রবিবার, ১৯ জুন ২০২১; ৪:১৫ পূর্বাহ্ণ


আমেরিকাতে  লস অ্যাঞ্জেলেস  নামে একটা শহর আছে ! তারকা ঝলমলে সে শহরে যাওয়ার ভাগ্য আমার কখনও হয় নি তবে এখন আর না যাওয়ার জন্য কোন হতাশা নেই কারন আমি জানি আমি বাস করি সত্যিকারের এক দেবশিশুদের শহরে যে শহরে বাস করে আমার থেকে বয়সে ছোট  দেবশিশু যারা আমার  আপনার জন্য নিরাপদ সড়কের দাবিতে রাস্তায় দাঁড়ায় ! আমাদের অধিকারের জন্য লড়াই করে এবং তারা  লস অ্যাঞ্জেলেসের  তারকাদের মতো নয় যাদেরকে দেখতে হলে টাকা আর ভাগ্য দুটোর উপর ভরসা রাখতে হয় !

আমরা যে প‌্রজম্মকে ‌‌প‌্রশ্ন ফাঁসের  জন্য চিনতাম সেই প‌্রজম্মের রুখে দাঁড়ানোর এই ছবি সত্যিই  অভাবনীয়  এবং একথা বলতেই হয় এই আন্দোলনের কারণে কোন নারী লাঞ্চিত হয় নি! কোন অসুস্থ রোগী আরো অসুস্থ হয়ে পড়ে নি  ! কোন তীব্র তিক্ততার শিকার হয় নি কেউ ! কত সুন্দর দেবশিশুদের এই আন্দোলন !

বিপ্লব কীভাবে শুরু হয় ? একটা ছাত্র কোন একটা আর্মি  ট্যাংকের সামনে দাঁড়িয়ে গেছে বুক চিতিয়ে  অথবা কোন এক অচেনা ফল বিক্রেতা নিজের দেহে আগুন লাগিয়ে দিয়েছে কারন তার জীবন এবং জীবিকা প‌্রশ্নের সম্মুখে পরেছে এভাবেই তো তাই না !বিদ‌্রোহ আসলে এভাবেই শুরু হয় , মানুষ জমায়েত হয় , একত্রিত হয় , চিৎকার করে এবং এই চিৎকারে ক্ষমতায় বসে থাকা অন্ধ বিবেকহীন মানুষদের সিংহাসন নড়ে যায় ! এই দেবশিশুদের বিপ্লব শুরু হয়েছে আরো দুই দেবশিশুর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে । যাদের মৃত্যুর বিচারের দাবিতে বাংলাদেশ নামক ৪৭ বছরের পুরনো রাষ্ট্রের শিশুরা পথে নেমেছে এই বিনষ্ট সময় এবং বিনষ্ট রাষ্ট্রটিকে সংস্কার করতে !

বাংলাদেশের জন্ম হয়েছে বিল্পবের মধ্য দিয়ে এবং এর প‌্রকৃতির মধ্যে একটা বিদ‌্রোহ পরায়ন ভাব আছে । বাংলাদেশ তার জন্মের পর থেকে স্বাধীনতাকামীদের সাহায্য করেছে এবং যারা স্বাধীনতা চায় তাদের স্বাধীনতা কে সস্মান করেছে । এখন স্বাধীনতা  মানে শুধু ভূখণ্ডগত স্বাধীনতা নয় , স্বাধীনতা মানে কথা বলার স্বাধীনতা , নিরাপদ জীবনের  নিরাপত্তা , যে রাস্তটা দিয়ে আমি প‌্রতিদিন পার হই সে রাস্তা দিয়ে নিরাপদে বাড়িতে ফিরে আসার প‌্রত্যশা করাও এক প‌্রকার স্বাধীনতা এবং এই  স্বাধীনতা প‌্রদান করতে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি ব্যার্থ হয়েছে ভয়ানক ভাবে এবং তার ফলেই আজকে প‌্রতিটি গৃহে গৃহে এতোদিন যে লুকানো দেবশিশু ছিলো তারা বের হয়ে এসেছে এবং আসছে ।

বিদ‌্রোহ আসলে ভূমিকম্পের মতো এটা বলে কয়ে আসে না এবং এটা অনেকটা বসন্তের মতো । বিদ‌্রোহ সব সময়ই একটা চমকের মতো এবং যখন বিদ‌্রোহ শুরু হয় তখন এটা একটা চমক দিয়েই শুরু হয় এবং যখন শেষ হয় তখন বসন্তের সুবাতাস রেখে যায় ! এই আন্দোলনের শুরটাও চমকে দেবার মতো শেষটা যদিও এখনও অবশ্যই  বোঝা যাচ্ছে না !

উন্নয়নের দুটি দিক আছে; একটা হলো অবকাঠামোগত আরেকটি হলো মানবিক উন্নয়ন । সরকার কাঠামোগত উন্নয়নের দিকে নজর রাখছে অথচ মানবিক উন্নয়নের দিকটার কথা মাথায় রাখছে না আর যার ফলশ‌্রুতিতে সমাজে নানাবিধ প‌্রতিক‌ূল পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে । মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হচ্ছে । শাসকশ‌্রেনীর সাথে জনগনের দূরত্ব তৈরি হচ্ছে ।

বাংলাদেশে  অবকাঠামোগত উন্নয়নের বিপ্লব  হয়েছে এবং এই বিপ্লবে বিভিন্ন শ‌্রেনী তৈরি হয়েছে । তেমনই এক শ‌্রেনী তৈরি হয়েছে বাস-ট্রাক চালক ও পরিবহণ শ্রমিক শ‌্রেনী যারা স্বার্থের জন্য মুনাফার লোভে অন্ধ হয়ে অদক্ষ চালকদের নিয়োগ দিচ্ছে আর তার ফলে ঘটে চলেছে এতো দূর্ঘটনা এবং তার প‌্রতিবাদে  রাস্তায় নেমে তৈরি হচ্ছে আরো দূর্ঘটনা !

আমাদেরকে এই দেশে  প‌্রতিনিয়ত যুদ্ধ করতে হচ্ছে দারিদ্র্য, বেকারত্ব আর ক্ষুধার বিরুদ্ধে কিন্ত মানুষ শুধু খারাপ প‌্রবৃত্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে বেঁচে থাকতে পারে না তার বেঁচে থাকার জন্য প‌্রয়োজন হয় কিছু ভালো লক্ষ্যের , কিছু ভালো উদ্যোগের এবং ভালোভাবে বেঁচে থাকার জন্য  ভালো সপ্নের । বেঁচে থাকার জন্য যে ভালো সপ্ন দেখতে হয় সেই সপ্ন একটা শান্ত প‌্রগতিশীল রাষ্ট্রে বসে দেখা সম্ভব, বাংলাদেশ নামক অস্থির রাষ্ট্রে নয় !

মাও সে তুং একবার একটা কথা বলেছিলেন বিপ্লব কোন ডিনার পার্টি অথবা নয় কোন তৈলচিত্র অথবা মনোরোম কোন ছবি অথবা কোন নারীর হাতে করা কোন এমব‌্রডায়রি ! আসলেই তাই বিপ্লব কোন সহজসাধ্য কর্ম নয় যা এক নিমিষেই সফল  হয়ে যায় বরং তার জন্য ধৈর্য্য ধরতে হয় ! অনেক ত্যাগ আর অনেকটা পথ পারি দিতে  পারলেই বিপ্লব সফলতার মুখ দেখে ।

নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনটা সমাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ভিতরে এবং বাহিরে দুই জায়গাতেই হচ্ছে । শিপ্ল  বিপ্লবের  সময়  তাতে যোগ দেওয়ার জন্য  কারখানা খোলা যেমন আবশ্যিক হয়ে পড়েছিলো আর শিপ্ল বিপ্লবের পরে এখনকার সময়কার বিপ্লবে ল্যাপটপ খোলা আবশ্যিক হয়ে দাঁড়িয়েছে !

আমাদের পাবলিক স্কুল  শিক্ষা পদ্ধতির সাথে ফ্যক্টরির উৎপাদন পরিবেশের  মিল আছে । ফ্যক্টরিতে শ‌্রমিকরা যেমন আদেশ পালন করে এবং কাজ করে যায় তেমনি স্কুলের ছাত্র ছাত্রীরা শিক্ষকের কথা শুনে এবং গলধকরন করে বাড়িতে ফিরে আসে বর্তমানের শিক্ষা পদ্ধতি নিয়ে আমার অন্তত এরকমই ধারনা ছিলো যা আজ বদলে গেছে আঠারোর বিপ্লব দেখে ।

আমার ধারনা ছিলো আমাদের শৈশব এ্ক বাক্সে বন্দী হয়ে গেছে আমরা সব কিছু নির্দিষ্ট  একটা বাক্সের মধ্যে থেকে চিন্তা করি এবং একটা নির্দিষ্ট অলিগলিতে আমাদের চিন্তা সীমাবদ্ধ এবং আমি আবারো স্বীকার করছি আমার চিন্তা ছিলো ভুল ! তবে এটা মানতে হবে সৃষ্টির আদি থেকে এখন পর্যন্ত মানুষের শৈশব সব সময়ই একটা না একটা হুমকির সন্মুখীন হয়েছে  ।

মধ্যযুগে মানুষের শৈশব হুমকির মুখে পরতো সমাজের অনৈতিক নিয়ম নীতি এবং অনাচারের বিরুদ্ধে যেমন কন্যা শিশু হত্যাসহ নানাবিধ কারনে । এর আগে আদিতে শৈশব শেষ হয়ে যেতো হিংস‌্র প‌্রানীর সম্মুখে পরে আর এখন শৈশব নষ্ট হয় গাড়ির চাকার নিচে পিষ্ট হয়ে ! আমরা কি বুকে হাত দিয়ে বলতো পারবো চার্লস ডিকেন্সের অলিভার টুইস্ট এর সময়কার চেয়ে আমরা ভালো সমাজে আমরা বাস করছি ?

আমাদের শৈশবের একটা সুন্দর সময় আমরা নষ্ট করি ক্যারিয়ারের কথা চিন্তা করে আর যার ভিত্তিতে হয়ে গেলো  কিছুদিন আগে কোটা সংস্কার আন্দোলন ।চাকরি হচ্ছে একটা পুরনো আইডিয়া বা ধারনা যার সৃষ্টি হয়েছে শিল্প  বিপ্লবের  সময় থেকে । আমরা এখন তথ্যের যুগে বাস করি এবং সম্ভবনার যুগে বাস করার পরেও আমাদের মধ্যে অধিকাংশ মানুষ পড়াশোনা করে একটা নিরাপদ ভালো বেতনের চাকরির জন্য যা শিক্ষাকে একটি পন্যে রূপান্তর করছে কিন্ত এই শিশুরা প‌্রমান করে দিয়েছে তারা শুধু নিরাপদ চাকরির জন্য পড়াশোনা করে না অথবা তারা শুধু তাদের নিজেদের জীবন শুধু সুন্দর করতে চায় না বরং  সুন্দর একটা বাংলাদেশেও চায় ।

‌বিপ্লবের সবচেয়ে গূরত্বপূর্ন  বিষয় হচ্ছে এর গতি প‌্রকৃতি বুঝতে পারা আর এর গতি প‌্রকৃতি অনুধাবন করা । বিপ্লব আসলে প‌্রথম হয় মানুষের মগজে এবং মননে যখন সে বুঝতে পারে তাকে বঞ্চিত করা হচ্ছে তা থেকে যা একান্তই তার অধিকার ! লেনিন একবার বলেছিলেন – এটা আসলে অসম্ভব নির্নয় করা কখন এবং কোথায় এবং কি কারনে ব‌িদ‌্রোহের সূচনা হবে এবং কীভাবে এর গতি প‌্রকৃতি নিয়ন্ত্রিত হবে । বিপ্লব তার নিজের গতিতে চলে এবং তার কার্য সাধন করে । নিরাপদ সড়ক চাই এখন একটা শুধু আন্দোলন নয় এটা এখন একটা্ সপ্ন !

সপ্ন হচ্ছে এমন একটা ব্যাপার যা অন্যের কাছ থেকে ধার করা যায় । অনেক সময় অন্যের দেখা সপ্ন নিজের সপ্ন বলে মনে হয় । বাচ্চারা যে নিরাপদ সড়কের সপ্ন দেখছে সে সপ্ন এখন আমাদের সবার সপ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে । তাদের সপ্ন আজ আমাদের সবার মধ্যে সংক্রমিত হয়েছে ।আর অবশেষে একটা কথা বলতে চাই যারা আমরা এই দেশ নিয়ে  গর্ব করতে লজ্জা পাই  আসেন আমরা আজ থেকে এই দেশ  নয় বরং এই  দেশের মানুষদের নিয়ে গর্ব করি ! রুখে দাঁড়ানো দুর্বার বাংলাদেশ কে নিয়ে গর্ব করি । নিরাপদ সুন্দর বাংলাদেশের জন্য প‌্রার্থনা করি ।

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন