শনিবার, ২ জানুয়ারি ২০২১; ১২:১০ পূর্বাহ্ণ


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে নিয়োগপ্রাপ্ত নবীন শিক্ষক শিক্ষিকাদের উদ্দেশ্যে ২০১২ সালের মে মাসে নীচের লেখাটি লিখেছিলাম। এর পরেই ঐ বিভাগে এক আলোড়ন ওঠে। একের পর পর এক জরুরী মিটিং ডাকা হতে থাকে আমাকে কি করে শায়েস্তা করা যায়। আআমস ভিসির কাছে ঘন ঘন যাতায়াত শুরু হয়। একসময় উনাদের প্রাণের আশা পূর্ণ হয়। আআমস আমাকে বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠায় ২০১২ সালের সেপ্টেম্বর মাসের ঘটনা। ওটা হলো বাধ্যতামূলক ছুটির প্রথম পর্ব। আর দ্বিতীয় পর্ব মাত্র গত বছরের ঘটনা। ওটার মামলা এখনও চলছে। যাই হোক, শুনলাম বিভাগে নতুন শিক্ষক নিয়োগ হয়েছে। আবারো শেয়ার করছি, হয়তো ওদের কোন কাজে আসবে।

 

“হে নবীন শিক্ষক,

আমি আবার নিজের পরিচয় দিয়া অযথা সময় অপচয় করিতে চাহি না। আমি এই দেশের একটি অন্যতম পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি বিভাগের একজন উদীয়মান গবেষক তারকা ব্যক্তিত্ব বলিয়া পরিচিত। আমার পেশাগত জগতে আমাকে সকলে একনামে চেনে। এই মাত্র কিছুদিন আগে আমি যেই বিভাগে কর্মরত সেই বিভাগের একটি অনুষ্ঠানে আমাকে কিছু বক্তব্য প্রদান করার জন্য অনুরোধ করা হইয়াছিলো। সেখানে আমি আমার বিভাগের নবীন শিক্ষকদের উদ্দেশ্যে কিছু উপদেশ বাণী দিয়াছিলাম। কিন্তু অনুষ্ঠানের স্বল্প পরিসরে আসলে অনেক কিছুই বলা সম্ভব হয় নাই। তাই এখন সেদিনকার না বলা কথা গুলো বলিবার চেষ্টা করিতেছি। আমার ধারনা নতুবা আমার এই মহামূল্যবান উপদেশবাণী হইতে সমগ্র শিক্ষক জাতি চরমভাবে বঞ্চিত হইতে পারে।

একজন নবীন শিক্ষক হিসেবে যেই বিষয়টি সর্বোপরি গুরুত্বপূর্ণ তাহা হইলো বিশ্ববিদ্যালয়ে তোমার অনুপস্থিতি। হ্যাঁ তুমি সঠিক শুনিয়াছো, উপস্থিতে নহে অনুপস্থিতি। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে এবং পেশাগত জীবনে সফলতা পেতে হলে অতি অবশ্যই এই বিশ্ববিদ্যালয়ে তোমার উপস্থিতি নুন্যতম হতে হবে । এই বিশ্ববিদ্যালয় হইতে তুমি যত অধিক দূরত্ব বজায় রাখিবে তুমি তত সাফল্যমন্ডিত শিক্ষক এবং গবেষক হইবে। আমার কথা যদি তোমার বিশ্বাস না হয় তা হলে তুমি তোমার আশেপাশের শিক্ষক মন্ডলীর দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করিলেই বুঝিতে পারিবে। সেইসব শিক্ষকেরাই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়িয়া থাকে যাহারা প্রকৃতপক্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়িয়া থাকা ছাড়া আর কোন কিছু করিতে সক্ষম নন। তাহাদের জন্য আমি এক ধরনের সহানুভূতি মিশ্রিত করুনা অনুভব করি।

বিশ্ববিদ্যালয় হইতে যথাসম্ভব দূরত্ব বজায় রাখিলেও শ্রেনীকক্ষে উপস্থিতি নিয়মিত থাকাটা বাধ্যতামূলক। এই ব্যাপার ফাঁকি প্রদান কোনরূপেই বাঞ্জনীয় নয়। নতুবা তোমার সাফল্যে যারা ঈর্ষান্বিত তাহারা অনেক কটু কথা বলিবার সুবর্ণ সুযোগ পাইবে। অনেক প্রথিতযশা অর্থনীতিবিদ শ্রেণীকক্ষে নিয়মিত উপস্থিত না হইবার কারণে বাজারে তাহাদের নামে অনেক বদনাম চালু রহিয়াছে। তুমি অবশ্যই চাইবে না তোমার ক্ষেত্রেও এরকম দুর্নাম বাজারে ছড়াইয়া পড়ুক।

তবে ক্লাস নিবার পরে এক মুহুর্তের জন্যেও বিভাগের কাজের জন্য সময় ব্যয় করিবে না। মনে রাখিবা, তোমার বিশ্ববিদ্যালয়কর্তৃক বরাদ্দকৃত রূমে তুমি যত কম সময় ব্যয় করিবা তুমি তত বড় শিক্ষক এবং গবেষক।

তবে সর্বোপরি উৎকৃষ্ট হইবে যদি তোমার জন্য কোন কক্ষই বরাদ্দ না থাকে। তাহা হইলে কেউ আশাও করিবে না যে তুমি তোমার কক্ষে অবস্থান করিবে। কেহই তোমার কক্ষের পানে চাহিয়া বলিবে না, উনাকে তো বিশ্ববিদ্যালয়ে কক্ষে একেবারেই দেখা যায় না। ইহা অবশ্য তোমার পক্ষে চাকুরী জীবনের শুরুতেই করাটা একটু বিপদজনক হইয়া যাইবে। তাহার চাইতে ভালো হইবে যদি তুমি বিদেশ হইতে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করিয়া আসিয়া দেখো যে তোমার কক্ষ অন্য কোন শিক্ষককে বরাদ্দ করা হইয়াছে, তখন তুমি আর কক্ষের বরাদ্দ চাহিয়া ঝামেলা বাড়াইলে না। বলাই বাহুল্য আমিও একই পন্থা অবলম্বন করিয়াছি এবং আমার প্রভূত সাফল্যের কথা কে না জানে।

এই বিভাগের একজন শিক্ষকের কথা না বলিয়া যাইতে পারিতেছি না। তিনি হইলেন একজন সর্বোচ্চ পর্যায়ের অকর্মন্য ব্যক্তি। তাহাকে একসময় প্রায়শই তাহার কক্ষে বসিয়া থাকিতে দেখা যাইতো এবং বিভিন্ন সময়ে ব্যালকনিতে অযথা ছুটাছুটি করিতে দেখা যাইতো । আর বিভাগের যত নগণ্য এবং তুচ্ছ কাজে তাকে সবসময় পাওয়া যায়। এখন অবশ্য তাহাকে সাইজ করিয়া ফেলিয়াছি তাই তিনি তেমন আর পরিলক্ষিত হন না। তার এই ধরনের কাজ দেখিয়া তার প্রতি আমি একধরনের অনুকম্পা বোধ করি। সবাই তো আর উচ্চ পর্যায়ের মেধা লইয়া জন্মাইতে পারে না এবং সেই মেধা ব্যবহার করিবার মত অধ্যবসায় হয়তো তাহাদের নাই। তাহারা তখন বিভাগে কুইজ প্রতিযোগিতা, নবীন বরণ এইসব নিকৃষ্ট কার্যকলাপের সাথে নিজেদের যুক্ত রাখে ছাত্র উপদেষ্টার একটা নামকাওয়াস্তে পদবী লাগিয়ে। মুখে বড় বড় কথা বলে যে ইহাতে ছাত্র ছাত্রীদের মানসিক এবং সার্বিক গঠনে সহায়তা করবে। এইসব অন্তঃসারশূন্য কথা শুনিয়া আমার প্রচন্ড হাসির উদ্রেক হয়। আমার প্রতিষ্ঠানে এক মাস কাজ করিয়া একজন ছাত্র বা ছাত্রীর যে পরিমাণ জ্ঞান অর্জন করিতে পারে তাহা অসামান্য এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে হাজার বৎসর থাকিয়াও তাহারা সেই জ্ঞান অর্জন করিতে পারিতো না।

তাই নবীন শিক্ষকের প্রতি আমার আহবান, তুমি অবশ্যই নিজেকে ছাত্র ছাত্রীদের লইয়া এই ধরনের কার্যকলাপ হইতে সম্পূর্নরূপে বিরত থাকিবে। তাহা না করিলে তোমাকে অহেতুক বিভাগে অধিক সময় কাটাইতে হইবে যাহা হইবে তোমার মূল্যবান সময়ের সম্পূর্ন রকম অপচয়। এই আপ্ত বাক্যটি মনে রাখিবে যে টাইম ইজ মানি। শুধু তাই নয়, ইহাও মনে রাখিবে যেইসব শিক্ষকদের এই ধরনের কার্যকলাপের সাথে যুক্ত তাহাদের ব্যক্তিগত কিছু কেলেংকারী রইয়াছে বলিয়া বাজারে গুজব প্রচলিত রহিয়াছে। ব্যাপারটি আমি গভীরভাবে পর্যবেক্ষন করিতেছি। একজন অনুগত প্রাক্তন ছাত্র আমি পাইয়াছি যে উক্ত ব্যক্তিটির ব্যাপারের তাঁর প্রচন্ড আক্রোশ। তাহাকে লইয়া আমি একটি জটিল প্ল্যান আঁটিয়াছি। যদিও কিছু সংখ্যক শিক্ষক বলিতেছে যে অন্যের ব্যক্তিগত ব্যাপার লইয়া এইরকম ঝাপাঝাপি করা খুবই কুরুচির পরিচয়। কিন্তু এই অকর্মণ্য ব্যক্তিটির বিভাগে উপস্থিতি এবং বিবিধরূপ কার্যকলাপ আমাকে এইরূপ বিরক্তির উদ্রেক করিয়াছে যে আমি ব্যক্তিগত ব্যাপার স্যাপার আর বুঝিতে চাহি না। আমার আরাধ্য শুধুমাত্রই একটি খুবই তৃপ্তিকর এবং মধুর প্রতিশোধ।

আশার বিষয় হইতেছে যে আমি বেশ কিছু শিক্ষকের নিকট হইতে বেশ সহযোগিতাও পাইতেছি। বিশেষ করিয়া একজন শিক্ষক তো এতই উৎসাহী যে পুরো দায়িত্বটি তিনি আমার নিকট হইতে নিজের কাঁধে তুলিয়া নিয়াছেন। তিনি সারাদিন বিভাগে থাকেন আর এই সমস্ত বিষয়ের সন্ধানে থাকেন, কাহাকে কিভাবে বাঁশ প্রদান করা যাইতে পারে। আমার পক্ষে ইহাই স্বাভাবিক মনে হয়। আমার মতে এটি যদি কোন একাডেমিক বিষয় হইতো আমি জানি আমি তাহাদের বেশীভাগকেও ধরিয়া বাঁধিয়াও আনিতে পারিতাম না। কিন্তু ব্যাপারটি যেহেতু নারীঘটিত তাই আমি বেশ কিছু উৎসাহী উৎসাহী শিক্ষক শিক্ষিকাকে পাচ্ছি। একজন গবেষক হিসাবে আমি বিষয়টি এভাবে ব্যাখা দিতে পারি।

বিভাগ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন হইতেছে অর্থনীতির পরিভাষায় যাহাকে বলে পাবলিক গুড। এটার কোন ownership নাই। তাই কোন private incentive নাই বিভাগ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নের জন্য। কারণ বিভাগের বা ছাত্রছাত্রীদের উন্নয়নে private benefit অনুপস্থিত। তাঁহার চাইতে নিজের আখের গোছানোর চেষ্টা চরিত্র করিয়া private benefit অর্জন অতি উত্তম কার্য। তাই গবেষক ছোটেন তাঁর কনসাল্টেন্ট ব্যবসায়, ধানের পাটের ব্যবসায়ী ছোটেন তাঁর পাটের গোলায় ইত্যাদি ইত্যাদি।

কিন্তু যেই মুহুর্তে নারী বা পুরুষ ঘটিত ব্যাপার চলিয়া আসে তখন একটি স্বয়ংক্রিয় private incentive তৈরী হইয়া যায়। প্রথমত ব্যাপারটি বেশ আকর্ষনীয় এবং মশলাদার। শুনিতে এবং আলোচনা করিতে বেশ আনন্দ পাওয়া যায়। আর এই সুযোগে সংশ্লিষ্ট শিক্ষককে শায়েস্তা করিবার একটি উৎকৃষ্ট সুযোগ তৈয়ার হয়। তাই তখন গুটি কয়েক বেশ উৎসাহে ভরপুর উদ্যমী শিক্ষক বা শিক্ষিকাকে পাওয়া যাইতে পারে এই ব্যাপারে। তাঁহারাই তখন সত্য মিথ্যা তথ্য মিশাইয়া বাকী শিক্ষকগণকে খেপাইয়া তুলিয়া একটি দুর্বার আন্দোলন গড়িয়া তুলিয়া সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের বারোটা বাজাইয়া দিতে সক্ষম হন। এই দিক দিয়া আমাদের এই বিশ্ববিদ্যালয়ের হার্ভার্ড, শিকাগো বা অন্যান্য নামী দামী বিশ্ববিদ্যালয় হইতে পিএইচডি প্রাপ্ত শিক্ষক আর আবুজরগিফরী কলেজের শিক্ষকের মধ্যে তেমন কোন পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়না। এই মডেলের সার্থক প্রয়োগ আমার বিভাগে ঘটাইতে পারিয়া এবং ওই অকর্মণ্য শিক্ষকের বার ঘটিকা বাজাইয়া আমি যারপরনাই আনন্দিত বোধ করিতেছি।

দু’একজন বেরসিক শিক্ষক অবশ্য বলেন তাঁহারা তাঁহাদের দীর্ঘ শিক্ষক জীবনে কিছু শিক্ষক শিক্ষিকাদের মধ্যে এই অপূর্ব ঐক্য বিভাগ বা ছাত্র ছাত্রীদের উন্নয়নের জন্য কস্মিনকালে পর্যবেক্ষন করেন নাই। আমি এইসব অর্বাচীন বক্তব্যে তেমন একটা কর্ণপাত করিবার প্রয়োজন অনুভব করি না। কারণ ইহার ব্যাখ্যা তো আমার উপরোক্ত incentive model বেশ ভালোভাবে প্রদান করিয়াছে।

তবে ইহা অনস্বীকার্য যে আমি কিছুটা বিব্রত বোধ করি বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বক্ষণিক বেতনভুক কর্মচারী হয়েও সেখানে নুন্যতম সময় ব্যয় না করার জন্য। তাই আমার মনে একটি সার্বক্ষণিক শঙ্কা কাজ করে হয়তো বিভাগে আমার অবস্থান দুর্বল হতে পারে। তাই আমি সর্বক্ষণ চেষ্টা করি যাতে বিভাগে আমার অনুগত অথবা বিরুদ্ধচারণ করবে না এইরকম এক দল নবীন শিক্ষকদের হাতে রাখতে। এই উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য আমি একটি দারুন পন্থা আবিষ্কার করিয়াছি। সবাই জানে যে আমার একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান রহিয়াছে যেখানে বেশ কিছু উচ্চমার্গীয় গবেষনা হইয়া থাকে। আর উন্নয়নের নামে গবেষণা যে বাংলাদেশে একটি অন্যতম লাভজনক ব্যবসা তাহা আমার চেয়ে ভাল আর কে জানে!

এই ব্যবসার প্রধান কাঁচামাল হইতেছে মানব সম্পদ। কি রকম মানব সম্পদ জানতে চান? আমি কিন্তু আমার বিজনেস সিক্রেট এইখানে ফাঁস করিয়া দিতেছি। প্লীজ ইহা কাহারো সহিত শেয়ার করিবেন না। আমার দরকার কিছু তথ্য উপাত্ত লইয়া কম্পিউটারে ঘাটাঘাটি করিয়া সুন্দর সুন্দর কিছু টেবিল চেয়ার তৈয়ার করিয়া দেয়া। ইংরাজী ভাষাটা সুন্দর রূপে লিখিতে পারাটা বাঞ্জনীয়। আর দরকার দাতা গোষ্ঠী কি চাইতেছে সেটা একটু করিয়া আলগোছে জানিয়া লওয়া। ধরা যাক দাতা গোষ্ঠী বেশ খরচ পাতি করিয়া একটি দারিদ্র নিরামক কর্মসূচী হাতে লইল। এইবার আমাকে বলা হইল, এইটা কি রকম কাজ করিতেছে তাহা একটু মূল্যায়ন করুন। আমি সাথে সাথে বুঝিয়া লইলাম তাহারা কি চায়।

তাঁহারা আর কি চাইবে বলুন? লাখ লাখ অর্থ ব্যয় করিয়া ইহা নিশ্চয়ই দেখিতে চায় না যে উনাদের প্রজেক্ট একটি বিশাল অশ্বডিম্ব প্রদান করিয়াছে। উনারা চায় ইহা দেখানো উনাদের সব প্রজেক্ট জম্পেশ কাজ দেখাইয়া বাংলাদেশ কেন পৃথিবীর তাবৎ দারিদ্র সমূলে উৎপাটন করিয়াছে। তথ্য উপাত্ত একটু এদিক ওদিক করিলে ইহা কোন বিষয়ই নহে। এই সমস্ত বেশীর ভাগ কাজ আমার সুরম্য অভিজাত এলাকায় বসিয়া আমার সুযোগ্য প্রাক্তন ছাত্র ছাত্রীরাই বেশীর ভাগ করে। আমি শুধু রিপোর্ট জমা দেয়ার আগে একটু দেখিয়া লই। না দেখিলেও চলে। এই দেশে দাতা গোষ্ঠীতে সেইসব বেশীর ভাগ সাদা চামড়াই যাহারা আছে তাহারা বেশীর ভাগই তাহাদের দেশে অচল মাল। না হইলে কি আর বাংলাদেশে পড়িয়া থাকে। তাহাদের হাতে পছন্দমত কিছু ধরাইয়া দিলেই তাহারা কিন্তু বহুত খুশী হইয়া বাক বাকুম করিতে করিতে ঝনঝন করিয়া বেশ কিছু ডলার ঢালিয়া দিবে।

এই ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে আমার প্রতি বৎসরই নতুন নতুন কর্মচারী প্রয়োজন হয়, সেখানে আমি যাহারা সদ্য বিভাগ হইতে পাশ করিয়াছে এবং খুবই ভাল ফল লাভ করিয়াছে তাহাদের নিয়োগ প্রদান করিয়া থাকি। তাহাতে আমার এক ঢিলে দুই পক্ষী মারার মত কর্ম সম্পাদন হইয়া থাকে। প্রথমত তাহারা আমার ব্যবসার শ্রীবৃদ্ধিতে খুবই কাজে আসিয়া থাকে, কারণ তাহারা যেহেতু খুবই মেধাবী ছাত্র-ছাত্রী সুতরাং তাহাদের কাজও আমার বেশ পছন্দ মাফিক হইয়া থাকে। তাদের মধ্যে থেকেই কেউ কেউ আবার পরবর্তীকালে বিভাগে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করিয়া থাকে এবং স্বভাবতই আমার সহিত তাহাদের একটা বেশ সৌহার্দপূর্ণ সম্পর্ক বজায় থাকে। তার মধ্যে আবার বেশ কিছু একটা কর্তৃত্ব মেশানো থাকে কারণ হাজার হউক তারা একসময় তো আমার বেতনভূক কর্মচারী ছিল। ইহার ফলে দিন দিন বিভাগে আমার কর্তৃত্ব বৃদ্ধি পাইতেছে।

প্রতিবার অবশ্য আমার এই চেষ্টা সফল হয় না। মাঝে মধ্যে কিছু বেয়ারা ছাত্র আমার প্রতিষ্ঠানে যোগদান দিতে চায় না। সেরকম একজন যখন বিভাগে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছিল তখন তার নামে একটি গুজব ছড়িয়ে তার নিয়োগ বন্ধ করার আমি প্রানান্ত চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত আমার এই আন্তরিক চেষ্টা একেবারেই সফল হয় নাই।

যাই হউক, আমার আরও অনেক অমূল্য বাণী প্রদান করার ছিল কিন্ত আমার এখনই বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্টের জুনিয়র ক্লার্কের প্রধান সহকারীর সাথে একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ মিটিং এ উপস্থিত হইতে হইবে বিধায় আমার বক্তব্যের এখানে সমাপ্তি টানিতে হইতেছে। আমি জানি আমি এই পর্যন্ত যতটুকুই বলিয়াছি তাহাই এই জগতের তাবৎ নবীন শিক্ষকদের জন্য একটি অমূল্য পাথেয় হইয়া থাকিবে। আমি আমার অতি ব্যস্ততার মধ্যিখানে যে এতখানি সময় বাহির করিয়া এই উপদেশ বাণী প্রদান করিয়াছি তাহার জন্য নবীন শিক্ষককুলের আমার কাছে আজীবন কৃতজ্ঞ থাকা উচিৎ। আশা করি আমার নির্দেশনা মানিয়া চলিয়া তোমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা জীবন আমার মতই অতি সাফল্যমন্ডিত হইবে। আমার আন্তরিক শুভ কামনা রইলো।

পেশাগত জীবনে বৃহষ্পতির তুঙ্গে থাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জনৈক শিক্ষক”

পুনশ্চঃ লেখাটির মধ্যে একটি সামগ্রিক গাম্ভীর্য আনার জন্য সাধু ভাষায় লিখিবার চেষ্টা করিয়াছি। কিন্তু বিশ্ব দাতা গোষ্ঠীর সহিত অনবরত ইংরাজী মাধ্যমে যোগাযোগ রাখিবার কারণে আমার বাংলা ভাষার চর্চা খানিকটা ব্যাহত হইয়াছে। তাই উপরোক্ত লেখনীতে সাধু এবং চলিত ভাষার মিশ্রণ হইয়া থাকিলে আমি আন্তরিক ভাবে দুঃখিত।

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন