শুক্রবার, ২ জানুয়ারি ২০২১; ১০:৩৯ অপরাহ্ণ


মেহদি হাসান খান, ডাক্তার ও সফটওয়্যার প্রকৌশলী। মুক্ত সফটওয়্যার অভ্র’র জনক।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে সবচেয়ে জনপ্রিয় হল ফেসবুক। ফেসবুক জনপ্রিয় হওয়ার বহু কারণগুলোর মধ্যে একটি হল দীর্ঘ বিস্তারিত লেখালেখির জন্য ফেসবুক একটি কার্যকর মাধ্যম। ২০০৬/০৭ এর দিকে ফেসবুকে খুব লম্বা স্ট্যাটাস বা নোট দেখা যেত না। যার অন্যতম কারণ ভাষা।

বাংলাদেশে এখনো ইংরেজি ফিকশন কিংবা নন ফিকশনের ভালো বাজার তৈরি হয়নি। এর পেছনে অনেক কারণ আছে, কিন্তু অস্বীকার করার উপায় নেই এখানকার মধ্যবিত্তের এক প্রবল বাংলাপ্রীতি আছে। সেটা রবীন্দ্রনাথের জন্যই হোক কিংবা ভাষা আন্দোলনকে ঘিরেই হোক কিংবা জাতিবৈচিত্রের অভাবজনিত কারণেই হোক, এই বাংলাবেগ এখানকার কালচারকে নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। তাই ব্লগ হোক আর অনলাইনে লেখালেখিই হোক, ইংরেজিতে মনের ভাব যেন কিঞ্চিৎটুকুও প্রকাশ করা যায় না।

অনলাইনে লেখালেখির ক্ষেত্রে এই শেকল ভাঙ্গার কাজ শুরু হয় এক যুগান্তকারী সফটওয়্যার দিয়ে যার নাম ‘অভ্র’ যা দিয়ে এই লেখাটিও লিখা হচ্ছে। এর আগে কি কম্পিউটারে বাংলা লিখা যেতো না? হ্যাঁ যেতো, কিন্তু ওটা ছিল এক প্রফেশনাল কাজ কারবার! এর জন্য ঘটা করে টাইপিং শিখার ক্লাস নিতে হতো, সফটওয়্যারের অরিজিনাল সিডি কিনতে হতো আরো যতো সব জটিল ব্যাপারস্যাপার। সে প্রেক্ষিতে অভ্র আসল আমজনতার ভাষার প্রকাশের দাবি নিয়ে। কেউ যেকোন কীবোর্ডেই ফ্রি সফটওয়্যারটি ইনস্টল করে মুহুর্তেই শুরু করে দিতে পারে তার লেখালেখির খাতা।

অভ্র শুরু থেকেই অনেক ঘাত প্রতিঘাত সহ্য করে আজকের এই পর্যায়ে এসেছে। বলা যায়, সাধারণ জনগণের ভালোবাসা এবং প্রয়োজনই এই পর্যায়ে নিয়ে এসেছে। এর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল ‘বিজয়’ বাংলা সফটওয়্যার যেটি বাণিজ্যিক এবং সরকারযন্ত্রকে কাজে লাগিয়ে এখনো সরকারীভাবে প্রভাব প্রতিপত্তি নিয়ে টিকে আছে বিজয়। কিন্তু বিজয় কখনোই জনগণের যন্ত্র হয়ে উঠেনি।

এই লেখায় আমরা অভ্র’র জনক সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত তথ্য উপস্থাপন করব।

অভ্র’র জনক মেহেদী হাসান খান ১৯৮৬ সালের ২৩ জুলাই জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ঢাকার নটর ডেম কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক ও ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ থেকে এমবিবিএস ডিগ্রী লাভ করেন । ঢাকার আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজে নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় থেকে কম্পিউটার প্রোগ্রামিং করেন মেহেদী । ২০০১ সালে মাধ্যমিক পাস করে ভর্তি হলেন নটর ডেম কলেজে । ২০০৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলা একাডেমির একুশে বইমেলায় গেলেন একদিন । সেখানে দেখলেন বাংলা ইনোভেশন থ্রু ওপেন সোর্স—বায়োসের স্টল। সেখানে কয়েকটি বাংলা ওয়েবসাইট দেখলেন । ইউনিবাংলা নামে ওদের পুরো একটা অপারেটিং সিস্টেমও দেখলেন । তবে সেটা লিনাক্সের জন্য । বাসায় এসে ওদের ওপেন টাইপ ফন্ট নামালেন । কিন্তু এ বাংলা লিনাক্সের ( অপারেটিং সিস্টেম ) জন্য । ক্যারেক্টার চার্টে মাউস দিয়ে ক্লিক করে করে বাংলা লিখতে হয় ।

জনপ্রিয় অপারেটিং সিস্টেম উইন্ডোজের জন্য নেই, তাই বাংলা ভাষা লেখাকে সহজলভ্য করতে নিজেই উদ্যোগ নেন এবং তৈরি করেন ‘অভ্র কী-বোর্ড’ সফটওয়্যার । বাংলা ভাষাকে আরও বিস্তৃত এবং আরও সহজলভ্য করতে তিনি বিনামূল্যে ‘অভ্র কী-বোর্ড’ সফটওয়্যার টি ব্যবহার করার ঘোষণা দেন । তাঁর কী-বোর্ড এর স্লোগান হচ্ছে “ভাষা হোক উন্মুক্ত” ।

মেহদী তার প্রথম বাংলা ফন্ট ইউনিবিজয় ডট নেট ফ্রেমওয়ার্ক ও ভিজ্যুয়াল বেসিক উপর লেখেন। পরে তিনি অভ্র কী-বোর্ড ব্যবহারকারীদের সুবিধার্তে ডট নেট ফ্রেমওয়ার্ক ছাড়াই লেখেন। অভ্র সম্পূর্ণভাবে ইউনিকোড উপযোগী, যা ইউনিকোড কনসোর্টিয়াম দ্বারা ২০০৩ সালের ১৪ জুন স্বীকৃত হয়। তিনি তার সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠান ওমিক্রনল্যাব প্রতিষ্ঠা করেন। অভ্র কী-বোর্ড প্রথম উন্মুক্ত করা হয় ২০০৩ সালে ২৬ মার্চ। ওমিক্রনল্যাব থেকে অভ্র উন্মুক্ত করা হয় ২০০৩ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর । বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশন এর জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরিতে ‘অভ্র’ ব্যবহার করা হয় । অভ্র সফটওয়্যার কী-বোর্ড বিনামূল্যে হওয়ায় সরকারের প্রায় ৫ কোটি টাকা বেঁচে যায় ।

২০১১ সালে তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পে বিশেষ অবদানের জন্য তাকে বেসিস ( বাংলাদেশ এসোসিয়েশন অফ সফটওয়্যার এন্ড ইনফরেমশন সার্ভিস ) পুরস্কার দেওয়া হয়। ‘সফটপিডিয়া’ তে ১০০ ভাগ স্পাইওয়্যার/অ্যাডওয়্যার/ভাইরাস মুক্ত সফটওয়্যার বলে স্বীকৃত। মাইক্রোসফটের অনলাইন সংগ্রহশালায় ইন্ডিক ভাষাসমূহের সমাধানের তালিকায় অভ্র কী-বোর্ডকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরির কাজে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন অভ্র ব্যবহার করে।


অভ্রকে বাংলা কীবোর্ড রিসোর্স হিসেবে ইউনিকোড সংস্থার ওয়েব সাইটে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বাংলাদেশ এসোসিয়েশন অফ সফটওয়্যার এন্ড ইনফরেমশন সার্ভিস ( বেসিস ) বাংলা তথ্য প্রযুক্তিতে বিশেষ অবদানের জন্য ‘বিশেষ অবদান পুরস্কার ২০১১’ প্রদান করে।

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন