রবিবার, ১২ জুন ২০২১; ৫:২০ অপরাহ্ণ


প্রতি বছর রবিউল আউয়াল মাসে বিতর্কের জোরালো বাতাস বয়ে যায় আমাদের অফ ও অন মাধ্যমগুলোতে। একদল লোক সব ঈদের বড় ঈদ, ঈদে মীলাদুন্নবী উদযাপনের আহবান জানায়। মুসলিম সংস্কৃতিতে ঈদ একটি ধর্মীয় উৎসব। তাই ঈদে মীলাদুন্নবী পালনের আহবান ধর্মীয় দিকটি জোরালো হয়ে থাকে।

আর ঠিক এ কারণে একদল আলিম ঈদে মিলাদুন্নবী পালনকে বিদআত বলেন। কারণ ইবাদত পালনের কোন নতুন পথ-পদ্ধতি আবিষ্কার করা যাবে না। তেমনটি করা হলে সেটি বিদআত হবে। এটা তো সত্য, আজকাল যেভাবে ঘটা করে ঈদে মিলাদুন্নবী পালন করা হয় সেটির প্রচলন রাসূলুল্লাহ (সা), সাহাবায়ে কেরাম ও তাবি‘ঈগণের যুগে ছিল না। যারা নানা অনুষ্ঠান আয়োজনে মিলাদুন্নবী পালন করেন তারা এই প্রশ্নটির কোন যুৎসই জবাব দিতে পারেননি।

কিন্তু এই দুই পক্ষ এবং নিরপেক্ষ- কোন পক্ষই যে বিষয়টি বিবেচনায় নেননি, সেটি হল উৎসব পালনের স্থানিক রূপের তারতম্য। আমরা যদি ক্ষণিকের জন্য ইসলামপূর্ব সময়ের আরব ও পারস্য সংস্কৃতির কথা স্মরণ করি, তাহলে জানতে পারব, আরবদের তুলনায় পারসিকরা অনেক বেশি সভ্য ছিল এবং তারা বহুবিধ ধর্মীয় ও জাতীয় উৎসবাদি উদযপান করত। পারস্যবাসী মুসলমান হওয়ার পর ইসলামের দুই ধর্মীয় উৎসবের পাশাপাশি জাতীয় উৎসবগুলো পালন করতে থাকে। এখনো ইরানে মহাসমারোহে মাসব্যাপী নওরোয উদযাপিত হয়।

যে মহান ব্যক্তিবর্গ ভারতবর্ষে ইসলাম প্রচার করেছেন, তাঁদের অধিকাংশই পারস্যবাসী। ভারতের বেশিরভাগ মুসলমান স্থানীয়। ইতোপূর্বে তারা হিন্দু ছিল। হিন্দুধর্ম এতটা উৎসবপ্রধান যে, অন্যধর্মীরা উৎসববের মাধ্যমে হিন্দুদেরকে চিনতে পারে। বলা হয়, বারো মাসে তেরো পূঁজা। তো এত এত উৎসবের দেশে মাত্র দুটো ধর্মীয় উৎসব দিয়ে কীভাবে টিকবে মুসলমানরা। ফলে মুসলিম উৎসবে যোগ হয় নতুন উৎসব: ফাতেহা-ই-ইয়াদহম, ফাতেহা-ই-দোয়াজদহম ইত্যাদি। সাংস্কৃতিক প্রতিতুলনার প্রভাব উৎসবের পাশাপাশি সাহিত্যেও পড়েছে। হিন্দুদের রাম আছে, মহাবীর অর্জুন আছে। মুসলমানদের কে আছে? হ্যাঁ, মুসলমানদের আছে আরো বড় বীর, আমির হামজা। আরো বড় মহাকাব্যিক ঘটনা: কারবালার কাহিনী। রচিত হয়: আমীর হামযা, মকতল হোসেন, বিষাদ সিন্ধু। এক্ষেত্রে কেউ শিয়াপ্রভাব খুঁজে পেলে অন্যায় বলা যাবে না। বীরত্বের কাহিনী তো খালিদ বিন ওয়ালিদের জীবনে কম নেই। তাকে নিয়ে তো পুঁথি রচিত হয়নি। যা হোক, নানা ত্রুটি সত্ত্বেও পুথির কবিরা মুসলমান পাঠকদের সামনে বিকল্প কাহিনী, বিকল্প বীরত্ব ও ভিন্ন মহাঘটনা উপহার দিতে পেরেছিলেন।

পুথিকবিদের যেটুকু সংস্কৃতিজ্ঞান ছিল আজকালের বড় বড় শিক্ষিতের সেটুকু নেই। বাংলাদেশি মূলধারার সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ইসলামশূন্য। গল্প-নাটকে কোন ইসলামি অনুষঙ্গ দেখতে পাবেন না। অথচ কলকাতার সিরিয়ালগুলোতে সারা বছরই পূজা চলে। হিন্দি ও বাংলায় তারা অনবরত ধর্মকাহিনী নির্ভর সিরিয়াল বানায়। বাংলাদেশের মুসলমান দর্শকরা রাম, বারণ, লক্ষণ, অর্জুন, মনসা, বিষ্ণু, শিব- এদের সবাইকে চিনে। অথচ তারা খালিদ-হামযা-উমর-ফাতিহ – এঁদেরকে ওভাবে চেনে না, জানে না। ধর্মের জন্য যাদের দরদ আছে, এ বিষয়ে তাদের সিরিয়াসলি চিন্তা করা উচিত।

মিলাদুন্নবী কে যারা বিদআত বলতে চান, তাদের উচিত বিকল্প সংস্কৃতি নির্মাণ, যা অতি অবশ্যই ধর্মযুক্ত হবে, তবে পালনআবশ্যক ইবাদাতের ধারণা-বিযুক্ত হবে। বিকল্প সংস্কৃতি নির্মাণ ব্যতিরেকে ফাতওয়া দিয়ে মিলাদুন্নবী পালনের ধারা বন্ধ করতে পারবেন না। রবিউল আউয়াল মাসে, এমনকি সারা বছরব্যাপী বিভিন্ন কর্মসূচি নেয়া যেতে পারে। শিক্ষার্থীদের জন্য নবীজীবন সম্পর্কিত বিভিন্ন প্রতিযোগিতাসহ নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা যেতে পারে। মনোযোগ ও অর্থ বিনিয়োগের মাধ্যমে অনুষ্ঠানগুলোকে আকর্ষণীয় ও জনপ্রিয় করা সম্ভব। এভাবে বিকল্প সংস্কৃতি নির্মাণে মেধা ও অর্থ বিনিয়োগ ব্যতীত শুধু ফাতওয়া দিয়ে না পারবেন বিদআত দূর করতে, আর না পারবেন সাংস্কৃতিক আগ্রাসন রুখতে।

জুবায়ের এহসান হক
অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন