রবিবার, ১৯ জুন ২০২১; ১১:৪৬ অপরাহ্ণ


গত শতাব্দীর অন্যতম প্রধান তাত্ত্বিক সামির আমিন গতকাল রবিবার ১২ আগস্ট, ২০১৮ সালে প্যারিসে মৃত্যুবরণ করেছেন। ১৯৩১ সালের ৩ সেপ্টেম্বর তিনি মিসরীয় পিতার ঔরস ও ফ্রেঞ্চ মাতার গর্ভে কায়রোতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতামাতা দুজনেই ছিলেন চিকিৎসক।

বাল্যকালে মিসরের পোর্ট সৈয়দ শহরের স্কুলে পড়াশোনার পাট চুকিয়ে ফ্রান্সের প্যারিসে রাজনীতিবিজ্ঞানে ডিপ্লোমা এবং পরিসংখ্যান ও অর্থনীতিতে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। ফ্রান্সে অবস্থানকালে তিনি ফ্রেন্স কমিউনিস্ট পার্টিতে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হয়ে পড়েন যে আদর্শ ও মূল্যবোধ পরবর্তীতে তাঁর বিভিন্ন লেখা এবং চিন্তায় দারুণভাবে প্রভাব ফেলে। প্যারিসের পড়াশোনা শেষে তিনি কায়রো ফিরে আসেন এবং একজন অর্থনীতিবিদ ও নীতিনির্ধারক হিসেবে দেশে এবং বিদেশে যুক্ত হয়ে পড়েন।

তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ইউনিপোলার পৃথিবীর বিপরীতে একটি মাল্টিপোলার পৃথিবীতে বিশ্বাসী ছিলেন। তাঁর বইগুলোর মধ্যে বিখ্যাত দ্য লিবারাল ভাইরাস ২০০৩, আ লাইফ লুকিং ফরোয়ার্ড ২০০৬, একিউমুলেশন অন আ ওয়ার্ল্ড স্কেল ১৯৭০ এবং ক্যাপিটালিজম ইন দ্য এজ অব গ্লোবালাইজেশন ১৯৯৭। তিনি মার্কসীয় ধারার পত্রিকা মান্থলি রিভিয়্যুর একজন নিয়মিত লেখক ছিলেন।

সামির আমিন মনে করতেন যে নিওলিবারালিজমের তাত্ত্বিক ভিত্তি নাজুক অবস্থায় এসে উপনীত হয়েছে। অবশ্য তার মানে এই নয় যে পুজিবাদ ভেঙ্গে পড়ছে। বরং পুঁজিবাদের বর্তমান অবস্থাটা আর থাকছে না এবং আমরা একটি নতুন ধাপে পদার্পন করছি।

সামির আমিনের সবচেয়ে বড় অবদান হল ইউরেসিন্ট্রিজম ধারণার বিকাশ। ১৯৭০ এর দশকে ডিকলোনাইজেশন এবং পোস্ট কলোনিয়াল পৃথিবীর চিন্তাকাঠামো বদলে দেওয়ার জন্য এই শব্দটি সামনে নিয়ে আসেন। তিনি ইন্টারন্যাশনালাইজেশন তত্ত্বেরও প্রবক্তা।

ডিপেন্ডেন্সি থিওরি বা নির্ভরশীলতার তত্ত্ব দিয়ে তিনি মার্কসীয় অর্থনীতির একটি নবপাঠের সূচনা করেছিলেন। নির্ভরশীলতা তত্ত্বে তিনি দেখিয়েছেন পৃথিবী আসলে দুই ভাগে বিভক্ত, কোর এবং পেরিফেরি। এই কোর এবং পেরিফেরির সম্পর্ক নির্ভরশীলতার। কোর দেশগুলো কাঁচামালের জন্য পেরিফেরির উপর নির্ভরশীল এবং পেরিফেরির দেশগুলো ফিনিশড গুডসের জন্য কোর দেশগুলোর উপর নির্ভরশীল। আরেকটা ব্যাপার হলো, এই নির্ভরশীলতার ফলে অসম বাণিজ্যের সৃষ্টি হয় এবং পুঁজিবাদী কাঠামোতে একটা চিরস্থায়ী বৈষম্য বিরাজ করে।

সিরিয়ায় আগ্রাসন নিয়ে আমিনের মন্তব্য ছিল –

রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসকে বিরোধিতা করে বিদেশী শক্তির সাহায্য নিয়ে সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রকৃত সন্ত্রাস সমস্যার সমাধান নয়। এই প্রশ্নের উত্তর হল আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে প্রকৃত জনপ্রিয় গণতান্ত্রিক আন্দোলনের লাভের জন্য এই ব্যবস্থাকে বাস্তবে পরিবর্তন করা। এটিই হচ্ছে চ্যালেঞ্জ। এবং এটি একটি প্রশ্ন যা উত্থাপিত হয়েছে। আমরা জানি না, আমি জানি না, আমার মনে হয় কেউ জানে না কীভাবে বিষয়গুলো এগোবেঃ হয় সরকার, অথবা সরকারের ভিতরের লোকজন, তা বুঝবে এবং বাস্তব সংস্কারের দিকে অগ্রসর হবে, আলোচনার চেয়েও বেশী কিছু করে, জনগণের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সাহায্যে শাসন ব্যবস্থাকে পুনর্বিন্যস্ত করে, অথবা বিস্ফোরণকে নিষ্ঠুরভাবে মোকাবিলা করার পথ ধরে রাখবে যা এখন পর্যন্ত করে চলেছে। তারা যদি এই পথে চলতে থাকে, এক সময়ে তারা পরাজিত হবে, কিন্তু তারা পরাজিত হবে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির উপকারের জন্য।  

মিসরের ইসলামিস্টদের নিয়ে তার মন্তব্য ছিল, ইসলামিজমকে কেবল রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে দেখলে চলবে না বরং এটি নিম্নবর্গের শ্রমজীবীদের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামও বটে।

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন