বৃহস্পতিবার, ২৩ জুন ২০২১; ৭:৫৩ অপরাহ্ণ


দেবী দেখলাম। বেশ চমৎকার লাগল। সিনেমাটোগ্রাফী, সাউন্ড খুবই হাই কোয়ালিটি। জয়া, যেরকম সবসময়, অসাধারণ অভিনয়। চঞ্চল চৌধুরীকে মিসির আলি চরিত্রে একেবারেই মানায়নি। তবে সেটা চঞ্চলের অভিনয়ের দোষ না। চঞ্চলের এই ক্যারেক্টারে এর বেশী কিছু করার ছিল না।

দেবী আরেকবার প্রমাণ করলো, ভাল কাহিনী, উন্নত মানের মেকিং হলে বাংলাদেশের মানুষ দলে দলে সিনেমা হলে আসবে। আর সেইদিকে না যেয়ে সিনেমার কিছু পাতি নেতা কিছুদিন পর পর রাস্তায় নামবে, কলকাতার বাংলা, ইন্ডিয়ান হিন্দী সিনেমার বিরুদ্ধে। এর চেয়ে বড় ভন্ডামি আর কি হতে পারে?

আমরা কিছু হলিউড মুভি যেদিন হলিউডে রিলিজ হইছে, একইদিন সিনেপ্লেক্সে ঢাকায় বসে মানুষ দেখেছে। অথচ পাশের দেশ ইন্ডিয়ার কোন সিনেমা দেশে হলে যেয়ে দেখতে পারছি না। কি হাস্যকর!

অনেকে বলে হলিউডের মুভি নিয়ে সমস্যা নাই, কারণ ইংলিশ মুভি বাংলাদেশের মুভির কম্পিটিটর না। কিন্তু হিন্দী মুভি যেহেতু অনেক জনপ্রিয়, তাই যেই মুহুর্তে হলে আসবে, সবাই হুমড়ি খেয়ে পড়বে, তখন বাংলা সিনেমার সাড়ে সর্বনাশ হয়ে যাবে।

এই যুক্তি দিয়ে স্বাধীনতার পর থেকে ইন্ডিয়ার বাংলা, হিন্দী সিনেমা বন্ধ। মাঝে মধ্যে ফাঁকে ফোকড়ে কয়েকটা আসছে, বেশীর ভাগই যৌথ প্রযোজনা, অনেক কাঠ খড় পুড়িয়ে। এই যে গত প্রায় চার যুগ হতে চললো, এই পুরো সময় জুড়ে ইন্ডিয়ার বাংলা, হিন্দী যে বাংলাদেশে ব্যানড রয়েছে। এর মধ্যে বাংলা সিনেমার কি উন্নতি আমরা দেখেছি?

উন্নতির নমুনা হলো এই রকম। ৯০ দশকের শুরুর দিকে যেখানে প্রায় ২০০০ বা তাঁরও বেশী সিনেমা হল ছিল, সেগুলো এখন কমতে কমতে ২০০/৩০০ এসে ঠেকেছে। সিনেমা হলে দর্শক নেই, সিনেমা হল মালিকের ব্যবসা নেই। মাঝে মধ্যে হঠাৎ হঠাৎ আয়নাবাজি, ঢাকা এটাক, দেবী এসে হাজির হয়। কিন্তু এইভাবে কি একটা শিল্প টিকে থাকতে পারে?

একবার কোথায় যেন পড়েছিলাম যে বাংলাদেশের সিনেমাকে ব্যবসাসফল করে সাসটেইনেবল মডেলে আনতে গেলে বছরে মিনিমাম ৩০/৪০ টা হিট মুভি লাগবে। ৩০, ৪০ তো দুরের কথা বছরে দুই তিনটা হিট সিনেমা প্রডিউস করাই আমাদের মুশকিল হয়ে যাচ্ছে। তাই অবশ্যম্ভাবী ভাবেই যা হবার তা হচ্ছে, হলের মালিকেরা হল ভেঙ্গে মার্কেট বানিয়ে ফেলছে। ওরা আসছে ব্যবসা করতে ভাই, দ্যাটস দ্য রিয়ালিটি, চ্যারিটি করতে আসে নাই।

পাকিস্তান এই বিষয়টা অনেক আগেই বুঝেছে। তাই রাজনৈতিকভাবে এতো বৈরীতা, কাশ্মীর নিয়ে এতো কামড়া কামড়ি, তারপরেও পাকিস্তানীরা কিন্তু বলিউডি সিনেমা নিয়মিত দেখছে। শুধু মাঝে মধ্যে যখন কারগিল জাতীয় বিশাল কোন সংঘাতময় পরিস্থিতি তৈরী হয়, তখন আবার সাময়িক ভাবে বন্ধ হয়। তবে সেটা ক্ষণস্থায়ী। কতদিন পরেই আবার শুরু হয়ে যায় বলিউড সিনেমার দাপট।

নিজের দেশের সিনেমা বা অন্য দেশের সিনেমা, যেভাবেই হোক আপনাকে আপনার দেশের হল সিনেমার শিল্পের প্লেয়ারদের টেকের যোগান অব্যাহত রাখতে হবে। এটা পাকিস্তানীরা পর্যন্ত বোঝে, কিন্তু আমরা বুঝিনা। পাকিস্তানীদের সিনেমার অবস্থা বাংলাদেশের চেয়েও ভয়াবহ ছিল। কিন্তু বলিউডি সিনেমা আসার পর ঘুড়ে দাঁড়িয়েছে। অনেকগুলো নতুন সিনেমা হল হয়েছে, মাল্টিপ্লেক্স হয়েছে। এতে সিনেমা সংশ্লিষ্ট কিছু মানুষের হাতে বেশ টাকা পয়সা এসেছে। তাঁরাই তখন উদ্যোগী হয়ে বেশ কিছু ভাল পাকিস্তানী মুভি বানানো শুরু করেছে।

একদম একই জিনিস বাংলাদেশে ঘটা খুবই সম্ভব। যেই মুহুর্তে সিনেমা হল মালিক, যাদের মধ্যে অনেকে আবার প্রযোজক, পরিবেশক, এদের কাছে টাকা আসা শুরু করবে অবশ্যম্ভাবী ভাবে তাঁরা এর কিছু ব্যয় করবে ভাল কিছু বাংলা সিনেমা বানাতে। তখন দেবী, আয়নাবাজির মতন আরও অনেক ভাল ভাল মুভি নিয়মিত পেতে থাকবো বলেই বিশ্বাস করি।

কিন্তু তা না করে কদিন পর পর রাস্তায় নেমে লাফালাফি, হিন্দী ছবি, কলকাতার বাংলা ছবি বন্ধ করা । নিজেদের মুরোদ নাই ভাল গল্প দিয়ে একটা সুন্দর ছবি নিয়মিত তৈরী করা, অন্যদের ভাল সিনেমা আমাদের দেখতে দেবেনা । খুব খারাপ লাগে যখন দেখি মোস্তফা সারওয়ার ফারুকী, রিয়াজের মতন লোকজন এইসব অসুস্থ আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়।

অথচ এই দেশের মানুষের ঘরে ঘরে টিভির চ্যানেলের ভিউয়িং টাইমের প্রায় ষোল আনাই হিন্দী বা কলকাতার বাংলার চ্যানেলের দলে। এমন কোন হিন্দী সিনেমা এই দেশের মানুষরা দেখে না যেটার পাইরেটেড ভার্সন কিছুদিন পরেই দেশে চলে আসে।

এরকম পরিস্থিতিতে কোন সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের ভয়ে আপনারা হিন্দী, কলকাতার বাংলা সিনেমার বিরোধিতা করেন জানতে পারি? শোনেন একটা কথা বলি, সাংস্কৃতিক আগ্রাসন বলে কিছু নাই। আপনার নিজস্ব সংস্কৃতি যদি আপনাকে উন্নত মানের বিনোদনের উপাদান দিতে সক্ষম না হয়, তাহলে সে স্বাভাবিক ভাবে বিদেশী উৎসের দিকে ঝুঁকবে।

তাই সাংস্কৃতিক আগ্রাসন যদি ঠেকাতে চান, তাহলে দরজা জানালা বন্ধ করে কিছু ঠেকানো যাবে না। কাজের কাজ হবে, তখন শ্বাস বন্ধ হয়ে মারা যাবার উপক্রম হবে। এর চেয়ে ভাল উপায় হলো, দরজা জানালা খোলা রাখুন, নির্মল বাতাস আসবে, মাঝে মধ্যে দুর্গন্ধযুক্ত বাতাস আসবে। সেগুলো ফিল্টার করার ব্যবস্থা রাখুন।

তাই আগ্রাসনের বাহানা আর দিবেন না। পারলে উন্নতমানের বিনোদন উপকরণ বানাতে চেষ্টা করুন। কলকাতায় দেখুন। সালমানের রেকর্ড ব্রেকিং হিট মুভি যখন চলছে, একই সময় হল ভর্তি দর্শক শ্রীজিতের মুভি দেখার জন্য।

ভাল সিনেমা বানান, সে যেই ভাষায় হোক, সিনেমায় মানুষ দলে দলে যাবে। বাংলাদেশের মানুষের বিনোদনের জায়গা খুব বেশী নেই। আমরা বিনোদিত হবার জন্য মুখিয়ে আছি।

তাই দয়া করে সে সুযোগটা একটু বেশী বেশী করে দেন। নিজেরা পারলে ভাল ভাল সিনেমা বানান, আর সেটা পারেন বা না পারেন, অন্য দেশের ভাল ভাল সিনেমা আমাদের দেখতে দেন। নিজেদের অক্ষমতা ঢাকার জন্য আমাদের এই ভাবে বঞ্চিত করবেন না দয়া করে।

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন