রবিবার, ১৯ জুন ২০২১; ৩:৪১ পূর্বাহ্ণ


অবৈধ অভিবাসন আমেরিকার একটি প্রধানতম সমস্যা অবৈধ অভিবাসনের সাথে মাদক,সন্ত্রাস এবং সন্ত্রাসবাদের আক্রমণ হতে পারে এমন আশংকা প্রবলভাবে জড়িত৷বৈধ অভিবাসনের কারনে আমেরিকার মতে অর্থনীতি সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে, অবৈধ অভিবাসীদের বিচার করতে গিয়ে প্রচুর টাকা খরচ হচ্ছে,ঠিকমতো স্বাস্থ্য সেবায় আমেরিকানরা প্রবেশ করতে পারছে না এবং শিক্ষা ব্যবস্থা মারাত্নক ভাবে প্রভাবিত হচ্ছে৷

-টিমোথি মার্ফি

মেক্সিকো বর্তমান বিশ্ব রাজনীতিতে আলোচিত এক দেশের নাম কারন তার ধনী প্রতিবেশী আমেরিকা দেয়াল তুলে দিতে চাইছে দুই দেশের সীমান্তে অবৈধ অভিবাসীর প্রবেশ ঠেকানোর জন্য৷ তবে একটি তথ্য আপনাকে নিশ্চয় চমকে দিবে যে বর্তমানে মেক্সিকোতে ২০০০ সালের পর থেকে সবচেয়ে কম মানুষ ইমিগ্রেশনের জন্য আবেদন করেছে৷ যেই মেক্সিকো কে আমরা অভিবাসী রাষ্ট্র হিসেবে জানি আর প্রেসিডেন্ট  ট্রাম্প যে রাষ্ট্রটিতে তার অধিক সংখ্যক অভিবাসনের জন্য,মাদকের জন্য বারবার দেয়াল তুলে দিতে চায় সেই রাষ্ট্রের হঠাৎ অভিবাসনের আবেদন কমে যাওয়া সত্যিই অবাক হবার মতো৷

আমার এই লেখাটিতে দেখানোর চেষ্টা করবো যে মেক্সিকোর প্রচুর সংখ্যক মানুষের অভিবাসী হতে চাওয়ার পিছনে কী ভাবে মাদক জড়িত৷ কেন এবং কি কারনে মেক্সিকোর মানুষ যাকে আন্তর্জাতিক  রাজনীতিতে বলে  Transnational organized crime জীবন বাঁচানোর জন্য ভীত হয়ে কেন অধিক সংখ্যক মানুষ অন্যন্য দেশে বিশেষ করে আমেরিকা তে চলে যেতে চাইছে৷

সাম্প্রতিক কালে একটা প্রতিবেদনে দেখা গেছে যে ২৬৪,৬৯২ মেক্সিকোন বলেছে যে তারা বিভিন্ন মাদক সংক্রান্ত অপরাধে জড়িত হয়ে যাওয়ার ভয়ে জীবন বাঁচানোর তাগিদে অন্য রাষ্ট্রে অভিবাসী হতে চায়৷

মেক্সিকো অভিবাসীর সংখ্যা ২০০০ সাল থেকেই কমতে শুরু করেছে আগে বছরে যেখনে ৫ লাখ ২৫ হাজার অভিবাসী হওয়ার জন্য আবেদন করতো এখন সেখানে প্রায় ১ লাখ মেক্সিকান অভিবাসী হওয়ার জন্য আবেদন করছে এর পিছনে কারন হিসেবে বলা যায় অনেক মেক্সিকান মেক্সিকোতে কলেজ ড্রিগী গ্রহন করছে এবং বর্ডার ক্রস করার খরচ প্রতিনিয়ত বেড়ে যাচ্ছে যা বেশিরভাগ মেক্সিকান বহনে প্রায় অসমর্থ তাই তাদের বর্ডার ক্রস করার হার প্রতিনিয়ত কমে যাচ্ছে বা তারা সীমান্ত অতিক্রম করতে পারছে না

মেক্সিকোর মাদক সংক্রান্ত দূর্ঘটনা:

ভয় আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ! আমরা জানি না কখন গোলাগুলি শুরু হবে আর কখন আমরা আমাদের জীবন হারাবো৷ – তিজুয়ানার এক নাগরিক, তিজুয়ানা মেক্সিকোর অন্যতম মাদক কবলিত অঞ্চল

মাদক  সংক্রান্ত দুর্ঘটনা গুলো মেক্সিকোতে অন্য রকমের আকার ধারন করেছে৷ আগে যে রকম যে ধরনের দুর্ঘটনা হতো এখন মেক্সিকোতে অন্য ধরনের অন্য রকমের দুর্ঘটনা হয়৷ বর্ডার অঞ্চল তিজুয়ানা তে আগে প্রতি বছর একশো পুলিশ অফিসার মারা যেতো দায়িত্ব পালন কালে৷ ২০০৮ সালে শুধু আমেরিকান বর্ডারেই একশো তেত্রিশ পুলিশ অফিসার মারা গেছে দায়িত্ব পালন কালে৷

ক্রিমিনাল  সংগঠন গুলো নানা ধরনের অপরাধ করছে এবং বিভিন্ন ধরনের অপরাধের সাথে ঝড়িয়ে পরছে ! তারা বিভিন্ন ধরনের অপরাধ করছে এবং তারা এখন বিকল্প ব্যবসার জন্য পথ খুঁজছে এবং তারা এখন বিকল্প ব্যবসার দিকে ঝুকে পরছে৷

অপহরন  মেক্সিকোতে অন্যতম অবৈধ বানিজ্য৷ সন্ত্রাসীরা  অপহরন করে সাধারনত বিভিন্ন পতিতালয় চালানো আর ক্যাসিনোতে তাদের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য৷ এছাড়াও বিভিন্ন ব্যবসায়ীদের অপহরন করেও টাকা সংগ্রহ করে৷

২০০৬ সাল থেকে ২০১০ সাল পযর্ন্ত কিছু মেক্সিকান শহর এমনিতেই খালি হতে শুরু করলো আর হঠাৎ করে হওয়া এই অভিবাসন আমেরিকাকে চিন্তার মধ্যে ফেলে দিলো কারন বেশিরভাগ অভিবাসীর গন্তব্য ছিলো আমেরিকা আর মেক্সিকানরা নিয়মিত এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় বর্ডার অতিক্রম করে এবং মেক্সিকানদের কাছে আমেরিকান বর্ডার অতিক্রম করা তেমন কোন সমস্যাই না কারন অনেক মেক্সিকান আমেরিকাতে বাস করে তাই মেক্সিকানদের কাছে আমেরিকান সীমানা অতিক্রম করা মানে হলো মেক্সিকোর এক শহর থেকে অন্য শহরে যাওয়া৷ যেভাবে ২০১০ সাল থেকে মেক্সিকানদের মধ্যে সীমান্ত অতিক্রম করার হার কমে যায় তবে সীমান্তবর্তী অঞ্চল গুলোতে অভিবাসীর সংখ্যা ব্যাপক আকারে বেড়ে যায় কারন ক্যালির্ফোনিয়ায় যাওয়ার চেয়ে টেক্সাসে অবস্থান করা সহজ৷

মাদকের কারনে  যেসব খুনগুলো হয় সেগুলো অন্যান্য খুন থেকে আলাদা কারন মাদকের কারনে হওয়া খুনগুলোতে মাথা আলাদা করে দেওয়া হয় দেহ থেকে, গলায় ফাঁস দিয়ে হত্যা করা হয় যাতে এই খুনগুলোকে সাধারন খুনগুলো থেকে আলাদা করা যায় এবং মাফিয়াদের যেন সবাই ভয় পায় তাই খুনগুলোর মূল উদ্দেশ্য থাকে ভয় ছড়ানো৷ অপহরন এখন মেক্সিকোর অন্যতম এক ক্রাইমে পরিনত হয়েছে এবং কিডন্যাপারদের প্রধান লক্ষ্য থাকে ধনী ব্যাক্তিরা তার ফলে অনেক ধনী মেক্সিকান আমেরিকাতে পালিয়ে যাচ্ছে জীবন বাঁচানোর জন্য৷ এই ধনী মেক্সিকানরা তাদের সব সম্পদ বিক্রি করে আমেরিকাতে পাড়ি দিচ্ছে আর এর ফলে কিন্ত লাভবান হচ্ছে আমেরিকা কারন আমেরিকাতে বিনিয়োগ বাড়ছে ধনী মেক্সিকানদের দ্বারা৷

আমরা প্রায় সব সময় সাধারনত মনে করি যে অভিবাসনের কারন হলো বেকারত্ব অথবা দারিদ্র্য কিন্ত নতুন একটি গবেষণায় দেখা গেছে ড্রাগ সংক্রান্ত কারনে মেক্সিকোর মানুষ অনেক বেশি পরিমানে অভিবাসী হয়৷

মেক্সিকো থেকে অভিবাসী হয়ে আসার কারনে সবচেয়ে বেশি সুবিধা হয়েছে হাউজিং কোম্পানিগুলোর কারন বর্ডার অঞ্চলে অভিবাসীরা আসার পর তারা বাড়ি কিনছে৷ যেমন যেখানে ক্যালির্ফোনিয়া অথবা শিকাগোতে হাউজিং ব্যবসায় ধস নেমেছে সেখানে ট্রেক্সাসে হাউজিং ব্যবসার উত্তরোত্তর উণ্ণতি হয়েছে৷ আর এই সব অভিবাসীদের পরিবার বৃহৎ হওয়ায় বড় আ্যাপার্টমেন্ট এর চাহিদা বেড়েই চলছে৷

অভিবাসনের ব্যাপারে সকলের একটা কমন ধারনা আছে অভিবাসনের ফলে যে দেশে অভিবাসীরা যাচ্ছে সেই দেশে প্রচুর পরিমানে বেকারত্বের তৈরি হয় কারন অভিবাসীরা শ্রম বাজারে প্রবেশ করে কোন একটি কাজ সেই দেশের নাগরিকদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেয় কিন্ত খুবই গূরত্বপূর্ন যে ব্যাপারটা আমরা ভুলে যাই তাহলো যেমন মেক্সিকোতে দেখা গেছে অভিবাসনের ফলে বিনিয়োগ বেড়েছে কারন ধনী মেক্সিকানরা তাদের সব বিক্রি  করে আমেরিকাতে এসে সেই অর্থ আমেরিকায় বিনিয়োগ করেছে৷ আমেরিকাতে মেক্সিকান রেষ্টুরেণ্ট, সেলুন, বার ইত্যাদি  বৃদ্ধি পেয়েছে৷ এমনকি আমেরিকান যে ব্যবসায়ীরা আগে মেক্সিকো তে বিনিয়োগ করতো তারাও আজ মেক্সিকো থেকে আমেরিকায় বিনিয়োগ করে ড্রাগ সংক্রান্ত অপরাধ থেকে মুক্তির জন্য৷

আমেরিকার বিদ্যালয়ের কাঠামোতে ও শিক্ষদান পদ্ধতিতেও পরির্বতন এসেছে কারন অনেক মেক্সিকান অভিবাসীর সন্তানরা আমেরিকায় পড়াশোনা করছে এবং আমেরিকার সংস্কৃতির সাথে মেক্সিকান সংস্কৃতির আদান প্রদান হচ্ছে৷

মেক্সিকো সিটি যেটা মেক্সিকোর রাজধানী সেখানে অনেক মেক্সিকান ধীরে ধীরে ফিরে গেছে বা ফিরে যেতে চায় কারন তারা ভাবে মেক্সিকো সিটি পর্যটকদের জন্য অন্যতম আর্কষনীয় স্থান৷ মেক্সিকো সিটি ব্যবসার বিনিয়োগের জন্যও সুবিধাজনক স্থান ছিলো কারন ৬,৫০০ ব্যবসায়ী ২০১০ সালে আবার মেক্সিকো তে ফিরে গেছে কারন সেখানে বিনিয়োগের সুস্থ পরিবেশ আস্তে আস্তে ফিরে আসছে৷আমেরিকা যদি আসলেই চায় অভিবাসী বিশেষ করে মেক্সিকান অভিবাসীরা তাদের দেশে না আসুক তাহলে সর্বপ্রথমে মেক্সিকোতে যে ড্রাগ সংক্রান্ত অপরাধ গুলো হয় তা বন্ধ করতে হবে৷

একটা সমীক্ষায় দেখা গেছে যে ৫৫ শতাংশ মেক্সিকান অভিবাসী তাদের রাষ্ট্রে ফিরে যেতে চায় যদি ফিরে যাওয়ার সুযোগ থাকে৷ তাই নীতি নির্ধারকদের জন্য এখনই সময় কীভাবে মাদক সংক্রান্ত অপরাধ কমানো যায় তা ভেবে দেখা তা নাহলে আমেরিকানরা মেক্সিকান অভিবাসী ঠেকাতে পারবে না এবং সবচেয়ে বড় কথা এটা মেক্সিকো সর্বপোরি পুরো উত্তর আমেরিকার জন্য মঙ্গলজনক হবে না৷

 

Source: World Drug Report 2017 and 2018 (United Nations office on Drug and crime )

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন