শুক্রবার, ২ জানুয়ারি ২০২১; ১১:৫৮ অপরাহ্ণ


বাংলাদেশের সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা (এস কে সিনহা) যুক্তরাষ্ট্র থেকে তার সদ্য প্রকাশিত স্মৃতিচারণমূলক বই ‘এ ব্রোকেন ড্রিম : রুল অব ল, হিউম্যান রাইটস এন্ড ডেমোক্রেসি’ তে ২০১৭ সালে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর মিথ্যাচার ও হুমকির মাধ্যমে কীভাবে তাকে দেশত্যাগে বাধ্য করা হয় তার একটি বিবরণী তুলে ধরেছেন।

বইটি সম্পর্কে বিবিসি বাংলায় সাক্ষাৎকারে তিনি যে অভিযোগগুলো তুলেছেন সেগুলোকে চারটি পয়েন্টে উপস্থাপন করা যায়।

১) প্রধান বিচারপতি কে তার সরকারী বাসভবনে অন্তরীণ করে রাখা হয়েছিল এবং অন্যদিকে আইনমন্ত্রী মিডিয়াতে বলেছিলেন যে তিনি গুরুতর অসুস্থ।
২) প্রধান বিচারপতিকে সেনা গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআই জোর করে বিদেশে পাঠিয়েছে এবং তার বিদেশে থাকার জন্য আর্থিক প্রস্তাব করা হয়েছিল।
৩) রাষ্ট্রপতি সুপ্রিম কোর্টের বাকি বিচারপতিদের ডেকে নিয়ে সিনহার বিপক্ষে অবস্থান নিতে নির্দেশনা দিয়েছিলেন। তারা রাষ্ট্রপতির কথায় প্রধান বিচারপতির বিপক্ষে খোলাখুলিভাবে অবস্থান নিয়েছে এবং অনাস্থা জানিয়েছে।
৪) প্রধান বিচারপতির অবস্থানের চেয়ে অধস্তন ডিজিএফআই দিয়ে যে এই কাজ করানো হচ্ছে তাতে প্রধানমন্ত্রী এবং রাষ্ট্রপতির সরাসরি অনুমোদন ছিল। 

এই বই প্রকাশের পর থেকেই বিভিন্ন মহল থেকে বিভিন্ন আলোচনার সূত্রপাত ঘটেছে। বিশেষত যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল পরিচালনায় সরকারের এজেন্ডা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তিনি যে উলঙ্গ অবস্থান নিয়েছিলেন সেটি বারবারই সামনে চলে আসছে। সঙ্গত কারণেই এই সমালোচনার অধিকার যে কারো আছে এবং হয়তোবা তিনি প্রাপ্যও।

কিন্তু তিনি হাসি তামাশার পাত্র নন। দেশের বিরাজমান বাস্তবতায় তিনি যে সত্য নিয়ে হাজির হয়েছেন তা একটি ঐতিহাসিক অবস্থান। তাছাড়া যে অবস্থানের কারণে তিনি দেশত্যাগে বাধ্য হয়েছেন সেটিও কিন্তু তার এক বলিষ্ঠ ভূমিকা যা ইতিহাসের অনন্য উপাদান। তার সে ভূমিকা বাংলাদেশকে একটি বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা করতে পারত।

রাষ্ট্র ও রাজনীতিতে অতীত বর্তমানকে প্রতিষ্ঠিত করার একটি অবলম্বন মাত্র। এস কে সিনহা অতীতে কী করেছেন, কতটুকু অন্যায় করেছেন, কতটুকু ক্ষমার অযোগ্য ছিল তার চেয়ে বড় বিষয় তিনি একটা সময়ে এসে স্বাধীন স্বত্ত্বায় মেরুদন্ড সোজা করে একটি নিপীড়নমূলক সরকয়ারকে চ্যালেঞ্জ করার মতো সাহসী হয়েছিলেন। এবং এর ফলাফলে তিনি বিচার বিভাগের সর্বোচ্চ পদ থেকে বিতাড়িত এবং দেশত্যাগে বাধ্য হয়েছিলেন।

এস কে সিনহার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান হল বাংলাদেশের কাঠামোগত সংকটকে তিনি উপস্থাপন করতে পেরেছেন। বর্তমান সরকারের দানবীয় চরিত্র, সংবিধান লঙ্ঘনের সুস্পষ্ট প্রমাণ, ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান কব্জা করে রাখার নজির দলিলপ্রমাণসহ তুলে ধরেছেন যেগুলো আগামীদিনের আওয়ামী শাসনের ইতিহাস লেখার বিশুদ্ধ উপাদান।

ব্যক্তি সিনহার চরিত্রহনন আওয়ামী প্রোপাগান্ডারই একটি অংশ। এই বই লেখার পর অনেক সচেতন ব্যক্তিবর্গও পরিণাম বা বুঝে সিনহাকে ব্যক্তিগত আক্রমণ করছেন। অথচ বর্তমান বাস্তবতার নিরিখে এস কে সিনহার ‘ব্রোকেন ড্রিম’ বা স্বপ্নভঙ্গ আদতে স্বপ্নভঙ্গ নয় বরং নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা মাত্র।

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন