, ১ জানুয়ারি ২০২১; ১২:৪৬ অপরাহ্ণ


কোরিয়া দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৪৫ সালে জাপানের নিকট থেকে স্বাধীনতা অর্জন করে। ১৯৪৮ সালে প্রথম কোরিয়া প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৫০-১৯৫৩ খ্রিঃ পর্যন্ত কোরিয়া যুদ্ধে দক্ষিণ কোরিয়া ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়। অধিকাংশ ভবন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কল-কারখানা ধ্বংস হয়ে যায়। লক্ষ লক্ষ মানুষ যুদ্ধে হতাহত হয়। মানুষ না খেয়ে অনাহারে দিন অতিবাহিত করে।

বিশেষজ্ঞরা তখন বলেছিলেন যুদ্ধের এই ক্ষতির রেশ কাটিয়ে উঠতে গরীব দেশ কোরিয়ার বহু বছর সময় লাগবে। মার্কিন জেনারেল Douglas MacArthur তখন বলেছিলেন Reconstruction in Korea would take at least a century। কোরিয়া এমন একটি দেশ যার ৭০ শতাংশ পাহাড়। দেশটি বাংলাদেশের চেয়ে আয়তনে অনেক ছোট, মাত্র ১০০,১৮৮ বর্গ কিলোমিটার। যে দেশের কোন প্রাকৃতিক সম্পদও নাই। ১৯৬০ সালে যাদের মাথাপিছু আয় ছিল মাত্র ৭৯ ডলার! এমন একটি দেশ কিভাবে যুদ্ধের পর ধ্বংসস্তুপ থেকে মাত্র ৪০ বছরেই বিশ্বের উন্নত দেশের কাতারে সামিল হলো!

বর্তমান বিশ্বের ১১তম অর্থনৈতিক শক্তিধর দেশ এই কোরিয়া। আইসিটি ও এডুকেশন সিস্টেমে বিশ্বের প্রথম স্থান, রপ্তানীকারক দেশের তালিকায় বিশ্বের ৫ম স্থান, চিকিৎসাসহ সকল ক্ষেত্রেই বিশ্বের প্রথম সারির দেশ এই কোরিয়া। ‍যুদ্ধ বিধ্বস্ত একটি গরীব দেশ কি করে স্বল্প সময়ে উন্নয়নের চরম শিখরে পৌঁছে গেলো! কোরিয়ার উন্নয়নের সেই শিক্ষণীয় গল্পই শোনাবো।

সম্প্রতি সদাশয় সরকার আমিসহ ২৯ জন কর্মকর্তাকে ২ সপ্তাহের জন্য KDI School of Public Policy and Management এর অধীন একটি স্টাডি প্রোগ্রামে দক্ষিণ কোরিয়ায় পাঠিয়েছিলেন। এতদিন দক্ষিণ কোরিয়ার নাম শুনলে মনের অজান্তেই শিয়াল বা কুকুর খাওয়ার ছবি মনের পর্দায় ভেসে উঠতো। তাদের বিষয়ে নেতিবাচক একটি ধারণা কাজ করত।

কোরিয়ায় যাওয়ার প্রোগ্রাম হওয়ার পর থেকে বুঝতে পারলাম শুধু আমি না, এমন চিন্তা আমাদের দেশের অনেকের মধ্যেই আছে। কারণ অনেকেই আমাকে এসব বিষয়ে জিজ্ঞাসা করেছে। তাছাড়া যাওয়ার আগে ভাবতাম কোরিয়া একটি সাধারণ মানের উন্নত দেশ, সেখানে গিয়ে দেখার বা শেখার মত কিছুই নাই।

আমার এসব চিন্তার ভুল ভাঙতে শুরু করে যখন ইনচন বিমানবন্দর থেকে বাসযোগে ডেইজন শহরের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করলাম। প্রশস্থ রাস্তা, রাস্তার দুধারে পরিকল্পিত সারি সারি বৃক্ষ, অটোমেটেড ট্রাফিক সিগন্যাল, সুউচ্চ অট্টালিকা ইত্যাদি দেখেতে দেখতে যাচ্ছিলাম আর কোরিয়ান গাইড আমাদের ইংরেজিতে ব্যাখ্যা করে শুনাচ্ছিলেন।

আমরা সাগরের উপর দিয়ে নির্মিত ২১ কিলোমিটার দীর্ঘ ইনচন ব্রিজ পার হলাম। সাগর তীরের বহুতল ভবনগুলো এর সৌন্দর্য আরও বৃদ্ধি করেছে। একসময় আমরা ডেইজন শহরে প্রবেশ করলাম। ছবির মত সুন্দর সাজানো গোছানো পরিচ্ছন্ন একটি শহর। রাস্তায় কোথাও এক টুকরা কাগজও চোখে পড়লনা। আমাদের এ শহর থেকে প্রতিদিন সেজং শহরে কেডিআই স্কুলে যেতে হত। সেজং শহরকে এসি সেজং বলা হয়। কারণ এই শহরকে তাদের এ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সিটি হিসেবে পরিকল্পিতভাবে গড়ে তুলছে। ডেইজন শহরের চেয়ে এ শহরটি আরও চমৎকার ও পরিকল্পিতভাবে ছবির মত সাজানো। ডেইজন থেকে বাসে ৩০ মিনেটের পথ। এই দুইটি শহরে ৫দিন অবস্থান করে আমরা দেশটির পোর্ট সিটি বুসান শহরে গেলাম।

সেজং ও বুসান এই দুটি শহরকে প্রাথমিকভাবে ২০২১ সালের মধ্যে পুরোপুরি স্মার্ট সিটি হিসেবে গড়ে তোলার প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার। আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স ব্যবহারের মাধ্যমে সেখানে সবকিছুই হবে প্রযুক্তি নির্ভর অটোমেটেড। যেমন- পথে কেউ অসুস্থ হলে রাস্তায় বিভিন্ন পয়েন্টে স্থাপিত ডিভাইসের বাটনের প্রেস করলে সরাসরি কাঙ্খিত ব্যক্তির ডেস্কে কল চলে যাবে এবং রোগীর সাথে কথা বলে কয়েক মিনিটের মধ্যেই সেখানে এ্যাম্বুলেন্স পৌঁছে যাবে। তাছাড়া যাত্রীরা বাস ও ট্রেনের রিয়েল টাইম তথ্য জানতে পারবে। সমন্বিত ট্রাফিক ব্যবস্থাসহ তথ্য প্রযুক্তি নির্ভর এমন এক ব্যবস্থা গড়ে তুলছে যেখানে মানুষের জীবনযাত্রা হচ্ছে অত্যন্ত সহজ ও সাশ্রয়ী। সেখানে পরিবেশ হবে সম্পূর্ণ দুষণমুক্ত।

বুসান শহরে ২ দিন অবস্থান করে আমরা KTX দ্রুত গতির ট্রেনে করে ৪১৭ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে ২.৫ ঘন্টায় রাজধানী সিউলে পৌঁছালাম। রাজধানী সিউলে ৫দিন অবস্থান করে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শেষ করে দেশে ফিরে আসলাম। কিন্তু কোরিয়ার বিভিন্ন শহরের পরিকল্পিত উন্নয়নের চিত্র, যোগাযেগ ব্যবস্থা, প্রযুক্তি, শিক্ষা ব্যবস্থা, গবেষণা, তাদের নৈতিকতা, ভদ্রতা ইত্যাদির কথাই চিন্তা করছি শুধু। এ চিন্তার কারণ হলো কোরিয়া এক সময় বাংলাদেশের চেয়ে গরীব ছিল, তাদের কোন প্রাকৃতিক সম্পদও ছিলনা। তাহলে এত উন্নত হলো কিভাবে! এ দেশের উন্নয়নের অনেক কিছু শেখার আছে আমাদের।

দেশটির ৪টি শহরে মোট ১৩দিন অবস্থান করেছি। অবস্থানকালে যা দেখেছি এক কথায় অভূতপূর্ব। বিভিন্ন সাইট ভিজিট এবং প্রশিক্ষণে আগত রিসোর্স পার্সনদের কাছে কোরিয়া উন্নয়নের যে গল্প শুনেছি তার আলোকে তাদের উন্নয়নের মন্ত্র ও আমাদের জন্য শিক্ষণীয় বিষয়গুলো উল্লেখ করা হলো।

কোরিয়ায় যে বিষয়গুলো আমাদের নজর কেড়েছে প্রথমেই তা উল্লেখ করছি:

১। যোগাযোগ ব্যবস্থা:

No obstacles, just highway এই নীতির মাধ্যমে দেশটি যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে যোগাযোগ ব্যবস্থার ব্যাপক উন্নয়ন সাধন করেছে। ১৯৬৮ সালে তারা সিউল থেকে পোর্ট সিটি বুসান পর্যন্ত চার লেনের হাইওয়ে নির্মাণ করে। জাতিসংঘের ভিয়েতনাম মিশনে সৈন্য প্রেরণ করে তা থেকে প্রাপ্ত অর্থ দিয়ে দেশের প্রথম সুপ্রশস্ত ৪১৬ কিলোমিটার এ হাইওয়েটি নির্মাণ করে। এখানে একটি শিক্ষণীয় বিষয় হলো, দেশটিতে অধিকাংশ জায়গায় জুড়ে রয়েছে পাহাড়। কিন্তু তাদের রাস্তাগুলো কোথাও আঁকাবাঁকা বা উঁচুনিচু নাই। কারণ হাইওয়ে বা ট্রেন লাইনগুলো নির্মাণের সময় যেখানে পাহাড় আছে সেখানে সরাসরি পাহাড়ের নিচে দিয়ে টানেল করে রাস্তা ও রেলপথ নির্মাণ করা হয়েছে। সবচেয়ে বেশি উন্নয়ন করেছে ট্রেন যোগাযোগ ব্যবস্থার। দ্রুত গতির KTX ট্রেন ঘন্টায় ৩০৫ কিলোমিটার বেগে চলে। সকল ট্রেন যথা সময়ে যাত্রা করে। তাদের ট্রেন স্টেশনগুলো আমাদের এয়ারপোর্ট থেকেও বড় ও আধুনিক।

শহরে চলাচলের জন্য প্রচুর আধুনিক এসি বাস রয়েছে। প্রতিটি বাসের নাম্বার ও নির্দিষ্ট স্টপেজ আছে। স্টপেজে একটি বোর্ডে বাসগুলোর রুট এবং কোন বাস কোন কোন গন্তব্যে যাবে তা উল্লেখ রয়েছে। বাসগুলো নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট রুটে চলাচল করে। শহরের যে কোন স্থানে যাওয়ার জন্য যে কোন স্পট থেকে কয়েক মিনিটের মধ্যেই বাস পাওয়া যায়। ভাড়া নির্ধারিত, ভাড়া আদায়ের কোন লোক নাই। বাসে উঠার পর শুধু সেখানে স্থাপিত ডিভাইসে কার্ড পান্স করতে হয়। যাদের কার্ড নেই, বিশেষ করে বিদেশী পর্যটকদের ভাড়া পরিশোধের জন্য বাসের সামনে একটি বাক্স রাখা আছে। যাত্রীকে বাসের উঠে উক্ত বাক্সে টাকা ঢুকিয়ে দিতে হয়। এছাড়া শহরে মাটিরে নিচে দিয়ে সাব-ওয়ে রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা রয়েছে। ফলে মানুষ খুব দ্রুত শহরের এক স্থান থেকে অন্য স্থানে চলাচল করেতে পারে। এ কারণে শহরে ট্রাফিক জ্যাম খুব বেশি দেখা যায় না। শহরে রাস্তায় সুপ্রশস্ত ফুটপথ রয়েছে। ফুটপথগুলোতে আধুনিক মানের বাহারি রঙের টাইলস বসানো হয়েছে। ফুটপথের পাশে সারি সারি আকর্ষণীয় বৃক্ষ শোভা পায়। সুন্দর ফুটপথগুলোতে হাটতেই আনন্দ লাগে।

২। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা:

৪টি শহরে কোথাও নোংরা, ময়লা-আবর্জনা চোখে দেখিনি। রাস্তায় একটি কাগজ বা পলিথিনও চোখে পড়েনি। ধুলা ময়লাও নাই কোথাও। এসব শহরের বিভিন্ন রেস্টুরেন্ট খেতে গিয়েছি কোথাও এক টুকরো পড়ে থাকা খাদ্য কণাও চোখে পড়েনি।

৩। ট্রাফিক সিগন্যাল:

১৩ দিন কোরিয়াতে কোন ট্রাফিক পুলিশ চোখে পড়েনি। সব কিছুই অটোমেশন। রাস্তার ব্যস্ততার ধরণ অনুসারে স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক সিগন্যালের সময় নির্ধারণ করা আছে। কোন রাস্তার কোন সিগন্যাল দিয়ে কতটি গাড়ি চলাচল করে, কোন রাস্তা দিয়ে কতজন লোক পায়ে হেটে পারাপার হয় তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সিস্টেমে গণনা হয়ে যায়। তার প্রেক্ষিতে স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক সিগন্যালের সময় নির্ধারণ করা আছে, সে অনুযায়ী সিগন্যাল বাতি জ্বলে। চারটি শহরে সবসময় রাস্তায় চলাচল করেছি, কখনও কোন ব্যক্তি বা গাড়িকে সিগন্যাল অমান্য করতে দেখিনি। উল্লেখযোগ্য ট্রাফিক জ্যামও চোখে পড়েনি।

৪। তথ্য-প্রযুক্তি:

প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে কোরিয়া অনন্য উচ্চতায় ‍প্রবেশ করেছে, যা চোখে না দেখলে বোঝানো কঠিন। পুরো সাউথ কোরিয়া দেশটি যেন একটি ফ্রি ওয়াইফাই জোন। প্রযুক্তির ব্যবহারে তারা এখন বিশ্বের এক নম্বর দেশ। বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত গতির ইন্টারনেট কোরিয়াতে। প্রযুক্তির মাধ্যমে আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স ব্যবহার করে তারা এখন স্মার্ট সিটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে।

৫। শিক্ষা:

World best education systems র‌্যাংকিং এ সাউথ কোরিয়া এখন বিশ্বের এক নম্বর অবস্থানে! প্রযুক্তি নির্ভর আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থা, অবকাঠামো এবং শিক্ষার গুণগত মান তাদের এ অবস্থানে নিয়ে এসেছে। তাদের অভিভাবকদের সাথে বাচ্চাদের কথোপোকথনে প্রথম বাক্যই থাকে Have you finished your study?

৬। কোরিয়ান মানুষ:

কোরিয়ার মানুষ খুবই শান্তিপ্রিয় ও পরোপকারী। তারা অত্যন্ত বিনয়ী ও মিষ্টভাষী। যেমন: রাস্তায় আপনি কোন কোরিয়ানকে কোন ঠিকানা জিজ্ঞাসা করলে সে পারলে আপনাকে ট্যাক্সিতে তুলে দিবে। কোরিয়ায় কোন দাঙ্গা-হাঙ্গামা, মারামারি নাই বললেই চলে। যেটা সত্য সেটাই বলবে, কোন প্রতারণার স্থান নাই। যা দেখেছি তাতে কোরিয়ানরা উচ্চ শিক্ষিত, পরিশ্রমী, সুশৃঙ্খল, সময়ানুবর্তী ও বিনয়ী জাতি।

যুদ্ধ বিধ্বস্ত কোরিয়ার এত উন্নয়ন সম্ভব হলো কিভাবে?

কোরিয়া যে উন্নয়ন সাধন করেছে তাকে Miracle of Han River নামে অবিহিত করা হয়। কিন্তু তাদের কোন প্রাকৃতিক সম্পদ নাই, খুব বেশি সমতল ভূমিও নাই (মাত্র ৩০%) । যুদ্ধ বিধ্বস্ত একটি দেশের কী ছিলো উন্নয়নের মূলমন্ত্র, কী ছিলো তাদের পলিসি, কী ছিল তাদের কমিটমেন্ট? তা নিম্নে উল্লেখ করা হলো:

১। ল্যান্ড রিফর্ম:

১৯৪৫ সালে কোরিয়ার ৭০ শতাংশ মানুষ কৃষির উপর নির্ভরশীল ছিল। তন্মোধ্যে ৮৬ শতাংশ মানুষের ‍নিজেদের কোন জমি ছিল না। তারা প্রজা হিসেবে জমিদারদের জমি চাষ করতো। সরকার তখন Land-to-the-tiller নীতি গ্রহণ করে। সরকার ভূমি মালিকদের নিকট থেকে বাজার মূল্যে জমি ক্রয় করে স্বল্প মূল্যে সকল ভূমিহীনদের মাঝে তা বিতরণ করে। এ ক্ষেত্রে সমঅধিকার নীতি গ্রহণ করা হয়। সকল মানুষকে জাতীয় অর্থনৈতিক উন্নয়নে অংশীদার করা হয়। এতে প্রায় শতভাগ মানুষ কৃষি জমির মালিক হয়ে যায়। নিজেরা জমির মালিক হয়ে তারা আত্মবিশ্বাসী ও উৎসাহী হয়ে উঠে। তাঁরা তাদের নিজেদের জমিতে দ্বিগুণ উৎসাহে চাষাবাদ করে ফসল উৎপাদন শুরু করে। ফলে ধান উৎপাদন অনেক বৃদ্ধি পায়। প্রতিটি পরিবারে সচ্ছলতা ফিরে আসে। তারা তাদের ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়ার পেছনে বিনিয়োগ শুরু করে।

২। এডুকেশন রিফর্ম:

যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশটির কোন প্রাকৃতিক সম্পদ নাই, তাই তারা মানব সম্পদ তৈরির উপর বেশি গুরুত্বারোপ করে। এ ক্ষেত্রে শিক্ষাকে মানব সম্পদ রূপান্তরের মূল হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। স্বাধীনতার পর ১৯৪৮ সালে কোরিয়ার মাত্র ৬৪% শিশু প্রাথমিক বিদ্যালয় গমন করত, মাত্র ১২% শিশু মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষা গ্রহণ করত। তখন দেশটির ১৩ বছর এবং এর বেশি বয়সী ৫৩% মানুষ ছিল নিরক্ষর। এ অবস্থায় সকল শিশুর জন্য সার্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা সাংবিধানিকভাবে বাধ্যতামূলক করা হয়। ফলে ১৯৫৯ সালে প্রাথমিক স্তরে এনরোলমেন্ট হয় ৯৬%। এছাড়া সার্বজনীন সাক্ষরতা কর্মসূচি শতভাগ বাস্তবায়নের জন্য ১৯৫৪ সালে Five year plan গ্রহণ করা হয়। ফলে ১৯৫৮ সালে নিরক্ষরতার হার নাটকীয়ভাবে ৪% তে নেমে আসে।

সরকার সকল শিশুর শিক্ষা নিশ্চিত করার জন্য Bottom-up Approach গ্রহণ করে। যাতে প্রাথমিক স্তরের শতভাগ শিশুর উপস্থিতি নিশ্চিত করার মাধ্যমে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার্থী উপস্থিতি বৃদ্ধি করা যায়। এছাড়া শিক্ষার ব্যাপক প্রসারে সরকার Low-cost Approach গ্রহণ করে, তবে আধুনিক ও উন্নত মানের শ্রেণি কক্ষ প্রস্তুতকরণের উপর বেশি গুরুত্বারোপ করে। Egalitarian Approach গ্রহণ করার মাধ্যমে সকল স্কুলের জন্য একই মানের অবকাঠামো ও সুযোগ সুবিধা প্রদান করা হয় এবং মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে প্রবেশের ক্ষেত্রে ভর্তি পরীক্ষা পদ্ধতি বাতিল করে লটারী পদ্ধতি চালু করা হয়। দেশটি কারিগরী, বৃত্তিমূলক ও বিজ্ঞান শিক্ষার উপর বেশি জোর দেয়। এছাড়া সরকার শিল্পোন্নয়নের উপর গুরুত্বারোপ করে ৫ বছর মেয়াদী ভোকেশনাল স্কুল চালু করে। উচ্চ শিক্ষার সম্প্রসারণে সরকার July 30 Education Reform Policy 1980 গ্রহণ করে।

শিক্ষা প্রসারের পাশাপাশি শিক্ষার মানোন্ননে সরকার ব্যাপক গুরুত্বারোপ করে। শ্রেণি কক্ষের আকার ছোট করা হয় এবং শিক্ষকের সংখ্যা বৃদ্ধি করা হয়।

যেমন- ১৯৬৫ সালে একটি শ্রেণি কক্ষে একসাথে ৬৫ জন শিক্ষার্থীকে পাঠদান করানো হত, ১৯৯৫ সালে তা কমে হয় ৩০জন। এছাড়া ১৯৬৫ সালে একজন শিক্ষকের বিপরিতে শিক্ষার্থী ছিল প্রাথমিকে ৬২ জন, মাধ্যমিকে ৩৯জন, উচ্চ মাধ্যমিকে ৩২জন। তা ২০০৫ সালে কমে যথাক্রমে হয় ২৫, ১৯ ও ১৫ জনে। শিক্ষার মনোন্নয়নে শিক্ষকদের বেতন এবং মর্যাদা বৃদ্ধি করা হয়।

সরকার শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ মেধাবীদের নিয়োগ প্রদান করে। শিক্ষকদের মর্যাদা ও বেতন বেশি থাকায় অনেক মেধাবী শিক্ষাকতা পেশাকে প্রথম পছন্দ হিসেবে বেছে নেয়। ১৯৯৫ সালে সরকার Presidential Committee for Education Reform গঠন করার মাধ্যমে শিক্ষায় নতুন মডেল গ্রহণ করে। যেখানে Knowledge-based Society গড়ে তোলার লক্ষ্যে বিদ্যালয়গুলোকে অধিক স্বায়ত্তশাসন প্রদান ও জবাবদিহিতামূলক করা হয়। এছাড়া প্রতিটি বিদ্যালয়ে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সংযোগ প্রদান করা হয়। শিক্ষায় তথ্য প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহার দেখা যায়।

৩। শিল্পোন্নয়ন, রপ্তানীমুখী নীতি গ্রহণ ও বাজার অর্থনীতি:

যুদ্ধের পরে ১৯৬০ সাল পর্যন্ত কোরিয়ার অর্থনীতি ছিল মূলত কৃষি নির্ভর। কোরিয়ায় কোন প্রাকৃতিক সম্পদ না থাকায় রপ্তানীমুখী অর্থনৈতিক কৌশল গ্রহণ করে। কারিগরী ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ জনবল গড়ে তোলা হয় এবং তাদের বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ প্রদান করা হয়। শুরুর দিকে সেখানে হালকা শিল্প প্রতিষ্ঠা লাভ করে। এ সময়ে রপ্তানীমুখী শিল্পকে উৎসাহিত করা হয়। ১৯৬০-১৯৭০ সালের দিকে কোরিয়ার মূল রপ্তানী পণ্য ছিল টেক্সাইলস, পরচুলা, চাল, রেশম, ফলমূল ও শাকসবজি, সামুদ্রিক মাছ, লৌহ আকরিক, প্রাকৃতিক গ্রাফাইট, টোবাকো, ধাতব পদার্থ ইত্যাদি।

১৯৮০-২০০০ সালের দিকে তাদের রপ্তানীমুখী পণ্য উৎপাদনে আমূল পরিবর্তন ঘটে। তখন তারা ভারী শিল্প পণ্য উৎপাদন ও রপ্তানীর দিকে ঝুঁকে পড়ে। এ সময়ে তাদের প্রধান রপ্তানী পণ্য হিসেবে বিবেচিত হয় ইলেক্ট্রনিক্স, সেমিকন্ডাক্টার, কম্পিউটার, গাড়ি, জাহাজ, স্টিল, ওয়্যারলেস টেলিকমিউনিকেশন যন্ত্রপাতি, টেক্সটাইল পণ্যসামগ্রী, পেট্রোকেমিক্যাল প্রোডাক্ট, ইলেক্ট্রনিকস হোম এপ্লিকেশন ইত্যাদি। প্রাথমিক পর্যায়ে ষাট ও সত্তরের দশকে শিল্প সম্প্রসারণে সরকার সরাসরি পৃষ্ঠপোষকতা করে। মূলত দক্ষ জনবল, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, বিজ্ঞানসম্মত শিল্প গবেষণা ও উদ্ভাবন ইত্যাদি কারণে কোরিয়া রপ্তানীমুখী ব্যাপক শিল্পোন্নয়ন করতে সক্ষম হয়।

৪। বিদেশী সাহায্যের পরিকল্পিত ব্যবহার:

১৯৫৩ সালে যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর দেশটি প্রচুর বিদেশী মানবিক সহায়তা পায়। যে সহায়তাগুলো সরকার সঠিকভাবে ব্যবহার করেছে। সরকার তখন ৩০% বিদেশী সহায়তা শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অবকাঠামো খাতে ব্যয় করে। অবশিষ্ট ৭০% অর্থ ফ্লাওয়ার মিল, সুগার রিফাইনিং, টেক্সটাইল এই তিনিট শিল্প প্রতিষ্ঠা ও প্রসারে ব্যয় করা হয়। এদের একত্রে ‘three white industries’ নামে অবিহিত করা হয়। ফলে দেশটি দ্রুত শিল্পায়নের দিকে ধাবিত হয়।

৫। নিউ ভিলেজ মুভমেন্ট (Saemaul Undong):

কোরিয়ার শহরাঞ্চলগুলো যখন ব্যাপক উন্নয়ন হতে শুরু করে। তখন সরকার গ্রামের উন্নয়নের উপর গুরুত্বারোপ করে। ১৯৭০ সালে নিউ ভিলেজ মুভমেন্ট চালু করে। এটি একটি Performance based apparoach যা ৩টি নীতি যথা- self-help, diligence, cooperation এর উপর প্রতিষ্ঠিত হয়। সরকার প্রথম বছর ৩৪৬৫৬টি গ্রাম (সকল গ্রাম) প্রকল্পে ৩০০ ব্যাগ করে সিমেন্ট প্রদান করে। গ্রামবাসী নিজেদের শ্রম ও পারস্পারিক সহযোগিতার দ্বারা গ্রাম উন্নয়নে রাস্তা, ব্রিজ নির্মাণ করে এবং স্যানিটেশন খাতে ব্যয় করে। এর মধ্যে মূল্যায়নে যেসব গ্রাম সবচেয়ে ভাল কাজ করেছে এমন ১৬,৬০০ গ্রামকে পরবর্তী আরও উন্নয়ন প্রকল্পে সিমেন্ট ও রড প্রদান করা হয়।

৬. R&D এ বিনিয়োগ:

Research and Development এর ক্ষেত্রে কোরিয়া এখন জিডিপির ৪.২৩% ব্যয় করছে। যা আমেরিকা ও জাপানের চেয়েও অনেক বেশি এবং সারাবিশ্বের মধ্যে দ্বিতীয় (ইজরাইল প্রথম-৪.২৭%)। এ কারণে দেশটি ইনোভেশনে বিশ্বের এক নম্বর অবস্থানে আছে। R&D এ বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, শিল্প, শিক্ষা, যোগাযোগ ইত্যাদি ক্ষেত্রে বিজ্ঞানসম্মত গুণগত গবেষণা কাজ পরিচালনা করা হচ্ছে। ফলে দেশটি বিভিন্ন ক্ষেত্রে টেকসই নীতি গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হচ্ছে এবং উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে পারছে।

৭। পলিসি বাস্তবায়ন:

কোরিয়ায় পলিসি গ্রহণ হয় ১০%, সেখানে পলিসি বাস্তবায়ন হয় ৯০%। কোরিয়ানরা কাজে বিশ্বাসী। তারা খুবই পরিশ্রমী ও দেশ প্রেমিক। বিজ্ঞানসম্মত গবেষণার মাধ্যমে পলিসি গ্রহণ করা হয় এবং দুর্নীতিমুক্তভাবে সকল প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়।

৮। বিনিয়োগ ও ব্যবসাবান্ধব সুষ্ঠু পরিবেশ:

বিনিয়োগ ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশের জন্য কোরিয়া বিশ্বের ৫ম স্থানে রয়েছে এবং ওইসিডি দেশের মধ্যে প্রথম স্থান। সেখানে যোগাযোগ ব্যবস্থা অনেক উন্নত এবং বিদ্যুত ও পানি সহজলভ্য। সমুদ্র বন্দরকে তারা অত্যাধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। সেখানে বড় জাহাজ থেকে সর্বোচ্চ মাত্র ১৭ ঘন্টায় মাল খালাস করা হয়। এসব কারণে আগে থেকেই কোরিয়ায় বিশ্বের বড় বড় কোম্পানী বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ করছে। ২০১৮ সালে কোরিয়ার FDI Stock এর পরিমাণ ২৩১ বলিয়ন মার্কিন ডলার।

আমাদের দেশের টেকসই উন্নয়নে কিছু সুপারিশ:

বাংলাদেশে স্বাধীনতার ৪৮ বছর পরও সময়ের তুলনায় কাঙ্খিত মাত্রায় উন্নয়ন হয়নি। বাংলাদেশে এখন যে গতিতে বিভিন্ন ক্ষেত্রে উন্নয়ন হচ্ছে তা আরও ৪০ বছর আগে থেকে শুরু হলে বাংলাদেশ এতদিনে উন্নত দেশে রূপান্তর হয়ে যেত। বাংলাদেশের সম্ভাবনা অনেক বেশি। দেশের সকল মানুষের মধ্যে দেশ প্রেম নেই বলে মনে হয়। কারণ অনেক মানুষ প্রচুর টাকা আয় করে তা দেশে বিনিয়োগ না করে বিদেশে পাচার করছে, আবার অনেকে মারাত্মক দুর্নীতির সাথে জড়িত।

আমাদের পলিসি গ্রহণে বিজ্ঞানসম্মত গবেষণা নাই, পলিসি সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হয়না এবং যতটুকু বাস্তবায়ন হয় সেখানেও দুর্নীতে রয়েছে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকার ইতোমধ্যে ব্যাপক কার্যক্রম শুরু করেছে। যা সর্বমহলে প্রশংসিত হচ্ছে। এখন গবেষণা ক্ষেত্রে আরও জোর দেওয়া প্রয়োজন। যে বিষয়গুলো আমাদের দেশের টেকসই উন্নয়নের জন্য বাস্তবায়ন জরুরী বলে প্রতীয়মান হয় তা উল্লেখ করা হলো:

১। শিক্ষা সংস্কার:

একটি দেশের টেকসই উন্নয়নের জন্য দক্ষ মানবসম্পদের কোন বিকল্প নাই। মানবসম্পদ তৈরির হাতিয়ার হলো মানসম্মত শিক্ষা। শিক্ষা ব্যবস্থার আমুল পরিবর্তন এখন সময়ের দাবী। সরকার শিক্ষায় পর্যাপ্ত অর্থ ব্যয় করছে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রচুর অবকাঠামো তৈরি হচ্ছে, আইসিটি সরঞ্জাম সরবরাহ করা হচ্ছে, অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করা হচ্ছে। সবই সময়োপযোগী ও প্রশংসনীয় উদ্যোগ। তবে পাশাপাশি শিক্ষার মানোন্নয়নে আরও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন এবং এ ক্ষেত্রে আরও গবেষণা দরকার। এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিদর্শনে গিয়ে খুবই হতাশ হতে হয়। বড় বড় নামকরা সরকারি ও বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পরিদর্শনকালে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত সকল শিক্ষার্থীকে প্রশ্ন করা হলো ‘আমি ভাত খেয়েছি’ এর ইংরেজি অনুবাদ কী হবে? শতশত শিক্ষার্থী কেউ জবাব দিতে পারেনা। প্রায় ১০-১৫% শিক্ষার্থী বলে ‘I eat rice’, অবশিষ্টরা চুপচাপ। ইংরেজি মূল বইয়ের প্রথম গল্পের প্রথম লাইন লিখতে বলা হলো সেখানে ১০টি শব্দের মধ্যে ৬/৭টি বানানই ভুল (আমি বই দেখে বলেছি, শিক্ষার্থী বোর্ডে লিখেছে) । ইংরেজি বইয়ের যে গল্পটি সবচেয়ে ভাল পড়ানো হয়েছে সে গল্প থেকে ৭/৮টি শব্দার্থ জিজ্ঞাসা করা হলো কেউ একটিও জবাব দিতে পারলনা! বাংলা বইয়ের প্রথম গল্প থেকে দুই লাইন লিখতে বলা হলো সেখানে ১০/১২টি শব্দ থাকলে ৫/৬টি বানান ভুল।

বিভিন্ন শ্রেণিতে যাদের রোল নম্বর ১ থেকে ৫ এর মধ্যে এটি তাদের অবস্থা। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চিত্রও প্রায় একই। মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা না গেলে মানব সম্পদের পরিবর্তে মানব বোঝা তৈরি হবে। বিগত কয়েক বছর থেকে পত্রপত্রিকায় দেখছি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিষয়ে ভর্তি হওয়ার মত যোগ্য শিক্ষার্থী পাওয়া যাচ্ছেনা। কারণ ইংরেজিতে ভর্তি হতে হলে ভর্তি পরীক্ষায় ইংরেজি বিষয়ে যে নাম্বার পেতে হয় তা মাত্র সীমিত কিছু শিক্ষার্থী পাচ্ছে। আমি যে কয়টি উপজেলায় চাকরি করেছি সেসব জায়গায় অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের একই অবস্থা। এ কারণে শুধু শিক্ষক, শিক্ষার্থী বা তদারককারীদের পুরোপুরি দায়ী করা যাচ্ছে না। এখানে বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে সঠিক পলিসি গ্রহণ ও তা বাস্তবায়নেও ত্রুটি রয়েছে বলেও মনে হয়। এ অবস্থা থেকে রেহাই পেতে গবেষণার মাধ্যমে দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ প্রয়োজন। তবে ফিল্ডে কাজ করার অভিজ্ঞতা ও কোরিয়ায় স্টাডি প্রোগ্রামের অভিজ্ঞতার আলোকে আপাতত যেটা করা জরুরী প্রয়োজন বলে মনে হয় তাহলো:

প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষকদের মর্যাদা বৃদ্ধি করা দরকার। অন্তত প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মর্যাদা বৃদ্ধি করা খুবই প্রয়োজন, যাতে মেধাবীরা এখানে আসতে আকৃষ্ট হয়। প্রাথমিক স্তরটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এখানে শিশুদের সবকিছুর একটি সুন্দর বেজ তৈরি হলে শিক্ষার্থীদের পরবর্তীতে জীবন গড়া সহজ হবে।

প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্যতা হিসেবে ছেলে-মেয়ে সকলের জন্যই সর্বনিম্ন অনার্স পাশ নির্ধারণ করা জরুরী। এছাড়া প্রচুর যোগ্য শিক্ষক নিয়োগদান প্রয়োজন।

যারা ইতোমধ্যে নিয়োগপ্রাপ্ত হয়েছেন তাদের আরও আধুনিক প্রশিক্ষণ প্রয়োজন।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ম্যানেজিং কমিটি পদ্ধতি বাতিল বা সংষ্কার করা প্রয়োজন। এ বিষয় নিয়ে আরও গবেষণা দরকার। কারণ, দেখেছি একটি এলাকায় গন্ডগোলের অন্যতম কারণ থাকে ম্যানেজিং কমিটির নির্বাচন। আমাকে একাধিক স্কুলে ৫০/৬০ জন পুলিশ মোতায়েন করেও ম্যানেজিং কমিটির নির্বাচন করতে হয়েছে। সারা বছরই এটাকে কেন্দ্র করে রাজনীতি চলে, এলাকায় দলাদলি সৃষ্টি হয়। ফলে বিদ্যালয়ে লেখাপড়ার সুষ্ঠু পরিবেশ ব্যহত হয়। যে উদ্দেশ্যে ম্যানেজিং কমিটি গঠন করা হয়েছে, সে উদ্দেশ্যতো বাস্তবায়ন হয়ই না বরং বিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ বিনষ্ট হয়। এছাড়া অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের সাথে ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি ও সদস্যদের মানসিক দ্বন্দ্ব লেগেই থাকে। ফলে কমিটির সভাপতি কর্তৃক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা অনেক জায়গায় শারীরিকভাবে লাঞ্চিত হয়, যা আমি নিজে দেখেছি।

শিক্ষার্থীদের খাতা মূল্যায়ন করার ক্ষেত্রে আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। কোন ক্রমেই যেন একজন শিক্ষার্থী খাতায় যা লিখেছে তার চেয়ে ১ নম্বরও বেশি না পায়। বেশি পাশ করার চেয়ে কিছু ফেল করাও অনেক ক্ষেত্রে ভাল। তাহলে শিক্ষার্থী পড়ালেখায় মনোযোগী হবে।

কারিগরি, বৃত্তিমূলক ও বিজ্ঞান শিক্ষার উপর আরও বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। এসএসসি পর্যন্ত বিজ্ঞান শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে।

প্রাথমিক বিদ্যালয়ে স্মার্ট মনিটর স্থাপনের মাধ্যমে শিশুদের পাঠদানের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

২। R&D এ বিনিয়োগ:

প্রতিটি মন্ত্রণালয়ে R&D উইং থাকা বাধ্যতামূলক করা দরকার। এ ক্ষেত্রে বাজেটে একটি নির্দিষ্ট বরাদ্দ রাখা প্রয়োজন। আপাতত অন্তত জিডিপির ১ থেকে ১.৫% অর্থ এ ক্ষেত্রে প্রতিবছর সরকারকে ব্যয় করা দরকার। তা নাহলে টেকসই উন্নয়ন বাঁধাগ্রস্থ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। বিশ্বের উন্নত প্রতিটি দেশই গবেষণা ও উন্নয়ন খাতে প্রচুর অর্থ খরচ করে। একটি সঠিক পলিসি গ্রহণ, উদ্ভাবন, পলিসি বাস্তবায়ন ইত্যাদি ক্ষেত্রে R&D এ বিনিয়োগের বিকল্প নাই। তা নাহলে একটি গৃহীত পলিসি বাস্তবায়নের ৫-১০ বছর পরে মনে হতে পারে এটা এভাবে না হয়ে ঐভাবে হলে ভাল হত। বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে গবেষণার মাধ্যমে গৃহীত সঠিক পলিসিই পারে দেশকে এগিয়ে দিতে।

৩। সিনিয়র সিভিল সার্ভিস পরীক্ষা পদ্ধতি চালুকরণ:

২০০৬ সালে কোরিয়ায় সিনিয়র সিভিল সার্ভিস সিস্টেম চালু করা হয়েছে। কোরিয়ায় সিভিল সার্ভিসে মোট ৯টি গ্রেড আছে। তন্মোধ্যে গ্রেড ১-৩ হলো ঐ দেশে সিনিয়র সিভিল সার্ভিস। সিনিয়র সিভিল সার্ভিসে যোগ দিতে হলে কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়। কোরিয়ার এই পদ্ধতিটা বাংলাদেশে বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। আমাদের দেশের ক্ষেত্রে এমন হতে পারে-

সহকারী সচিব থেকে উপসচিব পর্যন্ত স্বাভাবিক নিয়মে পদোন্নতি হবে। যুগ্মসচিব হিসেবে পদোন্নতি পেতে হলে তাকে সিনিয়র সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে। এরপর যুগ্মসচিব থেকে সিনিয়র সচিব পর্যন্ত স্বাভাবিক নিয়মে যোগ্যতা ও দক্ষতা অনুযায়ী পদোন্নতি হবে। পরীক্ষা পদ্ধতি হবে- লিখিত পরীক্ষা, গ্রুপ ওয়ার্ক, ভাইভা। এ ক্ষেত্রে নেতৃত্বদানের গুনাবলী, সমস্যা সমাধান কৌশল, বুদ্ধিমত্তা, ভাষা দক্ষতা, বিগত চাকুরি রেকর্ড, সততা, দেশপ্রেম ইত্যাদি বিষয়গুলো ভালভাবে যাচাইবাছাই করে নিতে হবে। সিনিয়র সিভিল সার্ভিস পরীক্ষা ও প্রমোশনের জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অধীন Senior Civil Servants Appoinment Sreening Committee নামে একটি উচ্চ পর্যায়ের কমিটি থাকবে।

৪। যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়নে বেশি গুরুত্ব দেওয়া:

এখন বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন আধুনিক উচ্চগতির ট্রেন চালু করা। ঢাকা থেকে দেশের বড় বড় শহরগুলোতে আন্তঃনগর দ্রুতগতির ট্রেন এখন সময়ের দাবী। কোরিয়ান KTX বাংলাদেশে চালু করা যেতে পারে। এছাড়া ঢাকা থেকে বিভাগীয় শহরগুলোতে যোগাযোগের জন্য আধুনিক ৮ লেনের হাইওয়ে নির্মাণ করা দরকার।

৫। পরিকল্পিত নগরায়ন:

ঢাকা শহরে মেট্রোরেল, ফ্লাইওয়ার নির্মাণ হচ্ছে। পাশাপাশি পরিকল্পিতভাবে সাবওয়ে নির্মাণ করা দরকার। আমাদের রাস্তায় ফুটপথে জায়গা কম। ঢাকা শহর ও কিছু বড় শহরে এখন ইচ্ছা করলেও রাস্তা ও ফুটপথ বড় করার সুযোগ নাই। তাই বিশেষ করে ঢাকা শহর বর্ধিতকরণ এবং অন্যান্য জেলা শহরে পরিকল্পিতভাবে প্রশস্থ রাস্তা ও প্রশস্থ ফুটপথ রেখে মার্কেট, দোকান, বাড়ি করার পরিকল্পনা এখন থেকেই করা দরকার। এছাড়া ভূমি জোনিং এর মাধ্যমে আলাদা আলাদা জায়গায় মার্কেট, আবাসিক, অফিস, স্বাস্থ্যসেবা, বিনোদনের জন্য নির্ধারণ করা দরকার। ঢাকা শহরের ন্যায় আরও কিছু শহরকে আধুনিকমানের সুযোগসুবিধাসহ পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলা দরকার। এতে মানুষের ঢাকা শহরমুখী প্রবণতা কমে আসবে। বিশেষ করে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও প্রশাসনিক ইউনিট।

৬। পলিসি বাস্তবায়নে উপর অধিক গুরুত্বারোপ করা:

আমাদের দেশে অনেক ভাল ভাল পলিসি আছে, কিন্তু তার সঠিক বাস্তবায়ন অনেক ক্ষেত্রে নাই। পলিসি প্রণয়ের চেয়ে পলিসি বাস্তবায়রে উপর অধিক গুরুত্বারোপ করা প্রয়োজন। কোরিয়াতে পলিসির ক্ষেত্রে পলিসি গ্রহণ ১০%, বাস্তবায়ন ৯০%।

৭। বিদেশী বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি:

বিদেশী বড় বড় কোম্পানীকে এ দেশে বিনিয়োগে আকৃষ্ট করতে আরও জোরালো পদক্ষেপ গ্রহণ আশব্যক। শিল্পায়নে সরাসরি সরকারি হস্তেক্ষেপ প্রয়োজন। বিশেষ করে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, জ্বালানি নিশ্চয়তা, দক্ষ শ্রমিক তৈরি করা দরকার।

ত্রিশ লক্ষ শহীদের আত্মদানের বিনিময়ে অর্জিত এ দেশ। এ দেশকে সত্যিকারে সোনার বাংলাদেশ হিসেবে গড়ে তোলা খুবই সম্ভব। তার জন্য দরকার সঠিক পলিসি প্রণয়ন ও তার স্বচ্ছ বাস্তবায়ন। দুর্নীতিকে বন্ধ করার সরকারি যে উদ্যোগ বাস্তবায়ন হচ্ছে তা চলমান থাকলে অচিরেই এ দেশ আরও দ্রুত গতিতে উন্নয়নের দিকে ধাবিত হবে। সোনার দেশ গড়তে কিছু সোনার মানুষও দরকার। এ দেশে যেমন দুর্নীতিবাজ মানুষ আছে, তেমনই সোনার মানুষেরও অভাব নাই। সেইসব সোনার মানুষই দেশকে বিশ্বের বুকে একটি উন্নত ও মর্যাদাবান দেশের কাতারে নিয়ে যাবে।

মোঃ উসমান গনি
উপজেলা নির্বাহী অফিসার

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন