, ১ জানুয়ারি ২০২১; ৪:৩৪ অপরাহ্ণ


ফ্রান্স শাসিত আলজেরিয়ার এক অতিদরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহন করেন আলবেয়ার ক্যামু (Albert Camus)। নিরক্ষর ও আংশিক বধির মা এবং অন্যের জমিতে কামিনখাটা বাবার ছেলে তিনি। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে যখন বাবাকে হারান ক্যামু, তখন তিনি মায়ের কোলের শিশু।

একসময় অর্থাভাবে তার পড়াশোনা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়। এই অবস্থায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের লুই জার্মেইন নামের এক শিক্ষক নিজ দায়িত্বে পড়াশোনা করান ক্যামুকে। অবশ্য ক্যামুর অসাধারণ প্রতিভার দিকে তাকিয়েই ওই শিক্ষক তার পড়াশোনার দায়িত্ব নেন। সেদিন ওই শিক্ষক আন্তরিক না হলে বিশ্বসাহিত্যের অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায় হয়ত অলিখিত থেকে যেতো।

বিদ্যালয়ের পাঠ চুকিয়ে দর্শন শাস্ত্র পড়তে ক্যামু ভর্তি হন আলজেরিয়ার প্রধান বিশ্ববিদ্যালয় ইউনিভার্সিটি অব আলজিয়ার্সে। কিন্তু দারিদ্রতা আর ঘুচেনি, রয়ে গেল তার পরম বন্ধু হয়েই। খেলাধুলায় বেশ আগ্রহ ছিল ক্যামুর। তিনি খেলতেন আলজিয়ার্স ইউনিভারসিটির ফুটবল দলে।

সেখানে তাকে দারিদ্রতার সাথে দরকষাকষি করতে হতো। জুতা দ্রুত ক্ষয় হয়ে যাবার ভয়ে দলের গোলকিপার পজিশনেই খেলতেন তিনি। কারণ গোলকিপার পজিশনে খেললে জুতা দ্রুত ক্ষয় হয়না। আহা! এতটাই নিঃস্ব পরিবারের সন্তান ছিলেন যে মাঠে দৌড়ে জুতা ক্ষয় করার মত উচ্চাভিলাষ দেখাতেন না তিনি। জুতার তলা ক্ষয় করে বাসায় গেলে বকুনি খেতে হতো তাকে। কে দেবে তাকে আবার জুতা কিনে? অবশ্য এই গোলকিপার থাকাকালীন তার চিন্তার জানালাগুলো খুলে যেতে থাকে। তিনি দর্শক হিসেবে দর্শনের বিভিন্ন হিসেবনিকেশ করতে পারতেন।

তার মতে গোলবারের সামনে দাঁড়ানো থেকে তিনি শিখেছেন,

“আমি শিখেছি, বল কখনো সেখানে আসেনা, যেখানে তুমি তাকে আশা করো। এটি আমাকে অনেক সাহায্য করেছে; বিশেষত বড় শহরে, যেখানে মানুষ যা দাবি করে তা সে পায়না।”

পরবর্তীতে তিনি “দি আউটসাইডার” ও “দ্য রেবেল”এর মত কালজয়ী বই লিখেন। ৪৪ বছর বয়সে ১৯৫৭ সালে নোবেল জিতেন সাহিত্যে। হ্যাঁ জুতা ক্ষয় হয়ে যাবার ভয়ে গোলপোস্টে খেলা আর পুরো মাঠ দৌড়ে জুতা ক্ষয় করাকে বিলাসিতা ভাবা ছেলেটাই আলবেয়ার ক্যামু (Albert Camus)।

আলবেয়ার ক্যামু তার নোবেল পুরস্কারটি উৎসর্গ করেন সেই শিক্ষক লুই জার্মেইনকে যিনি কামুকে তার দুঃসময়ে পড়ানোর দায়িত্ব নিয়েছিলেন। সাহিত্যে নোবেল প্রাপ্তির পর কৃতজ্ঞতা ও সম্মান দেখিয়ে জার্মেইনকে চিঠি লিখেন ক্যামু-

“১৯ নভেম্বর, ১৯৫৭

প্রিয় জার্মেইন,

আমার বর্তমান মানসিক বিপর্যয়কে পাশ কাটিয়ে আপনার সঙ্গে কথা বলার জন্য খুব মুখিয়ে ছিলাম। সম্প্রতি আমি এক বিরল সম্মানে সম্মানিত হয়েছি, যা আমি কখনও চাইনি এমনকি ভাবতেও পারিনি।

এই সংবাদ পাওয়ার পর প্রথমেই মায়ের কথা মনে এসেছে আমার, তারপর মনে এসেছে আপনার কথা। আপনার আমার মতো দরিদ্র এক ছেলের প্রতি ভালোবাসার যে হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন আপনি; আপনাকে ছাড়া, আপনার শিক্ষা ব্যতিরেকে এই প্রাপ্তি অসম্ভব ছিল।

এমন সম্মান আমি কখনও পাইনি। আপনি আমার জন্য কি ছিলেন, আপনার চেষ্টা, আপনার কাজ আমাকে কোথায় নিয়ে গিয়েছে, ছোট্ট এক স্কুলপড়ূয়া ছেলের প্রতি আপনার মহৎ দৃষ্টি, যা তাকে এখনও বাঁচিয়ে রেখেছে, যে কিনা এতদিন পর্যন্ত আপনার কাছে কৃতজ্ঞ, এসব কথা বলার জন্য আসলেই একটা উপলক্ষ তৈরি করে দিল এই প্রাপ্তি। আমার সমস্ত হৃদয় দিয়ে আপনাকে আলিঙ্গন করতে চাই।

আলবেয়ার ক্যামু”

গোটা দুনিয়ায় এখন ক্যামুর অমর সৃষ্টি পাঠ করা হয়। শিক্ষকের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা এবং দারিদ্রের মধ্যে চুপসে না যাওয়ার যে শিক্ষা ক্যামুর জীবন থেকে নেওয়া যায় তাও অনকরণীয়।

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন