শুক্রবার, ২ জানুয়ারি ২০২১; ১০:৩৭ অপরাহ্ণ


“চল মিনি আসাম যাবো,

দেসে বড় দুখ রে।

আসাম দেসে রে মিনি

চা বাগান ভরিয়া…”

আসাম যাওয়ার স্বপ্ন বুঝি আর কোন অভাবীর হবে না। সেই আসাম আর নেই যে আসাম সমতল ও পাহাড়ের লক্ষ প্রাণের বেদনাকে ধারণ করতে পারত। আসাম দক্ষিণ এশিয়ার জাত ও ধর্মের রাজনীতির উত্তাপে বারবারই উত্তপ্ত হলেও এবারের উত্তাপে বড় ধরণের অগ্নিকান্ডই বোধ হয় ঘটতে যাচ্ছে।

Source: Jugantar

আসামের সীমানা কখনোই কোন জনগোষ্ঠীর বলয়ে নির্ধারিত ছিল না, আজো নেই সে অর্থে। স্বাধীন বাংলাদেশ ভূখণ্ডের সাথে আসামের ভৌগোলিক আর ঐতিহাসিক যোগ ছিল, আছে। বাংলার স্বাধীন সুলতানেরা বর্তমান আসামের সবচেয়ে বড় শহর গৌহাটি (গুয়াহাটি-অহমিয়া) দখল করেছিলেন। একসময় কামরূপ (গৌহাটি ছিল এর সদর) বলতে বোঝাত বর্তমান আসামের পশ্চিম ভাগ এবং বর্তমান বাংলাদেশের উত্তর ভাগের কিছু অংশকে একত্রে। মোগলরা আসাম বলতে বুঝতেন কেবল বর্তমান আসামের পূর্ব ভাগকে।

Source: UNI

পুরনো আসামি ভাষা ছিল কামরূপী বাংলার আধারে গঠিত। কিন্তু আধুনিক অহমিয়া ভাষা ও জাতিতে রয়েছে মঙ্গোলীয় ধারার বিশেষ প্রভাব। আর্য বলতে সাধারণত যে ধরনের মানুষের চেহারা আমাদের মনে আসে, অধিকাংশ আসামির চেহারার মিল তার সঙ্গে হয় না। উত্তর-পূর্ব ভারতের সাত বোনের এক বোন আসামে এসে আর্যায়ন থেমে গিয়েছে একথা বলা যেতে পারে। ভাষাবিদ গ্রিয়ারসনের মতে- ভোজপুরী, মাগধী, মৈথিলী, উড়িয়া, আসামি এবং বাংলা এতই কাছের যে, এদের সবার জন্যই একটা ব্যাকরণ রচনা করা যেতে পারে। বাংলা এবং অহমিয়া এখনো একই অক্ষরে লিখিত হয়।

ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সরকার আসাম দখল করার পর আসামকে তদানীন্তন বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির অংশ করে নিয়েছিল। সে প্রেক্ষাপটে ১৯০৬ সালে গঠিত হয় Eastern Bengal And Assam Province । ধর্মভিত্তিক জনসংখ্যার ভিত্তিতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য দিখন্ডিত হওয়ার প্রেক্ষাপটে ১৯৪৭ সালে গণভোটের মাধ্যমে সিলেট জেলার করিমগঞ্জ মহকুমা ছাড়া আর সব ক’টি মহকুমা যোগ দেয় পাকিস্তানে। অর্থাৎ আসাম ও বাংলাদেশের মধ্যে নানাভাবেই ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের সূত্র ছিল।

সাম্প্রতিকতম খবর হচ্ছে- একাত্তর সনের পূর্বে বসবাসের প্রমাণাভাবে প্রায় অর্ধকোটি অহমিয়া বহিষ্কারের আশঙ্কায় আছেন। কর্তৃপক্ষ বলছে এই অভূতপূর্ব প্রক্রিয়ার উদ্দেশ্য অবৈধ বাংলাদেশি অভিবাসী সনাক্তকরণ। এতে করে আসামি মুসলিমদের মায়ানমারের রোহিঙ্গাদের ভাগ্য বরণ করার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। উল্লেখ্য, আসামে ৩ কোটি ২০ লক্ষ লোকের বাস যার এক-তৃতীয়াংশ মুসলিম।

আসামের মুসলমানরা কি বাংলাদেশ থেকেই গিয়েছে? সে সম্ভাবনা একেবারে নাই বললেই চলে। অনেক মুসলমানকে চেহারার দিক থেকে আসামিদের থেকে আলাদা করে চেনা যায় না (এ মর্মে সৈয়দ মুজতবা আলীকে আমরা সাক্ষী মানতে পারি)। কাছাড় জেলায় যে মুসলমানের বাস তাদের পূর্বপুরুষ অবশ্য সেখানে গিয়েছিল সিলেট জেলা থেকে। ব্রিটিশ শাসনামলে ধুবড়ি ও গোয়ালপাড়া জেলা রংপুর থেকে কেটে যোগ করা হয় আসামের সঙ্গে যাদের উভয়েরই ভাষা বাংলা।

Source: UNI

আসামে ব্রিটিশ শাসন শেষ হবার কিছুদিন পর ১৯৫০ সালে গোয়ালপাড়ায় আরম্ভ হয় ‘বঙ্গাল খেদা’ আন্দোলন। অথচ গোয়ালপাড়া একসময় ছিল বাংলাদেশেরই অংশ। বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার পর এখানে একটি অর্থনৈতিক ভিত্তি তৈরি হয়েছে। সমাজে বৈষম্য বাড়লেও স্বাধীন বাংলাদেশে দূর্বলও ভাষা পেয়েছে। এ অবস্থায় দলে দলে বাংলাভাষী মুসলমানরা আসামে গেছে, এর কোন নির্ভরযোগ্য তথ্য-উপাত্ত নেই। আসামের সঙ্গে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশেরও সীমান্ত আছে। পশ্চিমবঙ্গ থেকে বাংলাভাষী মুসলমান এক রাষ্ট্র বলে সহজেই আসামে ঢুকতে পারে। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী আসাম থেকে বাংলাভাষী মুসলমানদের তাড়াবার ব্যাপারে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। কেননা, এদের একটি অংশ হতে পারে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ থেকে যাওয়া।

Source: UNI

বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুঁড়ি ও কুচবিহার জেলা থেকে সম্প্রতি নাগরিক তালিকার অজুহাতে ‘মুসলিম খেদাও’ এর পিছনে একটি আইডেন্টিটি পলিটিক্স কাজ করছে। বিজেপি খেলছে ‘হিন্দু কার্ড’ – ‘‘বাঙালি হও আর অন্য কিছু, হিন্দু হলে সব মাফ’’। এই ‘মুসলিম খেদাও’ এর পিছনের প্রেক্ষাপটটা ‘বাঙালি খেদাও’ এর। তার জন্য আমাদের তাকাতে হবে অনেক পিছনে। আসামের ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার ভাষা মূলত অহমিয়া আর বরাক অববাহিকার বাংলা।

অবিভক্ত বাংলা থেকে দলে দলে বাঙ্গালিরা প্রথম সেখানে চাষবাস শুরু করলেও ক্রমশ ব্যবসা আর চাকরিতে তারা অগ্রসর হয়ে ওঠে- যা মধ্যবিত্ত আর শিক্ষিত অহমিয়াদের ক্ষোভের কারণ। তবে ব্যাপারটা এতো সরলও নয়। রাজধানী কলকাতা থেকে আসাম শাসনের শুরুতেই আসামের জন্য বাংলা ভাষাকেই স্থানীয় মূল ভাষা আর শিক্ষার মাধ্যম স্বীকৃতি দিয়ে দেয়া হয়। অথচ আসামের মাত্র উনিশ শতাংশ মানুষ বাঙালি ছিল।

আবার, ১৯৩১ সালের আদমশুমারি নিয়ে সন্দেহ আছে যেহেতু দায়িত্বপ্রাপ্তদের মধ্যে বাঙালিরা ছিল। বাঙালি সংস্কৃতি আর ভাষার আধিপত্য বিস্তারে বাঙালির মনোবাসনা আসামিদের মনোঃপুত হবার কথা নয়, হয়ও নি। ‘বাঙালি খেদাও’ শুরু হয়েছিল বাঙালিদের দখলে যেন বিধানসভা চলে না যায় সেই আশঙ্কা থেকেই। আর রাজ্যভাষা নিয়ে আন্দোলন শুরু করেছিল চাকুরি-সন্ধানীরা এবং নিহিত কারণ ছিল অর্থনৈতিক। দেশভাগের পর শরণার্থীদের চাপ আসাম ও মেঘালয়কেও (তখন একত্রে একই রাজ্য ছিল) সামলাতে হয়েছিল। ১৯৪৮ সনের আসামে বাঙালি এবং আসামি হিন্দুদের মধ্যে দাঙ্গা শুরু হয়, যাকে আমরা পরে আশির দশকে মেঘালয় এবং ত্রিপুরা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়তে দেখব। শরণার্থীর ঢল ঠেকানোকে দাঙ্গার প্রাথমিক কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা যেতে পারে এবং স্বাধীন ভারতে সেটাই ছিল প্রথম ‘বাঙালি খেদাও’ সহিংস আন্দোলন। তবে নেহরু আর পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী বিধানচন্দ্রের চেষ্টায় সহিংসতা আপাতত বেশি বিস্তৃত হবার সুযোগ পায় নি তখন।

১৯৫০ সাল থেকেই অহমিয়াকে রাজ্যভাষা বানাতে গণদাবী উঠে আসতে থাকে। ১৯৫৬ সালে রাজ্যের সীমানা পুনঃনির্ধারণ কমিশন গোয়ালপাড়া জেলাকে পশ্চিমবঙ্গের সাথে সংযুক্তি খতিয়ে দেখতে পরিদর্শনরত অবস্থায় বাঙালভীতি থেকে পুনর্বার দাঙ্গার সূত্রপাত ঘটে। দাঙ্গা ব্রহ্মপুত্র অববাহিকা থেকে ছড়িয়ে পরে বরাক অববাহিকায়।

মার্চ মাসের ১৫ তারিখে মুখ্যমন্ত্রী চালিহা ঘোষণা করেন- অহমিয়াকে রাজ্যভাষা করবার দাবী অ-অহমিয়াদের কাছ থেকেও আসতে হবে। এই প্রজ্ঞাহীন বক্তব্যই পরবর্তীকালের রাজ্যভাষা সম্পর্কিত সমস্যাবলীর মূল ছিল। স্থানীয় আসামীরা ছাড়াও ব্রহ্মপুত্র অবববাহিকায় অনেক বাঙালীর বাস ছিল, যাদের বেশিরভাগ পূর্ববঙ্গ থেকে এসে গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোতে থিতু হয়েছিলেন।ভাষার জন্য আন্দোলন তীব্রতর হলে আসাম প্রদেশ কংগ্রেস কমিটি অহমিয়া ভাষার পক্ষে প্রস্তাব গ্রহণ করে, অ-আসামিরা এবার তার প্রতিবাদ জানায়। অ-আসামি এলাকাগুলো প্রতিবাদী হয়ে উঠলে আসামিরা সহিংস হয়ে ওঠে। মজার ব্যাপার হলো, ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় বাঙালিরা অহমিয়াকে প্রকাশ্যে সমর্থন জানিয়েও আক্রান্ত ও লুটতরাজের শিকার হয়েছিল। আবার, কাছাড়ের বাঙালি ও পাহাড়িদের কাছ থেকে অহমিয়ার বিরুদ্ধে সবচেয়ে জোরালো প্রতিবাদ এলেও অহমিয়ারা তাদের প্রতি সহিংস আচরণ করেনি। আসামের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ সাধারণত ছাত্রসমাজকে সক্রিয় রাজনীতিতে জড়াতে নিরুৎসাহিত করতেন। কিন্তু ভাষার ইস্যুতে বাঙালিদের খেদাতে তারা ছাত্রদের ব্যবহার করেন।

১৯৩১ সালের তুলনায় ১৯৫১ সালের আদমশুমারিকে অধিক নির্ভরযোগ্য বিবেচনা করা হয়। পুরো জনসংখ্যার ৫৫ শতাংশ অহমিয়া ভাষী ছিল যেখানে States Reorganization Commission অনুসারে কোন রাজ্য একভাষী হতে হলে অন্তত ৭০ শতাংশের প্রয়োজন ছিল। কিন্তু বাংলাভাষী মাত্র ১৬ শতাংশ হওয়া সত্ত্বেও দার্জিলিং জেলায় রাজ্যভাষা হিসেবে বাংলা গৃহীত হয়েছিল। সুতরাং, কাছাড় এবং পাহাড়ি অধিবাসীদের অবমূল্যায়ন না করেই আসামে অহমিয়াকে রাজ্যভাষা হিসেবে গ্রহণ করা সম্ভবপর ছিল। ১৯৬০ সালের জুন মাসে ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় বাঙালি বসতিগুলো আক্রান্ত হয়। এই আক্রমণ গৌহাটির কটন কলেজ থেকে শুরু হয়ে সাড়া রাজ্যে ছড়িয়ে পড়ে। সবচেয়ে নৃশংস সহিংসতা সংঘটিত হয় কামরূপ জেলার গড়েশ্বরের পঁচিশটি গ্রামে। গৌহাটির জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও ডেপুটি ইন্সপেক্টর জেনারেল অব পুলিসকে (যারা উভয়েই বাঙালি ছিলেন) হত্যা করা হয়। এক হিসাবে ৫০০,০০০ বাঙালি আসাম থেকে বাস্তুচ্যুত হয়েছিল। জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরের মাঝে প্রায় ৫০,০০০ বাঙালি পশ্চিমবঙ্গে আশ্রয় নিয়েছিল।

১৯৬১ সালের ১৯ মে আসামের শিলচরে একদল হিন্দু দাবি করেন, আসামে অহমিয়ার পরে বাংলাকে ২য় সরকারি ভাষা করতে হবে। বিক্ষোভকারীদের উপর সরকার গুলি চালালে ১১ জন নিহত হয় এবং শেষ পর্যন্ত দাবি মেনে নিতে বাধ্য হয়। এরপর সত্তরের দশক ছিল ভাষা দাঙ্গার দশক। ১৯৭২ সালে বড় আকারে জাতিগত দাঙ্গা হয় যেখানে বাঙালিরাই মূলত আক্রান্ত হয়।

আশির দশকে দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে মেঘালয় রাজ্যেও। ১৯৮৩ সালের অভিবাসী-বিরোধী আন্দোলনের লক্ষ্যবস্তু হয় বাঙালিরা। এসব যখন হচ্ছিল তখন আসামের বাঙালিদের ভরসাস্থল ছিলেন জ্যোতি বসু। এখন আসামের মুসলিমদের ব্যাপারে মমতা  ব্যানার্জীর ভূমিকা খুব গুরুত্বপূর্ণ। ইতিবাচক হোক আর নেতিবাচকই হোক বলা যায়, এ থেকে শুরু হবে এক নতুন ইতিহাস।

 

তথ্যসূত্রঃ

  1. Assam Disturbance-1: Bongal Kheda Again (K C Chakravarti)
  2. Assam Disturbance-2: Tragedy of Political Tactlessness (P C Goswami)
  3. আসামে মুসলমান (এবনে গোলাম সামাদ)
  4. ‘চল মিনি আসাম যাব…’ (গওহার নঈম ওয়ারা)
  5. Wikipedia

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন