, ১ জানুয়ারি ২০২১; ৩:৫৪ অপরাহ্ণ


বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার গণপরিবহণ ব্যবস্থা স্মরণকালের সর্বোচ্চ সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আর এ গণপরিবহণ সমস্যার সমাধান হিসেবে সরকার বেছে নিয়েছে নিম্নমানের ভারতীয় বাস যেগুলো এই সংকটকে আরো ঘনীভূত করবে বলেই মনে হচ্ছে। সম্প্রতি চালু হওয়া ভারতের টাটা কোম্পানির ঢাকার চাকা ও গ্রীণ ঢাকা বাসগুলো ইতিমধ্যেই ফিটনেস হারানোর পথে এবং এগুলোর আকার আকৃতিও কোন মেগাসিটির গণপরিবহণের স্ট্যান্ডার্ডের মধ্যে পড়ে না। এই অবস্থায় সরকারের নতুন উদ্যোগ জনমনে এই সমস্যার নিরসনে সংশয় সৃষ্টি করছে।

রাজধানীর গণপরিবহন ব্যবস্থার উন্নতি ও দূরপাল্লার সেবা উন্নয়নে ভারত থেকে ৬০০ বাস কেনার জন্য ভারতের রাষ্ট্রীয় ঋণে (এলওসি) এসব বাস-ট্রাক কেনায় দরপত্র চূড়ান্ত করা হয় ২০১৬ সালে। তবে দুঃখজনকভাবে দরপত্রের শর্ত পরিবর্তন করে দিয়েছে দেশটির এক্সিম ব্যাংক যাতে করে বাধ্য হয়েই নিম্নমানের বাস-ট্রাক আমদানি করতে হচ্ছে সরকারকে।

বিআরটিসির তথ্যমতে, ২০১৬ সালের আগস্টে ভারতের ঋণে ৬০০ বাস ও ৫০০ ট্রাক কেনার প্রকল্প দুটি অনুমোদন করা হয়। এগুলো কেনায় ব্যয় ধরা হয়েছে যথাক্রমে ৫৮০ কোটি ৮৭ লাখ ও ২১৭ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। বাস-ট্রাকের সঙ্গে এগুলোর জন্য ১০ শতাংশ খুচরা যন্ত্রাংশও কেনা হবে। ২০১৮ সালের জুনে প্রকল্প দুটি শেষ হওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ধরা আছে।

সীমিত দরপত্রের মাধ্যমে বাস ও ট্রাকগুলো কেনা হবে, যাতে শুধু ভারতের কোম্পানিগুলোই অংশগ্রহণ করতে পারবে। বাস কেনায় ভারত সরকার ঋণ দেবে ৪৩৪ কোটি ৩২ লাখ ও ট্রাকে ১৫৮ কোটি ৪০ লাখ টাকা। বাকি অর্থ সরকারি তহবিল থেকে সরবরাহ করা হবে।

সম্প্রতি এলওসিতে বাস-ট্রাক কেনা প্রকল্প দুটির অগ্রগতি পর্যালোচনা প্রতিবেদন প্রণয়ন করেছে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এক্সিম ব্যাংকের কিছু শর্তের সঙ্গে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ একমত পোষণ করে। কিন্তু দেশের চাহিদা অনুযায়ী একনেক কর্তৃক টেন্ডার ডকুমেন্টসসহ উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) অনুমোদিত হওয়ায় এটি পরিবর্তনের কোনো সুযোগ নেই। তাছাড়া এক্সিম ব্যাংক কর্তৃক টেকনিক্যাল স্পেসিফিকেশনের পরিবর্তনের যে প্রস্তাব প্রেরণ করা হয়েছে, সে অনুযায়ী বাস-ট্রাক হবে নিম্নমানের। এজন্য একনেক কর্তৃক অনুমোদিত স্পেসিফিকেশন অপরিবর্তিত রেখে পুনরায় দরপত্র দলিল ও দরপত্র বিজ্ঞপ্তি এক্সিম ব্যাংকে পাঠানো হয়। গত বছর ২ ফেব্রুয়ারি ইআরডির মাধ্যমে এ তথ্য প্রেরণ করা হয়েছে।

এক বছর পেরিয়ে গেলেও এখনও এক্সিম ব্যাংকের উত্তর মেলেনি বলে জানান সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তারা শেয়ার বিজকে বলেন, এক্সিম ব্যাংক যে শর্ত দিয়েছে তাতে ভারতের ছোটখাটো কোম্পানি দরপত্রে অংশগ্রহণ করতে পারবে। তাদের বাস-ট্রাক হবে তুলনামূলক নিম্নমানের । ফলে সেগুলোর দামও পড়বে কম। এসব কোম্পানির কোনো একটি বাস-ট্রাক সরবরাহ করলে সেগুলো নিম্নমানের হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। তখন বাস-ট্রাকের বিশাল এ বহর নিয়ে বিপাকে পড়বে বিআরটিসি। তাই এক্সিম ব্যাংকের শর্ত মেনে নেওয়া হয়নি। তবে মন্ত্রণালয় থেকে ফিরতি চিঠি দেওয়া হলেও তার উত্তর এখনও দেয়নি এক্সিম ব্যাংক। ফলে বাস-ট্রাক কেনার প্রক্রিয়া আটকে আছে।

উল্লেখ্য যে ভারত থেকে ৫৮০ কোটি টাকায় ৬০০ বাস কেনার প্রকল্পের আওতায় ৩০০ দ্বিতল বাস, ১০০ এসি দূরপাল্লার বাস, ১০০ এসি সিটি বাস ও ১০০ নন-এসি সিটি বাস সংগ্রহ করা হবে। এগুলোর প্রতিটির দাম ধরা হয়েছে ভ্যাট ও কর ছাড়া যথাক্রমে ৭২ লাখ, ৭০ লাখ, ৬৯ লাখ ও ৪২ লাখ টাকা। আর ট্রাক কেনার প্রকল্পের আওতায় ১৫ টনের ৩৫০টি ও ১০ টনের ১৫০টি ট্রাক রয়েছে। এগুলোর প্রতিটির দাম ধরা হয়েছে ভ্যাট ও কর ছাড়া যথাক্রমে ৩০ লাখ ও ২৬ লাখ টাকা।

অর্থাৎ ভারতীয় ঋণের টাকায় বাস ক্রয় করতে হবে সে দেশ থেকেই। এজন্য বাংলাদেশ সরকারের চাহিদা অনুসারে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) প্রস্তুত করলেও তা সংশোধন করতে হয়েছে। কেননা মন্ত্রণালয়ের চাহিদার অনুসারে ভারতের কোনো কোম্পানি বাস তৈরি করে না। এজন্য ভারত যে ধরনের বাস প্রস্তুত করে সেটাই আনতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। যদিও বাসের দামে কোনো হেরফের হচ্ছে না।

এই ধরণের ঋণ এবং চুক্তি বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষা করে হচ্ছে না এবং ধরে নেওয়া যায় এই বাসের সার্ভিসও আশানুরূপ হবে না।

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন