রবিবার, ১২ জুন ২০২১; ৫:৫১ অপরাহ্ণ


বিদেশে একটা ইউনিভার্সিটিতে পড়াইতাম। বিদেশের পোলাপানরে বিদেশী জিনিস পড়ায়ে ঠিক জুত পাইতেছিলাম না। ভাবলাম দেশে যাইয়া দেশী জিনিস পড়াই। নর্থ সাউথে চলে আসলুম। কয়দিন পর প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়েও জুত করতে পারলাম না। কেমন জানি সফিস্টেকেড কোচিং সেন্টার টাইপ মনে হইতেছিল। তখন পুরানো ক্যাম্পাসে এনএসইউ। আরো বেশী বাক্স বাক্স টাইপ। ভাবলাম মায়ের কোলে ফিরে যাই, আহা ঢাবি, আলমা মেটার।

তাই আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসছিলাম পড়াইতে, গবেষণা করার কোন উচ্চমার্গীয় চিন্তা আমার কখনই ছিল না। এই ব্যাপারে আমার ব্যক্তিগত মতামত হইলো ত্যানা মার্কা জার্ণালে হাবি জাবি পাবলিশ কইরা প্রমোশন নেয়ার চেয়ে একটা ব্যাচের ছেলেমেয়েদের পিছনে পরিশ্রম কইরা ওদের মানুষ করা, ওদের মধ্যে আমার সামান্য, ক্ষুদ্র জ্ঞানের কিছুটা হলেও যদি ওদের সাথে শেয়ার করা হাজার গুণে বেশী মূল্যবান।

বিশেষ করে বাংলাদেশের মতন একটা দেশের কনটেক্সটে যেখানে এখন চলছে পপুলেশন ডিভিডেন্ডের যুগ, সবচেয়ে বেশী তরুণ এখন এই জনসংখ্যার অংশ, সেই তরুনদের শিক্ষিত, দক্ষ, আন্তর্জাতিক জব মার্কেটের জন্য শ্রম শক্তি তৈরী করাটা হওয়া উচিৎ নাম্বার ওয়ান প্রায়োরিটি।

কেউ বলতে পারে আপনে তো দুইটাই করতে পারেন, ভালো পড়াইতে পারেন, ভালো গবেষণাও করতে পারেন সমস্যা কি?

এই বিষয়ে আমার উত্তর হইলো বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা করার বিষয়টা হলো এরকম, আমার বাথরুমে টয়লেট হইলো বাংলা টাইপ। আবার সেই বাথরুমে দরজা, জানালা ভাঙ্গা। বসলে সব দেখা যায়। তো আমি দরজা ঠিক না কইরে সারা দিন মশগুল কেমনে বাংলা টয়লেট বদলে সেখানে কমোড লাগানো যায়।

গবেষক ভাই ও বোনেরা, আপনারা যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা কেন হয় না এই নিয়ে গবেষণা করতে করতে উড়ায়া ফালান, আর মনে করেন কিছু ফান্ডিং আসলেই বানের জলের মতন গবেষণা শুরু হইয়া যাইবো, আপনারা সবাই ব্যাপকভাবে বোকার স্বর্গে আছেন। কোন দেশে গবেষণা শুধু টাকা দিয়া হয়না। গবেষণা অনেক জটিল এবং কঠিন জিনিস। এর জন্য লাগে উন্নত ইনফাস্ট্রাকচার, শক্তিশালী পিয়ার গ্রুপ, সরকারী এবং বেসরকারী সিস্টেমেটিক ফান্ডিং । সেই সাথে ইউনিভার্সিটিতে থাকতে হয় পাবলিশ অর পেরিশ এর মতন কঠিন মৃত্যুবাণ। গবেষণা করেছো নয়তো মরেছো।

এইসব নিয়েই হয় বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার এক কমপ্লিট ইকোসিস্টেম। এর কিছুই নাই, আপনে চাইতেছেন আসমান থেকে গবেষণা টপাটপ কইরে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে থাকুক। আপনার আশার বলিহারী। আপনার বাথরুমের দরজা জানালা ফিক্স না করে গবেষণার কমোডে যাওয়াটা খুবই হাস্যকর।

কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের দুরবস্থা বলতে গেলেই নাইনটি নাইন পার্সেন্ট মানুষ গবেষণার কথা প্রথমেই নিয়ে আসে। আর তখনই ঘটে যায় ভয়ংকর ক্ষতিকর একটা বিষয়। আমাদের শিক্ষকদের মূল কাজ যেটি, শিক্ষকতার সেইগুলোর ভয়াবহ দুরবস্থার বিষয়টি পুরোপুরি ধামাচাপা পড়ে যায়।

তবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষকতার ইকোসিস্টেম কিন্তু সম্পূর্ণভাবে প্রস্তুত। এখানে অধিকাংশ রুমগুলোতে এখন মাল্টিমিডিয়া আছে, এমনকি ফুল ফাংশনাল এসি। তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান যে কাজ জ্ঞান বিতরণ সেটাতে আমরা এইরকম ভয়াবহ অবস্থা তৈরী করে রেখেছি কেন?

সেটা হলো যে আমরা সব ধরনের শিক্ষকরা, হোক দলবাজ, দলহীন, দলদাস, মুক্তমনা, সংকীর্ণমণা, সিংহ পুরুষ বা ভেড়ার পাল এরা সবাই মিলে একটা ভয়ানক জবাবদিহীনতার সংস্কৃতি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে জারি রেখেছি। সেটা আমরা হয় খুব সচেতন ভাবে করছি নয়তো অবচেতনভাবে প্রশ্রয় দিচ্ছি।

আপনি চিন্তা করতে পারেন যে আপনার প্রধান পরিচয় শিক্ষক, কিন্তু আপনি কেমন শিক্ষকতা করেন সেটার কোন জবাবদিহি আপনাকে করতে হয় না? আপনার চাকুরীর প্রমোশনে আপনার শিক্ষকতার কোন মাপকাঠি নাই? আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সিস্টেম ক্লাস ইভালুয়েশন, ছাত্র ছাত্রীদের কাছ থেকে জানতে চাওয়া আচ্ছা আমি কেমন পড়িয়েছি, সেটা আমরা এভয়েড করি। আমার অর্থনীতি বিভাগের দুনিয়া কাঁপানো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক শিক্ষিকারাও এটা চান না।

কিন্তু একই বিভাগে যখন ট্রেইনিং প্রোগ্রাম বা বাণিজ্যিক মাস্টার্স চলে, তখন প্রতিটি কোর্সের ইভালুয়েশন খুবই সিস্টেমেটিক ভাবে করা হয়। শুধু তাই না, এই ইভালুয়েশনের বেসিসে খারাপ শিক্ষক শিক্ষিকাকে হয়তো পরবর্তী কালে আর কোর্স দেয়া হয় না।

কিন্তু বানের জলে ভেসে আসা অনার্স বা মাস্টার্স প্রোগ্রামের কোন ছাত্র ছাত্রীদের কাছ থেকে কোন কিছু জানার আশা নাই। কি দরকার বাড়তি ঝামেলার? জানতে গেলেই তো গোমর ফাঁস। আর মাস শেষে তো অটোমেটিক টাকা ব্যাংক একাউন্টে জমা হচ্ছে। অতো ফাল পেড়ে লাভ কি?

কিন্তু সবচেয়ে মারাত্মক বাজে ব্যাপার কি জানেন? সেটা হলো শিক্ষকতায় ফাঁকিবাজি, পরীক্ষার খাতা ঠিকমত না দেখা, নম্বর সময়মতন না দেয়া এগুলোকে সবাই আমরা একটা নিরীহ, নির্দোষ ব্যাপারে পরিণত করেছি। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে বিবেকবান শিক্ষকরাও এই বিষয় নিয়ে যখন আলাপ করেন তখন তাঁদের মধ্যে একটা হাসাহাসির সুর থাকে। যেন দুষ্ট একটা ছেলের কিছু বাজে অভ্যাস নিয়ে আলোচনা করছি।

আপনারা বলেন আপনি এটা নিয়ে এতো লাফালাফি করেন কেন? এইটা তো কোন ব্যাপার না। আমাদের বিভাগে দু’একজন এরকম আছে। কিন্তু বেশীরভাগই ভালো।

প্রথম কথা হলো, আপনার সিস্টেমে যদি কোন একাউন্টেবিলিটি চেক করার সিস্টেম না থাকে তাহলে প্রথমত ইউ হ্যাভ এবসিলিউলি নো আইডিয়া এই ফাঁকিবাজি কতটা ভয়াবহ ভাবে ছড়িয়ে গেছে। আর তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নেই যদি এটা অনেক কম, কিন্তু একজনও থাকলে আপনি কেন সেটা মেনে নেবেন?

আপনি কি এত সহজে বলতে পারবেন, আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশীরভাগ শিক্ষকই ভাল, তবে দু’একজন মাঝে মধ্যে ছাত্রীদের রেপ করে? পারবেন বলতে?অথচ যা হচ্ছে এগুলো সত্যিকারের রেইপ না হলেও প্রত্যেকটি একটি একটি বিশাল মাপের একাডেমিক রেইপ।

আমি একাডেমিক কমিটির মিটিং এ আমার সব সিনিয়র শিক্ষক শিক্ষিকার সামনে এই কথাই বলেছিলাম, এই বিভাগে চলছে একাডেমিক মার্ডার, রেইপ, লুন্ঠন। তখন সব শিক্ষক সমস্বরে চিৎকার করে উঠে আমাকে আর কোন কথা বলতে দেয় নাই। সেইদিনই তাঁরা সারাদিন মিটিং করে সন্ধ্যায় ভিসির কাছে যেয়ে সিন্ডিকেটে আমাকে দ্বিতীয় বারের মতন বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠায়।

আপনার একটা সেমেস্টারে ক্লাস নেয়ার কথা ৩০ টা কিন্তু ১৫, ২০ কিংবা ২২টা নিয়ে ছেড়ে দিয়েছেন। ওই ক্লাসে যদি ১৫০ জন ছাত্র ছাত্রী থাকে তাহলে আর আপনি যদি ১০টা ক্লাস কম নেন তাহলে আপনি ওই ক্লাসের জীবন থেকে ১৫০০ টা ক্লাস আওয়ার কেড়ে নিয়েছেন। এটি একটি একাডেমিক ম্যাস মার্ডারের সমতুল্য ঘটনা। হ্যাঁ আপনি একজন ম্যাস মার্ডারার। ওই ক্লাসের ১০০/১৫০ ছাত্র ছাত্রীর ন্যায্য অধিকারকে আপনি খুন করেছেন।

ক্লাসে ঠিকমতন গিয়েছেন কিন্তু হাবিজাবি পড়িয়েছেন, কিংবা গল্প করে কাটিয়েছেন, আপনি একজন একাডেমিক ম্যাস ধাপ্পাবাজ, ফেরেববাজ। সরকারী ঘুষখোর আমলার সাথে আপনার কোন পার্থক্য নাই।

মাসে লাখ টাকার উপরে বেতন নিয়ে সারাদিন প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে পড়ান, অথবা গবেষণার নামে দোকান খুলে সেখানে দিন রাত কাটান? গাড়ি থেকে নেমে সরাসরি ক্লাসে যান আর সেখান থেকে সরাসরি গাড়িতে ওঠেন? এই আপনি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষিকা? আপনি একজন একাডেমিক লুইচ্চা, লম্পট, চরিত্রহীন।

সারাজীবন ঘর সংসার করলেন, বড়লোকের বউ হয়ে সামাজিক স্ট্যাটাস বজায় রাখার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিকা হইলেন। ভ্যানিটি ব্যাগ দোলাতে দোলাতে বিশ্ববিদ্যালয়ে আসেন, বুয়ার গল্প বলতে বলতে বের হয়ে যান। আপনি একজন ফাঁকিবাজ, সুযোগসন্ধানী দুই নম্বরী মহিলা একাডেমিক।

আপনি যখন পরীক্ষার খাতা ঠিকমতন না থেকে উল্টোপাল্টা নাম্বার দেন, তখন আপনি একজন একাডেমিক ম্যাস রেপিস্ট। আপনি যেইসব ছাত্র ছাত্রীরা যারা কঠোর পরিশ্রম করে পড়াশুনা করে পরীক্ষা দিয়েছে, তাঁদের সেই পরিশ্রমকে বিনা বাক্য ব্যয়ে ধর্ষণ করেছেন। আপনি একজন গণধর্ষণকারী।

এখন সময় এসেছে এইসব শিক্ষকতার নামে গণহত্যাকারী, গণধাপ্পাবাজ, গণধর্ষণকারী, লুইচ্চা লম্পট শিক্ষক শিক্ষিকাদের চিহ্নিত করা। আপনার বিভাগে একজনও থাকলে তাঁর বিরুদ্ধে সোচ্চার হোন।

সব ধরনের জবাবদিহিতার বিধি নিয়ে আলোচনা শুরু করুন। নিজ নিজ বিভাগে কোর্স ইভালুয়েশনের জোর দাবী তুলুন। পরীক্ষার খাতা নম্বর প্রকাশের সময় ছাত্র ছাত্রীদের দেখান, তাঁদের ভুল গুলো ধরিয়ে দিন। লুকোছাপা করে নিজের দায়িত্ব এড়াবেন না, ফাঁকিবাজি সিস্টেম চালু রাখবেন না।

আসলে আমি নিজেও বোকার স্বর্গে বাস করছিঃ কি হবে জানেন? উপরের যেসব ভয়ংকর অপরাধের কথা বললাম, এইসব অপরাধীদের সবাই চেনে আর জানে। তাঁদের সাথে সবাই হাসে, গল্প করে, সামাজিক সম্পর্ক রেখে চলে। উপরের অপরাধগুলোতে কারোর কিছু এসে যায় না।

কিন্তু যেই মুহুর্তে খবর আসবে কোন নারীঘটিত বিষয়, ছাত্রী কিংবা অন্য কারো সাথে সাথে সাথে সবার সম্মিলিত বিবেক জেগে উঠবে । হাহাকার দিয়ে সবাই জাত গেলো জাত গেলো বলে মাতম শুরু করবে। কারণ এই বিষয়টা ঐসব একাডেমিক ম্যাস মার্ডার, রেপ, ধাপ্পাবাজি, লম্পট, লুইচ্চামির তুলনায় একজন আমাদের চোখে এবং আমাদের ভাষায় একজন ‘রিয়েল লাইফ লুইচ্চা’ র টপিক অনেক বেশী আকর্ষণীয়। কারণ এখানে একজন জলজ্যান্ত ব্যক্তি আছে, একজন নারী আছে, সেই নিয়ে মুখরোচক গল্প আছে।

শেষ করার আগে আবারো বলছি, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের দুরবস্থার কথা আলোচনা করতে যেয়ে প্লীজ গবেষনার বিষয়টি প্রথমেই আনবেন না। প্রথমেই বলুন আপনার মূল দায়িত্বের কথা। আপনি কি আসলে কি?

আপনে স্বীকার করেন বা না করেন, আপনার মূল পরিচয় হচ্ছে ক্লাসে যাওয়া মাস্টার। আপনে বেতন পান মাস্টারি করার জন্য। সেটি যদি ঠিকমতন না হয় তাহলে গবেষণা করে জগৎ সংসার উল্টে দিয়ে কি লাভ?

স্বীকার করে নিন যে গবেষণার জন্য কোন কিছুই প্রস্তুত নেই। হ্যাঁ সেটা প্রস্তুত করার চেষ্টা করুন, উদ্যোগ নিন। সেটা অবশ্যই জরুরী। কিন্তু যেই সার্ভিসটা আমরা এই মুহুর্তে এই দিন থেকেই খুব ভালো মতন দিতে পারি সেটি কেন আমরা করবো না?

এতো কিছুর পরেও মনে হয় বাংলাদেশের এই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো চলছে কিভাবে? চলছে এইভাবে যে এখানে এখনও রয়েছে মুষ্টিমেয় শিক্ষক শিক্ষিকা, যারা শিক্ষকতাকে ধ্যান জ্ঞান করে জ্ঞানের আলো বিলিয়ে যাচ্ছেন। নিরলসভাবে ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য কাজ করছেন। কেউ কেউ এর পাশাপাশি আবার এতো প্রতিকূলতার মধ্যেও মৌলিক গবেষণাও করছেন। এনারা অনেক শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি।

কিন্তু আপনাদের প্রতিও শ্রদ্ধা অনেকটা কমে যায় যখন দেখি এইসব একাডেমিক লুইচ্চা, লম্পট, ম্যাস মার্ডারদের আপনারা প্রশ্রয় দেন। এদের সাথে হেসে হেসে কথা বলেন, ভদ্রতার সুন্দর সামাজিক সম্পর্ক রাখেন। এদের অপরাধ প্রশ্রয় দিয়ে আপনিও তখন এই অপরাধের সামিল হোন।

তাই অনেক হয়েছে, এই ভয়ংকর একাডেমিক অপরাধীদের প্রশ্রয় সেই অপরাধের সামিল আপনিও হবেন না । এদের এখনই ধরিয়ে দিন। কেমন ধরিয়ে দিবেন সেটার জন্য উপায় খুঁজুন। ধরিয়ে না দিতে পারলেও অন্তত সামাজিক ভাবে বয়কট করুন।

আপনার গবেষণার চেয়ে হাজার গুণে মহত্তর কাজ হবে সেটি।

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন