শুক্রবার, ২ জানুয়ারি ২০২১; ১০:৪০ অপরাহ্ণ


সংস্কৃতি একটি সমাজের দর্পণ স্বরূপ, নির্ণায়ক ভালমন্দের। উন্নয়ন কিংবা প্রগতির কথা চিন্তা করলেই মাথায় আসে সাংস্কৃতিক বিপ্লব কিংবা সাংস্কৃতিক উৎকৃষ্টতা সাধনের ভাবনা। কিন্তু আমাদের বিরাজমান সমাজ, রাষ্ট্র, প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তিক জীবন চলছে উল্টো পথে। আতঙ্ক, সন্ত্রাস, বলপ্রয়োগের মাধ্যমে সৃষ্টি করা হয়েছে এক নতুন ধ্বংসাত্মক সংস্কৃতি যার নাম ভয়ের সংস্কৃতি। পারস্পরিক সম্পর্কের নির্ণায়ক এখন জবরদস্তি এবং স্বেচ্ছাচারিতা। বিরাজমান এই জটিল পরিসস্থিতি নিয়েই রচনা করা হয় মাত্র ১৪৪ পৃষ্ঠার অনন্য সৃষ্টি ‘ভয়ের সংস্কৃতি’ যা রচনাশৈলী, ভাষাশৈলী, যুক্তি প্রতিযুক্তির ,তথ্য ,উপাত্ত ও প্রমানের সমারহে হয়ে উঠেছে এক অনবদ্য গ্রন্থ।

বই: ভয়ের সংস্কৃতি; লেখক: আলী রীয়াজ; ISBN 9789849074793

প্রকাশক: প্রথমা; প্রথম প্রকাশ: নভেম্বর ২০১৪

বাংলাদেশের শীর্ষ বুদ্ধিজীবী ও যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের অধ্যাপক এবং গবেষকদের মধ্যে অন্যতম ব্যক্তিত্ব শ্রদ্ধেয় আলী রীয়াজ স্যার যে আশঙ্কা নিয়ে বইটি রচনা করেন তা শুধু সত্যই প্রমানিত হয়নি বর্তমান সময়ে তা এতটাই প্রবল আকার ধারন করেছে যে জাতিগত, লিঙ্গজ, সম্প্রদায়গত, শ্রেণিগত প্রতিটি পারস্পরিক সম্পর্কের ভিত্তি হয়ে দাড়িয়েছে ভয়, আতঙ্ক, বলপ্রয়োগ। বইটিতে আলী রীয়াজ বলেন, “ভয়ের সংস্কৃতি আতঙ্ক, সন্ত্রাস, বলপ্রয়োগকে প্রাতিষ্ঠানিকীকরন করে।” যেমনটা ছিলো ইরানে সাভাক রুপে, যুক্তরাষ্ট্রে ওয়ার অন টেরর রুপে, বাংলাদেশে সন্ত্রাস দমন আইন রূপে। যার ফলে আইনের মাধ্যমে জনগনের মৌলিক অধিকার হরন করা হয়েছে। অপনায়করা হয়ে যায় রূলমডেল, প্রতিষ্ঠান হয়ে পরে ব্যক্তিক সম্পত্তি যা পুনরূৎপাদিত হতে থাকে প্রতি নিয়ত যার সহায়ক হিসেবে কাজ করে গণমাধ্যম।

ভাবাদর্শের জাল ছড়িয়ে দেয়ার মাধ্যমে একটি গোষ্ঠী অপর গোষ্ঠীকে বল প্রয়োগের কিংবা সেচ্ছাচারের সম্মিলিত অর্জন করে। যার জন্য সুপরিকল্পিতভাবে কাজ করার ফলে পরিবার, সমাজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আড্ডা সমূহ যা মানুষকে অধীন করে তুলেছে প্রতিনিয়ত। লেখক বইটিতে উপস্থাপন করেছেন শাসক গোষ্ঠী কিভাবে তৈরি হয় এবং তার সাথে অন্যসব নিয়ামকের অর্থনৈতিক সম্পর্কটাই বা কি? ক্রমান্বয়ে বাংলাদেশের শিরা উপশিরায় ঢুকে পরা এই সংস্কৃতির উৎপত্তি কোথা থেকে? কিভাবে রাজনীতিকে ধর্মীকরন করা হলো কিংবা ধর্মকে কিভাবে রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের জন্য ব্যবহার করা হয়েছে তার তথ্য, উপাত্ত প্রমাণসহ পাওয়া যায় বইটিতে। এদিক থেকে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ও নির্মোহভাবে উপস্থাপিত হয়েছে যাতে কাউকে ছাড় দিয়ে কোন কথা বলা হয়নি।

ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী এবং ধর্মীয়ভাবে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়গুলো তাদের নিজস্বতা নিয়ে কতটা হূমকির মুখে আছে তা শুধু উপলব্ধিরই বিষয় নয়, লজ্জাজনকও বটে। ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম মাত্রায় আনিশ্চয়তায় ভুগতে থাকা হিন্দুরা দেশ ছেড়েছে বিগত কয়েক দশকে যার পরিমাণ আশ্চর্য রকমের বেশি।এছাড়া হিন্দুসহ অন্যান্য জনগোষ্ঠীর উপর প্রকাশ্য হামলা, হুমকি, আত্যচার নতুন কিছু নয়। এই সবকিছুই ঘটেছে একটি রাজনৈতিক বাতাবরণের মধ্য দিয়ে যার দায় কোন রাজনৈতিক শক্তিই এড়াতে পারবে না।

লেখক দেখিয়েছেন, ফতোয়া সালিশের নামে যে বর্বর অত্যাচার নিপীড়ন করা হয় তার প্রমাণ পত্রিকার পাতাতে অহরহ দেখা যায়। আর এর মূল ভিক্টিম নারীরা এর মাধ্যমে আত্যচারিত হয়ে আসছে যুগ যুগ ধরে। এর থেকে নিরাময়ের লক্ষণও তেমন একটা চোখে পরে না।

হত্যা, গুম, অপহরন, ক্রসফায়ার এখন নিত্যদিনের সাধারন ঘটনা মাত্র যা আমরা সংবাদপত্র কিংবা মিডিয়ার শিরোনামের ভাষাতেই প্রমাণ পাই। এই ঘটনাপ্রবাহ এক প্রকার নাটকের মতো যার মাধ্যমে মানুষের মাঝে ভয় সৃষ্টি করা সম্ভব এবং অপরাপর ভিন্নমতাবলম্বীদের দমিয়ে দেয়ার সুপরিকল্পিত মাধ্যম।

সর্বোপরি লেখকের আশঙ্কা এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে আমাদের রাষ্ট্র থিওক্রেটিক রাষ্ট্রে কিংবা ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র হিসাবে স্থায়ী রূপ ধারণ করতে পারে যার পরিনাম ভয়াবহ।

সমসাময়িক রাজনীতি ও সমাজ কাঠামোর মধ্যকার পারস্পরিক সম্পর্ক উপলব্ধি করার জন্য বইটি অসাধারণ। আমরা কোথায়, কিভাবে, কোন অবস্থায় ও কোন পরিস্থিতিতে বসবাস করছি তা একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে বুঝা, উপলব্ধি করা আমাদের কর্তব্যের থেকেও বেশি কিছু। আর সেই কর্তব্যবোধকেই উস্কে দিতে সক্ষম ‘ভয়ের সংস্কৃতি’।

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন