, ১ জানুয়ারি ২০২১; ৪:৫১ অপরাহ্ণ


পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্র দুটি পৃথক আর্থ-রাজনৈতিক মতাদর্শ। মানুষের সামগ্রিক সংকট মোকাবেলায় উভয়ই ভিন্নপথ অবলম্বন করে অগ্রসর হয়েছে। সামন্তসমাজের ধারা পেরিয়ে অগ্রসর হয়েছে বুর্জোয়া সমাজ। কার্ল মার্কসের মতে, “আধুনিক রাষ্ট্রের শাসকমণ্ডলী বুর্জোয়া শ্রেণীর সাধারণ কাজকর্ম ব্যবস্থাপনার একটি কমিটি মাত্র। সামাজিক উৎপাদনের প্রক্রিয়ায় নতুন আর্থিক কাঠামো গড়ে ওঠে পুঁজিবাদী বিকাশের মাধ্যমে। ব্যক্তিমালিকানার স্বীকৃতি, পুঁজির আগ্রাসী বিস্তার লাভ ও উৎপাদনের উপকরণের বিশাল পরিসরকে কাজে লাগিয়ে মুনাফা এবং আধিপত্যের জাতীয়-আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাপনা গড়ে ওঠে। স্থানীয় পুঁজি থেকে বিশ্বপুঁজি এবং স্থানীয় উৎপাদনকে স্থানীয় বাজার পেরিয়ে বিশ্ববাজারে নিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়ায় পুঁজিবাদের বিকাশ ও বিস্তার ঘটে।”

পুঁজিবাদী উৎপাদন সম্পর্কের উৎস ও বিকাশ সমগ্র উৎপাদনী ক্রিয়াকে প্রাণবন্ত করে তুলেছিল। তা শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রকাশ ও বিকাশের অব্যাহত প্রেরণা জুগিয়েছে। ভ. ই. লেনিন পুঁজিবাদের সর্বোচ্চ রূপকে ‘সাম্রাজ্যবাদ’ বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। বাস্তবে পুঁজিবাদের বিকাশে যে উন্নয়ন ও ভোগবিলাসের ক্ষেত্র প্রস্তুত হয় তা সংকটমুক্ত নয়। মানবিকতাকে উপেক্ষা করে পুঁজির আত্মকেন্দ্রিক বিকাশ, সম্পর্কের যান্ত্রিকায়ন, বিচ্ছিন্নতা ও শোষণ ক্রমাগত স্পষ্ট হয়েছে।

রাষ্ট্রীয় একচেটিয়া পুঁজিবাদের বিভিন্ন শ্রেণী গড়ে উঠেছে। আর্থিক ও বাণিজ্যিক পুঁজির রূপ পেরিয়ে সামাজিক পুঁজি ও সাংস্কৃতিক পুঁজির পথ ধরে টিকে থাকতে চাচ্ছে পুঁজিবাদ। শ্রমের চরিত্র ও শ্রমপ্রক্রিয়ার পরিবর্তন ঘটিয়ে পুঁজিবাদ নিজেকে মানিয়ে নিতে সচেষ্ট হয়েছে। বস্তুগত সম্পদের বাইরে বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদের ক্ষেত্রেও প্রসারিত হয়েছে পুঁজিবাদের নজর। দারিদ্র্যমুক্তি, উন্নয়ন ও গণতন্ত্রের বিকাশের কথা বলে পুঁজিবাদের সংস্কার ঘটানো হয়েছে।

কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের মাধ্যমে নতুন রূপে বিকশিত হয়ে পুঁজিবাদ আজ মুক্তবাজার ও বিশ্বায়নের নতুন রূপে বিকশিত। তা সত্ত্বেও পুঁজিবাদের বিশ্বসংকট আড়ালে থাকেনি। বিক্ষোভের বৈশ্বিক প্রকাশ ঘটেছে দেশে দেশে।

পুঁজিবাদের ব্যর্থতা —বিরোধের পথ ধরে সমাজতন্ত্রের চিন্তা ও আন্দোলন ক্রমবিকশিত হয়েছিল অসাম্য, বৈষম্য ও শোষণ থেকে মানুষের মুক্তির লক্ষ্য নিয়ে। সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্য আর ঔপনিবেশিক শোষণমুক্তির লক্ষ্য হলো সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম। সাম্যভিত্তিক একটি আদর্শ সমাজের রূপরেখা প্রকাশ করা হয়। কাল্পনিক সমাজতন্ত্র থেকে গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র এবং সাম্যবাদী সমাজতন্ত্রমুখী অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকে। সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী প্রক্রিয়া ও জাতীয় মুক্তির সাফল্যের লক্ষ্য নিয়ে অগ্রসর হতে থাকে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব ও ভাবাদর্শের সংগ্রাম। পুঁজিবাদী শোষণব্যবস্থা আর বুর্জোয়া রাষ্ট্রতন্ত্র অবসানের লক্ষ্যে শ্রমিকশ্রেণীর রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলন চলে। শ্রেণী শোষণের বিপরীতে সামাজিক মালিকানাভিত্তিক নতুন সামাজিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা চলে। উৎপাদনের উপায়ের উপর সমাজতান্ত্রিক মালিকানা প্রতিষ্ঠার ব্যবস্থা গৃহীত হয়।

সমাজতান্ত্রিক সমাজে বদলে যায় শ্রমের চরিত্র। সমাজতন্ত্র বিকাশের পরিস্থিতিতে কী ধরনের রাজনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা যায় এবং বৈপ্লবিক গণতান্ত্রিক পার্টির নেতৃত্বে প্রগতিশীল সংগঠনের জোট গঠন করা যায় তা নিয়ে চলে আলোচনা-সমালোচনা। সমাজতান্ত্রিক দেশগুলো বিদ্যমান রাজনৈতিক সমস্যা সমাধানের জন্য বহুদলীয় ব্যবস্থা প্রবর্তনে সচেষ্ট হয়। বিপ্লবোত্তর অবস্থায় বহুদলীয় ব্যবস্থায় সপক্ষে যুক্তি উত্থাপিত হয়। সমাজতন্ত্রও সংকটের মুখে পড়ে সমাজতান্ত্রিক বিশ্বব্যবস্থা প্রবর্তনের প্রক্রিয়ায়। সমাজ-সংস্কারের প্রক্রিয়ায় সমাজতন্ত্রের বাস্তবায়ন গুরত্ব পায়। জাতীয় মুক্তি, নারীমুক্তি, মুক্তচিন্তা, বিজ্ঞান ও ধর্মের সঙ্গে সমাজতন্ত্রের সম্পর্ক বিষয়ে নানা আলোচনা-পর্যালোচনা চলে। সমাজতন্ত্রের প্রয়োজন এবং এর ভবিষ্যত নিয়ে বাড়তে থাকে আলোচনার পরিসর।

একদিকে সাম্রাজ্যবাদী শোষণ-প্রক্রিয়া এবং অন্যদিকে সমাজতন্ত্রের ভাঙ্গন মানব জাতিকে নতুন সংকটে নিয়ে যায়। সমাজতান্ত্রিক বিশ্বের বিপর্যয়, সমস্যা ও সংকট নিয়ে চলে আলোচনা। পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্রের স্বাতন্ত্র্য, সংকট এবং সংকটমুক্তির লক্ষ্যে করণীয় স্থির করা হয়। পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্রের বৈশিষ্ট্যগত বৈপরীত্য ও পার্থক্য অনিবার্য হয়ে ওঠায় জনকল্যাণের ভুমিকা নিয়ে আবির্ভূত হয়। যাতে কল্যাণমূলক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় উভয় মতাদর্শের ভালো দিকগুলো গৃহীত হয়।

কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের উদ্ভব ঘটে আঠার ও উনিশ শতকে। ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের নেতিবাচক দিকগুলো পরিহার করা হয় এতে। আর কল্যাণমূলক রাষ্ট্রে সকল নাগরিকের কর্মসংস্থান, আয়, শিক্ষা,স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তার সুযোগ-সুবিধাগুলো নিশ্চিত করা হয় খুব গুরুত্বের সাথে।

বিজ্ঞানের আবিষ্কার আর শ্রমিকের জ্ঞানের ফসলে মানব সভ্যতায় উৎপাদন ব্যবস্থা কায়েম আছে। এখানে পুঁজিপতিদের বিন্দুমাত্র কৃতিত্ব নেই। কর্পোরেট মালিকেরা নিজেদের উৎপাদনক্ষেত্রে বা কারখানায় গিয়ে হাতুড়িতে কোনোদিন একটুও স্পর্শ করেন নাই। তারা শ্রমিকের রক্তচুষে যে সম্পদ আর পুঁজির পাহাড় তৈরি করেছে, সেটার জোরে মানুষের জ্ঞানলব্ধ ফসলকে কুক্ষিগত করে নিজেরাই ব্যাপকহারে মুনাফা সঞ্চয় করছে। এটাই সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের মধ্যখানের মূল পার্থক্যটা খুব ভালো করে স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দেয়। দুটো ক্ষেত্রেই উৎপাদনের এক হল “শক্তি” (শ্রমিক,কৃষক) এবং দুই হল “উৎপাদনের উপাদান” (হাতুড়ি,কম্পিউটার,লাঙ্গল,রেঞ্চ)। সামাজিক হলেও সোশ্যালিস্ট দেশে তার মালিক রাষ্ট্র। কিন্তু পুঁজিবাদী দেশে সেটা ব্যক্তি মালিকের কুক্ষিগত হয়ে যায়। বিজ্ঞান সব রোগের ওষুধ আবিষ্কার করে দিয়েছে। কিন্তু চাইলেই মানুষ বিজ্ঞানের এই দানকে নিজেদের কল্যাণে ব্যবহার করতে পারবে না।

যদি ওষুধ কোম্পানিকে দ্রব্যটির মূল্য দেয়ার মত অর্থ তার না থাকে। এটাই হল নির্মম পুঁজিবাদ। আর কোন মালিকই জন্ম থেকে মালিক হয়ে পুঁজি নিয়ে দুনিয়ায় আসে না। পৃথিবীকে প্রতারণা করে, সে ন্যায্য প্রাপ্য থেকে শ্রমিকদের বঞ্চিত করেই তৈরি করে তার নিজস্ব পুঁজির পাহাড়। শ্রমিক যত শোষিত আর নিষ্পেষিত হতে থাকে, ততই মালিকের সম্পদ আর টার্নওভারের পরিমাণটাও গাণিতিকহারে বাড়তে থাকে। কিছু অজ্ঞ আর অসচেতন লোকের ধারণা হল মালিকই শ্রমিককে রুটি দেয় এবং রুজির ব্যবস্থা করে থাকে। অথচ বাস্তবটা একেবারেই ঠিক উল্টোদিক।

মালিক শ্রমিককে নিয়োগ করে নিজের স্বার্থে। যখন প্রয়োজন ফুরিয়ে যায়, তখন শ্রমিককে ঘাড় ধাক্কা দিতে মালিকেরা এক মুহুর্তও সময় নেয় না। মালিক কোনদিনই ছাঁটাই হওয়া শ্রমিকের ঘর, পরিবার, সন্তানের অসুখ ও শিক্ষা এসবের চিন্তা করে না। সে শুধু বোঝে নিজের স্বার্থ। কাজেই উৎপাদিত সামগ্রী বা আবিষ্কার কোন পুঁজিপতির পৈতৃক সম্পত্তি কখনই নয়। তাই শ্রমিকের পরিশ্রম, বুদ্ধিমত্তা ও বিজ্ঞানের অবদানের দ্বারা নির্দ্বিধায় এই শ্রমিকের সৃষ্ট পণ্য এবং প্ৰযুক্তিকে ব্যবহার করতে পারে মালিকের বাজারে বিক্রির জন্য।

পরিশেষে বলা যায়, সর্বজনীন কল্যাণের দিকে গুরুত্ব দিয়ে সম্পদের সুষম বন্টন ও ব্যক্তির স্বাধীনতা সংরক্ষণ করার ব্যবস্থা গৃহীত হয় এতে। কালক্রমে উদার অর্থনীতি ও মুক্তবাজার অর্থনীতির পথপরিক্রমায় আত্মপ্রকাশ ঘটে বিশ্বায়নের। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সহায়তায় তা দ্রুতবেগে অগ্রসর হচ্ছে। বিশ্বব্যাপী সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থাকে পরস্পরনির্ভরশীল করা ও সামাজিক সম্পত্তির প্রসারকরণের প্রক্রিয়া চলে। তাই বিশ্বায়নেরও আছে ইতিবাচক এবং নেতিবাচক দিকসমূহ।

 

তথ্যসুত্র ::

(01) Making Globalization Work. —> Joseph E. Stiglitz.

(02) Globalization and Its Discontents. —> Joseph E. Stiglitz.

(03) Freefall: America, Free Markets, and the Sinking of the World Economy.
—> Joseph E. Stiglitz.

(04) The Price of Inequality: How Today’s Divided Society Endangers Our Future.
—> Joseph E. Stiglitz.

(05) The Great Divide: Unequal Societies and What We Can Do About Them.
—> Joseph E. Stiglitz.

(06) On Economic Inequality. —> Amartya Sen.

(07) Inequality Reexamined. —> Amartya Sen.

(08) A Contribution to the Critique of Political Economy. —> Karl Marx.

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন