বৃহস্পতিবার, ১৬ জুন ২০২১; ৪:৪৫ অপরাহ্ণ


অর্থনীতিতে নোবেল স্মারক পুরস্কার অন্যান্য শাখার নোবেল পুরস্কারের চেয়ে আলাদা। আলাদা দুইটি কারণেই, প্রথমত এটি ১৯৬৯ সাল থেকে প্রচলিত নোবেল পুরস্কারের নবতর সংযোজন এবং দ্বিতীয়ত এর সাথে যুক্ত আছে রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণ থেকে শুরু করে নানা সামাজিক উপাদান। অন্যান্য বছরের মতো এবার ২০১৮ সালের অর্থনীতির নোবেলজয়ীদের নাম ঘোষণা করেছে দ্য রয়্যাল সুইডিশ অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেস।

উইলিয়াম ডি নরডাস যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল ইউনিভার্সিটির অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক। ১৯৪১ সালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নিউ মেক্সিকোতে জন্মগ্রহণ করেন। ইয়েল ইউনিভার্সিটিতেই পড়াশোনা করেন তিনি। অন্যদিকে পল এম রোমার চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত বিশ্বব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ও ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫৫ সালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ডেনভারে জন্মগ্রহণ করেন। শিকাগো ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা করেন তিনি।

নোবেল কমিটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, জলবায়ু পরিবর্তনকে দীর্ঘ মেয়াদে সামষ্টিক অর্থনীতির সঙ্গে একীভূত করে বিশ্লেষণের স্বীকৃতি হিসেবে উইলিয়াম ডি. নরডাসকে এবং প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনকে দীর্ঘ মেয়াদে সামষ্টিক অর্থনীতির সাথে বিশ্লেষণের স্বীকৃতি হিসেবে পল এম রোমারকে এই পুরস্কার দেওয়া হয়েছে।

প্রফেসর নরডাস কার্বন ডাই অক্সাইড নির্গমন হ্রাসের জন্য কার্বন ট্যাক্সের প্রস্তাব করেন যেটি অন্যান্য অনেক অর্থনীতিবিদের কাছে জনপ্রিয় পলিসি ইন্সট্রুমেন্ট হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

নরডাসের মডেলটির নাম ইন্টেগ্রেটেড এসেসমেন্ট মডেল যার মাধ্যমে তিনি অর্থনীতি, সামাজিক প্রভাব এবং পরিবেশের মধ্যকার আন্তক্রিয়াকে ধরতে চেষ্টা করেছেন। এই মডেলটি একটি অদ্বিতীয় উপায় যার মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তনকে পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে বিশ্লেষণ করে অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের জলবায়ুগত প্রভাব নির্ণয় করা সম্ভব।

ইন্টেগ্রেটেড এসেসমেন্ট মডেল হল কার্বনের সামাজিক ব্যয় নিরুপণের ভিত্তিস্বরূপ যা এখন বিভিন্ন দেশের সরকার জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলার উপায়গুলোর মধ্যে সর্বোত্তমটি বাছাই করতে সক্ষম। এটি কার্বন ট্যক্স কতটুকু বসানো উচিৎ তারও একটি সংখ্যা উৎপাদন করে।

রোমারের সবচেয়ে বড় অবদান হল আইডিয়া কিংবা নতুন উদ্ভাবনী চিন্তা কীভাবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে সহায়ক হতে পারে যা তিনি অর্থনীতির মডেলের মাধ্যমে দেখিয়েছেন। ১৯৮০ এর দশকে যখন কাজগুলো করেছিলেন এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল ‘ইনডিজেনাস গ্রোথ মডেল’ যেটি তিনি শিল্প বিপ্লবকে বোঝার প্রচেষ্টা হিসেবে করেছিলেন বলে তিনি দাবি করেন।

সচরাচর অর্থনীতিবিদগণ উদ্ভাবনী চিন্তাকে গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু পাবলিক পলিসির বাইরের একটা বিষয় বলেই মনে করতেন। রোমারের অবদান তিনি উদ্ভাবনকে পলিসি টুলসের মধ্যে এনে দেখিয়ে দিয়েছেন যে গবেষণা ও নতুন উদ্ভাবনকে প্রোমোট করার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের বাধাসমূহ দূর করা সম্ভব। বিভিন্ন দেশের পলিসিগত এই পার্থক্যগুলোর কারণেই বিভিন্ন দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বিভিন্ন রকম।

রোমারের মডেলটি সহজভাবে বলতে গেলে যা হয় তা হল সময়ের সাথে সাথে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে যায়। কিন্তু যদি ছোট্ট একটি বিষয় পরিবর্তন করা যায় তাহলে দেখা যায় প্রবৃদ্ধির বিরাট আকারের পরিবর্তন হয় এবং মানুষের জীবনকে পরিবর্তন করে। বর্ধিত প্রবৃদ্ধির বেশিরভাগই আসে নতুন প্রযুক্তি থেকে যা মানুষকে কম শ্রম এবং কম সম্পদ দিয়েও বেশি কাজ করার সুযোগ তৈরি করে। কিন্তু প্রশ্ন হল প্রথম ধাপেই কীভাবে এই উদ্ভাবনের সন্ধান পাওয়া যাবে?

রোমারের মতে অর্থনৈতিকভাবে একটি বাজারের ব্যবস্থা করতে হবে যেখানে নতুন চিন্তা এবং উদ্ভাবন করতে তরুণরা সাহস পাবে আদতে যেটি অর্থনীতিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার তরিকা বলে দিবে। এভাবে সরকারও গবেষণা ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগ করবে। এটাই এনডোজেনাস গ্রোথ থিওরির মূল চিন্তা যেটা বলে যে তুমি নতুন এবং প্রয়োজনীয় চিন্তায় বিনিয়োগ করে এই ক্ষেত্রটাকে বোস্ট করতে পারো যেটি শেষ মেয়াদে গোটা অর্থনীতিটাকেই সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।

২০১৫ সালের দিকে একটি লেখায় রোমার অন্যান্য গ্রোথ মডেলগুলোকে গণিতান্ধ বলে উল্লেখ করেন। গণিতান্ধ মানে হল কোন একটা তত্ব কিংবা মডেলের মধ্যে অন্ধভাবে গণিত ব্যবহার করে সহজ বিষয়কে জটিল করে উপস্থাপন করা। রোমার ২০১৬ সালে বিশ্ব ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হলেও ১৮ মাস পরেই তিনি রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ তুলে পদত্যাগ করেন।

নরডাস এবং রোমারের নাম দীর্ঘদিন ধরেই নোবেলের দাবিদার হিসেবে আলোচিত হয়েছিল কিন্তু তাঁরা যে একসাথে নোবেল পাবেন সেটা হয়ত কেউ ভাবেনি। এই ঘোষণার মাধ্যমে বিশ্ব অর্থনীতির অগ্রসর দেশগুলোর কাছে দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি গুরুত্ব পেয়েছে বলা যায়।

এই স্বীকৃতির মাধ্যমে নোবেল কমিটি একটি বার্তা দিতে চেয়েছে যে বৈশ্বিক অর্থনীতির বিদ্যমান বড় সমস্যাগুলো মোকাবেলায় বিভিন্ন দেশের সরকারগুলোর মধ্যে সহযোগিতা প্রয়োজন।

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন