রবিবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২১; ৯:৪০ অপরাহ্ণ


২০১৮ সালের ৫ নভেম্বরে ফোর্ট ওয়েইন, ইন্ডিয়ানায় অবস্থিত কাউন্টি ওয়ার মেমোরিয়াল কলিসিয়ামে ডোনাল্ড ট্রাম্প রিপাবলিকান সিনেটর মাইক ব্রাউনের প্রচারাভিযান সমাবেশে আসেন।  অ্যারন বার্নস্টেইন / গেটি ইমেজেস

 

 ২০১৮ এর ৬ নভেম্বরে অনুষ্ঠিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন একটি দ্বিধাবিভক্ত কংগ্রেস তৈরি করেছে ও মূলত এক দেশে দুই জাতির অস্তিত্বকে পুনরায় জোরদার করেছে। তবে এটি আরো একবার দেশটির বিদ্যমান রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে নৈতিক ও রাজনৈতিক অধোগতির গভীর পর্যায়কে — অন্তত রাজনৈতিক প্রচারাভিযানে যা দেখা যায় সেটাকে উদ্ঘাটন করেছে। নিচের একান্ত সাক্ষাৎকারে বিশ্বনন্দিত পণ্ডিত ও গণ-বুদ্ধিজীবী নোয়াম চমস্কি আলোচনা করেছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও আরো বৃহৎ অর্থে পৃথিবী যে সব প্রধান ইস্যুর মোকাবিলা করছে সেগুলোকে কীভাবে দুই পার্টির অধিকাংশ প্রার্থী সামান্যই নির্দেশ করেছেন।  

সি.জে. পলিক্রনিউঃ নোয়াম, মানুষ যখন ২০১৮ এর মধ্যবর্তী নির্বাচনের বিজয়ী ও পরাজিতদের নিয়ে আলোচনা করছে (এবং সেই নির্বাচনের অর্থ নিয়ে স্পষ্টতই অনেক কিছু বলার আছে), তখন আপনি কোনটিকে  আমেরিকার চলমান গণতন্ত্রের সর্বশেষ প্রকাশের সবচেয়ে লক্ষণীয় বৈশিষ্ট্য হিসেবে বিবেচনা করেন?

নোয়াম চমস্কিঃ সবচেয়ে লক্ষণীয় বৈশিষ্ট্যগুলো নির্মমভাবে স্পষ্ট।

মানবজাতি দু’টো আসন্ন অস্তিত্ববাদী হুমকির সম্মুখীন হয়েছেঃ পরিবেশগত বিপর্যয় এবং পারমাণবিক যুদ্ধ। প্রচারাভিযানের বাগাড়ম্বর ও সাধারণ প্রচারে এগুলো কার্যত উপেক্ষিতই ছিলো। ট্রাম্প প্রশাসন নিয়ে প্রচুর সমালোচনা হয়েছে, কিন্তু প্রশাসনের নেওয়া এ যাবতকালের সবচেয়ে অশুভ অবস্থান, অর্থাৎ  পারমাণবিক যুদ্ধের বিদ্যমান ভয়ানক হুমকির বৃদ্ধি এবং সামগ্রিক মানব সমাজের টিকে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় ভৌত পরিবেশ ধ্বংসের লক্ষ্যে ধাবিত হওয়া নিয়ে টু শব্দও হয়নি।

সমগ্র মানব ইতিহাসে এগুলোই সবচেয়ে চিন্তনীয় ও জরুরী প্রশ্ন হিসেবে দেখা দিয়েছে। প্রচারাভিযানে  এগুলো যে কদাচিৎ উঠে এসেছে সেটা সত্যিই আশ্চর্যজনক — আর এটা আমাদের নৈতিক ও বৌদ্ধিক সংস্কৃতির ব্যাপারে, অপ্রীতিকর হলেও, কিছু গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বহন করে।

নিশ্চিতভাবে, সবাই এই ব্যাপারগুলো উপেক্ষা করেননি। যারা তাদের বিপুল ক্ষমতা ও বিশেষ সুবিধা   সংরক্ষণের জন্য তাদের তিক্ত শ্রেণী যুদ্ধে প্রতিনিয়ত সতর্ক থাকে, তাদের কাছে এগুলোই ছিলো আগ্রহ ও বিবেচনার বিষয়। কয়েকটি রাজ্য আসন্ন পরিবেশগত বিপর্যয়কে উদ্দেশ্য করে গুরুত্বপূর্ণ ব্যালট কার্যক্রম নিয়েছিলো। কার্বন ট্যাক্সসহ এই উদ্যোগসমূহকে পরাস্ত করার জন্য জীবাশ্ম জ্বালানি শিল্প ডেমোক্রেট অধ্যুষিত ওয়াশিংটন রাজ্যে ব্যাপক, কখনো কখনো রেকর্ড-ভঙ্গকারী, অর্থ ব্যয় করেছে এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে সফল হয়েছে।

আমাদের এটা স্বীকার করা উচিত যে এগুলো অভাবনীয় মানবতা বিরোধী অপরাধ। এগুলো সামান্যই নজরে এসে অগ্রসর হয়।

ডেমোক্রেটরা এসব গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগকে অগ্রাহ্য করার মাধ্যমে এদেরকে পরাস্ত করতে সাহায্য করেছে। নিউ ইয়র্ক টাইমসের একটি জরিপে দেখা গেছে, ডেমোক্রেটরা “ডিজিটাল কিংবা টিভি বিজ্ঞাপনে, তাদের ক্যাম্পেইন রচনায় কিংবা সামাজিক মাধ্যমে” এগুলো কদাচিৎ উল্লেখ করেছে। এমনকি, অবশ্যই রিপাবলিকানরাও এসব কথা উল্লেখ করেননি, যাদের নেতৃবৃন্দ মানব জাতিকে যত দ্রুত সম্ভব পাহাড়ের কিনার থেকে নিক্ষেপ করতে বদ্ধপরিকর। তারা যা করছে সজ্ঞানে করছে, যেটা সহজেই দৃশ্যমান।

টাইমসের নিবন্ধে ব্যাখ্যা করা হয়েছে যে, “পরিবেশবাদী এক্টিভিস্ট ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা বলেন ভোটার, এমনকি ডেমোক্রেটিক ভোটারদের কাছে এই ইস্যুটির বরাবরের মত নিচের দিকে থাকা এবং বৈশ্বিক উষ্ণায়ন নিয়ে পার্টির লাইনে যে গভীর মেরুকরণ দেখা দিয়েছে এটা তারই প্রতিফলন।” নিবন্ধটি আরো যোগ করতে ব্যর্থ হয়েছে যে এই মূল্যায়নটি দেশ এবং দেশের রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠানসমূহের একটি অভাবনীয় অভিযোগ, যেগুলোর প্রত্যেকটি,  এ মূল্যায়ন অনুসারে, অবক্ষয়ের এমন একটি পর্যায়ে নিমজ্জিত হয়েছে যে সংঘবদ্ধ মানব সমাজ নিকট ভবিষ্যতে ন্যূনতম  সহনীয় কোনোভাবে টিকে থাকতে পারবে কিনা সেটার সামান্যই গুরুত্ব আছে।

সেই অব্যক্ত অভিযোগ সঠিক কিনা সে বিষয়ে আমরা নিশ্চিত নই। সম্ভবত ডেমোক্রেটিক প্রার্থী শন ক্যাস্টেনের কাছে এর কিছু গুরুত্ব থাকতে পারে, যিনি আসন্ন জলবায়ু বিপর্যয়কে তাঁর ক্যাম্পেইনের মধ্যমণি করে একটি রিপাবলিকান ডিস্ট্রিক্টকে উলটে দিয়েছেন।

মানব ইতিহাসের বর্তমান উল্লেখযোগ্য সময়ে নৈতিক অধঃপতনের বেলায় প্রচুর প্রতিযোগিতা রয়েছে। হয়ত কাফকার সম্মানে, পুরস্কারটি সম্ভবত ট্রাম্পের ন্যাশনাল হাইওয়ে ট্রাফিক সেইফটি এডমিনিস্ট্রেশন নামক আমলাতন্ত্রের নিকট হস্তগত হবে। ক্যাম্পেইনের একদম মাঝপর্যায়ে নিঃসরণ বিষয়ক নিয়ম-কানুনের  অবসান ঘটানোর জন্য এটি সঙ্গতিপূর্ণ যুক্তি সহকারে একটি বিস্তারিত গবেষণা বের করেছিলোঃ বর্তমান হালচাল পূর্বানুমান করার মাধ্যমে দেখা গেছে যে এই শতাব্দীর শেষ নাগাদ খেল খতম হয়ে যাবে। এ বিপর্যয়ে মোটরচালিত গাড়ির নিঃসরণের তেমন ভূমিকা নেই, তাই সেটা সীমিত করার চেষ্টায় ফায়দা নেই।

সংক্ষেপে বলা যায়, বেচারা নিরোকে আড়ালে রেখে, দুনিয়া পুড়ে ছাই হতে হতে লুট করে নাও।

এটি নিশ্চয়ই ইতিহাসের সবচেয়ে অশুভ দলিল হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার যোগ্যতা অর্জন করেছে। তারপরও, ক্যাম্পেইনে এটি কোনো ইস্যুই নয়।

অতীতে অনেক দানব দেখা গেছে… কিন্তু এমন একটি খুঁজে পাওয়া দুষ্কর যে কিনা টইটুম্বুর পকেটে  আরো কিছু ডলার পুরে রাখবার জন্য সংঘবদ্ধ মানব সমাজের টিকে থাকার সম্ভাবনাকে ধ্বংস করতে নিয়োজিত, আর সেটা দূরবর্তী ভবিষ্যতে নয়।

আমাদের চোখের সামনে যা ঘটে চলেছে তা বলার জন্য ভাষা খুঁজে পাওয়া মুশকিল।

বিপুল সংখ্যক ভোটার আক্ষরিক অর্থেই ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত, তাদের প্রতিনিধিরা তাদের আকাঙ্ক্ষার প্রতি মনোযোগ না দিলেও দাতা শ্রেণীর কথা ঠিকই শোনে।

একই জিনিস দ্বিতীয় অস্তিত্ববাদী হুমকি, পারমাণবিক যুদ্ধের  বেলায়ও সত্য। নির্বাচনের কয়েক সপ্তাহ আগে ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছিলেন

যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আইএনএফ চুক্তি থেকে সরে দাঁড়াচ্ছে, যেটার বদৌলতে পশ্চিম ইউরোপ ও রাশিয়ায় মোতায়েনকৃত স্বল্প পাল্লার মিসাইলসমূহ অপসারণ করা হয়েছিলো। ধ্বংসাত্মক ভীতি প্রদর্শনপূর্বক খুবই বিপজ্জনক এসব অস্ত্রের মস্কো পর্যন্ত উড়ে যেতে সময় লাগতো মাত্র কয়েক মিনিট, এ আচমকা আক্রমণে পালটা জবাবের যেকোনো সম্ভাবনাই ধূলিসাৎ হয়ে যেতো। এটি নিশ্চিতভাবে আমাদের সকলকে শেষ করে দিয়ে, অতীতে প্রায়ই ব্যর্থ হওয়া স্বয়ংক্রিয় সিস্টেম থেকে উৎসারিত সতর্কবার্তার উলটো দিকে একটি পারমাণবিক প্রতিক্রিয়ার বিপদকে বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়।

পূর্ববর্তী ইতিহাসের সাথে পরিচিত যে কেউ জানে, আমরা যে এ যাবতকাল পর্যন্ত অন্তিম পারমাণবিক যুদ্ধ এড়িয়ে গিয়েছি সেটাই আসলে একটা অলৌকিক ঘটনা। ইতোমধ্যে যে হুমকিটি শোচনীয় ছিলো সেটা ট্রাম্পের পারমাণবিক পর্যালোচনার দ্বারা বৃদ্ধি পেয়েছে, যা নতুন অস্থিতিশীল অস্ত্রসমূহ অনুমোদন করেছে এবং পারমাণবিক আক্রমণের সীমাকে অবনমিত করেছে। এই সর্বশেষ পদক্ষেপটি এই হুমকিকে  আরো বাড়িয়ে দেয়। ক্যাম্পেইন পরিক্রমা কিংবা প্রচারে এর কোনো উল্লেখ নেই।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই মর্মে চুক্তি থেকে সরে দাঁড়াচ্ছে যে চীন এতে কোনো অংশীদার নয় এবং রাশিয়া এটি লঙ্ঘন করেছে — তারাও পালটা দাবি করেছে যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি লঙ্ঘন করেছে। এই সমস্যাগুলো কীভাবে নির্দেশ করতে হয় সেটা সহজঃ পরিদর্শন ও কূটনীতির মাধ্যমে, যেগুলোর কোনোটাই চেষ্টা করা হয়নি। চলুন, এর বদলে আনন্দের সহিত সর্বাত্মক ধ্বংসের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেই। আর রাজনৈতিক প্রচারাভিযানের উচ্ছ্বসিত প্রকাশে এ সবকিছুকে এড়িয়ে চলি।

আবারো, বিদ্যমান নৈতিক ও বৌদ্ধিক সংস্কৃতির বিষয়ে এবং প্রতিকার প্রদানের প্রয়োজনীয়তার ব্যাপারে খুব শীঘ্রই আমাদের কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করতে হবে।

মানুষের ইতিহাসের নিছকই সর্বাধিক তাৎপর্যপূর্ণ প্রশ্নগুলোকে এক পাশে সরিয়ে রেখে আলোচনার বিষয়বস্তুর দিকে ফিরে তাকাই।

নির্বাচনের বিষয়ে একটি আকর্ষণীয় তথ্য হচ্ছে এটি শ্রমজীবী মানুষের কাছে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলো নিয়ে কাজ করার ব্যাপারে সমগ্র ডেমোক্রেটিক পার্টির ব্যর্থতাকে আরো একবার প্রকাশিত করেছে। কৃষ্ণাঙ্গ শ্রমজীবী মানুষ যখন ব্যাপকভাবে, এমনকি আগের চেয়েও বেশি, ডেমোক্রেটিক পার্টিকে সমর্থন করেছে, তখন এই পার্টি কলেজে না যাওয়া শ্বেতাঙ্গ জনগোষ্ঠীর সমর্থন হারিয়েছে। তার চেয়েও বড় কথা, অন্তত ডেমোক্রেটিক পার্টির নেতৃবৃন্দ, যাদেরকে প্রায়ই “ওয়াল স্ট্রিট ডেমোক্রেট” হিসেবে অভিহিত করা হয়, তাদের কাছে এর গুরুত্ব সামান্যই। তাঁরা সমৃদ্ধিশালী শহরতলীতে, যেখানে রিপাবলিকান ভোটাররা স্বাভাবিকভাবে ট্রাম্পের অভদ্রতায় বিরক্ত ছিলো, সেখানে তাঁদের সাফল্য নিয়ে উল্লসিত। স্বাভাবিক কিংবা ভণিতা যেভাবেই হোক, ট্রাম্পের পাগলামিগুলো তাঁর শ্বেতাঙ্গ শ্রমজীবী শ্রেণীভুক্ত নির্বাচকদের ধরে রাখতে সাহায্য করে যখনই তাঁর পার্টি প্রত্যেকবার তাদেরকে প্রতারিত করে, অন্য দিকে সে গভীর অঙ্গীকার নিয়ে তার আসল নির্বাচক, তথা প্রচুর সম্পদ ও কর্পোরেট ক্ষমতার স্বার্থসিদ্ধি করে।

শ্রমজীবী আমেরিকানদের বিশ্বাসঘাতকতা এর চেয়ে বেশি আর স্পষ্ট হয় না, যদিও সৌভাগ্যবশত অনেকেই প্রতারণা থেকে মুক্ত হচ্ছেন। মধ্যবর্তী নির্বাচনের একটি আশাব্যঞ্জক দিক ছিলো একদল বৈচিত্র্যময়  তরুণ প্রগতিশীল প্রার্থীদের সাফল্য, যাদের বেশিরভাগই নারী। এটি সাম্প্রতিক বছরগুলোর  জনপ্রিয় এক্টিভিজমের প্রতি একটি স্বীকৃতি এবং ভবিষ্যতের জন্য একটি আশাবাদী ইঙ্গিত, যদি এটি বর্ধিত ও বিকশিত হয়।

বাইরে থেকে, নির্বাচন কেন্দ্রে ট্রাম্পের সাফল্যের অনেকটাই বর্ণবাদী ও বিচ্ছিন্নতাপরায়ণ আবেদনের সাথে সম্পর্কযুক্ত করা যায়, বিশেষ করে একদল জঙ্গি ও অপরাধীদের দ্বারা আমাদের সীমান্তে আসন্ন “আক্রমণের” হুমকির ব্যাপারে নির্বাচন অবধি যে ক্রোধের উপর তিনি মনোনিবেশ করেছেন — তারপর বিষয়টি বাদ দিয়েছেন যখন বিশ্বাসীদের এককাট্টা করতে এটার আর কোনো প্রয়োজন ছিলো না।

কম লোকেই স্মরণ করে থাকবেন যে ট্রাম্প রিগ্যানের কৌশল টুকে নিচ্ছিলেন। ১৯৮৫ সালে আমাদের নির্ভীক নেতা কাউবয় বুট পরিধান করে একটি জাতীয় জরুরী অবস্থার ঘোষণা দিয়েছিলেন কারণ নিকারাগুয়ার সৈন্যরা দুই দিনের মধ্যে টেক্সাসের হার্লিঞ্জেনে চলে আসবে — আর এ কথা শুনে মানুষ অট্টহাসিতে ফেটে পড়েনি। ট্রাম্প একই কাজ করলেন এবং ঘোষণা দিলেন যে, মানুষ যদি দুর্দশা ও নিপীড়ন (যে দুর্দশা ও নিপীড়নের জন্য আমাদের দায় বেশি) থেকে পালিয়ে আমাদের সীমান্তে এসে পৌঁছে তাহলে তারা আমাদের সবাইকে হত্যা করতে সচেষ্ট হবে। আমাদের প্রতিরক্ষার জন্য নিয়োজিত হাজার হাজার সৈন্যদের সহায়তা করার জন্য বিপুল অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত মিলিশিয়ারা সীমান্তে ছুটে গিয়েছিলো, এবং এটা কাজে দিয়েছে বলেই মনে হয়। জরিপে দেখা গেছে মানুষ ট্রাম্পকে ভোট দিয়েছে কারণ এ অপরাধীদের ধ্বংসাত্মক কাজ থেকে তিনি আমাদের রক্ষা করতে পারেন। এটা থেকেও কিছু শেখার আছে।

রিপাবলিকান নেতারা বুঝতে পারেন যে জিওপি (গ্র্যান্ড ওল্ড পার্টি) একটি সংখ্যালঘু পার্টিতে পরিণত হচ্ছে, যে কারণে তাঁরা ভোটারদের দমিয়ে রাখার প্রক্রিয়ার সন্ধানে বদ্ধপরিকর।

কিন্তু ট্রাম্পের কৌশল কেন কাজ করে সেটা যখন আমরা জিজ্ঞেস করি তখন আমরা গভীরতর কিছু খুঁজে পাই, যেটা স্থানভেদে নির্দিষ্টতা সহকারে মোটামুটি সারা বিশ্বে ছড়িয়ে আছে। অর্থনৈতিক দুরবস্থা, আশাহীনতার বোধ, প্রতিষ্ঠানসমূহের প্রতি ন্যায্য অবজ্ঞা, এবং তাদের প্রতি যা করা হচ্ছে সে ব্যাপারে বোধগম্য রাগ ও ক্ষোভের পরিস্থিতিতে মানুষ গণ-উত্তেজক নেতাদের সহজ শিকারে পরিণত হতে পারে যারা তাদের ক্ষোভকে বলির পাঁঠাদের দিকে পরিচালিত করে, যারা সাধারণত আরো বেশি নাজুক অবস্থায় আছে। এমন পরিস্থিতিতে যেসব উপসর্গের উত্থান ঘটে থাকে, এসকল নেতা সেগুলোকে ত্বরান্বিত করে। বিশ্বজুড়ে এটাই ঘটে চলেছে। বহু দেশে আমরা ভিন্নভাবে, একের পর এক নির্বাচনে এমনটাই প্রত্যক্ষ করি।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে শ্রমজীবী শ্রেণীর মানুষ ৪০ বছরের অচলাবস্থার কারণে ভুগেছে যখন অল্প কিছু হাতে সম্পদ কুক্ষিগত হয়ে বিপুল অসমতার দিকে ধাবিত হয়েছে। ডেমোক্রেটরা এসব কিছুকে অগ্রাহ্য করেছে, এবং আরো বাজে ব্যাপার হলো, তাঁরা থ্যাচার ও রিগ্যানের সময়ে চালু হওয়া নব্য উদারপন্থী নীতিকে এগিয়ে নিয়ে গেছে এবং পরিকল্পনা অনুযায়ী এসব পরিণতিকে চাপিয়ে দিয়েছে। আর পরিকল্পনাকারীদের কাছে নব্য উদারপন্থী কার্যক্রমগুলো সুচারুরূপে সফল হয়েছে, সে পন্থাগুলো  আমাদের এখানে পর্যালোচনা করার প্রয়োজন নেই।

২০১৪-১৫ এর একটি প্রবৃদ্ধির পর, বিশেষ করে সর্বগ্রাসী আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য, এখন যখন কর্পোরেট মুনাফা ঊর্ধ্বগামী হচ্ছে তখন নিম্ন বেকারত্ব, বেতন বৃদ্ধি মূল্য স্ফীতির সাথে পেরে উঠছে না। এ প্রতিষ্ঠানসমূহ যে সংকটের জন্য দায়ী সেটা থেকেই উত্থিত হয়ে তারা পূর্বের চেয়ে অধিকতর সমৃদ্ধ ও ক্ষমতাশালী হয়েছে। একটি পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া হচ্ছে দেশের সম্পদ গবেষণা ও উন্নয়ন, উদ্ভাবন ও পণ্যের ক্রমবিকাশ থেকে বড় বড় ধনীদের স্বার্থে আর্থিক লেনদেনের দিকে স্থানান্তরিত হয়ে যাচ্ছে। এটা তাদের জন্য ভালো, কিন্তু সমাজের স্বাস্থ্য ও ভবিষ্যতের জন্য ভয়াবহ।

সম্পদের কেন্দ্রীকরণ ও কর্পোরেট ক্ষমতার বৃদ্ধি স্বয়ংক্রিয়ভাবে গণতন্ত্রের যবনিকায় পর্যবসিত হয়। একাডেমিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের গবেষণায় বেরিয়ে এসেছে যে বিপুল সংখ্যক ভোটার আক্ষরিক অর্থেই ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত, তাদের প্রতিনিধিরা তাদের আকাঙ্ক্ষার প্রতি মনোযোগ না দিলেও দাতা শ্রেণীর কথা ঠিকই শোনে। এটা আরো ভালোভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে নির্বাচনগুলোর অধিকাংশই কেনা হয়ে থাকেঃ নির্বাহী ও কংগ্রেস উভয় ক্ষেত্রেই নির্বাচিত হওয়ার যোগ্যতা, অতঃপর নীতিমালা, প্রচারাভিযানের  খরচের একটি মাত্র চলক থেকে অসাধারণ সঠিকতার সাথে অনুমান করা যায়। অনেক পেছনে গিয়ে এবং ২০১৬ সালের নির্বাচন সহকারে থমাস ফার্গুসনের কাজটি বিশেষভাবে প্রকাশ্য। আর এটি একটি সামান্য সূচনা। আইন প্রণয়ন সাধারণত কর্পোরেট তদবিরকারীদের দ্বারা গঠিত হয়, এমনকি লিখিতও হয়, অন্য দিকে এতে স্বাক্ষরকারী প্রতিনিধিদের চোখ থাকে পরবর্তী নির্বাচনের জন্য অর্থায়নের দিকে।

মধ্যবর্তী নির্বাচনটি অন্যান্য ভয়ংকর বিকাশের দিকে আলোকপাত করেছে। গণনাকৃত ভোটের কেবল ৪০ শতাংশ দিয়েই রিপাবলিকানরা সিনেটে তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা বাড়িয়েছে। ২৫ শতাংশ জনগোষ্ঠীর রাজ্যগুলো থেকে, যার মানে হলো ১৫ শতাংশ ভোটে (অধিকাংশই গ্রামীণ, শ্বেতাঙ্গ, ধার্মিক, বিজ্ঞানের প্রতি সংশয়প্রবণ, ব্যাপকভাবে সশস্ত্র) ৬০ জন সিনেটর নির্বাচিত হয়েছেন। আর এই প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ডেমোক্রেটরা যদি কঠোরভাবে এই অবস্থার পরিবর্তন না করে এবং এমন একটি রাজনৈতিক দলে পরিণত না হয় যেটা কেবল শ্রমজীবী শ্রেণীকে তার তিক্ত শ্রেণী শত্রুর কাছে পরিত্যাগ করবে না, যেমনটা গত ৪০ বছর ধরে তারা করে এসেছে, তাহলে কয়েক রকম নাগরিক দ্বন্দ্ব কীভাবে এড়ানো যেতে পারে সেটা বিবেচনা করা দুরূহ হয়ে যাবে।

সি.জে. পলিক্রনিউঃ আমরা এই সত্যকে কীভাবে ব্যাখ্যা করবো যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতি যখন সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যান্য সময়ের তুলনায় অধিকতর কদর্য, অধিকতর মেরুকৃত ও অধিকতর বিভক্ত বলে মনে হয়, তখন উভয় পার্টিই দেশ ও বিশ্বের কাছে সমাসন্ন সর্বাধিক জটিল ইস্যুকে নির্দেশ করা থেকে বিশদভাবে  দূরত্ব বজায় রাখে?

নোয়াম চমস্কিঃ ১৮৯৫ সালে খুবই সফল ক্যাম্পেইন ম্যানেজার মার্ক হান্নার বিখ্যাত উক্তিটি হচ্ছেঃ “রাজনীতিতে দু’টি জিনিস গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমটি হচ্ছে টাকা, আর দ্বিতীয়টি আমি মনে করতে পারছি না।”

যারা দেশের সম্পদ নিয়ন্ত্রণ করে তাদের নিজস্ব অগ্রাধিকার আছে, যেমন প্রাথমিকভাবে স্ব-সমৃদ্ধি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ সংক্রান্ত ক্ষমতার বৃদ্ধি। একটি নব্য উদারপন্থী গণতন্ত্রে এসব অগ্রাধিকার বজায় থাকে আর ক্ষোভ-উন্মত্ত জনতা পেছনের কামরায় পড়ে থাকে যেটা তাদের ঠিকানা।

প্রধান ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তারা অবশ্যই পরিবেশগত বিপর্যয়ের অসামান্য ভয়াবহতা উপলব্ধি করেন কিন্তু তারা জীবাশ্ম জ্বালানিতেই বিনিয়োগ বাড়াচ্ছেন কারণ সেখানেই টাকা আছে। জ্বালানি কর্পোরেশনসমূহের মতো তারাও সেসব প্রার্থীদের সমর্থন দিতে একটুও আগ্রহী নয় যারা তাদের দ্বারা কৃত ভয়াবহ অপরাধের ব্যাপারে সাবধানবাণী উচ্চারণ করে। লকহীড-মার্টিন ও তার সহযোগীরা সামরিক বাজেটের বিশাল প্রবৃদ্ধি দেখে বেশ আনন্দিত এবং ইউএস ইনস্টিটিউট অফ পিস (পরিহাস বোধের অভাবে অরওয়েলকে ব্যঙ্গ করে আমলাতন্ত্র বেশ খুশি) কর্তৃক প্রকাশিত ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন ন্যাশনাল ডিফেন্স স্ট্র্যাটেজি-র মতো এমন সব ঘোষণায় নিশ্চয়ই উল্লসিত।

আমাদের কখনো ভুলে গেলে চলবে না যে নির্বাচনী রাজনীতিকে খারিজ না করেও একে গুরুতর রেডিক্যাল  রাজনৈতিক কার্যক্রমের প্রধান লক্ষ্যবস্তু করা উচিত নয়।

এই মলিন দলিলটি আমাদেরকে সাবধান করে দেয়, আমাদের ভয়ংকরভাবে হ্রাসকৃত সামরিক বাহিনী, যেটা বাকি বিশ্বের প্রায় পুরোটা জুড়েই আছে, রাশিয়া ও চীনের বিরুদ্ধে একটি দ্বিমুখী যুদ্ধে জয়ী না-ও হতে পারে। অবশ্যই, সামরিক শিল্প কিংবা প্রতিবেদনের সম্মানিত লেখকরা কেউই বিশ্বাস করেন না যে, অন্তিম ধ্বংস ছাড়া এমন একটি যুদ্ধে লড়াই করা তো যাবেই না, বরং এটি হচ্ছে স্বাস্থ্য ও শিক্ষার মতো অর্থহীন জিনিস থেকে ট্যাক্স প্রদানকারীদের ডলার সরিয়ে নিয়ে শিল্প ও অর্থায়নের কাণ্ডারীদের যোগ্য পকেটে চালান করে দেওয়ার একটি দারুণ উপায়।

খুব বেশি রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব আমাদের নিরাপত্তার প্রতি এমন অসাধারণ ঝুঁকিকে খারিজ করে দেওয়ার মতো সাহস করবেন না।

কদর্যতার ক্ষেত্রে বলা যায়, এটি নব্য উদারপন্থার বছরগুলোতে উভয় পার্টির ডানপন্থার দিকে চালিত হওয়ার ফল, অত্যধিক সম্পদ ও কর্পোরেট ক্ষমতার প্রতি অঙ্গীকার নিয়ে ডেমোক্রেটরা অভিহিত  ‘মডারেট রিপাবলিকান’-এ পরিণত হয়েছে (অথবা প্রায়ই আরো খারাপ) এবং রিপাবলিকানরা পরিসর থেকে ছিটকে পড়েছেন, যার ফলে হয়ত তাঁরা তাদের সত্যিকার নীতিমালার জোরে নির্বাচনে জিততে পারেন না। এ কারণে তাঁরা আসল নীতিমালা থেকে মনোযোগ অন্য দিকে সরিয়ে নিয়ে তাদের ভোটিং আসনগুলোকে “সাংস্কৃতিক ইস্যু”-তে সংহত করতে বাধ্য হয়েছেন। এগুলোকে ঠিক রাখার জন্য, নেতৃবৃন্দের পক্ষে তাদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নিছক ভুল হিসেবে দানবায়ন করতে নয় বরং তাদের গভীরভাবে ধারণকৃত মূল্যবোধসমূহকে ধ্বংস করতে মুখিয়ে থাকাই স্বাভাবিক — আর সেই প্রতিপক্ষের কাছে “অশোভন”দের প্রতি ঘৃণার অবলম্বন নেওয়াই স্বাভাবিক। বিরোধ শীঘ্রই যুদ্ধ-বিগ্রহে অধঃপতিত হয়।

রিপাবলিকান নেতৃবৃন্দ কীভাবে একটি ভোটিং আসনকে সংগঠিত করতে চেয়েছেন সেগুলোর অনেক দৃষ্টান্ত আছে, এর কয়েকটা আমরা পূর্বেই আলোচনা করেছি। একটি প্রকাশ্য ঘটনা হচ্ছে গর্ভপাতের অধিকার। ষাটের দশকে নেতৃত্ব সহকারে রিপাবলিকান পার্টি (রিগ্যান, ফোর্ড, জর্জ এইচ.ডব্লিউ বুশ ও অন্যান্যরা) কট্টরভাবে ইচ্ছার পক্ষে ছিলো। ভোটাররাও একই রকম ছিলেন। ১৯৭২ সালে দুই-তৃতীয়াংশ রিপাবলিকান সরকারের হস্তক্ষেপ ছাড়াই গর্ভপাতকে একটি ব্যক্তিগত বিষয় হিসেবে মনে করতেন।

নিক্সন ও তাঁর সহযোগীরা বুঝতে পেরেছিলেন যে তাঁরা একটি গর্ভপাত বিরোধী অবস্থান নেওয়ার মাধ্যমে  ঐতিহ্যগতভাবে ডেমোক্রেটিক, ক্যাথলিক ভোটকে আকৃষ্ট করতে পারেন। পরবর্তীতে ৭০ এর দশকে ইভাঞ্জেলিকালরা রাজনৈতিক কার্যক্রমের জন্য সংগঠিত হতে শুরু করে। তাঁদের দাবিগুলোর মধ্যে ছিলো ছেলে-মেয়েদের জন্য পৃথক স্কুল বজায় রাখা। রিপাবলিকান কর্মী পল ওয়েরিখ একটি সুযোগ খুঁজে পেলেন। পৃথক স্কুলের জন্য একটি উদাত্ত আহ্বানে কোনো কাজ হবে না, কিন্তু রিপাবলিকান পার্টি যদি গর্ভপাতের বিরোধিতা করার ভান করে, তাহলে এটি প্রচুর ইভাঞ্জেলিকাল ভোট পেয়ে যাবে, যেটা এখন ট্রাম্পের ভোটারগোষ্ঠীর একটি মূল অংশ। যাদের সম্বন্ধে মনে করা হতো যে তাদের সামান্যতম চরিত্র ও সততা ছিলো, যেমন সিনিয়র বুশ, যিনি অন্যদের সাথে একই পথে হেঁটেছেন, তাঁদের সহ নেতৃবৃন্দ সেভাবেই উৎসাহী “জীবনবাদী” সমর্থক হয়ে গেলেন।

এরই মধ্যে রিপাবলিকান পার্টির আসল নির্বাচক হিসেবে রয়ে গেছে প্রচুর সম্পদ ও কর্পোরেট ক্ষমতা, ট্রাম্পের অধীনে আরো অধিক নাটকীয়ভাবে। এই আসল নির্বাচকমণ্ডলীকে উদ্দীপনা নিয়ে সেবা দান করার পাশাপাশি ভোটিং ঘাঁটিতে দখল বজায় রাখা সত্যিই একটি অর্জন।

তাদের ভোটিং ঘাঁটি সংকুচিত হওয়ার ফলে রিপাবলিকান নেতারা বুঝতে পারেন যে জিওপি (গ্র্যান্ড ওল্ড পার্টি) একটি সংখ্যালঘু পার্টিতে পরিণত হচ্ছে, যে কারণে তাঁরা ভোটারদের দমিয়ে রাখার প্রক্রিয়ার সন্ধানে ও তাঁদের প্রচেষ্টাকে সমর্থন দিতে পারবে এমন প্রতিক্রিয়াশীলদের দ্বারা কোর্ট প্যাকিং (সুপ্রীম কোর্টের বিচারকের সংখ্যা বৃদ্ধির মাধ্যমে কোর্টের মতামতে সামঞ্জস্য আনার লক্ষ্যে ১৯৩৭ সালে প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের একটি ব্যর্থ প্রস্তাব) করতে বদ্ধপরিকর।

এটা উল্লেখ করা উচিত যে অনেক কেন্দ্রীয় ইস্যুতে পার্টি নেতৃত্বের সাথে জনপ্রিয় মতামতের ভিন্নতা দেখা যায়। তবে ইতোমধ্যে যেটা বলেছি, অধিকাংশ মানুষ ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার দরুণ এর তেমন কোনো গুরুত্ব নেই। একটা উদাহরণ দেই, জনগণ ৪০ বছর যাবত নির্বাচনে ধনীদের উপর উচ্চ কর ধার্য করার পক্ষে জোরালোভাবে সমর্থন দিয়েছে — যদিও ধনীদের উপর কর হ্রাস পেয়েছে।

সি.জে. পলিক্রনিউঃ বার্নি স্যান্ডার্স যখন সিনেটে পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন তখন তাঁর শিষ্য আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্তেজ নিউ ইয়র্কের ১৪ তম ডিস্ট্রিক্টে তাঁর প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে বিশাল ব্যবধানে জয় লাভ করেছেন এবং আদতেই কংগ্রেসের সর্বকনিষ্ঠ নারী নির্বাচিত হয়েছেন। বস্তুত, হাউজে এখন সম্ভবত যত জন গণতান্ত্রিক সমাজবাদী আছেন তত জন রক্ষণশীল ডেমোক্রেট আছেন, তাই প্রশ্নটি হচ্ছে প্রগতিশীলদের একটি তৃতীয় রাজনৈতিক দল গঠন করা উচিত নাকি ডেমোক্রেটিক পার্টিকে ভেতর থেকে পরিবর্তন করার চেষ্টা করা উচিত? এই বিষয়ে আপনার কী মত?

নোয়াম চমস্কিঃ অষ্টাদশ শতকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাংবিধানিক ব্যবস্থাটি তার সকল ত্রুটি সহকারে গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের পথে একটি বড় পদক্ষেপ ছিলো, যেটাকে ইউরোপের সাথে তুলনা করা যায়। এমনকি “উই দ্য পিপল” ধারণাটি, যদিও মোটা দাগে বিভ্রান্তিকর, একটি তাক লাগানোর মত ধারণা ছিলো। তা সত্ত্বেও, ব্যবস্থাটি তুলনামূলক মানদণ্ডে ক্রমশই অনেক পশ্চাদ্গামী হিসেবে প্রতিভাত হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবস্থাসম্পন্ন কোনো দেশকে ইউরোপ নতুন সদস্য হিসেবে মেনে নেবে কিনা তা সন্দেহজনক। বিশেষ করে ব্যবস্থাটি দুই শাসকের আধিপত্যের প্রতি আমূল চ্যালেঞ্জ জানাতে ব্যর্থ। একটি তৃতীয় পার্টির জন্য ভিত্তি তৈরি করতে হলে জনপ্রিয় সংহতির একটি গুরুতর ও টেকসই প্রচেষ্টা থাকা দরকার — এটা অসম্ভব নয়, তবে এখন দৃশ্যমান নয়। ডেমোক্রেটিক পার্টির চরিত্র অন্তত এর আধুনিক নিউ ডিল উৎসের দিকে, এবং এর বাইরেও (ষাটের দশকের এক্টিভিজমের মার্জিত প্রভাব ও তার ভবিষ্যৎ পরিণামের ফলশ্রুতিতে কিছু ক্ষেত্রে ইতোমধ্যে দলটির যথেষ্ট পরিমাণে বেশি) স্থানান্তরের সম্ভাবনা থাকতে পারে।

আরো অনেক সাধারণ নির্বাচনে সমন্বিত নীতিমালা গ্রহণের মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায় থেকে আরম্ভ হয়ে সম্ভবত রাজনৈতিক ব্যবস্থায় অধিকতর সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণের জন্য যথেষ্ট জনসমর্থন লাভের মাধ্যমে স্বতন্ত্র পার্টির বিকাশের সম্ভাবনা আছে।

তবে আমাদের কখনো ভুলে গেলে চলবে না যে নির্বাচনী রাজনীতিকে, খারিজ না করেও, একে গুরুতর রেডিক্যাল  রাজনৈতিক কার্যক্রমের প্রধান লক্ষ্যবস্তু করা উচিত নয়, যেটা আধিপত্যবাদী মতাদর্শসমূহকে ধ্বংস করার জন্য এবং সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের ভিত্তির জন্য প্রচণ্ডভাবে — এমনকি নিদারুণভাবে — যে গণচেতনা থাকা আবশ্যক, তার বিকাশে সহায়তা করার লক্ষ্যে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সুরক্ষাকারী মৌলিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে পরিবর্তন করার জন্য সচেষ্ট হয়।

 

***

সি.জে. পলিক্রোনিউ একজন রাজনৈতিক অর্থনীতিবিদ/রাষ্ট্রবিজ্ঞানী যিনি ইউরোপ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা কেন্দ্রে শিক্ষকতা করেছেন ও কাজ করেছেন। তাঁর প্রধান গবেষণার আগ্রহে রয়েছে ইউরোপীয় অর্থনৈতিক একীভূতকরণ, বিশ্বায়ন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অর্থনীতি এবং নব্য উদারপন্থার আর্থ-রাজনৈতিক প্রকল্পের বিনির্মাণ। ট্রুথ আউটের নিয়মিত প্রদায়কের পাশাপাশি তিনি ট্রুথ আউটের পাবলিক ইন্টেলেকচুয়াল প্রকল্পের একজন সদস্য।

 

 

 

 

 

 

 

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন