বৃহস্পতিবার, ২৩ জুন ২০২১; ৯:১১ অপরাহ্ণ


ব্রিটিশ ভারত ভেঙ্গে ইন্ডিয়া এবং পাকিস্তানের সৃষ্টি ও ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় গত শতকের পৃথিবীর অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক ঘটনা। পৃথিবীতে একক সময়ে এর চেয়ে বড় আকারের মাইগ্রেশন কোথাও ঘটার নজির নেই।

পাকিস্তান এবং ইন্ডিয়ার স্বাধীনতা দিবস যথাক্রমে ১৪ আগস্ট এবং ১৫ আগস্ট। ১৯৪৭ সালের আগস্ট মাসে ব্রিটিশ ইন্ডিয়া ভেঙ্গে এ দুটি দেশ সৃষ্টি হয়।

কিন্তু ইন্ডিয়া এবং পাকিস্তানের জাতীয় দিবস কিংবা রিপাবলিক ডে কিন্তু এই দিবসগুলো নয়। ইন্ডিয়ার রিপাবলিক ডে ২৬ জানুয়ারি এবং পাকিস্তানজুড়ে পালন করা হয় ‘পাকিস্তান ডে’ যেটি ২৩ মার্চ। আগস্ট মাসের মধ্যরাতে লর্ড মাউন্টব্যাটেনের টেবিলে ইন্ডিয়া পাকিস্তানের জন্ম হলেও এই দুই দিবস দিয়ে বোঝা যাবে দেশ দুটি সৃষ্টির দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট।

১৯২৭ সালে ভারতের সাংবিধানিক পুনর্গঠন অধ্যয়ন করার জন্য ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সাতজন সদসবৃন্দের দ্বারা গঠিত হয়েছিল সাইমন কমিশন বা ইন্ডিয়ান স্ট্যাটুইটরি কমিশন রিপোর্ট যাকে বাংলায় বলা যায় ভারতীয় সংবিধানিক কমিশন। ভারতে ভারতীয় সমস্যাবলি অনুসন্ধান করে শাসনতান্ত্রিক সংস্কার সম্পর্কে প্রতিবেদন পেশ করার জন্য এই কমিশন গঠন করা হয়েছিল। ভারতশাসনের জন্য এই কমিশন গঠিত হলেও এতে কোন ভারতীয় ছিল না।

এই কমিশনের বিরুদ্ধে ভারতজুড়ে প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ সমাবেশ হয়। লাহোর রেলওয়ে স্টেশনের সামনে এমনই একটি বিক্ষোভ সমাবেশে পুলিশের গুলিতে নিহত হন কংগ্রেসের একজন প্রধান নেতা লালা লাজপত রায়। এই একটি হত্যাকান্ডই পুরো রাজনৈতিক ঘটনাবলির মোড় ঘুরিয়ে দেয়।

এই মৃত্যুর পর কংগ্রেস একটি কমিশন করে সাংবিধানিক সংস্কারের জন্য ব্রিটিশরাজের কাছে দাবি জানায়। মতিলাল নেহেরুর নেতৃত্বে ১৯২৮ সালে নেহেরু রিপোর্টটি প্রকাশিত হয়। এই রিপোর্টে কংগ্রেস ব্রিটিশরাজের কাছে অস্ট্রেলিয়া ও কানাডার মতো ইন্ডিয়ার ডমিনিয়ন স্ট্যাটাস চেয়েছিল। কিন্তু ভগত সিং এই সিদ্ধান্তের কঠোর বিরোধিতা করে।

ভগত সিং যদিও নিজে কমিউনিস্ট ছিলেন কিন্তু কংগ্রেসের একজন বড় মাপের নেতার হত্যাকান্ড তাঁকে প্রতিশোধ নিতে অনুপ্রাণিত করে। তিনি তাঁর আরো দুজন কমরেড নিয়ে লাহোরের এএসপি জন পি সান্ডার্সকে হত্যা করেন। এই হত্যার দায়ে ভগত সিং ও তাঁর দুজন কমরেডকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদন্ড প্রদান করা হয়।

এই ঘটনার অব্যবহিত পরেই ৪০ বছর বয়স্ক যুবক জওহরলাল নেহেরু তাঁর বাবা মতিলাল নেহেরুর স্থলাভিষিক্ত হন ও কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হন। তিনি কংগ্রেসের সভাপতি হয়েই পূর্ণ স্বরাজ বা স্বাধীনতার পক্ষে কাজ করা শুরু করেন। সময়টা ১৯২৯ সাল। একই বছরের ৩১ ডিসেম্বর মধ্যরাতে তিনি রাভি নদীর পূর্বতীরে লাহোর দুর্গে প্রথম ভারতের পতাকা উত্তোলন করেন। ১৯৩০ সালের ২৬ জানুয়ারি লাহোরে তিনি একটি রেজোলুশন পেশ করেন যেটিকে স্বাধীনতার প্রথম দলিল বলা যায়। সে প্রেক্ষাপট থেকেই ইন্ডিয়া ২৬ জানুয়ারিকে বর্তমানে ‘রিপাবলিক ডে’ হিসেবে পালন করে থাকে।

অন্যদিকে লাহোরে ১৯৪০ সালের ২৩ মার্চ মুসলিম লীগের অধিবেশনে প্রাদেশিক স্বায়ত্বশাসনের দাবি নিয়ে একটি রেজলোশন পাশ করা হয় যেটি লাহোর রেজলোশন নামে পরিচিতি পায়। পরবর্তীতে পাকিস্তান সৃষ্টির পর লাহোর রেজলোশনকেই পাকিস্তান রেজলোশন বা পাকিস্তান প্রস্তাব নামে অভিহিত করা হয়। বর্তমানে ২৩ মার্চকে পাকিস্তান দিবস হিসেবে উদযাপন করা হয়।

উল্লেখযোগ্যভাবে দুই দেশের জাতীয় দিবসের সাথেই যুক্ত হয়ে আছে লাহোর যেটি বর্তমানে পাকিস্তান পাঞ্জাবের প্রধান শহর। এমনকি বাংলাদেশেও লাহোর প্রস্তাব একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক দলিল যেটির প্রধান দাবি ছিল বাংলাসহ আশেপাশের মুসলিম অঞ্চলগুলো নিয়ে একটি আলাদা দেশ সৃষ্টি করা।

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন