মঙ্গলবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২১; ৮:০৬ অপরাহ্ণ


সম্প্রতি কার্যকর হওয়া সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮ এতদিন ধরে প্রচলিত ১৯৮৩ সালের ‘মোটরযান অধ্যাদেশ’-কে বাতিল ও প্রতিস্থাপন করেছে। নতুন আইনে বহুগুন বর্ধিত জরিমানা ও কারাদণ্ড নিয়ে সবখানে আলোচনা/সমালোচনা চললেও এই আইনের অধীনে সড়ক দূর্ঘটনায় ক্ষতিপূরণ চেয়ে মামলা দায়েরের বিধানে যে ব্যাপক পরিবর্তন আনা হয়েছে- সেটির ভাল-মন্দ নিয়ে কোন আলোচনা কোথাও দৃশ্যমান নয়।

বর্তমানে রহিত/বাতিল হওয়া ১৯৮৩ সালের মোটরযান অধ্যাদেশ-এ সড়ক দুর্ঘটনায় আহত/নিহত/ক্ষতিগ্রস্ত হলে আদালতে মামলা করে ক্ষতিপূরণ পাওয়ার দারুন কার্যকরী একটি বিধান ছিল ধারা- ১২৮ এ। ওই আইন অনুসারে বাংলাদেশের প্রত্যেক জেলা জজের অধীনে একটি করে Claims Tribunal গঠন করার বিধান ছিল। বাংলাদেশের যে কোন জেলায় কেউ যদি অন্যকারো অবহেলার ফলে সড়ক দূর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত হতো- তাহলে সেই আইনের ১২৮ ধারানুযায়ী ক্লেইমস ট্রাইবুনালে আর্থিক ক্ষতিপূরণ চেয়ে মামলা করতে পারতো। এই ‘আর্থিক ক্ষতিপূরণ’ এর পরিমাণ ছিল- অনির্দিষ্ট (Unliquidated Damages), অর্থাৎ, ক্ষতিপূরণের অংক কত হবে তা অবহেলাপ্রসূত প্রতিটি পৃথক দূর্ঘটনায় কৃত ক্ষয়- ক্ষতির ভিত্তিতে নির্ধারণ করার এখতিয়ার ছিল সংশ্লিষ্ট আদালতের।

সড়ক দূর্ঘটনায় চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদের মৃত্যুর ঘটনায় তাঁর স্ত্রী ২০১২ সালে মোটরযান অধ্যাদেশ-১৯৮৩ এর ১২৮ ধারানুযায়ী গঠিত এই ‘Claims Tribunal’ এ ‘আর্থিক ক্ষতিপূরণ’ চেয়ে মামলা করেছিলেন। পরবর্তীতে মামলাটি হাইকোর্ট বিভাগে স্থানান্তরিত হয়। হাইকোর্ট সেই মামলায় এক যুগান্তকারী রায়ে তারেক মাসুদের পরিবারকে ৪ কোটি ৬১ লাখ ৭৫ হাজার ৪৫২ টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে নির্দেশ দিয়েছেন! রায়ে বলা হয়, চালক, বাস মালিক ও বীমা কোম্পানিকে তিন মাসের মধ্যে ওই অর্থ পরিশোধ করতে হবে।

আশ্চর্যের বিষয় হলো- নতুন প্রবর্তিত সড়ক পরিবহন আইনে সড়ক দূর্ঘটনায় ক্ষতিপূরণ চেয়ে ক্লেইমস ট্রাইবুনাল বা আদালতে মামলা করার এই বিধান বাতিল করা হয়েছে! বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে নতুন সড়ক আইনের ধারা-৫৩ অনুসারে একটি “আর্থিক সহায়তা তহবিল” গঠন করে সেই তহবিল হতে সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি বা মৃত ব্যক্তির প্রতিনিধি-কে আবেদন সাপেক্ষে আর্থিক ক্ষতিপূরণ প্রদানের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

ধারা- ৫৪ তে বলা হয়েছে- “আর্থিক সহায়তা তহবিল” পরিচালনার জন্য একটি “ট্রাস্টি বোর্ড” থাকবে। এই ট্রাস্টি বোর্ডের হাতেই সড়ক দুর্ঘটনায় আঘাতপ্রাপ্ত বা ক্ষতিগ্রস্ত বা মৃত ব্যক্তির উত্তরাধিকারী কর্তৃক দাবিকৃত ক্ষতিপূরণের পরিমাণ নির্ধারণ ও ক্ষতিপূরণ প্রদানের ক্ষমতা অর্পণ করা হয়েছে।

ক্ষতিগ্রস্ত আবেদনকারী যদি মনে করেন যে ট্রাস্টি বোর্ড কর্তৃক মঞ্জুর করা ক্ষতিপূরণ অপর্যাপ্ত তাহলে ধারা-৫৯ অনুযায়ী একই কর্তৃপক্ষ (ট্রাস্টি বোর্ড) এর কাছে পুনর্বিবেচনার আবেদন করতে পারবেন এবং পুনর্বিবেচনার সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট না হলে সরকারের কাছে আপিল করতে পারবেন। আপিলের সিদ্ধান্তেও সন্তুষ্ট না হলে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি “সালিশ নিষ্পত্তিকারী (Arbitrator)” নিকট আবেদন করতে পারবেন এবং আরবিট্রেটর এর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত (Conclusive)।

নতুন সড়ক আইনের ধারা ৬১(৪) অনুযায়ী- এই আইনের অধীন ক্ষতিপূরণ দাবি সংক্রান্ত প্রশ্ন জড়িত আছে এমন কোন মামলা কোন দেওয়ানি আদালত বিচারের জন্য গ্রহণ করতে পারবে না, এমনকি সালিশ নিষ্পত্তিকারীর কোন সিদ্ধান্ত বা কার্যধারা আদালতে চ্যালেঞ্জ করা যাবে না; সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কোন আদালতে নিষেধাজ্ঞা চাওয়া যাবে না।

উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে- এই নতুন আইনের মাধ্যমে সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিপূরণ দাবির মামলা গ্রহণে আদালতের এখতিয়ার কেড়ে নেওয়া হয়েছে। ক্ষতিপূরণ দাবির পুরো প্রক্রিয়া-কে “বিচার-বহির্ভূত” বা Extra-judicial ও আমলাতান্ত্রিক করে ফেলা হয়েছে। সংক্ষুদ্ধ ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির আদালতে আইনি প্রতিকার পাওয়ার পথ রুদ্ধ করে ট্রাস্টি বোর্ডের কাছে ন্যস্ত করা হয়েছে যা ক্ষতিপূরণ দাবির প্রক্রিয়াকে আমলাতান্ত্রিক, জটিল ও সময়সাপেক্ষ করে ফেলবে।

১২জন সদস্য বিশিষ্ট এই ট্রাস্টি বোর্ডের সিংহভাগই হচ্ছেন সরকারের ঊর্ধ্বতন আমলা ও সরকারি কর্মকর্তা, আর আছেন সরকার মনোনীত সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি ও সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের প্রতিনিধি, আইনের সাথে সংশ্লিষ্ট কোন ব্যক্তি বা সাধারণ যাত্রীদের প্রতিনিধিত্ব করে এমন কেউ এই বোর্ডে নেই। এমন একটি ট্রাস্টি বোর্ড কর্তৃক সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত বা ভিক্টিমের স্বার্থ কীরূপ সংরক্ষিত হবে তা ভাবনার বিষয়।

যে সালিশকারীর সিদ্ধান্তকে আদালতের এখতিয়ারের ঊর্ধ্বে স্থান দেওয়া হচ্ছে তিনি কে হবেন সেটি এখনো অনির্ধারিত- বিধি দ্বারা চূড়ান্ত হবে। আশংকা হচ্ছে- সালিশকারীও ট্রাস্টি বোর্ডের মতো আমলা নির্ভর হয় কিনা!

আদালতে তথা ক্লেইমস ট্রাইবুনালে মামলা হলে দায়ী চালক ও সংশ্লিষ্ট যানবাহনের মালিক-কে ব্যক্তিগতভাবে দায়ী করা ও তাদের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় করার সুযোগ ছিল যা নতুন আইনে থাকছে না; “আর্থিক সহায়তা তহবিল” হতে ট্রাস্টি বোর্ড ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ ও প্রদান করবে। মজার ব্যাপার হলো- নতুন সড়ক আইনের ধারা-৫৩ অনুযায়ী- এখন থেকে প্রত্যেক মোটরযান মালিক-কে বাধ্যতামূলকভাবে বার্ষিক বা এককালীন চাঁদা প্রদান করতে হবে যা দিয়ে ওই “আর্থিক সহায়তা তহবিল” গঠিত হবে। অর্থাৎ, কোন মোটরযান বা বাইকের মালিক যদি সড়ক দুর্ঘটনায় পড়েন তাহলে তিনি নিজেদের প্রদত্ত চাঁদা থেকেই আসলে ক্ষতিপূরণ পাবেন; অপরাধী থেকে নয়!

বাতিল হওয়া মোটর‍যান অধ্যাদেশে সন্নিবেশিত ‘ক্লেইমস ট্রাইবুনাল’ নতুন সড়ক পরিবহন আইনে ফিরিয়ে আনার দাবি তুলছি, আমলা নির্ভর কোন কমিটির বদলে ক্ষতিপূরণ দাবির মামলায় আদালতের এখতিয়ার পুনরুজ্জীবিত করতে হবে। ক্ষতিপূরণ চেয়ে আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার সুযোগ রুদ্ধ করা আইনের শাসনের অন্তরায়- এই বোধ ও উপলব্ধি ছড়িয়ে দেওয়া জরুরি।

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন