রবিবার, ১৯ জুন ২০২১; ২:৫২ পূর্বাহ্ণ


পাশ্চাত্যের ধন্যবাদ দেওয়া উচিৎ ওরহান পামুককে তার অসাধারণ  আর অনবদ্য উপন্যাসগুলোর জন্য। পামুকের উপন্যাসগুলো দুটি ভিন্ন ধর্ম আর ভিন্ন সংস্কৃতির মধ্যে সেতু হিসেবে কাজ করেছে শুধু তাই নয় পামুকের লেখনী প্রাচ্য আর পাশ্চাত্যের মধ্যে সংযোগ তৈরিতে সাহায্য  করেছে  পামুক না থাকলে হয়তো পশ্চিমারা এতো সমৃদ্ধ  একটা সংস্কৃতি সমন্ধে জানতেই পারতো না ! ঠিক আমাদের মতো একটা সংস্কৃতি যেটা ঐতিহ্যে আর জীবন বৈচিত্র্যে কোন অংশেই আমাদের সংস্কৃতি থেকে কম সমৃদ্ধিশালী নয় !

– দ্যা ডেইলি টেলিগ্রাফ ,ব্রিটেন

ওরহান পামুক ২০০৬ সালে সাহিত্যে নোবেলজয়ী একজন তুর্কিশ সাহিত্যিক। যিনি তার অনবদ্য লেখনী আর সৃষ্টিশীলতা দিয়ে পুরো পৃথিবীতে তৈরি করেছেন তার বইয়ের অসংখ্য পাঠক তাকে আমরা অভিহিত করতে পারি একজন ইস্তানবুলের গল্পকথক হিসেবে।কেন তাকে ইস্তানবুলের গল্পকথক বলছি তা একটু পরে বলছি। তার আগে বলতে চাই ওরহান পামুক সমন্ধে । সাহিত্যে দ্বিতীয় সর্বকনিষ্ঠ নোবেলজয়ী লেখক সমন্ধে ব্রিটিশ প্রভাবশালী পত্রিকা দ্যা গাডির্য়ান যাকে অভিহত করেছেন  সমসাময়িক পৃথিবীর একজন অন্যতম সেরা প্রভাবশালী জীবিত লেখক হিসেবে !

সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার ছাড়াও (নোবেল প্রাপ্ত প্রথম তুর্কি) পামুক অজস্র পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। ২০০৫ সালে পামুক  সংস্কৃতিতে অবদান রাখার জন্য জামার্নির দ্যা পিচ প্রাইজ পুরস্কার অজন করেন যেটা জামার্নির সংস্কৃতি শাখায়  সবচেয়ে  মর্যাদাকর পুরস্কার  হিসেবে বিবেচিত হয় । ২০০৬ সালে ওরহান পামুক টাইমস ম্যাগাজিন অনুযায়ী পৃথিবীর শীর্ষ একশো প্রভাবশালী ব্যক্তির তালিকায় নিবার্চিত  হন ৷

ওরহান পামুক  আমেরিকান একাডেমি অফ আর্টের একজন সম্মানিত সদস্য। তার বই  মাই নেম ইজ রেড ২০০২ সালে অর্জন করে Prix du Meilleur Livre Étranger, Premio Grinzane Cavour এবং ২০০৩ সালে International IMPAAC Dublin Literary Award  ইউরোপীয়ান রাইটার্স পার্লামেন্ট(ইউরোপীয় লেখকদের সংসদ) তাদের লেখক  সম্মাননায় পামুককে   ভূষিত করেছেন ।

ওরহান পামুক জম্মগ্রহন করেন ৭ জুন ১৯৫২ সালে ৷

পা মুক একজন সাহিত্যক,উপন্যাসিক,চিত্রনাট্যকার এবংশিক্ষক ৷পামুক তুরস্কের অন্যতম সেরা উপন্যাসিক যার বই এখন পর্যন্ত ১৩ মিলিয়ন কপি বিক্রি হয়েছে এবং ৬৩ টি ভাষায় তার বই অনুদিত হয়েছে যা তাকে তুরস্কের সবচেয়ে জনপ্রিয় লেখকে পরিণত করেছে ৷ পামুক একটি বিত্তবান কিন্তু পতনরত উচ্চশ্রেণীর পরিবারে বড় হন এবং   তার  এই  অভিজ্ঞতা চিত্রিত হয়েছে তাঁর দ্যা ব্ল্যাক বুক এবং ছেফদাত বে ও তাঁর ছেলেরা উপন্যাসে।  উল্লেখ্য,   ছেফদাত বে  ও তার ছেলেরা পামুকের প্রথম উপন্যাস । পামুক তার শৈশব নিয়ে নিজেই বলেছেন  আমি নিজেকে ইস্তানবুলের গল্পকথক বলে মনে করি এবং আমার গল্পের বিষয়বস্তু  হলো আমার শহর । আমি মনে করি এই শহরের প্রতিটি অলি গলিতে গল্প লুকিয়ে আছে । এই গল্প, এই শহরের রহস্য এই শহরের অলিগলি এর সবকিছু আমি ভালোবাসি!   তাই আমার লেখাতে সবসময় ইস্তানবুলের ঘ্রাণ  পাওয়া যায় !  তার এ অভিজ্ঞতা আরো সুন্দর ভাবে উঠে এসেছে তাঁর আত্নজীবনীমূলক  গ্রন্থ ইস্তাম্বুল-এ। ওরহান পামুক সবসময় শিল্পের অন্য সব শাখা থেকে  উপন্যাসকে বেশি গুরুত্ব  দিয়েছেন । পামুকের মতে,  ক্লাসিক বইগুলো সবসময় উপন্যাস হয় যেমন আন্না কারেনিনা, দ্যা ব্রাদার কামোজেব, দ্যা ম্যাজিক মাউন্টেন , শাহনামা ইত্যাদি।পামুক নিজেই বলেছেন আমি প্রায় সময় এই বইগুলো পড়ি এবং আমার  ছাত্র ছাত্রীদের পড়তে বলি কারন এই বইগুলো আসলে উদাহরণ উপন্যাস কতটা শক্তিশালী হতে পারে! পামুক নিজেও তাই সবসময় উপন্যাস লিখে গেছেন  তার কালজয়ী উপন্যাসগুলো হলো  দ্যা হোয়াইট ক্যাসেল, দ্যা ব্লাক বুক, দ্যা নিউ লাইফ, মাই নেম ইজ রেড, স্নো, দ্যা মিউজিয়াম অফ ইনোস্নেস ইত্যাদি ।ওরহান পামুক আমেরিকার কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনামূলক সাহিত্যের  একজন অতিথি শিক্ষক  ।

ইস্তানবুল বইতেই পামুক বলেছেন যে শৈশব থেকে বাইশ বছর পর্যন্ত  সে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিল  ছবি আঁকা আকিতে এবং পামুকের স্বপ্ন ছিল সে বড় হয়ে একজন চিত্রশিল্পী হবেন।২৩ বছর বয়সে পামুক তার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন এবং তিনি সিদ্ধান্ত নেন যে তিনি একজন উপন্যাসিক হবেন।তিনি পড়াশোনা করেন রবার্ট কলেজে এবং স্থাপত্য অধ্যয়নের জন্যে ভর্তি হন ইস্তানম্বুল টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটি-তে কারণ তিনি ভেবে ছিলেন স্থাপত্য তার প্রকৃত স্বপ্ন চিত্রশিল্পী হওয়ার পথ সুগম করবে কিন্তু ৩ বছর পর তিনি স্থাপত্য পড়া বাদ দিয়ে ১৯৭৬ সালে ইস্তানবুল  বিশ্ববিদ্যালয়ে  সাংবাদিকতা ইনস্টিটিউট থেকে স্নাতক পাশ করেন। ২২ থেকে ৩০ বছর বয়স পর্যন্ত পামুক তাঁর মায়ের সাথে বসবাস করেন এবং তাঁর প্রথম উপন্যাস লেখার পাশাপাশি প্রকাশক খুঁজতে থাকেন । ওরহান পামুকের  লেখনী সমন্ধে বলা যায় তিনি তার বইগুলোতে  বেশীরভাগ সময় মনোযোগ দিয়েছেন ইসলামের ইতিহাস, ঐতিহ্যের সাথে আধুনিক তুরস্কের সংস্কৃতি , ঐতিহ্যের  সংকটগুলো বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরতে  । তিনি নিজেকে সাংস্কৃতিক মুসলিম বলে পরিচয় দেন অর্থাৎ ঐতিহাসিক এবং সাংস্কৃতিক ধর্মীয় ঐতিহ্যের সাথে তিনি একাত্ব অনুভব করলেও আল্লাহ-এর প্রতি তাঁর ব্যক্তিগত আনুগত্য নেই। ওরহান পামুক তার লেখনী সমন্ধে বলেছেন আমার বইগুলোতে সাধারনত আমি বেশীরভাগ সময় মনোযোগ দিয়েছি ইসলামের ইতিহাস, ঐতিহ্যের সাথে আধুনিক তুর্কির রূপ পৃথিবীর কাছে তুলে ধরতে।তুরস্ক অনেকদিন ধরেই নিজেদেরকে  সেকুলার রাষ্ট্র  হিসেবে প্রমান করার চেষ্টা করছে তাই অনেক ইসলামিক দল, ইসলামিক রাষ্ট্র বলছে যে এভাবে আসলে তুরস্ক এভাবে ইসলামের অমর্যাদা করছে!ওরহান পামুক তার লেখনীতে তুরস্কের রাজনীতির স্বরুপ তুলে ধরা চেষ্টা সবসময় করেছেন।  পামুকের মতে সে  তুরস্কে  ইসলামের অবমাননা  করতে চায় না।তুরস্ক আসলে একটা ভুল করেছে  আর সেটা হলো তার সামরিক বাহিনীকে বিশ্বাস করাটাই হচ্ছে তুরস্কের সবচেয়ে বড় ভুল বলে ওরহান পামুক মনে করেন আর তার এ মন্তব্যের জন্য তিনি অনেক আলোচনা আর সমালোচনার সম্মুখীন হয়েছেন  বা হচ্ছেন ।

সাহিত্য জীবন

১৯৮২ সালে ছেফদাত বে ও তাঁর ছেলেরা  নামে বইটি প্রকাশিত হলে ১৯৮৩ সালে  পামুক   কেমাল পুরস্কার লাভ করেন  তার এই বইটির  জন্য। পামুকের  লেখনীতে উঠে আসে একই পরিবারের তিন প্রজন্মের উপাখ্যান ।পামুকের প্রথম উপন্যাস প্রকাশিত হয় ১৯৮২ সালে  তিনি লেখক হবেন এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সাত বছর পর ।  ইস্তানবুলের এক ধনী পরিবারের তিন প্রজন্মের জীবনযাত্রার গল্প  পাঠকদের মুগ্ধ করে ।  প্রথম উপন্যাসেই বাজিমাত করেন ওরহান পামুক এবং তার প্রথম উপন্যাসের জন্য পামুক  অনেকগুলো  পুরস্কার জিতে নেন  ।

ওরহান পামুকের  পরের বই দ্যা সাইলেন্ট হাউস ১৯৮৩ সালে প্রকাশিত হয় ।

দ্যা হোয়াইট ক্যাসেল  ১৯৮৫ সালে প্রকাশিত হয় এই বইটি। দ্যা হোয়াইট ক্যাসেল এর মাধ্যমে পামুক তার প্রথম আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জন করেন।সাহিত্যবোদ্ধা আর সাহিত্য সমলোচকদের প্রথম দৃষ্টি আকর্ষনে তিনি সক্ষম হন দ্যা হোয়াইট ক্যাসেল বইটির মাধ্যমে।দ্যা হোয়াইট ক্যাসেলের গল্প গড়ে উঠেছে এক Venetian (ইতালির সাথে সম্পর্কিত এক ধরনের ভাষা)ও একজন অটোম্যান স্কলারের মধ্যকার  গল্প নিয়ে উপন্যাসটি লেখা হয়েছে  ।

১৯৮৫ থেকে ১৯৮৮  পামুক নিউইয়র্কের  কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটিতে অতিথি শিক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন।আমেরিকা থাকাকালীন ওরহান পামুক দ্যা ব্লাক বুক বইটি লিখেন। তার এই বইটি পড়লে আপনার মনে হবে আপনি ইস্তানবুলে আছেন। ইস্তানবুলের সব আলো বাতাস, গলি, রাস্তা- চৌ রাস্তায় অলি-গলিতে  মনে হবে আপনি ঘুরে বেড়াচ্ছেন এমনটা অনুভূতি হবে। বইটির  গল্প অবশ্য গড়ে উঠেছে এক উকিল তার স্ত্রী নিঁখোজ হয়ে যায় এবং তিনি কিভাবে তার স্ত্রীকে খুঁজে বের করেন তার উপর ভিত্তি করে।

“দ্যা   ব্লাক    বুক“ তুরস্কে প্রকাশিত হয় ১৯৯০ সালে । দ্যা ব্লাক বুক পামুকের খ্যাতি আরো বাড়িয়ে তোলে কারন এই বইটির মাধ্যমে আসলে পামুক প্রমাণ  করে দেয় সে অতীত আর বর্তমান নিয়ে লিখতে সমানভাবে পারদর্শী । ১৯৯১ সালে ওরহান পামুক এর কন্যা রুয়া জম্মগ্রহন করে এবং ১৯৯১ সালে পামুক দ্যা হিডেন ফেস সিনেমার জন্য চিএনাট্য লিখেন যা তার “ ব্লাক  “ নামক গল্পের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে।

১৯৯০ সাল থেকে হঠাৎ করেই ওরহান পামুক তুর্কিশ রাষ্ট্র ব্যবস্থা, মানবাধিকার, চিন্তার স্বাধীনতা বিষয়ে প্রথম লেখালেখি শুরু করেন ।১৯৯০ সালে প্রকাশিত Kara Kitap (The Black Book)(কালো পুস্তক) উপন্যাস তাঁকে এনে দেয় জনপ্রিয়তা ।বইটি আলোচিত হয়ে ওঠে এর জটিল রচনাশৈলী ও প্রাচুর্যতার   জন্য । এ উপন্যাস অবলম্বনে একটি ছায়াছবি চিত্রায়িত হয় যা পরিচালনা করেন বিখ্যাত তুর্কি পরিচালক ওমর কাফুর ।

পামুকের বই দ্যা নিউ লাইফ ১৯৯৪ সালে প্রকাশিত হয় এবং এই বইয়ের কাহিনী গড়ে উঠে একজন তরুন বিশবিদ্যালয়ে পড়ুয়া ছাত্র যে একটি রহস্য উপন্যাস দিয়ে অনেক প্রভাবিত হয়। প্রকাশিত হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত বইটি তুরস্কের সবচেয়ে বেশি পঠিত উপন্যাস হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।

তুর্কি পরিচালক ওমর কাফুর ১৯৯৫ এ প্রকাশিত পামুকের ৫ম উপন্যাস Yeni Hayat। (নতুন জীবন) তুরস্কে আলোড়ন সৃষ্টি করে এবং সবচেয়ে দ্রুত বিক্রি হওয়ার রেকর্ড করে।

১৯৯৮ সালে ওরহান পামুকের আরেকটি যুগান্তকারী বই বের হয় যার নাম হচ্ছে  “মাই নেম ইজ রেড এই বইটির কাহিনী গড়ে অটোম্যান আর পাসির্য়ান দুইজন লেখকের তারা কিভাবে পশ্চিমের বাহিরের পৃথিবীকে দেখে এবং তাদের ব্যক্তিগত জীবন তাদের প্রেম কাহিনী এইসব কিছু  মাই নেম ইজ রেড বইটি লেখা হয়েছে । ২০০০ সালে প্রকাশিত মাই নেম ইজ রেড পামুককে পৌঁছে দেয় জনপ্রিয়তার  শীর্ষে।  উত্তরাধুনিক রচনাশৈলীতে এ উপন্যাসে বিধৃত হয় । চিত্রকলা, রহস্য, দর্শন ও প্রাচ্য-পাশ্চাত্যের দ্বন্দ্ব এবং বর্ণিত হয় ১৬ শতকের অটোম্যান  সাম্রাজ্যের সুলতান মুরাট তৃতীয়ের   রাজত্বের তুষারাচ্ছন্ন ৯টি দিন। পাশ্চাত্যের রেঁনেসার প্রভাবে প্রাচ্যের শিল্পের অস্তিত্ব সংকট পাঠককে চলমান প্রাচ্য-পাশ্চাত্যের অস্থিরতার কথাই মনে করিয়ে দেয়। অনেকগুলো ভাষায় অনুদিত বইটি ২০০৩ সালে জিতে নেয় বিশ্বের সবচেয়ে বেশি অর্থ মূল্যের সাহিত্য পুরস্কার International Dublin Literary Award  যার  বর্তমান  মূল্যমান ১,২৭,০০০$  মার্কিন  ডলার ।

২০০২ সালে  পামুকের একটি রাজনৈতিক উপন্যাস প্রকাশিত হয় যার নাম  স্নো (তুষার ) ।    স্নো পামুক নিজেও বলেছেন তার প্রথম এবং শেষ রাজনৈতিক উপন্যাস তুরস্কের যে অস্থিরতা,গণতন্ত্রের যে বেহাল অবস্থা তার সম্পূর্ণ চিত্র এই বইয়ের মাধ্যমে ফুটে উঠেছে।এই উপন্যাসে সীমান্তবর্তী শহর কারসের   ইসলামিক ও পাশ্চাত্যের দন্দ্বের পরিবেশ চিত্রিত হয়েছে।প্রবাসী তুর্কি কবি ‘ কা  ‘ এ শহরে হিজাব পরিহিত নারীদের ঘন ঘন আত্মহত্যার ঘটনা উদঘাটনের উদ্দেশ্যে এসে মুখোমুখি হয় পুরাতন প্রেমিকার, উগ্র আদর্শে বিশ্বাসী মাওলানা ও নেতার, দূর্নীতি-গ্রস্থ প্রশাসনের,  নাস্তিকতার এবং মৌলবাদী ও উদারপন্থিদের সংঘর্ষের মধ্যে পড়ে যায় । ওরহান পামুকের এই বইয়ের কাহিনী গড়ে উঠেছে একটা ছোট শহর  “কারস” এর উপর ভিত্তি করে এটা ওরহান পামুকের লেখা রাজনৈতিক উপন্যাস ৷

ওরহান পামুকের স্নো বইটির জনপ্রিয়তা দেখলে অবাক হয়ে যেতে হয়।বইটি লেখার শুরুতে পামুক ভাবতে পারেন নাই বইটা এতো জনপ্রিয় হবে। পূর্ব আর পশ্চিমের বিরোধ যে তুরস্কের প্রতিদিন কার জীবন যাত্রায় কতটা প্রভাব ফেলে তা স্নো বইতে ওরহান পামুক ফুটিয়ে তুলেছেন।

স্নো নিয়ে পামুক নিজেই বলেছেন প্রথম দিকে আমি যখন উপন্যাস লিখতে শুরু করি তুরস্কের পাঠকরা স্নো পড়তে শুরু করে তখন তুরস্কের মিডিয়া, সাংবাদিক আর সাহিত্য বোদ্ধারা জিজ্ঞেস করতে থাকে আমার বই পাঠকরা পছন্দ করে কেন ? কিছুদিন পর তুরস্কের বাহিরে পৃথিবীব্যাপী পাঠকরা যখন আমার বই পড়তে থাকে তখন বাহিরের সাংবাদিকরা জিজ্ঞেস করতে থাকে পামুক আমাদের দেশের পাঠকরা আপনার বই পড়ে কেন? ওরহান পামুকের উত্তর তখন কিন্তু খুব চমকপ্রদ।তিনি উত্তর  দেন আমি সাধারনত সেসব বই লিখি আসলে যেসব বই আমি পড়তে চাই ।আর এখন আমার মনে হয় পৃথিবী ব্যাপী সবাই আমার অনুভূতির সাথে তাদের অনুভূতি যোগ করতে পারে।আমি যেভাবে চিন্তা করি তারাও আমার চিন্তার সাথে  একাত্মতা প্রকাশ করে । পাঠকরা আমার চিন্তার সাথে পরিচিত আর তাই তারা আমার বই পড়তে ভালোবাসে আর তাই প্রকাশকরা আমার বই প্রকাশ করতে আগ্রহী ! ২২ বছর বয়স থেকে যখন আমি লিখতে শুরু করি তখন থেকে আমি ভাবি ভবিষৎে  হয়তো আমি যা লিখবো সেই সব লেখা এখন আমি যা লিখছি তা থেকে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হবে ভালো হবে ।তবে আমার মনে হয় সেই সময় এখনও অনেক দূরে রয়েছে। আমার পক্ষে সেরকম কিছু তৈরি করা এখনও সম্ভব হয়নি । আমার মনে হয়  আমার সেরা কাজটা করে উঠা এখনও আমার পক্ষে সম্ভব হয়নি৷

২০০৩  সালে প্রকাশিত হয় (ইস্তানম্বুল)

-একটি শহরের স্মৃতি) বইটি মূলত পামুকের স্মৃতিচারনমূলক একটি বই । আর  এই বইটি থেকে  পামুকের জীবন সমন্ধে অনেক বেশি ভালো ধারনা পাওয়া যায় ।

২০০৬ সালে সাহিত্যে নোবেল পাওয়ার পর ২০০৮ এর গ্রীষ্মে তিনি প্রকাশ করেন নিস্পাপের জাদুঘর    (Museum of Innocence  ) নামক একটি উপন্যাস। । এই উপন্যাসের
সাথে সম্পর্কিত দৈনন্দিন সামগ্রী নিয়ে পামুক ইস্তানম্বুলে একটি সত্যিকার জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করেন। ওরহান পামুকের নিস্পাপের জাদুঘর বই   বের হয় যেটাতে ওরহান পামুক বর্ণনা  করেন  একজন ব্যক্তি একটা জাদুঘর বানিয়ে চলছেন যিনি তার প্রিয়তমাকে হারিয়েছেন।ভালোবাসা বঞ্চিত মানুষটি তার ভালোবাসাকে স্মরনীয় করে রাখার জন্য ভালোবাসার মানুষের স্মৃতির উদ্দেশ্যে জাদুঘর বানিয়ে চলছেন।আর এই জাদুঘর তিনি বানাচ্ছেন সেসব বস্তু দিয়ে যেসব বস্তু তার প্রেমের সাথে ভালোবাসার মানুষটির সাথে জড়িত ।

ওরহান পামুকের দশম উপন্যাস দ্যা রেড হেয়ার উইম্যান যেটি প্রকাশিত হয় (২০১৬)সালে  যার কাহিনী গড়ে উঠেছে একজন শিক্ষানবিশের  গল্প  নিয়ে যে শূন্য মরুভূমিতে পানি খুঁজছে ৷

এটি   এমন একটি উপন্যাস যেটাতে   ওরহান পামুক ভলতেয়ারের  দর্শন দিয়ে অনেক বেশি অনুপ্রাণিত  হয়েছেন  । ভলতেয়ার যেমন গল্পকথকের মতো তার দর্শন বলে গেছেন তেমনি ওরহান পামুক তার দ্যা রেড হেয়ার উইম্যান বইতে একই ধাঁচে লিখে গেছেন। এই বইটার আবেদন অনেক বেশি বাড়িয়ে দিয়েছে যেভাবে ওরহান পামুক পূর্ব আর পশ্চিমের সাহিত্যকে একত্রে এক সাথে সংযোগ করেছেন তার জন্য  । সমলোচকদের মতে পামুকের প্রাচ্য আর পাশ্চাত্যের এতো সুন্দর সংযোগের জন্য  পামুক  প্রশংসা পাওয়ার দাবীদার । এর  কাহিনীটি এমন  ১৯৮০ সালে মাস্টার মাহমুত আর তার শিক্ষানবিশ নতুন এক পদ্ধতি ব্যবহার করেন মরুভূমিতে কুয়া খননের জন্য এবং এর মাধ্যমে তিরিশ বছর আগে ইস্তানবুলে হয়ে যাওয়া এক পুরনো খুনের রহস্য বের হয়ে আসে ।এই বইটি পড়লে বোঝা যায় ওরহান পামুক তার সুনিপুন হাতে কিভাবে পশ্চিমের সফোক্লাসের ওদিপাসআরপূর্বের ফেরদৌসির  শাহনামার রুস্তম আর সোহরাবের কাহিনীর কি অপূর্ব সংমিশ্রণ ঘটিয়েছেন !

পামুক তার জীবনের তিন বছর যে সময়টা আমেরিকায় কাটিয়েছেন তা বাদ দিলে বাকিটা সময় তিনি তুরস্কে কাটিয়েছেন একই রাস্তায় এবং একই বাড়িতে যে বাড়িতে তিনি জম্মেছিলেন । পামুক গত ৪০ বছর ধরে উপন্যাস লিখেছেন এবং  তিনি নিজেই বলেছেন লেখালেখি ছাড়া তিনি তার সমগ্র  জীবনে আর বিশেষ কিছু করেন নাই।বিভিন্ন সময় ওরহান পামুক তার বিভিন্ন মন্তব্যের জন্য অনেক সমালোচনার মুখোমুখি হয়েছেন  । আর তাকে নিয়ে বিতর্কের  উত্তর তিনি নিজেই দিয়েছেন এইভাবে  :

“তুরস্কে আমি বেশি সমলোচিত আলোচিত আমার বইয়ের জন্য না বরং আমার  বিভিন্ন সময়কার সাক্ষাৎকারের জন্য ।কারন রাজনৈতিক নেতারা আমার উপন্যাস  পড়ে না, তারা যা করে তা হলো শুধু আমার সাক্ষাৎকার দেখেন ৷অটোম্যান  সাম্রাজ্যে আর্মেনিয় গণহত্যা সম্পর্কে মন্তব্য করায় ২০০৫ সালে তুরস্কে তাঁকে বিচারের সম্মুখীন হতে হয় । পামুকের নিজস্ব বক্তব্য, জন্মভূমিতে বাক-স্বাধীনতার অভাবের প্রতি আলোকপাত করাই তাঁর উদ্দেশ্য ছিল। এর ফলশ্রুতিতে মিছিলে তাঁর বই পোড়ানো হয়। তাঁকে হত্যার চেষ্টাও করা হয়।এতো কিছুর পরেও দমে যান নি ইস্তানবুলের গল্পকথক।এখনো লিখছেন আর তার চারপাশে তৈরি করছেন মুগ্ধতা।  এই   মুগ্ধতা হচ্ছে  সাহিত্যের প্রতি মুগ্ধতা । সুন্দরের প্রতি পূজা । পামুক মনে করেন তার লেখালেখির জীবনের তিনি এখন মধ্যখানে রয়েছেন ! তিনি আশা প্রকাশ করেছেন তিনি আরো লিখবেন আর তিনি পাঠকদের বারবার চমকে দিবেন  তার অসাধারন লেখনী দিয়ে  মৃত্যুর আগ পর্যন্ত । আমরাও চাই আমাদের প্রিয় এই লেখক আরো অনেক দিন লিখুক আর আমাদের বারবার চমকে দিক তার কলমের সৃষ্টিশীলতা  দিয়ে ।

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন