শনিবার, ১৮ জুন ২০২১; ৩:২৩ অপরাহ্ণ


ছবিঃ সংগৃহীত

বাংলা সাহিত্যের রূপদান ও অগ্রগতির ক্ষেত্রে সাময়িকপত্র ও সংবাদ পত্রের ভূমিকা অনস্বীকার্য। বাংলা ভাষায় মুদ্রিত প্রথম পুস্তকখানি ছিল একখানা ‘ব্যাকরণ ও অভিধান’। ১৭৪৩ খ্রীষ্টাব্দে এই গ্রন্থখানি মুদ্রিত হয়। তবে বাংলা ভাষার অক্ষর তখনও তৈরী হয় নি। পর্তুগীজ বণিকেরা বাংলাদেশে ব্যাবসা করার তাগিদে বাংলা শেখার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে। পর্তুগালের লিসবনে মুদ্রিত অভিধানটিতে বাংলা-পর্তুগীজ ও পর্তুগীজ-বাংলা দু’রকম শব্দ ভাণ্ডারই ছিল। পর্তুগীজরা এদেশের লোকের মুখে যে রকম ভাষা ও উচ্চারণ শুনতো, রোমান অক্ষরে সে রকমই ছাপা হয়েছিল বইটিতে। এর কিছু মনোগ্রাহী উদাহরণ দিযেছেন কেদারনাথ মজুমদার। যেমন, মুই যাইবাসছি (আমি যাইতেছি ) রোমান হরফে ছাপা হয়েছে ‘Moui Zeibasschee’ অথবা মুহর খোওয়া দওয়া (আমার খাওয়া দাওয়া ) রূপান্তরিত হয়ে হয়েছে ‘Mouhore khoah dohah’ ইত্যাদি। এদেশে তখনও বাংলা ছাপাখানা স্থাপিত হয় নি। এরপর মুদ্রিত হল হলহেড সাহেবের ব্যাকরণ। বইটির নাম A Grammar of the Bengali Language; ১৭৭৮ খ্রীষ্টাব্দে Sir Chirles Wilkins এটি প্রকাশ করেন। হুগলী থেকে বাংলা অক্ষরে প্রকাশিত হয়েছিল এটি। পঞ্চানন কর্মকার নামক এক ব্যক্তি সে সময়ে মুদ্রণ বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। উইলকিন্সের নির্দেশে তিনি কাঠের তৈরী বাংলা অক্ষর প্রস্তুত করেন। এ কাজে তিনি ছিলেন খুবই দক্ষ। প্রত্যেকটি অক্ষরের জন্য তিনি পাঁচসিকা করে নিতেন।

     ভারতবর্ষে প্রথম সংবাদপত্রটি প্রকাশিত হয়েছিল এই বাংলাদেশেই। হিকি (Hicky) ১৭৮০ খ্রীষ্টাব্দের ২৯শে জানুয়ারি এটি প্রকাশ করেন; সংবাদ পত্রটির নাম ছিল ‘বেঙ্গল গেজেট’, হিকির গেজেট নামেও এটি পরিচিত ছিল। কিন্তু প্রকাশের পরেই গভর্ণর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংস-এর পরিবার সম্বন্ধে আপত্তিকর সংবাদ পরিবেশন করায় দু’বছরের মধ্যেই পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে যায়।

     ১৮১৮ খ্রীষ্টাব্দের এপ্রিল মাসে ‘দিগ্দর্শন’ নামে বাংলা অক্ষরে মুদ্রিত বাংলা ভাষায় প্রথম মাসিক পত্রিকা শ্রীরামপুর ব্যাপ্টিস্ট মিশন থেকে জন ক্লার্ক মার্শম্যানের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়। এর ঠিক পরে ঐ বছরেই ২৩শে মে মার্শম্যানেরই সম্পাদনায় মিশন থেকে প্রকাশ লাভ করে বাংলা ভাষার প্রথম সংবাদপত্র ( সাপ্তাহিক ) ‘সমাচার দর্পণ’। ১৮১৮-এর জুন মাসেই বের হয় গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্যের প্রকাশনায় বাঙালী পরিচালিত প্রথম বাংলা সাপ্তাহিক সংবাদপত্র ‘বাঙ্গাল গেজেটি’। অতএব ১৮১৮ সালটি বাংলা মুদ্রণ ও সংবাদপত্রের ইতিহাসে একটি স্মরণযোগ্য বছর।
ইংরেজরা এদেশে শিক্ষা বিস্তারে মন দিয়েছিল যে সব কারণে তার মধ্যে একটি ছিল এদেশে মানুষের সঙ্গে মিশে তাদের অভাব অভিযোগ, সংস্কৃতি ও ধর্মবোধের সঙ্গে পরিচিত হওয়া; শাসন ব্যবস্থা সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য এটির প্রয়োজনীয়তা ছিল। অপর একটি কারণ ছিল নিজেদের ধর্মমতের উৎকর্ষ প্রতিষ্ঠিত করে ধর্মান্তরে উৎসাহ যোগানো। ইংরাজী ভাষা পড়তে এবং লিখতে পারে এরকম কিছু লোককে অফিসের কাজে নিযুক্ত করাও ছিল অন্যতম উদ্দেশ্য। কারণ যাই হোক, এদেশে শিক্ষা বিস্তারে এবং মানুষকে বিজ্ঞান-মনস্ক করে তুলতে ইংরেজদের ইতিবাচক ভূমিকা অনস্বীকার্য।

       ইংল্যাণ্ড থেকে আগত সিভিলিয়ানদের এদেশের ভাষা ও রীতিনীতি শেখার উদ্দেশ্যে ১৮০০ খ্রীষ্টাব্দেই ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ চালু হযেছিল। অন্য কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানও ধীরে ধীরে স্থাপিত হয়েছিল বিভিন্ন স্থানে। বাংলা সাহিত্য সে সময়ে মূলতঃ বাংলা সংবাদপত্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। ধর্ম বা সামাজিক কোন বিষয়ে একটি পত্রিকায় প্রকাশিত মতামত কোন প্রভাবশালী ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর কাছে গ্রহণযোগ্য না হলে তারা অন্য একটি পত্রিকা প্রকাশের মাধ্যমে নিজেদের বক্তব্য প্রতিষ্ঠিত করতে সচেষ্ট হত। এ ধরণের বিতর্ক ও বিবাদকে কেন্দ্র করে বহু পত্রিকা জন্মলাভ করেছে। কিন্তু প্রকৃত সাহিত্য চর্চা ও তার প্রসারের জন্য প্রয়োজনীয় লেখক বা পাঠক গোষ্ঠী কোনটাই তখন গড়ে ওঠে নি। ১৮৪০ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত যে সব পত্রিকা প্রকাশিত হয়েছিল এবং তখনও সচল ছিল সম্পাদকের নাম সহ তাদের কয়েকটি হল : সমাচার দর্পণ (১৮১৯), জে.সি.মার্শম্যান; সমাচার চন্দ্রিকা (১৮২২),ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়; জ্ঞানান্বেষণ (১৮৩১), রামচন্দ্র মিত্র; সংবাদ পূর্ণোচন্দ্রোদয় (১৮৩৫), উদয়চন্দ্র আঢ্য ; সংবাদ প্রভাকর (১৮৩৬), ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত; সম্বাদ সৌদামিনী (১৮৩৮), কালাচাঁদ দত্ত; সম্বাদ ভাস্কর (১৮৩৯), শ্রীনাথ রায়; সম্বাদ রসরাজ (১৮৩৯), কালীকান্ত গঙ্গোপাধ্যায় ইত্যাদি। এই সময়ের মধ্যেই অনেক সংবাদপত্র প্রকাশিত হয়েও বন্ধ হয়ে গিয়েছে। যেমন – রামমোহন রায়ের ‘সম্বাদ কৌমুদী’, কৃষ্ণমোহন দাসের ‘সম্বাদ তিমিরনাশক’, প্রেমচাঁদ রায়ের ‘সম্বাদ সুধাকর’, কালীশঙ্কর দত্তের ‘সম্বাদ সুধাসিন্ধু’, রামচন্দ্র ও কৃষ্ণধন মিত্রের ‘জ্ঞানোদয়’, রামচন্দ্র মিত্রের ‘পশ্বাবলী’ ইত্যাদি।

       সে সময়ে সাহিত্যপত্র হিসাবে আলাদা কোন পত্রিকা ছিল না। কিছু কিছু সাহিত্যাশ্রয়ী লেখা সংবাদপত্রতেও বেরোত এবং সেগুলিই সাহিত্যপত্রের কাজ করত। লেখকের সংখ্যাও ছিল কম; একই লেখককে বিভিন্ন বিষয়ে লিখতে হত। এ প্রসঙ্গে একটি পত্রিকার নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য; সেটি হল ‘সংবাদ প্রভাকর’। এটি প্রথমে প্রকাশিত হয়েছিল (২৮শে জানুয়ারি, ১৮৩১) সাপ্তাহিক হিসাবে এবং পরে বারত্রয়িক (সপ্তাহে তিন বার) থেকে দৈনিক পত্রিকায় রূপান্তরিত হয় (১৪ই জুন,১৮৩৯)। এটিই ছিল বাংলা ভাষায় প্রথম দৈনিক সংবাদপত্র। সংবাদপত্র নাম হলেও এটিকে অনেকে সাহিত্যপত্র হিসাবেই চিহ্ণিত করেছেন। ‘সংবাদ প্রভাকর’ সম্বন্ধে বঙ্কিমচন্দ্র লিখেছেন –“বাংলা সাহিত্য এই প্রভাকরের নিকট বিশেষ ঋণী। …. একদিন প্রভাকর বাঙ্গালা সাহিত্যের হর্তাকর্তা বিধাতা ছিল। প্রভাকর বাঙ্গালা রচনার রীতিও অনেক পরিবর্তন করিয়া যান ….।” লেখক তৈরীর ভূমিকাও পালন করেছে ‘সংবাদ প্রভাকর’।

        এরপর উল্লেখযোগ্য ‘তত্ত্ববোধিনী’ পত্রিকা এটি প্রকাশিত হয় ১৮৪৩ খ্রীষ্টাব্দের ১৬ই আগস্ট এবং প্রথম সম্পাদক ছিলেন অক্ষয়কুমার দত্ত। প্রগতিশীল মনোভাবাপন্ন এই পত্রিকাটি স্ত্রী-স্বাধীনতা, বিধবা বিবাহ, স্ত্রী-শিক্ষা ইত্যাদির পক্ষে এবং বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহ প্রভৃতি কু-প্রথার বিরুদ্ধে লেখনী চালনা করে জনমত গড়ে তুলতে প্রয়াসী হয়েছিল। আশি বছর ধরে পত্রিকাটি সমাজ সেবার কাজ চালিয়ে গিয়েছে। রাজেন্দ্রলাল মিত্র সম্পাদিত ‘বিবিধার্থ সংগ্রহ’ প্রকাশিত হয় ১৮৫১ সালের অক্টোবর মাসে – ‘বঙ্গদেশস্থ জনগণের জ্ঞানবৃদ্ধি হয় এমত ও আনন্দ-জনক প্রস্তাব সকল প্রচার করা’ ছিল পত্রিকাটির উদ্দেশ্য। রবীন্দ্রনাথের ‘জীবনস্মৃতি’তে এর উল্লেখ রয়েছে।
দ্বারকানাথ বিদ্যাভূষণের ‘সোমপ্রকাশ’ (১৮৫৮), যোগেন্দ্রনাথ ঘোষের ‘অবোধবন্ধু’ (১৮৬৩), উমেশচন্দ্র দত্তের ‘বামাবোধিনী পত্রিকা’ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। ‘বামাবোধিনী পত্রিকা’ প্রকাশিত হয়েছিল মেয়েদের কথা তুলে ধরতে এবং “বিশেষতঃ স্ত্রীলোকদের জন্য” ছাপা ‘মাসিক পত্রিকা’ (১৮৫৪) নামক পত্রিকাটি ছিল মেয়েদের জন্য প্রথম কাগজ।

         কিছু পত্রিকা অনেক বছর ধরে চলেছিল আবার কয়েকটি ছিল স্বল্পায়ু। উদয়চন্দ্র আঢ্যের ‘সংবাদ পূর্ণোচন্দ্রোদয়’,ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের ‘সংবাদ প্রভাকর’ ও ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘সমাচার চন্দ্রিকা’ ৭০ বছরেরও বেশী পরমায়ু পেয়েছিল। ব্যবসায়িক কারণে অনেক পত্রিকা প্রতিযোগিতায় টিকতে পারেনি। পাঠকেরা অনেক সময়েই পত্রিকা নিয়ে গ্রাহক মূল্য পরিশোধ করতেন না। এই একটি কারণেই পরবর্তী কালেও অনেক পত্রিকার বিলুপ্তি ঘটেছে। এই প্রসঙ্গে ১৮৭৩ সালে প্রকাশিত একটি পত্রিকায় একজন সম্পাদক লিখেছেন -“ধন্য আমাদের দেশ। ধন্য আমাদের ‘নেব দেব না প্রবৃত্তি’।” মন্তব্যটি বিশেষ করে প্রনিধানযোগ্য এই কারণে যে এথেকে বোঝা যায় মানুষের মূল প্রকৃতি ও মানসিকতা যুগের সঙ্গে অপরিবর্তিতই থেকেছে। অনেক সময়ে প্রকাশক ক্ষতি স্বীকার করেও পত্রিকা প্রকাশ অক্ষুণ্ণ রেখেছেন। আদর্শের প্রতি বিশ্বস্ততা ও সমাজকল্যাণের প্রেরণা তাদের উদ্বুদ্ধ করেছে পত্রিকা চালাতে। এ রকম একটি পত্রিকা হরিনাথ মজুমদারের ‘গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা’। এটি আত্মপ্রকাশ করেছিল এপ্রিল ১৮৬৩ খ্রীষ্টাব্দে। গ্রামের সাধারণ মানুষের দুঃখ দুর্দশা ও বঞ্চনার কথা তুলে ধরত পত্রিকাটি সুবিচার পাবার আশায়। ক্রমশঃ ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েন হরিনাথ এবং তাকে পত্রিকা চালাতে ৭০০ টাকা পর্যন্ত ঋণ করতে হয়েছিল। তখনকার দিনে এর মূল্য সহজেই অনুমেয়। তবু হরিনাথ লিখে গিয়েছেন সাধারণ মানুষের স্বার্থে। অর্থকষ্ট ছাড়াও বহু বাধা ও নিগ্রহ তাকে সহ্য করতে হয়েছে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে। মানুষ তার পাশে এসে দাঁড়ায় নি; সহানুভূতিও প্রকাশ করে নি। দুঃখ করে হরিনাথ লিখেছেন -“যাহাদের নিমিত্ত কাঁদিলাম, বিবাদ মাথায় বহন করিলাম,তাহাদের এই ব্যবহার।” সব প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে আপোষহীন সংগ্রাম করে ২২ বছর ধরে চালিয়েছেন হরিনাথ তার ‘গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা’।

          ১৮৭২ সালের ১২ই এপ্রিল প্রকাশিত হয় বঙ্কিমচন্দ্রের ‘বঙ্গদর্শন’। পত্রিকাটিকে অনেকে সর্বকালের শ্রেষ্ঠ পত্রিকা বলে মনে করেন। এই মূল্যায়ন সমর্থিত হয় রবীন্দ্রনাথের বিচারে – “বঙ্গদর্শনের পূর্ববর্তী ও তাহার পরবর্তী বঙ্গসাহিত্যের মধ্যে যে উচ্চনীচতা তাহা অপরিমিত। দার্জিলিঙ হইতে যাহারা কাঞ্চনজঙ্ঘার শিখরমালা দেখিয়াছেন তাঁহারা জানেন, সেই অভ্রভেদী শৈলসম্রাটের উদয়রবিরশ্মি-সমুজ্জ্বল তুষারকিরীট চতুর্দিকের নিস্তব্ধ গিরিপারিষদবর্গের কত উর্ধ্বে সমুত্থিত হইয়াছে। বঙ্কিমচন্দ্রের পরবর্তী বঙ্গসাহিত্য সেইরূপ আকস্মিক অত্যুন্নতি লাভ করিয়াছে; একবার সেইটি নিরীক্ষণ ও পরিমাণ করিয়া দেখিলেই বঙ্কিমের প্রতিভার প্রভুত বল সহজে অনুমান করা যাইবে”।
এই স্বল্প পরিসরের ভূমিকাতে প্রকাশনা সময়ের ক্রম বজায় রেখে বিশাল সংখ্যক সাময়িক পত্রিকার নামোল্লেখ করা উদ্দেশ্য নয়, সেটা সম্ভবও নয়। এ ধরণের গ্রন্থ আগেই প্রকাশিত হয়েছে। তবে কয়েকটি পত্রিকার বিশেষত্ব উল্লেখ করা যেতে পরে। যেমন –
• বাংলা ভাষায় ধর্ম বিষয়ক প্রথম পত্রিকাটি ছিল ১৮১৯ খ্রীষ্টাব্দে প্রকাশিত দ্বিভাষিক ‘গসপেল ম্যাগাজিন’।
• বিজ্ঞান বিষয়ক প্রথম সাময়িকপত্র ‘বিজ্ঞান সেবধি’ ১৮৩২ সালের এপ্রিল মাসে Society for Translating European Sciences কর্তৃক প্রকাশিত হয়।
• বাংলা ভাষায় প্রকাশিত প্রথম দৈনিক সংবাদপত্র ‘সংবাদ প্রভাকর’; প্রকাশনার তারিখ ছিল ১৮৩৯ সালের ১৪ই জুন।
• চিকিৎসা শাস্ত্র সম্বন্ধীয় প্রথম পত্রিকা ‘আয়ুর্ব্বেদ দর্পণ’ চাণক নিবাসী নারায়ণ রায় কর্তৃক প্রকাশিত হয় ১৮৪০-এর জুন মাসে।
• বাংলা ভাষায় প্রকাশিত প্রথম সচিত্র মাসিক পত্রিকা ‘বিবিধার্থ সংগ্রহ’; প্রকাশিত হয় ১৮৫১ খ্রীষ্টাব্দের অক্টোবর মাসে।
• প্রথম রঙ্গরসের পত্রিকা ‘বিদূষক’ প্রকাশিত হয় ১২৭৭ বঙ্গাব্দের অগ্রহায়ণ মাসে।
• মহিলা পরিচালিত প্রথম মাসিক পত্রিকা ‘অনাথিনী’-র প্রকাশ ১২৮২ বঙ্গাব্দের শ্রাবণ মাসে, সম্পাদিকা থাকমণি দেবী।
• মহিলাদের জন্য প্রচারিত প্রথম মাসিক পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন প্যারীচাঁদ মিত্র ও রাধানাথ শিকদার। প্রকাশিত হয় ১২৬১ বঙ্গাব্দের ১লা ভাদ্র,পত্রিকাটির নাম ছিল ‘মাসিক পত্রিকা’।
• প্রথম আঞ্চলিক সংবাদপত্র ‘মুর্শিদাবাদ সম্বাদপত্রী’। কাশিমবাজার রাজ কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের আনুকূল্যে ১৮৪০ খ্রীষ্টাব্দের ১০ই মে প্রকাশিত হয় পত্রিকাটি।
• প্রথম কবিতা বিষয়ক মাসিক পত্রিকা ‘কবিতাকুসুমাবলী’ ঢাকা থেকে প্রকাশিত হয় ১৮৬০ সালের মে মাসে; শুরুতে সম্পাদক ছিলেন কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদার।

       ব্রহ্মানন্দ কেশবচন্দ্র সেনের সম্পাদনায় ১৮৭৮ সালের এপ্রিল মাসে প্রকাশিত ‘বালকবন্ধু’ ছিল প্রথম শিশু-পত্রিকা। তবে পত্রিকাটির প্রকাশনা ছিল অনিয়মিত এবং এটি ছিল স্বল্পায়ু। এ কারণে ১৮৮৩ সালের ১লা জানুয়ারি প্রকাশিত ‘সখা’ই ছিল বালক-বালিকাদের প্রকৃত সখা। মাসিক পত্রিকাটির প্রথম সম্পাদক ছিলেন প্রমদাচরণ সেন। ১৮৬০ খ্রীষ্টাব্দে প্রকাশিত ‘সত্যপ্রদীপ’ পত্রিকাটিকে অনেকে বাংলা ভাষায় রচিত প্রথম শিশুপাঠ্য পত্রিকা বলে চিহ্ণিত করেছেন।

       বাংলা সাময়িকপত্র চর্চা ও গবেষণার ক্ষেত্রে প্রথমেই ঋণ স্বীকার করতে হয় কেদারনাথ মজুমদারের (১৮৭০-১৯২৬) কাছে। তার রচিত ‘বাঙ্গালা সাময়িক সাহিত্য’ গ্রন্থে ৪০টি সাময়িক পত্রের পরিচয় বাদ দিয়েও রয়েছে কয়েকটি মূল্যবান অধ্যায়। সেখানে তিনি যে সব বিষয় আলোচনা করেছেন তার মধ্যে রয়েছে – ‘মিশনারি যুগের বাঙ্গালা মুদ্রিত গ্রন্থ’, ‘কোম্পানির আমলে দেশীয় শিক্ষার অবস্থা ও ব্যবস্থা’,’বাঙ্গালা সাময়িক সাহিত্যের ক্রমবিকাশ ও বঙ্গসমাজ’ ইত্যাদি। তার পরিবেশিত তথ্য থেকে সে যুগের শিক্ষা, সংস্কৃতি, সমাজ ব্যবস্থা এবং সময়ের সঙ্গে তার পরিবর্তন, উন্নতি ও বিকাশ সম্বন্ধে, বিশেষতঃ পত্রপত্রিকা ও মুদ্রণ সংক্রান্ত বিষয়ে একটা সুস্পষ্ট ধারণা করা সম্ভব।
মহেন্দ্রনাথ বিদ্যানিধি (১২৬০-১৩১৯ বঙ্গাব্দ) সাময়িকপত্র গবেষণার ক্ষেত্রে যথেষ্ট নিষ্ঠার পরিচয় দিলেও তিনি কোন গ্রন্থের মাধ্যমে তার সমীক্ষার ফল লিপিবদ্ধ করে যান নি। স্বাভাবিক ভাবেই তিনি প্রচারের আলোতে আসেন নি। তবে বিভিন্ন পত্রিকায় মহেন্দ্রনাথের প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। কেদারনাথের আগেই তিনি সাময়িক পত্রের চর্চা শুরু করেছিলেন। এ বিষয়ে তিনি পথিকৃৎ বলা যেতে পারে।

         এর পরেই স্মরণীয় যে নামটি সেটি হল ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮৯১-১৮৫২)। সত্যানুসন্ধানী ও অসাধারণ অধ্যবসায়ী এই ইতিহাসবিদ পরম নিষ্ঠা ও শ্রদ্ধা সহকারে সাময়িক পত্রের যে পরিচয় গ্রন্থিত করে রেখে গিয়েছেন তা থেকেই আমরা উনবিংশ শতাব্দীর বেশ কিছু সংবাদপত্র ও সাময়িক পত্রিকার সঙ্গে পরিচিত হতে পারি। তার অনুশীলন ছাড়া এ ধরণের বহু প্রকাশনার তথ্য ইতিহাস থেকে সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে যেত। ‘বাংলা সাময়িক পত্র’ নামাঙ্কিত গ্রন্থের প্রথম খণ্ডে প্রায় ২৫০টি সংবাদ ও সাময়িকপত্রের বিশদ পরিচয় মেলে। ১৮১৮ থেকে ১৮৬৮ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত বহু প্রকাশনার পরিচয় এতে লিপিবদ্ধ রয়েছে। দ্বিতীয় খণ্ডে রয়েছে ৮৪২টি পত্রিকার নাম ও প্রকাশকাল, কিন্তু প্রথম খণ্ডের মত এতে পত্রিকার সম্বন্ধে অন্য কোন তথ্য বা আলোচনা পরিবেশিত হয় নি। এ কাজটি বা বিংশ শতাব্দীর প্রথম দু’তিন দশকে প্রকাশিত পত্র পত্রিকার তথ্য সহ পরিচয় তিনি কেন গ্রন্থিত করে গেলেন না সেটা ভেবে দুঃখ হয়। ব্রজেন্দ্রনাথের সত্যনিষ্ঠা কিন্তু জানাতে ভোলে নি যে তার প্রদত্ত তালিকার বাইরেও কিছু পত্রিকা থেকে যাওয়া অসম্ভব নয়। তিনি উল্লেখ করেছেন –”আমাদের বিবরণে অসম্পূর্ণতা থাকা মোটেই বিচিত্র নহে।”
যতীন্দ্রমোহন ভট্টাচার্য (১৯০৫-১৯৯০) তার পত্রিকা গবেষণার ফল ধরে রেখেছেন বিভিন্ন পত্রিকায় প্রবন্ধ প্রকাশের মাধ্যমে। এ ছাড়া রয়েছে একটি ৪২ পাতার ছোট বই ‘শ্রীহট্টবাসী সম্পাদিত এবং শ্রীহট্ট ও কাছাড় হইতে প্রকাশিত সংবাদপত্র’।

        সাময়িকপত্র চর্চার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম বিনয় ঘোষ। পাঁচ খণ্ডে রচিত তার ‘সাময়িপত্রে বাংলার সমাজচিত্র’ গ্রন্থে সে কালের সমাজ ও সংস্কৃতির সামগ্রিক চিত্রটি সুন্দরভাবে ধরা পড়েছে। বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় পরিবেশিত রচনা থেকেই আহরিত হয়েছে এই বিপুলাকার গ্রন্থের উপাদান।

         বর্তমানে অনেকেই পুরান সাময়িকপত্র সম্বন্ধে উৎসাহ দেখাচ্ছেন, বহু পরিশ্রম করে বিভিন্ন সূত্র থেকে তথ্য সংগ্রহে ব্রতী হয়েছেন। তাদের অধ্যবসায় ও গবেষণাকে সম্মান জনিয়েই বর্তমান ভূমিকাটি গীতা চট্টোপাধ্যায়ের নামোল্লেখ করেই শেষ করব। শ্রীমতী চট্টোপাধ্যায় অসাধারণ পরিশ্রম ও নিষ্ঠা সহকারে বাংলা সাময়িক পত্রিকাপঞ্জীর তিনটি খণ্ড প্রকাশ করেছেন। ব্রজেন্দ্রনাথ যেখানে ছেড়েছেন শ্রীমতী চট্টোপাধ্যায় সেখান থেকেই শুরু করে সুন্দর ভাবে কাজটি এগিয়ে নিয়ে গিয়েছেন। তার গ্রন্থে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হল কোন পত্রিকাটি কোন গ্রন্থাগারে বা ব্যক্তিগত সংগ্রহে লভ্য সেই তথ্য পরিবেশন। উৎসাহী ব্যক্তি অনায়াসেই পত্রিকাটির খোঁজ পেতে পারেন। এই তিনটি খণ্ডে মোট প্রায় ১৭৫০টি পত্রিকার হদিশ মেলে। অত্যন্ত দুঃখের কথা হল বহু পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত রচনার বিপুল সংখ্যক লেখক-লেখিকাদের পরিচয় অজ্ঞাতই রয়ে গিয়েছে। প্রকাশনার সঙ্গে সঙ্গে রচয়িতাদের পরিচিতি প্রকাশিত হলে আজ এভাবে তাদের হারিয়ে যেতে হত না। সৃষ্ট রচনা রয়েছে কিন্তু স্রষ্টা চিরকালের জন্য অজ্ঞাতই থেকে যাবেন। এখন তথ্য সংরক্ষণের জন্য অনায়াসেই আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্য নেওয়া যায়। কিন্তু সে যুগে হস্তাক্ষরে বা মুদ্রিত আকারে ধরে রাখা ছাড়া অন্য উপায় ছিল না। প্রতিলিপি তৈরী করার উপায় তখনও আবিষ্কৃত হয় নি। লেখকদের অনেকে হয় ত এক সময়ে বেশ কিছু লিখেছেন কিন্তু পরে আর লেখেন নি। আবার অনেকে একটি দু’টি লেখার পর লেখা ছেড়ে দিয়েছেন। এদের অনেকেরই খবর এখন আর কেউ রাখেন না। বিখ্যাত যারা হয়েছেন তারা রয়েছেন, অখ্যাতরা হারিয়ে গেছেন। সেকালে অবশ্য অনেকে লেখার সঙ্গে নিজেদের নাম প্রকাশ করতে কুণ্ঠা বোধ করতেন। বর্তমানে বেশ কিছু পত্রিকার প্রতিলিপি সরকারী গ্রন্থাগার ও অন্য সংস্থার চেষ্টায় ইন্টারনেটের মাধ্যমে জনসাধারণের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। এই উদ্যম অবশ্যই প্রশংসনীয়। সম্প্রতি জাতীয় গ্রন্থাগারে রক্ষিত কিছু পুরাণো সংবাদপত্র, পত্রিকা ও গ্রন্থের জন্যও একই রকম উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

         উনিশ শতকের প্রথম দিকে সাময়িক পত্র-পত্রিকার প্রচার সংখ্যা খুবই কম ছিল; এর একটি প্রধান কারণ, তখন বাংলা ভাষার পাঠকসংখ্যা ছিল নিতান্তই কম। শতাব্দীর শেষের দিকে এই সংখ্যা কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে; বিশেষ করে কয়েকটি পত্রিকার ক্ষেত্রে। স্বপন বসুর লেখা থেকে জানা যায় – ১২৭৯ বঙ্গাব্দে বঙ্কিমচন্দ্রের ‘বঙ্গদর্শন’ ছাপা হত ১৫০০ কপি; রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সম্পাদিত ‘ভারতী’ ৮৫০ কপি; ১৮৯৭ সালে দেবীপ্রসাদ রায়চৌধুরীর ‘নব্যভারত’ ছাপা হয়েছে ১৮০০ কপি; রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের ‘প্রদীপ’ ৩০০০ কপি। অক্ষয়চন্দ্র সরকারের ‘নবজীবন’-এর প্রচার সংখ্যা ৫০০০, ‘বঙ্গবাসী’র ১০০০০। তবে এগুলির জনপ্রিয়তা ছিল অনেক বেশি। সাধারণভাবে পত্রিকা ছাপা হত ৫০০ কপির কাছাকাছি। দ্বারকানাথের ‘অবলাবান্ধব’ পত্রিকার প্রচার সংখ্যা ছিল মাত্র ২৫০, যদিও এটি চলেছিল দীর্ঘকাল। সাময়িক পত্রিকার ক্ষেত্রে এখনও হয়ত এই ধারাই বজায় আছে। কয়েকটি পত্রিকার প্রচারসংখ্যা বেশি হলেও বহু পত্রিকার চাহিদা নিতান্তই কম।       এবার একটু চোখ ফেরান যাক বাংলা ভাষায় প্রকাশিত কয়েকটি সংবাদপত্রের দিকে। ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুতে প্রকাশিত কয়েকটি পত্রিকার উল্লেখ ত আগেই করা হয়েছে। ১৯০৪ সালের নভেম্বরে প্রকাশিত ব্রহ্মবান্ধব উপাধ্যায়ের ‘সন্ধ্যা’ ছিল একটি সান্ধ্য পত্রিকা। এক পয়সা দামের এই পত্রিকাটিতে যুব সমাজকে সরাসরি আহ্বান জানান হয়েছিল সশস্ত্র বিপ্লবে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য। ভারতবর্ষকে ব্রিটিশ শাসন মুক্ত করতে অসহযোগ যে একটা পথ সেটা সম্ভবতঃ ব্রহ্মবান্ধবই প্রথম তুলে ধরেন। ১৯০৬ সালের ২১ নভেম্বর ‘সন্ধ্যা’ পত্রিকায় তিনি লিখেছেন – “চৌকিদার এবং কনস্টেবল থেকে শুরু করে মুন্সেফ এবং ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট    সহ সর্ব্বস্তরের সরকারী কর্ম্মচারীগণ যদি সরকারি দায়িত্ব থেকে একযোগে পদত্যাগ করেন, তাহলে ফিরিঙ্গির শাসন একদিনে খতম হতে পারে। একটা গুলি ছোঁড়ারও দরকার হবে না ।”

     ১৯০৪ সালেই প্রকাশিত আর একটি পত্রিকা ছিল ‘হিতবাদী’; সম্পাদক ছিলেন কৃষ্ণকমল ভট্টাচার্য। ‘সন্ধ্যা’ এবং ‘হিতবাদী’ দুটি পত্রিকাই বঙ্গ-ভঙ্গ ব্যর্থ করে আন্দোলন সংগঠিত করতে এগিয়ে এসেছিল। ‘যুগান্তর’ ছিল ‘হিতবাদী’র মতই একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা। প্রকাশিত হয়েছিল ১৯০৩ সালে। অরবিন্দ ঘোষ ছিলেন এর চালক শক্তি। ১৯১০ সালে বৃটিশ সরকারের চালু করা প্রেস আইনের কঠোরতার জন্য পত্রিকাগুলি যথাযথ সংবাদ প্রকাশের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা ও সত্য উদ্ঘাটনে পদে পদে বাধা পেয়েছে। জালিয়ানওয়ালাবাগের মত নৃশংস হত্যাকান্ডও যথেষ্ট রেখে ঢেকে পরিবেশন করতে হয়েছে।

      ১৯১৪ সালের ৬ই আগস্ট ‘দৈনিক বসুমতি’র জন্ম। উদ্যোক্তা ছিলেন উপেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়। শিবরাম চক্রবর্তীও এক সময়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে এই কাগজ বিক্রি করেছেন। বসুমতী সাহিত্য মন্দির থেকে প্রকাশিত সেকালে অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়েছিল পত্রিকাটি। ১৮৯৬ সালে উপেন্দ্রনাথ ‘সাপ্তাহিক বসুমতী’ বের করেন। পরে তার পুত্র সতীশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের সম্পাদনায় দৈনিক সংস্করণটি প্রকাশিত হয়। পরবর্তী সম্পাদক হন হেমেন্দ্রপ্রসাদ ঘোষ। ১৯৪০ ও ৫০-এর দশকে উপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় এবং বিপ্লবী বারীন্দ্রকুমার ঘোষের সম্পাদনার পর আবার হেমেন্দ্রপ্রসাদ ঘোষ ফিরে আসেন। পরবর্তী কালে অর্থাভাবে ক্লিষ্ট হয়ে পড়লে সাংবাদিক বিবেকানন্দ মুখোপাধ্যায় সম্পাদনার দায়িত্ব গ্রহণ করে পত্রিকাটিকে সচল রাখার চেষ্টা করেন।ক্রমে অসাধারণ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে পত্রিকাটি, প্রচার সংখ্যা এক লক্ষ ছাড়িয়ে যায়। কিন্তু সত্তরের দশক থেকেই ‘দৈনিক বসুমতী’ ক্রমশঃ তার জৌলুষ হারাতে থাকে। পত্রিকার স্বত্বাধিকারী ছিলেন কংগ্রেস নেতা অশোক সেন, সেই সুবাদেই হয়ত ১৯৭৪ সালে রাজ্য সরকার পত্রিকাটি অধিগ্রহণ করে; কিন্তু এটিকে উজ্জীবিত করা যায় নি। ১৯৯২ সালের সপ্তমীর দিন থেকে পত্রিকাটি একেবারে বন্ধ হয়ে যায়। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সহায়তায় ২০১২ ফেব্রুয়ারি থেকে ‘বসুমতী’র মাসিক সংস্করণটি চালু হলেও দৈনিক পত্রিকা আর ফিরে আসে নি।

       ১৯২২ সালের ১৩ই মার্চ দোলের দিন ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’র জন্ম। প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন, সুরেশচন্দ্র মজুমদার,প্রফুল্ল কুমার সরকার,মৃণালকান্তি ঘোষ প্রমুখ ব্যক্তিরা। শুরুতে লাল কালিতে ছাপা চার পৃষ্ঠার কাগজটি সান্ধ্য দৈনিক হিসাবে প্রকাশিত হয়েছিল; ১৯২৩ থেকে প্রভাতী দৈনিকে পরিবর্তিত হয়। লাল কালিতে ছাপা হওয়ায় ‘ইংলিশম্যান’ পত্রিকা এটিকে বিপদ সঙ্কেত বলে গণ্য করে। জাতীয়তাবাদী আদর্শে উদ্বুদ্ধ পত্রিকাটি প্রথম থেকেই নির্ভীকভাবে সংবাদ প্রকাশের জন্য মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। পত্রিকার প্রথম সম্পাদক প্রফুল্লকুমার সরকার সম্পাদকীয়তে ঘোষণা করেন –“স্বরাজ আমাদের জন্মগত অধিকার, আর উহা আমাদের লাভ করিতেই হইবে।” ১৯২৩ সালে বিপ্লবী যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় ( বাঘা যতীন ) সম্বন্ধে প্রবন্ধ লিখে সম্পাদক প্রফুল্লকুমার ও মুদ্রক অধরচন্দ্র দাস একমাস করে কারাদন্ড ভোগ করেন। ১৯২৭ সালের ২৫শে জুলাই স্বাধীনতা আন্দোলন বিষয়ক প্রবন্ধ প্রকাশের জন্য তৎকালীন সম্পাদক সত্যেন্দ্রনাথ মজুমদার গ্রেপ্তার বরণ করেন; একই ধরণের অপরাধে ১৯৩০ সালে আবার ছ’মাসের কারাদন্ড। এভাবে ২৫ বছরের মধ্যে ১৯ বার শাস্তি নেমে আসে ‘আনন্দবাজারে’র উপর। পত্রিকাটি আদর্শে অবিচল থেকে কাজ চালিয়ে গেছে। মুদ্রণের মান উন্নত করার লক্ষে ১৯৩৫ সালে বাংলা কাগজে প্রথম লাইনো টাইপ চালু হয় এই পত্রিকায়। ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’র রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গী নির্দিষ্ট কিছু ছিল না; মুলতঃ কংগ্রেস ঘেঁষা হলেও প্রয়োজনে কংগ্রেসেরও সমালোচনা করেছে পত্রিকাটি।

       পত্রিকাটি এখন বাংলা ভাষায় সর্বাধিক প্রচারিত পত্রিকা বলে খ্যাত। শিবরাম চক্রবর্তীর লেখা থেকে জানা যায়, আনন্দবাজার পত্রিকা প্রেসের দেয়ালের গায়ে লাগিয়ে দেওয়া হত এবং লোকে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পড়ত। এক সময় শিবরাম চক্রবর্তী নিজেই পত্রিকাটি ফেরি করেছেন। পত্রিকাটি প্রথম বছর সান্ধ্য দৈনিক হিসাবে চ’লে ১৯২৩ -এর জুন থেকে প্রভাতী দৈনিকে রূপান্তরিত হয়। বর্তমানে এই পত্রিকাটিতে স্থানীয় সংবাদই বেশি পরিবেশিত হয়, আন্তর্জাতিক খবর প্রায় থাকে না বললেই চলে। এ ছাড়া রয়েছে আনন্দবাজারের নিজস্ব একটি বানান রীতি। ‘গান্ধী’কে লেখা হয় ‘গাঁধী’, ‘ডেঙ্গু’কে ‘ডেঙ্গি’, অলিম্পিকের সময় সব পত্রিকা যখন লিখছে ‘সিওল’ তখন আনন্দবাজার লিখেছে ‘সোল’ ইত্যাদি। ১৯২৬ সালে পূজার সময় প্রথম আনন্দবাজারের ‘শারদীয় সংখ্যা’ প্রকাশিত হয়। ১৯৪০-এ বেরোয় ছোটদের জন্য ‘আনন্দমেলা’। বিভিন্ন সময়ে সম্পাদনার কাজ করেছেন প্রফুল্ল কুমার সরকার, সত্যেন্দ্রনাথ মজুমদার, মাখনলাল সেন, বঙ্কিমচন্দ্র সেন, নলিনীকিশোর গুহ, চপলাকান্ত ভট্টাচার্য। চপলাকান্ত চলে যাবার পর ১৯৫৯ সালের ১লা ফেব্রুয়ারি থেকে ১৯৮৩-র ১৭ই ফেব্রুয়ারি আমৃত্যু সম্পাদক ছিলেন প্রতিষ্ঠাতা প্রফুল্লকুমার সরকারের পুত্র অশোককুমার সরকার। বর্তমান সম্পাদক অশোককুমারের পুত্র অভীক সরকার।
‘আনন্দবাজার’ সংস্থা থেকে প্রকাশিত ‘দেশ’ পত্রিকাটি প্রথম থেকেই উচ্চমানের সাহিত্য পত্রিকা হিসাবে সুধীজনের স্বীকৃতি লাভ করেছে। ১৯৩৩ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত এই সাপ্তাহিক পত্রিকাটির সম্পাদক ছিলেন সাগরময় ঘোষ। ম্যাগসেসে পুরস্কারপ্রাপ্ত অমিতাভ চৌধুরীও এক সময় পত্রিকাটি সম্পাদনা করেছেন। বহু বছর সাপ্তাহিক হিসাবে চলার পর ‘দেশ’ পাক্ষিকে রূপান্তরিত হয়। বহু প্রথিতযশা সাহিত্যিক ও ব্যক্তিত্বের রচনা এই পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। এখানে একটি বহু পুরানো ঘটনার উল্লেখ করা যেতে পারে। প্রবীন ব্যক্তিদের হয় ত মনে আছে, ১৮৬৮ সালে ‘দেশে’র শারদীয় সংখ্যায় সাহিত্যিক সমরেশ বসুর ‘প্রজাপতি’ নামক উপন্যাসটি অশ্লীলতার দায়ে অভিযুক্ত হয়। ব্যাঙ্কশাল কোর্টের বিচারক সমরেশ বসু ও প্রকাশক সীতাংশু দাশুগুপ্তকে ২০১ টাকা করে জরিমানা এবং অনাদায়ে দু’মাস কারাদন্ডের সঙ্গে বইটি বাজেয়াপ্ত করারও আদেশ দেন। আপীল করলে হাইকোর্টও একই আদেশ বহাল রাখে। সমরেশ বসু জরিমানা দিতে অস্বীকার করে কারাদন্ড বেছে নিলে এগিয়ে আসেন ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’র মালিক অশোককুমার সরকার। তিনি সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হ’লে দীর্ঘ সতের বছর পর লেখক ও প্রকাশক নির্দোষ বলে ঘোষিত হন এবং বইটির উপর থেকে নিষেধাজ্ঞাও প্রত্যাহৃত হয়। এখন ‘দেশে’ অবশ্য সাহিত্যধর্মী রচনার সঙ্গে রাজনীতি, বিজ্ঞান, শিল্প ইত্যাদি বহু বিষয় পত্রিকায় স্থান পায়। ২০০৫ সাল থেকে মূল পত্রিকার সঙ্গে একটি সহ-প্রকাশনা ‘বইয়ের দেশ’ও প্রকাশিত হচ্ছে। বই মেলার আগে ‘বই সংখ্যা’ দেশ পাঠককে কোন নির্দিষ্ট বই মূল্য ও প্রকাশকের নাম সহ খুঁজে পেতে সাহায্য করে। পত্রিকার বর্তমান সম্পাদক হর্ষ দত্ত। ‘দেশ’ যদিও সংবাদপত্র নয় তবু এখানে উল্লেখ করা হল সাহিত্যপত্র হিসাবে এটির জনপ্রিয়তা ও গুরুত্ব উপলব্ধি করে।

       ১৯০৬ সালে বিপ্লবীদের মুখপত্র ‘যুগান্তর’ বন্ধ হয়ে গেলে, ১৯২৩ সালে শিবরাম চক্রবর্তী নিজের সম্পাদনায় সেটিকে সাপ্তাহিক হিসাবে পুনঃপ্রকাশের ব্যবস্থা করেন। তুষারকান্তি ঘোষ এক হাজার টাকায় পত্রিকাটির স্বত্ব কিনে নেন এবং ১৯৩৭ সালের ৩রা সেপ্টেম্বর থেকে দৈনিক সংবাদপত্র হিসাবে এটি প্রকাশিত হতে থাকে। প্রথমে সম্পাদক ছিলেন যতীন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য ( তুষারকান্তি ঘোষ ?), পরে বিবেকানন্দ মুখোপাধ্যায় মাসিক দু’শ টাকা পারিশ্রমিকে প্রধান সম্পাদকের পদে নিযুক্ত হন এবং দীর্ঘদিন তিনি পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ‘যুগান্তর’ এক সময়ে যথেষ্ট জনপ্রিয় ছিল। ‘বুদ্ধিতে যার ব্যাখ্যা চলে না’,অমিতাভ চৌধুরীর ‘নিরপেক্ষর ডায়েরী’ প্রভৃতি ধারাবাহিক ‘ফিচার’ সে সময়ের লোক সম্ভবতঃ এখনও ভুলতে পারেন নি। অনেক ঘাত প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে এগিয়ে ১৯৯৬ সালে ‘যুগান্তর’-এর প্রকাশ বন্ধ হয়ে যায়। কিছুদিন আগে ‘আবার যুগান্তর’ নাম দিয়ে দৈনিক পত্রিকা বের হলেও বেশিদিন চলে নি।

       ১৯২০ সালের ১২ই জুলাই মুখ্যতঃ শ্রমিক-কৃষকদের জীবন ও সংবাদ নিয়ে প্রকাশিত হয় সান্ধ্য দৈনিক ‘নবযুগ’। সম্পাদক ছিলেন মুজঃফর আহমদ ও কাজী নজরুল ইসলাম। মালিক ছিলেন এ.কে. ফজলুল হক। সমাজতান্ত্রিক চেতনাকে উদ্বুদ্ধ করে স্পষ্ট বক্তব্য সমন্বিত প্রবন্ধ প্রকাশ করায় কাগজের জামানত বাজেয়াপ্ত হয় এবং পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে যায়। প্রায় কুড়ি বছর পরে পত্রিকাটি দ্বিতীয় পর্যায়ে প্রকাশিত হয়েছিল কাজী নজরুলের সম্পাদনায়। বাকশক্তি লুপ্ত না হওয়া পর্যন্ত (১৯৪২) সম্পাদনা করেছেন তিনি।

       ১৯৪৫ সালের ডিসেম্বরে আত্মপ্রকাশ করে ভারতের কম্যুনিস্ট পার্টির মুখপত্র ‘স্বাধীনতা’। চার পৃষ্ঠার এই প্রভাতী দৈনিক পত্রিকাটির সম্পাদক ছিলেন কম্যুনিস্ট নেতা সোমনাথ লাহিড়ী; প্রকাশিত হত ডেকার্স লেন থেকে। প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন মুজঃফর আহমদ। বার্তা সম্পাদক ছিলেন নৃপেন চক্রবর্তী। ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’র ভূতপুর্ব এই সাংবাদিক পরবর্তী কালে স্বাধীন ভারতে ত্রিপুরা রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন। বিভিন্না ক্ষেত্রে সংগ্রাম ও বিদ্রোহের সংবাদ প্রকাশিত হত ‘স্বাধীনতা’য়। এই পত্রিকাতেই সম্ভবতঃ প্রথম রিপর্টেজ (reportage) ধরণের সংবাদ পরিবেশন শুরু হয়। কোন একটি ঘটনা বা সংবাদ সাধারণ ও অল্পশিক্ষিত মানুষের কাছে বোধগম্য ও আকর্ষণীয় করে তোলার জন্য একটি বিশেষ রীতি বা ভঙ্গীতে পরিবেশন করাই রিপোর্টাজ। অনেক সময় গল্পের আকারেও সংবাদ প্রকাশিত হত। রিপোর্টাজ লিখতেন সুভাষ মুখোপাধ্যায়, ননী ভৌমিক, প্রভাত দাশগুপ্ত, গোলাম কুদ্দুস প্রভৃতি নেতৃবৃন্দ। পত্রিকার মুখ্য প্রতিবেদক ছিলেন প্রভাত দাশগুপ্ত। প্রবন্ধ লিখতেন হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, গোপাল হালদার, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, ভবানী সেন, নীরেন্দ্রনাথ রায়, ধীরেন্দ্রনাথ সেন প্রমুখ ব্যক্তিরা। এই পত্রিকায় ছোটদের জন্য নির্ধারিত ‘কিশোর সভা’ নামক বিভাগটির দায়িত্বে ছিলেন তরুণ কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য। অসাধারণ জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল ‘স্বাধীনতা’। ১৯৪৮ সালে কম্যুনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ ঘোষিত হলে ‘স্বাধীনতা’র প্রকাশ বন্ধ হয়ে যায়। ১৯৫১ সালে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহৃত হলে ‘স্বাধীনতা’ পুনঃপ্রকাশিত হয়। এ পর্যায়ে সম্পাদক ছিলেন জ্যোতি বসু ও ভুপেশ গুপ্ত। বার্তা সম্পাদক ছিলেন সুকুমার মিত্র ও সুধাংশু দাশগুপ্ত। লেখকদের মধ্যে ছিলেন সরোজ মুখোপাধ্যায়, সুশীতল রায়চৌধুরী, সোমনাথ লাহিড়ী, ভবানী সেন, সরোজ গুপ্ত প্রভৃতি নাম করা ব্যক্তিবর্গ।

       ‘সত্যযুগ’ প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৪৯ সালে সত্যেন্দ্রনাথ মজুমদারের সম্পাদনায়; প্রধান পরিচালক ছিলেন প্রতাপকুমার রায়। কিছুদিন বন্ধ ছিল পত্রিকা। পরে আবার প্রকাশিত হলেও নানা সমস্যায় জর্জরিত হয়ে ১৯৮৭ সালে ‘সত্যযুগ’ অস্তমিত হয়। কম্যুনিস্ট পার্টি দুভাগ হয়ে গেলে, ‘স্বাধীনতা’ ভেঙে জন্ম হয় ‘কালান্তর’ ও ‘গণশক্তি’ পত্রিকার। ১৯৬৬-র অক্টোবরে ‘কালান্তর’ সাপ্তাহিক হিসাবে প্রকাশ পেয়ে ১৯৬৭-র ৭ই অক্টোবর থেকে দৈনিকে রূপান্তরিত হয়। ভবানী সেন প্রধান সম্পাদক ছিলেন ঠিকই কিন্তু মূলতঃ দেখাশোনা করতেন জ্যোতি দাশগুপ্ত ও প্রভাত দাশগুপ্ত। দৈনিক ‘কালান্তর’ বন্ধ হয়ে গিয়ে ১৯৯৫ থেকে পুনঃপ্রকাশিত হয়েছে। সাপ্তাহিক হিসাবে ‘গণশক্তি’ শুরু হয়েছিল মুজঃফর আহমেদের উদ্যোগে ১৯৬৪ সালের মার্চ মাসে সরোজ মুখোপাধ্যায়ের সম্পাদনায়। ১৯৬৭ সালের ৩রা জানুয়ারি থেকে সান্ধ্য দৈনিক এবং ১৯৮৬ সালের ১লা মে থেকে প্রভাতী দৈনিক হিসাবে প্রকাশিত হচ্ছে পত্রিকাটি। সরোজ মুখোপাধ্যায়ের পরে আমৃত্যু সম্পাদনা করেছেন অনিল বিশ্বাস।পরবর্তী সম্পাদক নারায়ণ দত্ত। ১৯৪৮ সালে সুরেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় ও প্রফুল্লচন্দ্র ঘোষের উদ্যোগে প্রকাশিত ‘লোকসেবক’ এবং অতুল্য ঘোষের সম্পাদনায় প্রকাশিত পত্রিকা ‘জনসেবক’ ষাটের দশকেই বন্ধ হয়ে যায়।

       ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’ ছেড়ে এসে সাংবাদিক গৌরকিশোর ঘোষ ও বরুণ সেনগুপ্ত শুরু করেন যথাক্রমে ‘আজকাল’ (১৯৮১) ও ‘বর্তমান’ (ডিসেম্বর ১৯৮৪)। বরুণ সেনগুপ্তের সম্পাদনায় ‘বর্তমান’ পত্রিকা অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়েছিল। ২০০৮ সালের ১৯শে জুন তার মৃত্যুর পর বোন শুভা দত্ত ‘বর্তমান’ সম্পাদনা করছেন। ‘আজকাল’ পত্রিকা একটু বামঘেঁষা। এটিই একমাত্র বাংলা পত্রিকা যাতে জ্যোতিষ বিষয়ক কোন ফলাফল প্রকাশ করা হয় না। বর্তমান সম্পাদক অশোক দাশগুপ্ত।  

      ১৯৯২ সালের ৯ই আগস্ট প্রকাশিত হয় আর একটি পত্রিকা ‘সংবাদ প্রতিদিন’। শঙ্কর ঘোষ ও স্বপনসাধন বোসের পর বর্তমান সম্পাদক সৃঞ্জয় বোস। পত্রিকাটি এখনও সচল রয়েছে। বিখ্যাত ইংরেজি পত্রিকা ‘স্টেটসম্যান’ পত্রিকার প্রকাশনা সংস্থা থেকে বাংলা সংবাদপত্র ‘দৈনিক স্টেটসম্যান’ প্রকাশিত হচ্ছে ২০০৪ সালের ২৮শে জুন থেকে। মূলতঃ সরকার বিরোধী বক্তব্য প্রকাশিত হয় এই পত্রিকায়। বর্তমান সম্পাদক মানস ঘোষ। সম্প্রতি ‘একদিন’ নামে একটি পত্রিকা কিছুদিন বন্ধ থাকার পর ২০১৪-র জুলাই থেকে পুনরায় প্রকাশিত হচ্ছে। প্রখ্যাত সাংবাদিক সুমন চট্টোপাধ্যায়ের হাত ধরেই পত্রিকাটি অবতীর্ণ হয়েছিল। তিনি ‘এই সময়’ পত্রিকার সম্পাদনার কাজে যোগদানের পর ‘একদিনে’র বর্তমান সম্পাদক ঋতব্রত ভট্টাচার্য। প্রতি রবিবার পত্রিকাটিতে ‘নবপত্রিকা’ নামে যে অতিরিক্ত কয়েক পৃষ্ঠা সংযোজিত হত, বিষয়বৈচিত্র্যে তা ছিল অসাধারণ। এ প্রসঙ্গে গৌরকিশোর ঘোষের সম্পাদনায় প্রথম দিকের ‘আজকাল’ পত্রিকার কথা মনে পড়ে। পাঠকের সুস্থ রুচি গড়ে তুলতে সংবাদপত্রের যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে এটা মনে করেই এই বিষয়ের অবতারণা। ‘একদিনে’র প্রচার সংখ্যা খুব বেশি ছিলনা। কয়েক মাস বন্ধ থাকার পর সম্প্রতি পত্রিকাটি নতুন সাজে সজ্জিত হয়ে পুনঃপ্রকাশিত হচ্ছে। সংবাদের বিন্যাস ভালই তবে বিনোদন জগতের নায়ক নায়িকাদের রঙিন ছবি প্রচুর সংখ্যায় ছাপা হচ্ছে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য – ‘সেকেলে মার্কা’ ‘নব পত্রিকাটি’ প্রকাশিত হচ্ছে না। হয় ত আর হবে না। এবার হয়ত ‘একদিন’ পাঠকসমাজে আদৃত হবে। প্রতিযোগিতা ও ব্যবসায়িক প্রয়োজন কিভাবে সংস্কৃতির পরিবর্তন ঘটায় এটা তার একটা উদাহরণ। অতি সম্প্রতি ২০১২ সালের ১৫ই অক্টোবর থেকে ‘এই সময়’ নামে আর একটি সংবাদপত্র প্রকাশিত হচ্ছে। সাহু জৈন পরিবারের বেনেট কোলম্যান এন্ড কোম্পানি দ্বারা প্রকাশিত ও সাংবাদিক সুমন চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত এই পত্রিকার মূল প্রতিদ্বন্দী ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’। তবে ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’, ‘বর্তমান’ বা ‘সংবাদ প্রতিদিন’-এ কিছুটা থাবা বসালেও ‘এই সময়’ এখনও শহরের বাইরে প্রত্যন্ত স্থানে তেমনভাবে প্রবেশ করতে পারে নি। তবে প্রচুর সংখ্যায় বিজ্ঞাপন প্রকাশিত হচ্ছে পত্রিকাটিতে। এটির প্রচার সংখ্যা ক্রমশঃ বৃদ্ধি পাবে বলেই মনে হয়।

       সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবরের সত্যতা ও নির্ভরযোগ্যতা সম্বন্ধে আজ থেকে প্রায় ৬০ বছর আগে প্রকাশিত ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মন্তব্য প্রণিধানযোগ্য – “অনেকের ধারণা আছে যে, সংবাদপত্রের বিবরণমাত্রই অকাট্য সত্য। আবার অনেকে বর্তমান কালের সংবাদপত্রের অসত্য প্রচারের অদ্ভুত ক্ষমতা দেখিয়া একেবারে বিপরীত সীমায় পৌঁছিয়া সিদ্ধান্ত করিয়া বলেন যে, সংবাদপত্রের বিবরণ মোটেই বিশ্বাসযোগ্য নয়। এই দুই কোনটাই যে ঠিক নয়, তাহা বলাই বাহুল্য। ইতিহাসের অন্য উপাদানের মত সংবাদপত্রের মধ্যেও সত্য মিথ্যা দুই-ই আছে। দেশ কাল পাত্র বিবেচনা করিয়া সত্য মিথ্যা যাচাই করিয়া লইবার দায়িত্ব ইতিহাস লেখকের। …… তবে এদিক দিয়া অতীত ও বর্ত্তমান যুগের সংবাদপত্রের মধ্যে একটা গুরুতর প্রভেদ আছে। মোটামুটি বলা যাইতে পারে, এ-যুগের সংবাদপত্র বিগত শতাব্দীর সংবাদপত্র অপেক্ষা অনেক বেশী মিথ্যাচারী। ইহার কারণ – বর্ত্তমান যুগে গণতান্ত্রিক শাসনযন্ত্র। এ-যুগে জন-সমষ্টিকে কাছে টানিতে না পারিলে শাসন ক্ষমতা লাভ করা চলে না। সে জন্য সত্য হউক মিথা হউক, যা কিছু একটা স্তোকবাক্যে প্রবোধ দিয়া লোককে নিজের দলে টানা প্রত্যেক রাজনৈতিক দলেরই একটা জীবন-মরণের ব্যাপার হইয়া দাঁড়াইয়াছে; এই কাজের ভার পড়িয়াছে প্রত্যেক দলের সংবাদপত্রের উপর। এই কারণে বর্ত্তমান যুগের সংবাদপত্রের শুধু মতামতই নয়, সংবাদ-পর্য্যন্ত অনেক সময় অতিশয় বিকৃত ।”

 যতদিন যাচ্ছে টেলিভিশন চ্যানেলের মত সংবাদপত্রের সংখ্যাও ক্রমবর্ধমান। প্রতিযোগিতার দৌড়ে পাল্লা দিতে গিয়ে সংবাদ পরিবেশনে নতুনত্ব আনার চেষ্টা চলছে। অনেক সময় গল্পের আকারে সংবাদ পরিবেশিত হচ্ছে। শুষ্ক নিরপেক্ষ সংবাদ ছাপলে পাঠক সংখ্যা কমে যাবার সম্ভাবনা। পত্রিকার পরিচালক মন্ডলী নিশ্চয়ই সেটা চাইবেন না।
কযেকটি মাত্র পত্রিকার কথা এখানে উল্লেখিত হল। যুগের সঙ্গে সংবাদপত্রে প্রকাশিত রচনা ও সংবাদের ভাষা, বানান রীতি, মতামত প্রকাশের ধরণ ও প্রবণতার পরিবর্তন ঘটেছে।এটি একটি মূল্যবান গবেষণার বিষয়। বিশদ ভাবে সব খুটিনাটি লিপিবদ্ধ করতে হলে অনেক তথ্য সংগ্রহের প্রয়োজন। বহু সংবাদপত্র চিরদিনের জন্য লুপ্ত হয়েছে, তার কোনও কপিও সংরক্ষিত হয় নি। এগুলি সম্বন্ধে প্রত্যক্ষভাবে জানার কোন সুযোগ নেই। যে সমস্ত পত্রিকা বা সরকারি নথিতে এসব পত্রিকার উল্লেখ রয়েছে সেখান থেকে তথ্য সংগ্রহ করা ছাড়া অন্য উপায় নেই। সংগৃহীত

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন