শুক্রবার, ২ জানুয়ারি ২০২১; ১০:৫২ অপরাহ্ণ


শ্রোতাদের অনেকের কাছেই তার গায়কী ছিল অনেকটা ‘acquired taste‘। যাদের ভালো লাগতো, লাগতো। তারা প্রায় সাথে সাথেই ভক্তে পরিণত হতো। যাদের ভালো লাগতোনা, তাদের ভালো লাগাতে হলে অনেকবার শুনতে হতো কিংবা গানটি অসাধারণ হতে হতো।

তাই তার ভক্তদের সাথে আজ যারা তার মৃত্যুতে শোকাহত তাদের অনেকেই দ্বিতীয় দলের মানুষ। তাদের অনেকের কাছে গায়ক আইয়ুব বাচ্চুর বদলে গিটারিস্ট বা সূরকার আইয়ুব বাচ্চুকে তাদের বেশি পছন্দের। বলার অপেক্ষা রাখেনা এক সময় হারানোর বেদনা সয়ে নিয়ে ব্যক্তি বাচ্চুকে মূল্যায়ন করবেন তার পরিবার-পরিজন, বন্ধু-বান্ধব, এবং সংগীত জগতের সহকর্মীরা।

বাংলাদেশের ব্যান্ড সংগীত সংশ্লিষ্টদের নোংরা, কাদা ছোঁড়াছুঁড়ির রাজনীতির বাইরে ছিলেননা তার রথী-মহারথীদের কেউই। আশা করি কোনও একদিন কারও স্মৃতিচারণে সত্য বেরিয়ে আসবে, অনেক জল্পনাকল্পনার অবসান হবে। শিল্পী বাচ্চুর সৃজনশীলতার, বাদ্যযন্ত্রে তার দক্ষতা ও কর্তৃত্বের মূল্যায়নের দায়িত্ব বর্তাচ্ছে সংগীতবোদ্ধাদের উপর। আর যাদের জীবনকে তার গান স্পর্শ করেছে, যে গানের কথা, সুর এবং আবেগ জীবনের বিভিন্ন পর্বে, বিভিন্ন গল্পে, বিভিন্ন অভিজ্ঞতায় অণুরণিত হয়েছে তারা লিখছেন কেন তার মৃত্যুতে এক অবর্ণনীয় খারাপলাগা তাদের আচ্ছন্ন করেছে।

এই লেখাটি উপরিউক্ত সকল দৃষ্টিভঙ্গি এড়িয়ে বাংলা ব্যান্ড সঙ্গীতের ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে এই কিংবদন্তীতূল্য সংগীতজগত পরিব্রাজকের ভ্রমণকে লিপিবদ্ধ করার একটি দূর্বল প্রয়াস। স্বাভাবিকভাবেই দুইটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়বস্তুকে অল্প কয়েক অনুচ্ছেদে আলোচনা করতে গেলে অনেক জায়গায় অনেক কিছুকে নির্মমভাবে বাদ দিতে হয়েছে। উদারমনে সেই সকল দোষত্রুটি এড়িয়ে যাওয়ার অনুরোধ রইলো।

পেশাদার মিউজিশিয়ান হিসেবে জীবনের প্রথম দশক বাচ্চু যাদেরকে দিয়েছিলেন বাংলাদেশের প্রথম সুপারগ্রুপ ‘সোলস’ সেই অর্থে রক ব্যান্ড ছিলনা। সুপার সোলস অ্যালবাম প্রকাশকালে এবং তার আশেপাশের সময়ে সোলস ছিল সত্যিকার অর্থে তপনের আধুনিক বাংলা গায়কী এবং নকীবের কীবোর্ড নির্ভর একটি pop ensemble। অ্যালবামে বাচ্চুর উপস্থিতি আর যাই কিছু হোক অন্তত সশব্দ ছিলনা। পেশাগতভাবে সোলসের সাথে সম্পৃক্ত থাকাটা সে সময় বাচ্চুর জন্যে নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। বাংলাদেশের বাজার তখনও তার সঙ্গীতশিল্পীদের স্বচ্ছলতা দিতে পারেনি। সেই প্রেক্ষাপটে সোলসের আয় তার সমসাময়িক যেকোনও ব্যান্ডের চেয়ে বেশিই ছিল।

কিন্তু গিটার দেবতা যার মাঝে ভর করেছেন সে মানুষের পক্ষে বাকি জীবন কেবল টাকা-পয়সার জন্যে পশ্চাতপটে তৎকালীন আইকন নাইল রজার্স কিংবা সাধারণ রকাবিলি রিফ অথবা রিদম বাজানো সম্ভব ছিলনা। সোলসের সুপারহিট অ্যালবামের পরে কাছাকাছি সময়েই বাচ্চু তাই দুইটি একক অ্যালবামে নিজের মনে ইচ্ছেকে প্রাধান্য দিয়েছেন। হয়তো সেগুলো তখন বিশেষ কোনও সাড়া জাগাতে পারেনি, কিন্তু একজন প্রতিভাবান, উদীয়মান মিউজিশিয়ানের সকল লক্ষণই তাতে পাওয়া যায় – অনেক ধরণের স্টাইল নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা এবং পছন্দের বাদ্যযন্ত্র গিটারকে তাতে মেলানোর ঐকান্তিক প্রচেষ্টা।

এর মাঝামাঝি কোনও এক সময় সোলসেও আসে পরিবর্তন। দুই সহোদর নকীব এবং পিলুর বিদায়ের পর সোলসের গানের ধাঁচে একটি লক্ষণীয় পরিবর্তন আসে। ব্যান্ডের গানে বাচ্চুর গিটার আগের চেয়ে বেশি প্রাধান্য পেতে থাকে। ১৯৮৫-র ‘কলেজের করিডোরে’ সেইদিক থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ অ্যালবাম এবং অ্যালবামের ‘খুঁজিস যাহারে’ ততোধিক গুরুত্বপূর্ণ একটি গান।

সঙ্গীতজ্ঞরা হয়তো দ্বিমত পোষণ করবেন, অধমের মতে বাংলাদেশের ব্যান্ড সংগীতের ইতিহাসে ‘খুঁজিস যাহারে’ গিটার-ড্রিভেন পপ জঁনরার প্রথম জনপ্রিয় গান। পরের দিকের গানগুলোর মধ্যে খুব সম্ভবত ‘আণবিক আঘাতে’ গানেও বাচ্চু প্রাণ খুলে গিটার বাজিয়েছিলেন, কিন্তু তপনের উপস্থিতির এবং তার উপর ব্যান্ডের অতিরিক্ত নির্ভরতার কারণে বাচ্চু যেই ধরণের মিউজিক করতে চেয়েছিলেন সেই ব্যাপারে সোলসের একটি অন্তর্গত সীমাবদ্ধতা ছিল।

একে irony বলবেন কিনা জানিনা এক সময় এই সবকিছুর ভারে সোলস নামের ব্যান্ডটি ধীরে ধীরে তাদের ‘সোল’ হারিয়ে ফেলে। বাচ্চুও বিদায় নেন।

একটি রক ব্যান্ড গঠনের অভিপ্রায়ে বাচ্চু যখন সোলস থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন তখন তার মুখ্য পরিচয় ছিল দেশের সেরা গিটারিস্টের। এলআরবি যখন তিনি গঠন করেন তখন তিনি ছাড়া ব্যান্ডে সনাতন অর্থে প্রতিষ্ঠিত কোনও মিউজিশিয়ান ছিলনা। হয়তো বাচ্চু ইচ্ছে করেই তা করেছিলেন। প্রতিভাবান কিন্তু টেকনিকেলি অপরিপক্ক্ব এই তরুণদের তিনি নিজের মতন করে গড়ে তুলতে পেরেছিলেন। প্রথম লাইনআপের প্রত্যেকেই বহুদিন তার সাথে ছিলেন।

বাচ্চু নামের সংগীত মহীরূহের ছায়ায় পুরো ক্যারিয়ারটিই কাটিয়ে দিলেন বেস গিটারিস্ট স্বপন। ড্রামার রিয়াদ তার ক্যারিয়ারের সেরা সময়টি কাটিয়েছেন তার সান্নিধ্যে। নিজেকে তৈরি করে টুটুল এক সময় নিজেই আত্মপ্রকাশ করলেন গায়ক এবং সংগীত পরিচালক হিসেবে। এদের সাথে নিয়েই তিনি তার স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিলেন।

এই প্রসঙ্গে বলতে হচ্ছে যে বাংলাদেশের ব্যান্ড সংগীতাঙ্গনে এলআরবি’র আত্মপ্রকাশ তার ইতিহাসের একটি ক্রান্তিলগ্নে। সেই সময়কার প্রতিষ্ঠিত গিটার গুরুরাও বিভিন্ন ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। অন্তর্মূখী সেলিম হায়দার (ফিডব্যাক) পেশাদার গানবাজনা থেকে ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছেন অথবা গুটিয়ে নিচ্ছেন। নিলয় দাশের নিওক্ল্যাসিকাল ঝংকার দুইটি অ্যালবামের পর থেমে গিয়ে অন্যকিছুর অশনি সংকেত দিচ্ছে। নগরবাউল হওয়ার পথে জেমস তখন শৈল্পিক প্রেরণা খুঁজছেন বিদেশী গানের দেশী কাভারে এবং অন্যান্য পরীক্ষা-নিরীক্ষায়।

দেশের বিভিন্ন স্থানে মঞ্চে অভিষিক্ত হলেও এলআরবি সবার সামনে আসে বিটিভির একটি ব্যান্ড শোর মাধ্যমে। অধমের মতে যারা অংশগ্রহণ করেছিলেন এবং যেই গান গেয়েছিলেন তার বিচারে সেই অনুষ্ঠানটি বিটিভির ইতিহাসের অন্যতম সেরা অনুষ্ঠান। ‘হকার’ গানের মাধ্যমে এলআরবি বাংলাদেশকে জানান দেয় তারা কি করতে চলেছে। অনুষ্ঠানের বছর খানেকের মধ্যেই বের হয় আইয়ুব বাচ্চু তথা এলআরবি’র Magnum Opus – তাদের ডাবল অ্যালবাম। তাদের প্রথম দুই-তিনটি অ্যালবাম থেকে বেরিয়ে আসে আজকের দিনের বাংলা ব্যান্ড সঙ্গীত ইতিহাসের স্বীকৃত ক্লাসিক গানগুলো। এই গানগুলোর সাথে কাউকে নতুনভাবে পরিচয় করিয়ে দেয়া নিষ্প্রয়োজন।

বিচক্ষণ পাঠকমাত্রেই খেয়াল করেছেন শিরোমানেই আইয়ুব বাচ্চুকে অভিহিত করা হয়েছে ক্রান্তিকালের গিটার হিরো হিসেবে। লেখার প্রায় শেষের দিকে তার ব্যাখ্যা দেওয়ার কাজটা কালাতিক্রান্ত হওয়ার পথে। বৈশ্বিক ব্যান্ড সঙ্গীত জগতে হার্ড রক এবং হেভি মেটাল জঁনরার আধিপত্য তখন তুঙ্গে। সত্তরের শেষ দিক থেকে আশির দশক পর্যন্ত বাংলাদেশেও এই ব্যান্ডগুলোর ভক্তের সংখ্যা অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। নব্বই যখন আসি আসি তখন এই তরুণ ভক্তকূল সঙ্গীতাঙনে ধীরে ধীরে প্রবেশ করেছে। বাম্বা’র বড় পরিসরের কন্সার্টে কম-বেশি উপস্থিতি থাকলেও তাদের দেখা যেত বিশেষত অপেক্ষাকৃত ছোট অডিটোরিয়ামে।

এলআরবি’র ডাবল অ্যালবাম বাজারে আসার আগেই ওয়ারফেজ এবং রকস্ট্রাটার অ্যালবাম দুইটি দিয়ে এই তরুণ তুর্কীরা ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিউট এবং রাশিয়ান কালচারাল সেন্টারের পাঁচিল টপকে আমাদের ঘরে ঢুকে পড়ে, ক্যাসেট প্লেয়ারে স্থান করে নেয়। এরপরের বাংলাদেশের গিটার হিরোরা এসেছেন সেই জঁনরার মধ্যে থেকেই।

এর ফলে সোলস-ফিডব্যাকদের পপ আর ওয়ারফেজ-রকস্ট্রাটার হেভি মেটাল যুগের মাঝখানে ক্রান্তিকালের মানুষ হয়ে রয়ে যান দুই বন্ধু আইয়ুব বাচ্চু আর জেমস।

তাদের দু’জনের পথ অবশ্য তখন আলাদা হয়ে গেছে। বাচ্চু যখন তার গিটারে সুরের ব্যপ্তি এবং বৈচিত্র্যের সম্ভার ঘটানোতে মনোনিবেশ করলেন আর জেমস নিজের গায়কীতে জোর দিয়ে গিটারের কাজকে সীমাবদ্ধ করলেন নিজস্ব signature sound-এ। তাই অধমের কাছে বাচ্চুই রয়ে গেলেন ক্রান্তিকালের গিটার হিরো আর জেমস হয়ে গেলেন ক্রান্তিকালের রকস্টার।

আইয়ুব বাচ্চুকে শেষবার দেখার অভিজ্ঞতার কথা দিয়েই ইতি টানা যাক। প্রায় দুই দশক আগে টিএসসি’র অডিটোরিয়ামে বিভাগীয় অনুষ্ঠানে আরও কয়েকটি ব্যান্ডের সাথে হাজির ছিলেন বাচ্চু ও এলআরবি। সেইদিনটির জন্য টিএসসি বিভাগীয় নিয়ন্ত্রণে থাকার কথা থাকলেও ব্যান্ডজগতের দিকপালদের উপস্থিতির কথা লোকমুখে ছড়িয়ে পড়েছিল সারা বিশ্ববিদ্যালয়ে। আস্তে আস্তে লোক জমতে শুরু হওয়ার এক পর্যায়ে প্রধান ফটকে দাঁড়ানো স্বেছাসেবকেরা এবং অন্যান্য দায়িত্বপ্রাপ্তেরা বুঝতে পারেন এই জনস্রোত সামলানো তাদের কাজ নয়। ভাগ্যের ফেরে সবার শেষে মঞ্চে ওঠা বাচ্চুকেই তাগাদা দেয়া হয় দ্রুত অনুষ্ঠান শেষ করার।

অল্প কিছু গান গেয়ে বিদায় নেয়ার সময় বাহ্যত হতাশ বাচ্চু বলেছিলেন তিনি গাইতে চেয়েছিলেন আরও অনেক ক্ষণ। মনে হয় একই আক্ষেপ নিয়েই তিনি চলে গেলেন চিরতরে।

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন