মঙ্গলবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১; ৮:১৬ পূর্বাহ্ণ


বর্তমানে উচ্চশিক্ষার জন্য বিভিন্ন দেশ থেকেই স্কলারশীপের ব্যবস্থা আছে। কিন্তু ফান্ড, ফ্লেক্সিবিলিটি, লার্নিং ক্যাপাবিলিটি এবং এক্সপোজারের হিসেবে ইউরোপ এখনো একটি আকর্ষণীয় গন্তব্যস্থল। স্কলারশীপের জন্য আবেদনের পূর্বে অবশ্যই যে কথাটি মনে রাখতে হবে তা হল আপনাকে স্কলারশিপ দেয়া মানে হচ্ছে আপনার পিছনে কেউ বিনিয়োগ করছেন এবং তারা এমন কাউকেই খুঁজছেন যাদের কাছ থেকে ভবিষ্যতে রিটার্ন পাবার সম্ভাবনা বেশি।

এই লেখাটি ইউরোপের বিভিন্ন দেশে স্কলারশীপের (কমনওয়েলথ, ডাড, শেভেনিং, অস্ট্রেলিয়া এওয়ার্ড, সুইডিশ এওয়ার্ড ইত্যাদি) জন্য প্রয়োজনীয় হলেও মূলত ইরাসমাস মুন্ডাস স্কলারশীপ নিয়ে কথা বলব। আরো স্পষ্টভাবে ইরাসমাসের মাস্টার্স ইন পাবলিক পলিসি।

কারা আবেদন করতে পারেন?

সাধারণত সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের (Economics/ Development Studies/ Sociology/ Political Science/ IR/ Anthropology/…) গ্র্যাজুয়েটরাই বেশির ভাগ ক্ষেত্রে আবেদন করে থাকেন। এছাড়াও আইন, পাবলিক হেলথ এবং ক্ষেত্র বিশেষে বিজনেস স্টাডিজ, মানবিক অনুষদের এবং আগ্রহী যে কেউ আবেদন করতে পারেন।

স্কলারশিপ পাবার ক্ষেত্রে বিবেচ্য বিষয়:

১। একাডেমিক প্রোফাইল (সিজিপিএ বেশি থাকলে ভাল, তবে শুধুমাত্র সিজিপিএ সব মাপকাঠি না!)

যারা পাশ করে ফেলেছেন তাদের এখানে আর ইম্প্রুভ করার কিছু নাই। ঢাল তলোয়ার যা আছে তা যথেষ্ট মনে করে আত্মবিশ্বাস নিয়ে ঝাপিয়ে পড়ুন। যারা মনে করছেন আপনার সিজিপিএ কম বলে বৃত্তি পাবেন না এবং আত্মবিশ্বাস এর ঘাটতি আছে। আপনারা নিচের ২ ও ৩ নং একটু কষ্ট করে পড়েন, চিন্তা করেন এবং সিদ্ধান্ত নিন। সময় বেশি কম মনে হলে পরের বছরের জন্য এখনি পরিকল্পনা শুরু করুন। আপনার একজন মেন্টর খুঁজে বের করুন, যদি এখনো কেউ না থাকে।

২। আবেদনকারীর মোটিভেশন 

এটি যেকোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক স্কলারশিপ এর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক। অনেক ক্ষেত্রেই ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ স্কোর আবেদনকারীর SOP/ Motivation Letter/ Letter of Intent (LoI) এর উপর নির্ভর করে।

গতানুগতিক SOP লিখে Competitive Scholarship পাওয়া খুবই দুরূহ ব্যাপার। SOP এর ভাষা হতে হবে পরিষ্কার, সহজবোধ্য এবং কনভিন্সিং। আপনার অনেকগুলো কাজ দেখানোর চাইতে ১/২ কাজ এবং তার ফলাফল/ প্রভাব দেখাতে পারানোটাই বেশি অর্থবহ হবে।

যেহেতু ৫০০/৬০০-৭০০/৮০০ শব্দের মধ্যেই SOP লিখতে হয় তাই Activity language এর বদলে Result Language ব্যবহার করলে ইতিবাচক সাড়া পাবার সম্ভাবনা বেশি। SOP ড্রাফট হয়ে গেলে অবশ্যই এবং অবশ্যই নিজ গরজে ২/১ জনকে (যাদের সাথে আপনি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন এবং ক্রিটিকেল মন্তব্য করার সামর্থ্য রাখেন) দিয়ে রিভিউ করিয়ে নিবেন। এই বিষয়ে আপনার পরিচিতদের মধ্যে যারা বিভিন্ন দেশে মাস্টার্স কিংবা পিএইচডি করছেন অথবা আগে করে এসেছেন, তাদের সহায়তা নিতে পারেন।

৩। প্রাসঙ্গিক কাজের প্রতিফলন 

একাডেমিক প্রোফাইল এর পাশাপাশি প্রাসঙ্গিক কাজের প্রতিফলন ঘটানো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যাদের সিজিপিএ একটু কম, তারাও কাজ দেখিয়ে ভাল ফায়দা করতে পারবেন। প্রাসঙ্গিক কাজ হিসেবে আপনার গবেষণামূলক কর্ম, জার্নাল আর্টিকেল (***Publication counts!) এবং পেশাগত অভিজ্ঞতাগুলো ফুটিয়ে তুলুন। অধিকাংশ competitive scholarship এর ক্ষেত্রেই ন্যূনতম ২-৩ বছরের পূর্ণকালীন কাজের অভিজ্ঞতা চাওয়া হয়।

CV/ Resume যেটাই চাওয়া হউক না কেন, আপনার অভিজ্ঞতাগুলো/ মুন্সিয়ানা সেভাবেই Contextualize করে নিবেন।
আরেকটি বিষয়, Mundus Public Policy তে ৪ টি ট্রাক (Global Public Policy; European Public Policy; Political Economy and Development; & Governance and Development) আছে, যেকোনো একটি পছন্দ করতে হবে। আপনি যে ট্রাকে আবেদন করবেন আপনার SOP সেভাবেই সাজাবেন। আপনার সব অভিজ্ঞতার প্রতিফলন ঘটাবেন সেই ট্রাক টার্গেট করে। আপনার SOP দেখলেই যেন মনে হয় আপনার জীবন মরণ সবকিছু ঐ ইস্যুকে ঘিরে।

৪। নেতৃত্ব দেবার যোগ্যতা 

এটা নিয়ে বেশি কিছু বলব না যেহেতু বাংলাদেশের অলিগলিতে লিডারশীপ এক্সপার্ট আছেন- দেশের জনসংখ্যার চাইতেও এক্সপার্ট বেশি বলে মনে হয়। এ বিষয়ে কথা বলতে আমি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি না, তার জন্য দুঃখিত। একটা বাক্যেই বলবঃ আপনার SOP এবং CV তে আপনার লিডারশীপ দেখাতে পারেন ( scholarship পাবার এর জন্য আপনাকে এটা পারতেই হবে!)।

৫। ভাষাগত দক্ষতা

যথারীতি আপনাকে standardized test যেমন IELTS পার করে আসতেই হবে; overall band score 7/7+ রাখার চেষ্টা করুন। আপনার আশেপাশে অনেকেই আছেন ভাল স্কোরার। তাদের কাছ থেকে বুদ্ধি- পরামর্শ নিতে পারেন, এবং দিনশেষে আপনাকেই (বিশেষত আমরা যারা সারাজীবন বাংলা মাধ্যমে পড়াশুনা করেছি) শ্রম দিতে হবে ভালফলের জন্য। একেবারে কাউকে না পেলে Youtube এর সাথে সংসার শুরু করে দিন।

৬। রেফারেন্স লেটার

Reference letter matters!!

সাধারণত ২ (অল্পকিছু ক্ষেত্রে ৩জন!) জনের রেফারেন্স লেটার এর প্রয়োজন হয়। একটি নিতে পারেন আপনার একজন শিক্ষক, যিনি আপনাকে ভাল করে চিনেন এবং চোখ বন্ধ করে আপনার জন্য লিখবেন। আরেকটি পেশাগত/ কর্মক্ষেত্র থেকে নেয়া শ্রেয়।

এই লেটার কে লিখছেন সেটা যতটা না গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ তাতে কি লিখা আছে।

হাই ভোল্টেজ রেফারি (এটা সবার কপালে জুটে না!) পেলে খুবই ভাল, না পেলেও হতাশার কিছু নাই। রেফারেন্স লেটার এর কাজ শেষ মুহূর্তের জন্য ফেলে রাখবেন না। আপনার সম্মানিত রেফারিদের আগেভাগে অবহিত করে রাখুন এবং আপনার পরিকল্পনার (কোথায়, কিসে আবেদন করছেন) কথা জানান, যাতে ওনারা সেভাবেই লিখতে পারেন। যেহেতু ওনারা বিশেষত আমাদের শিক্ষক মণ্ডলী বেশির ভাগ সময় ব্যস্ত থাকেন এবং আপনার মত অনেকেই ওনাদের কাছে রেফারেন্স লেটার নিতে যাবেন, তাই ওনাদেরও কিছুটা সময়ের প্রয়োজন আছে। এখন কিছু ক্ষেত্রে অনলাইনেই রেফেরেন্স চাওয়া হয়। এজন্য আবেদনের প্রক্রিয়া A to Z মুখস্থ করে রাখবেন। বিন্দুমাত্র ভুল করার অবকাশ নেই এখানে!

আরেকটি কথা, যারা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন তারা জানেন আমাদের প্রশাসনিক ভবনগুলো কত বেশি সহায়ক এবং সনদ/ ট্রান্সক্রিপ্ট এর উত্তোলন কিংবা সত্যায়ন কত মামুলি ব্যাপার ! সময়ের অঙ্ক কষে এবং কৌশলী হয়ে কাজগুলো করে নিবেন।

এছাড়াও, কিছু ক্ষেত্রে আবেদন করার জন্য সামান্য কিছু ফি ডলার/ ইউরো তে অনলাইনে পরিশোধ করতে হয়। বাংলাদেশে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই আমাদের ইন্টারন্যাশনাল ক্রেডিট কার্ড এর জন্য পেরেশানিতে এবং শেষ মুহূর্তে একটা দৌড়োদৌড়ির মধ্যে পরতে হয়। এই বিষয়টি শুরুতেই মাথায় রাখা বাঞ্ছনীয়।আশার কথা দিয়ে শেষ করি, বাংলাদেশী শিক্ষার্থীদের Erasmus Mundus Scholarship পাওয়ার সংখ্যা বেশ ভাল এবং এই বছর আরো বেশি ইতিবাচক কিছু আশা করি।

২০১৮-২০ সেশনে পাবলিক পলিসি তে বাংলাদেশ থেকে তারেক ভাই এবং আমি এই স্কলারশিপ পেয়েছিলাম, যেটা খুব কমক্ষেত্রেই ঘটে একই প্রোগ্রামে একই দেশ থেকে ২ জনকে স্কলারশিপ দেয়া। এই বছর সারা বাংলাদেশ থেকে ২০১৯-২১ সেশনে অনেক বেশি এপ্লিকেশন এবং কয়েকজনের Mundus MAPP Scholarship আশা করছি।

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন