, ১ জানুয়ারি ২০২১; ১২:৫০ অপরাহ্ণ


২০১০ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর এলাহাবাদ হাইকোর্ট বাবরি মসজিদের ২.৭৭ বা ১.১২ হেক্টর ভূমি সমান তিন ভাগে ভাগ করার রায় দেয়, পরের বছরই এ রায়ে স্থগিতাদেশ দেয় ভারতের সুপ্রিম কোর্ট। বাবরি মসজিদ ছিল ভারতের উত্তরপ্রদেশের ফৈজাবাদ জেলার অযোধ্যা শহরের রামকোট হিলের উপর অবস্থিত একটি প্রাচীন মসজিদ। ১৯৯২ সালে একটি রাজনৈতিক সমাবেশের উদ্যোক্তারা, ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের আদেশ অনুযায়ী মসজিদ ক্ষতিগ্রস্ত হবে না এই প্রতিশ্রুতি দিয়ে মসজিদসংলগ্ন এলাকায় একটি রাজনৈতিক সমাবেশ শুরু করে, যা পরে একটি দাঙ্গার রূপ নেয় এবং মসজিদটি সম্পূর্ণরূপে ভূমিসাৎ করা হয়। ফলস্বরূপ ওই একই সালে ভারতের প্রধান শহরগুলোতে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সংঘটিত হয়, যা মুম্বাই ও দিল্লি শহরে দুই হাজার মানুষের প্রাণ কেড়ে নেয়।

বাবরি মসজিদ তৈরি হওয়ার পর প্রায় সাড়ে তিন শ’ বছর টানাপড়েন তেমন ছিল না। মুঘল আমল শেষে ভারতে ব্রিটিশ রাজ প্রতিষ্ঠা পেতেই আইনি লড়াই শুরু হয়।

২৭ বছর আগে ধ্বংস হয়েছিল অযোধ্যার বাবরি মসজিদ। তবে বাবরি মসজিদ নিয়ে বিতর্ক, গণ্ডগোল যা-ই বলা হোক না কেন সবই কিন্তু নব্বইয়ের দশকে শুরু হয়নি। বিবাদের সূত্রপাত আরো আগে। সিপাহি বিদ্রোহের চার বছর আগে বাবরি মসজিদ নিয়ে প্রথম বিবাদের কথা উল্লেখিত রয়েছে ইতিহাসের পাতায়। হিসাবমতো অযোধ্যা বিতর্ক ৫০০ বছরের পুরনো। বিতর্কিত ভূখণ্ডের দখল নিয়ে হিন্দু-মুসলিম সম্প্রদায়ের আইনি বিবাদ ১৩৪ বছর ধরে চলে।

১৫২৮ সালে অযোধ্যায় বাবরি মসজিদ নির্মাণ করেন মুঘল সম্রাট বাবরের সেনাপতি মির বাকি। তিনিই সম্রাট বাবরের নামে ‘বাবরি মসজিদ’-এর নামকরণ করেন। এর দুই বছর আগে ভারতে মুঘল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছেন জহিরুদ্দিন মুহাম্মদ বাবর।

১৮৮৫ সালে ভারতে ব্রিটিশ রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। ফৈজাবাদের জেলা আদালতের দ্বারস্থ হয়ে বাবরি মসজিদের বিতর্কিত কাঠামোর বাইরে সামিয়ানা তৈরি করে রামলালার মূর্তি স্থাপনের অবেদন জানান মহন্ত রঘুবীর দাস। আবেদন খারিজ করে দেয় ব্রিটিশ আদালত। ১৯৪৯ সালে বছর দেড়েক আগে ভারত স্বাধীন হয়। ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহ, শীতের রাত। বিতর্কিত কাঠামোর মূল গম্বুজের নিচে রামলালার মূর্তি স্থাপিত হলো। মন্দিরপন্থীরা দাবি করলেন, রামলালা প্রকট হয়েছেন।

১৯৫০ সালে গোপাল সিমলা এবং মহন্ত রঘুবীর দাস ফৈজাবাদ আদালতে আলাদা আলাদা মামলা করে বিতর্কিত স্থানে রামলালার পূজার অনুমতি চাইলেন। ১৮৫৩ সালে সিপাহি বিদ্রোহের চার বছর আগে প্রথম ধর্মীয় বিবাদের সূত্রপাত হয় এই মসজিদকে কেন্দ্র করে।
১৯৫৯ সালে বিতর্কিত জমির মালিকানা দাবি করে মামলা করে নির্মোহী আখড়া।

১৯৮১ সালে ভারতের উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী পদে তখন বিশ্বনাথ প্রতাপ সিংহ। বিতর্কিত জমির মালিকানা দাবি করে আদালতের দ্বারস্থ হয় উত্তরপ্রদেশ সেন্ট্রাল সুন্নি ওয়াক্ফ বোর্ড। ১৮৮৫ সালে বিতর্কিত স্থানে মন্দির নির্মাণের দাবি জানিয়ে ফৈজাবাদ জেলা আদালতে প্রথম মামলা দায়ের করেন মহন্ত রঘুবীর দাস।

১৯৪৯ সালে ভারতের স্বাধীনতার দুই বছর পর স্থাপত্যের ভেতরে রামের মূর্তি উদ্ধার হয়। মুসলিমরা অভিযোগ তোলে, স্থাপত্যের ভেতরে হিন্দুরা মূর্তি রেখে এসেছে। গোটা ঘটনায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত জওয়াহেরলাল নেহরু অত্যন্ত দুঃখ প্রকাশ করেন। গোটা বিষয় নিয়ে দুই সম্প্রদায়ই আইনি মামলার পথে যায়। স্থাপত্যটিকে বিতর্কিত তকমা দিয়ে চিরতরের জন্য বন্ধ করে দেয় কেন্দ্রীয় সরকার।

১৯৮৪ সালে বাবরির ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় সংযোজিত হয়। জাতীয় কংগ্রেসের পর এক নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থান হয়। নাম ভারতীয় জনতা পার্টি। তার সাথে গোটা দেশে মাথাচাড়া দেয় হিন্দুত্ববাদ। ভগবান রামের জন্মভূমিকে অশুভ শক্তি থেকে ‘মুক্ত’ করার ডাক দিয়ে হিন্দুত্ববাদী সংগঠন বিশ্ব হিন্দু পরিষদের নেতৃত্বে গঠিত হয় রাম মন্দির কমিটি। তার পুরোধা করা হয় বিজেপি নেতা লালকৃষ্ণ আদভানীকে।

১ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৬ সালে বিতর্কিত কাঠামোর দরজা হিন্দুদের উপাসনার জন্য খুলে দিতে বলে ফৈজাবাদের আদালত। ১৪ আগস্ট ১৯৮৯ সালে বিতর্কিত জমিতে স্থিতাবস্থা বহাল রাখার নির্দেশ দেয় ইলাহাবাদ হাইকোর্ট। ৬ ডিসেম্বর ১৯৯২ সালে উগ্র হিন্দুদের হামলায় ধূলিসাৎ হয়ে যায় বাবরি মসজিদ। দাঙ্গায় প্রায় দুই হাজার লোক নিহত ও প্রায় ৯ হাজার কোটি ভারতীয় রুপির (৩৬০ কোটি মার্কিন ডলার) সম্পদ বিনষ্ট হয়।

৩ এপ্রিল ১৯৯৩ সালে সংসদে আইন পাস করিয়ে বাবরি মসজিদের বিতর্কিত জমির দখল নেয় কেন্দ্রীয় সরকার। ২৪ অক্টোবর ১৯৯৪ সালে ঐতিহাসিক ইসমাইল ফারুকি মামলায় ভারতের সর্বোচ্চ আদালত জানায়, কোনো এক মসজিদকে ইসলামের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হিসেবে ধরা হবে না। ১৯৯৮ সালে কেন্দ্রে ক্ষমতায় আসে বিজেপির জোট সরকার। প্রধানমন্ত্রী হন অটল বিহারি বাজপেয়ী। চার বছর পর বাজপেয়ী নিজের অফিসে একটি অযোধ্যা সেল গঠন করেন।

২০০৩ সালের আগস্ট মাসে এএসআই রিপোর্টে জানায়, মসজিদের নিচে রামমন্দির থাকার অস্তিত্ব পাওয়া গিয়েছে। এই রিপোর্টকে চ্যালেঞ্জ করে মুসলিম ল বোর্ড। ৩০ সেপ্টেম্বর ২০১০ সালে বাবরি মসজিদ মামলার রায় দেয় এলাহাবাদ হাইকোর্ট। তিন বিচারকের বেঞ্চ সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামতের ভিত্তিতে জানায়, বিতর্কিত জমি তিন ভাগে ভাগ করে দেয়া হচ্ছে সুন্নি ওয়াক্ফ বোর্ড, নির্মোহী আখড়া এবং রামলালা বিরাজমানের মধ্যে।

৯ মে ২০১১ সালে এলাহাবাদ হাইকোর্টের রায়ে স্থগিতাদেশ দেয় সুপ্রিম কোর্ট। ২১ মার্চ ২০১৭ সালে ভারতের প্রধান বিচারপতি জে এস খেহর বলেন, আদালতের বাইরেই মীমাংসা করে নেয়া হোক বাবরি মসজিদ বিতর্কের। ৭ আগস্ট ২০১৭ সালে বাবরি মসজিদ মামলার শুনানির জন্য তিন বিচারপতির বেঞ্চ গঠন করে সুপ্রিম কোর্ট।

২০ নভেম্বর ২০১৭ সালে উত্তরপ্রদেশ শিয়া সেন্ট্রাল ওয়াক্ফ বোর্ড জানায়, সেখানে মন্দির বানালে আপত্তি নেই। পরিবর্তে লখনৌতে মসজিদ বানিয়ে দেয়া হোক। ৫ ডিসেম্বর ২০১৭ সালে প্রধান বিচারপতি দীপক মিশ্র, বিচারপতি অশোক ভূষণ এবং বিচারপতি এস আবদুল নাজিরের বেঞ্চে আবার নতুন করে শুরু হয় বাবরি মসজিদ মামলার শুনানি।

২৯ অক্টোবর ২০১৮তে নতুন প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈয়ের নেতৃত্বে আবার নতুন করে তিন বিচারপতির বেঞ্চ গঠন হয়। ৮ জানুয়ারি ২০১৯-এ প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈয়ের নেতৃত্বে এবার তৈরি হয় পাঁচ বিচারপতির বেঞ্চ। কারো সরে দাঁড়ানো, কারো অসুস্থতার কারণে সেই বেঞ্চে পরে কিছু পরিবর্তনও হয়।

৮ মার্চ ২০১৯ সালে বিচারপতি এফ এম কলিফুল্লা, আধ্যাত্মিক গুরু শ্রী শ্রী রবিশঙ্কর এবং আইনজীবী শ্রীরাম পঞ্চুকে নিয়ে মধ্যস্থতা প্যানেল তৈরি করে দেয় সুপ্রিম কোর্ট। ২ আগস্ট ২০১৯ সালে মধ্যস্থতার চেষ্টা ব্যর্থ। সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি জানান, ৬ আগস্ট থেকে শুনানি হবে অযোধ্যা মামলার। ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯-এ মধ্যস্থতা কমিটিকে আবার আলোচনা শুরু করতে বলে সুপ্রিম কোর্ট। এ মাসের মধ্যে আলোচনা শেষ করার সময় বেঁধে দেয়া হয়।

১৬ অক্টোবর ২০১৯ সালে প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈ বলেন, অনেক হয়েছে, শেষ করতে হবে অযোধ্যা মামলার শুনানি।

৯ নভেম্বর ২০১৯ : ভারতের অযোধ্যার বিতর্কিত জমিতে রামমন্দির হবে, বিকল্প জায়গায় নির্মিত হবে মসজিদ। এ জন্য সুন্নি ওয়াক্ফ বোর্ডকে অযোধ্যার মধ্যেই বিকল্প পাঁচ একর জমি দিতে হবে। অযোধ্যায় ২.৭৭ একর জমি রামলালার। সূত্র : বিবিসি।

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন