, ২০ জুন ২০২১; ৪:৪৯ অপরাহ্ণ


ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্ষমতায় আসা কেন এতো গূরত্বপূর্ন ? মিথ্যা সংবাদ প্রতিরোধের জন্য আমরা কি করতে পারি ? কেন উদার গনতান্ত্রিক ধারনা বিপদের সম্মুখে ? নতুন বিশ্বযুদ্ধ কি হবে ? কোন সভ্যতা পৃথিবীর ইতিহাস নিয়ন্ত্রণ করে বা করবে ? ইশ্বর কি আবার ফিরে এসেছে ? ইশ্বর কি পৃথিবীকে নিয়ন্ত্রণ করছে ? কোন সভ্যতা পৃথিবীর ইতিহাস নিয়ন্ত্রণ করছে দক্ষিণ চীন নাকি ইসলাম ? ইউরোপ কি কখনো অভিবাসীদের জন্য সহায়ক হবে ? জাতীয়তাবাদ কি কখনো অসমতা, সম্পদের অসম বণ্টন লাঘব করতে পারবে  অথবা পরিবেশ বিপর্যয়ের মতো সমস্যার সমাধান করতে পারবে ? সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে আমরা কি ভাবে লড়বো ? এই সমস্যাগুলোই মনে হয় একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন  যার উত্তর খোঁজা অবশ্যই প্রয়োজন কিন্তু সমস্যাগুলোর সমাধান খোঁজার সময় আমাদের কই ! আমাদের সময় কই পুরো পৃথিবীকে নিয়ে ভাবার যেখানে আমাকে অথবা প্রতিমুহূর্তে চিন্তা করতে হয় এর পরের বেলায় আমার অণ্ণ কি হবে  এর পরে আমার দায়িত্ব কি হবে ? আমাদের কে এই প্রতিযোগিতা মূলক পৃথিবীতে প্রতিমূর্হতে যখন অণ্ণ,বস্ত্র, বাসস্থানের চিন্তায় দিন যাপন করতে হয় তখন বিশ্ব রাজনীতি নিয়ে চিন্তা করার সময় আমাদের কই!

ইতিহাস তার নিজের গতিপথ ধরে নিজের মতো করে চলে এবং আমরা যদি জানতে চাই ইতিহাসের উদ্দেশ্য কি তাহলে এটা মেনে নিতে হবে যে ইতিহাস চলে তার নিজের পথ ধরে সে আমাদের সুবিধা বা অসুবিধা বিবেচনা করে চলে না৷ এখন আমরা তো বলতেই পারি  এটা তো ন্যায় না ! এখন মূল ব্যাপারটা  হলো ইতিহাসে যে ন্যায় আছে এটা আমাদের কে বলেছে?ইতিহাস ন্যায় অন্যায়ের বিচার করে চলে না ইতিহাস চলে আপন শক্তি তে আপন মহিমায়৷

পৃথিবীতে প্রত্যেকটি মানুষের উদ্দেশ্য,উদ্দেশ্য,লক্ষ্য আর কর্তব্য আলাদা তাই তো বলা যায়-সাত বিলিয়ন মানুষের এই পৃথিবীতে সাত বিলিয়ন উদ্দেশ্য রয়েছে মানুষের আর মানুষ তার সেই নিজস্ব উদ্দশ্যে সাধনের লক্ষ্যে কাজ করছে ! একজন মা যে মুম্বাই এর বস্তিতে বাস করে তার প্রধান লক্ষ্য হলো কীভাবে সে তার সন্তানদের খাদ্যের যোগান দিতে পারবে৷একজন রিফিউজি যাকে ভূমধ্যসাগর পারি দিতে হবে ইউরোপে যেতে হবে বাঁচার জন্য তার সময় কই পৃথিবীর ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবার৷তাই পৃথিবীর ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে পারে এমন মানুষ খুব কম৷মানুষের তাই তাদের দীর্ঘমেয়াদী বিষয়গুলো নিয়ে ভাবার সময় খুব কম বললেই চলে কারন সমাধানের জন্য বাঁচার জন্য তাদের অনেক সমস্যার সমাধান করতে হয় যে সমস্যাগুলোর খুব তাড়াতাড়ি সমাধান আবশ্যিক হয়ে দাঁড়ায়৷

প্রযুক্তি এবং জৈব প্রযুক্তি হলো আমাদের একবিংশ শতাব্দীর অন্যতম  বড় চ্যালেঞ্জ৷  ধারনা করা হচ্ছে যে তথ্য প্রযুক্তির উণ্ণতির কারনে এবং জৈব প্রযুক্তির  বিশেষ করে রোবোটিক প্রযুক্তির অত্যধিক উণ্ণতির কারনে কোটি কোটি মানুষ নিমিষেই তাদের চাকরি হারিয়ে ফেলতে পারে কারন তথ্য প্রযুক্তি এবং জৈব প্রযুক্তি হলো এমন একটা ধারনা এবং এই দুটির অভিনব উণ্ণতির ফলে মনুষ্য শ্রমের প্রয়োজনীয়তা কমে যেতে পারে বা বলা যায় প্রয়োজনীয়তা ইতিমধ্যে কমে গেছে!আর তথ্য প্রযুক্তির অত্যধিক উণ্ণতির ফলে আরেকটা যেটা হতে পারে সেটা হলো পুরো সিস্টেম মুষ্ঠিমেয় কিছু মানুষের হাতে চলে যাবে যারা পুরো প্রযুক্তি কে নিয়ন্ত্রণ করবে তার সাথে তারা মানব সভ্যতার নিয়ন্ত্রণ তাদের নিজেদের হাতে নিয়ে নিবে আর যদি তাই হয় তাহলে তো বুঝতেই পারছেন পরিনতি হবে ভয়ানক৷

মানুষ আসলে গল্পে বিশ্বাস করে কিছু সংখ্যার বা ঘটনার বিপরীতে আপনি কাউকে কোন কিছু বোঝাতে চাইলে তাকে সংখ্যা, ইকুয়েশন দিয়ে না বুঝিয়ে খুবই সাধারন একটা গল্প দিয়ে বোঝান সে নিঃসন্দেহে ভালো বুঝবে! এটা কিন্ত নিজেকে দিয়েও বিচার করা যায়৷ ধরুন আপনাকে বলা হলো আপনাকে ১ থেকে ১০০ সংখ্যা পর্যন্ত শোনানো হবে অথবা কোন একটা গল্প বলা হবে তাহলে আপনি কোনটা বেছে নিবেন নিঃসন্দেহে আপনি গল্প শুনতেই স্বাছন্দ্য করবেন তেমনি খুব খেয়াল করলে দেখা যায় প্রত্যেকটি জাতির একটি নিজস্ব গল্প বা মিথ আছে আর আমাদের জাতীয়তাবাদের ধারনা কোন একটা মিথের উপর ভর করেই গড়ে উঠেছে বা উঠে যেমন বাংলাদেশের গল্প যদি আপনি কারো কাছে করতে চান তাহলে নিঃসন্দেহে আপনাকে ১৯৭১ এর গল্প করতে হবে ৷ এরকম ভাবেই পৃথিবীবাসীর জন্য বিংশ শতাব্দী তে আমাদের ঠিক আগের শতাব্দীতে নিউ ইর্য়ক,লণ্ডন এবং বার্লিন ও মস্কো তিনটা গল্প তৈরি করলো পুরো পৃথিবীর জন্যগল্প তিনটি হচ্ছে ফ্যাসিজম ,কমিনিউজ্ম এবং লিবারেলজম ৷দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ফ্যাসিজম কে হারিয়ে দিলো এবং ১৯৪০ থেকে ১৯৮০ সাল এই সময়টুকু যুদ্ধক্ষেএ ছিলো সমাজতন্ত্র আর উদারতাবাদ বা লিবারেলজিমের মধ্যে এবং এরপরই কমিনিউস্ট বা কমিনিউজম হেরে গেলো এবং কমিনিউজমের পরাজয়ের মধ্য দিয়ে লিবারেলজম জিতে গেলো৷ লিবারেলজম তখন একমাত্র আইডিয়া বা ধারনাতে পরিনত হলো যা দিয়ে ভবিষ্যৎতের পৃথিবী কে ব্যাখা করা যায় ৷

উদারতাবাদ বা লিবারেলইজম আমাদের দেখানোর চেষ্টা করেছে মুক্তি অথবা স্মাধীনতার মূল্য কতটুকু৷ লিবারেলইজম বলার চেষ্টা করেছে গত কয়েকশো বছর ধরে মনুষ্য সভ্যতা স্বৈরাচারী শাসক এবং ব্যবস্থা দ্বারা শাসিত হয়েছে এবং শাসিত হবার ফলে পুরো ব্যবস্থার সাথে জড়িত পদ্ধতির সাথে অবগত হয়েছে৷ মানুষ তার স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করেছে , যুদ্ধ করেছে নিজের মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্য এবং এর জন্য পদক্ষেপের পর পদক্ষেপ নিয়েছে আর এরপরেই অনেকগুলো পদক্ষেপের পর স্বৈরাচারী শাসক কে হটিয়ে গনতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠার পথ সুগম করেছে৷ মুক্ত ব্যবসা বা ফ্রি ট্রেড এর মাধ্যমে অথর্নৈতিক যেসব প্রতিবন্ধকতা গুলো ছিলো তা দূর করা গেছে ৷ এছাড়া মানুষ এই আধুনিক সময়ে অনেক কুসংস্কার থেকেও মুক্ত হয়েছে বিভিন্ন ধরনের বাধা পেরোতে সক্ষম হয়েছে ৷ উম্মুক্ত রাস্তা,ব্রিজ এবং ব্যস্ত এয়ারপোর্ট জীবনকে অনেক খানি সহজ করে দিয়েছে৷

আধুনিকতার এ যাবৎকাল পর্যন্ত সংঞ্জা ছিলো কে কত বেশি উন্মুক্ত যাদের সীমান্ত ,ব্যবসা প্রতিষ্ঠান যত বেশি উণ্ণত তারা তত বেশি আধুনিক! যত বেশি মার্কেট উন্মুক্ত তত বেশি সমৃদ্ধির দ্বার উন্মুক্ত এরকমটাই তো ধারনা ছিলো এতোদিন!

আধুনিকতার এ ধারনা থেকেই মনে করা হতো হয়তো সময় লাগবে তবে ধীরে ধীরে দক্ষিন কোরিয়া,ইরাক বাজার উম্মুক্তকরনের মাধ্যমে ধীরে ধীরে ডেনমার্কের মতো শান্তি এবং সমৃদ্ধির রাষ্ট্রে পরিনত হবে৷

বিশেষ করে ১৯৯০ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত উণ্ণয়নের এ ধারনা ছিলো এক মন্ত্রের মতো৷ অনেক সরকার বিশেষ করে ব্রাজিল আর ভারত উদারতাবাদের ধারনা প্রনয়ন করে উণ্ণতির জন্য এবং যারা নিজেদের রাষ্ট্রে লিবারেল পদ্ধতি প্রনয়নে ব্যর্থ হয় সেই সব রাষ্ট্র কে মনে করা হতো তারা ব্যর্থ এমনকি ১৯৯৭ সালে বিল ক্লিনটন সমালোচনা করেন চীনের কারন চীন লিবারেল পদ্ধতি প্রনয়নে অসর্মথতা জানিয়েছিলো ! বিল ক্লিনটনের মতে চীনের লিবারেল পদ্ধতি না প্রনয়নের এই ব্যর্থতা ইতিহাসে এক বড় ব্যর্থতা হিসেবে লিখিত থাকবে ৷

লিবারেল পদ্ধতির জন্য সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা আসে ২০০৮ সালে বৈশ্বিক অথর্নৈতিক ক্রাইসিসের সময় এবং পৃথিবীর মানুষ প্রথমবারের মতো অনুধাবন করতে শিখে এই পশ্চিমাদের তৈরি এই লিবারেল পদ্ধতি মোটেও এুটি মুক্ত এবং এরই সাথে আমাদের আরো অনুধাবনে আসে যে লিবারেল পদ্ধতির কথা প্রচার করা হচ্ছে এবং যেই উম্মুক্ত দেয়ালের কথা বলা হচ্ছে এই সবে সমস্যা আছে ৷কোন কিছুই আসলে উম্মুক্ত নয় কারন অভিবাসনের পথ রুদ্ধ হয়ে যাচ্ছে,গনতন্ত্র প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে , সংবাদ মাধ্যমের এবং কথা বলার স্বাধীনতা দেশে দেশে কেড়ে নেওয়া হচ্ছে মোট কথায় গনতন্ত্রের পথ বিপন্ন হচ্ছে৷

তুরস্ক এবং রাশিয়ার দিকে তাকালে দেখা যায় সেখানে নতুন ধরনের উদারতাবাদের চর্চা হচ্ছে স্বৈরাচারী সরকারের নিয়ন্ত্রনাধীনে এবং সবচেয়ে বড় ব্যাপার হলো চীনের অভূতপূর্ব উণ্ণতির পর খুব কম মানুষই বলতে সাহস পাবে যে চায়নিজ কম্যুনিস্ট পার্টি ইতিহাসের ভুল পথে হাঁটছে!

এতো কিছুর পর আবার যখন কফিনের শেষ পেরেক ঠুকার মতো যখন ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলো এবং ব্রিটেন ব্রেক্সিট করলো তখন এই উদারতাবাদের উদারতার ফাক ফোকর আমাদের চোখের সামনে আরো বেরিয়ে পরলো ৷এই তো কিছুদিন আগেও আমেরিকান আর ইউরোপিয়ানরা ইরাক আর লিবিয়া কে গনতন্ত্রমুখী করতে চাচ্ছিলো অথচ আজ  ইউরোপ আর আমেরিকায় তাদের নিজ দেশেই তাদের গনতন্ত্র আজ প্রশ্মের সম্মুখীন৷

আর লিবারেল পদ্ধতির এই ব্যর্থতার জন্য দায়ী করা হচ্ছে আমাদের অথবা তাদের জাতিগত বিদ্বেষ ,লোভ, অন্ধ অহমিকা কে! এছাড়াও যেমন নারী পুরুষের সমতার কথা আমরা দিনরাত বলি অথচ হিলারি ক্লিনটনের প্রেসিডেন্ট না হওয়ার পিছনে রয়েছে তিনি একজন নারী! লিঙ্গগত বৈষম্য প্রধান নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে আজো এবং অন্যান্যরা দাবি করেছে যে উদারতাবাদ এবং গ্লোবালইজেশন হচ্ছে বড় একটি মাধ্যম যে মাধ্যমের মাধ্যমে ধনীদের কে ধনী এবং দরিদ্রদের আরো দরিদ্র বানানোর চক্রান্ত চলছে৷

১৯৩৮ সালে মানুষের সামনে তিনটি গল্প দেওয়া হয় ফ্যাসিজম,কম্যুনিউজম এবং লিবারেলজম,১৯৬৮ সালে দুইটি গল্প দেওয়া হয় আর ১৯৯৮ সালে একটা গল্প অবশিষ্ট থাকে আর ২০১৮ সালে মানুষ কে দেওয়ার মতো বিশ্বাস করানোর মতো আর কোন গল্পই অবশিষ্ট লিবারেল

এলিট যারা এতোদিন ধরে পৃথিবীকে নিয়ন্ত্রণ করে আসছিলো তারাও বিপাকের মুখে পরেছে বর্তমান সমসাময়িক অবস্থায় এবং বর্তমান অবস্থা কে তুলনা করা যায় ১৯৮০ সালের সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনকার অবস্থার সাথে যখন কম্যুনিস্টরা হতবুদ্ধি হয়ে পরেছিলো যে তারা কীভাবে বর্তমান বিশ্ব কে জানবে এবং বুঝবে যখন বোঝার জন্য এবং দেখার জন্য কোন ধারনা আর অবশিষ্ট নাই !

যখন ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হলো এবং ব্রেক্সিট হলো তখন পরিস্থিতি কে অতোটা গুরুত্বের সাথে নেওয়া হয় নি কিন্ত অনেকটা পথ অতিক্রম করে আজ জানা যায় পরিস্থিতি আজ কতোটা প্রকট আকার ধারন করেছে ৷ ব্যাপারটা অনেকটা হালকা মাথাব্যাথার মতো যাকে মাথাব্যাথা বলে  আগ্রাহ্য করা হয়েছে আর পরে সময়ের সাথে সাথে তা ব্রেন টিউমারে পরিনত হয়ে জীবন নাশের আশংকার তৈরি হয়েছে !

Francis Fukayama নামের একজন লেখক ১৯৯০ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর বলেছিলো End of history is here অর্থাৎ শাসনব্যবস্থা হিসেবে গনতন্ত্র জয়লাভ করেছে গনতন্ত্রের চেয়ে ভালো কোন শাসনব্যবস্থা আর আসবে না!এখন সময়ের সাথে সাথে সেই পুরনো প্রশ্ন আবার ফিরে এসেছে আসলেই কি গনতন্ত্র সবচেয়ে উৎকৃষ্ট শাসন ব্যবস্থা এর চেয়ে ভালো কোন পদ্ধতি কি আর নেই আর এত ভুলে ভরা পদ্ধতি সবচেয়ে উৎকৃষ্ট পন্থা হয় কি করে? আর এতো ফাক ফোকরের মধ্য দিয়ে গনতন্ত্র টিকে থাকবেই বা কি করে তাই একবিংশ শতাব্দীর অন্যতম সেরা প্রশ্ম হলো ইতিহাসের সমাপ্তি এখানে কি না ? গনতন্ত্রের সলিল সমাধির উপরে আমরা দাড়িয়ে আছি কিনা!

 

Source :  Yuval Noha Harriri, 21 lessons For the o 21st Century

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন