগী হয়ে কিছু ইন্সটিটিউট বানায় সেই খানে ভারতীয় বা শ্রীলংকান ট্রেইনার এনে তা দিয়ে যদি সিনিয়ার ম্যানেজার এবং ডিসিশান মেকারদের স্কিল আগায় নেয়া যেত খুব সহজেই এই প্রবলেম গুলো সল্ভ করা যেত। মাত্র দুই তিন বছরেই সিচুয়েশান পালটে যেত।

কিন্ত, এই ফ্যাসিস্ট সরকারের কাছে মিথ্যার পুনরুৎপাদন এবং ক্ষমতা টিকাইয়া রাখা বাদে আর কোন ইস্যুতে নজর নাই। তাই এই গুলো বলে কোন লাভ নাই।

কিন্ত লেট আস বি ভেরি ক্লিয়ার বাংলাদেশে ১০ লক্ষ ভারতীয় কাজ করেনা। ভারতে যে রেমিটেনেসের টাকা যাচ্ছে, তার থেকে কয়েক গুন বেশী টাকা হুন্ডি দিয়ে যায়। কিন্ত, যেইটুকু বৈধ পথে যায় সেইটা বাংলাদেশে কর্মরত ভারতীয় নয় আমরাই পাঠাই, এবং আমাদের প্রয়োজনে পাঠাই।

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন