মঙ্গলবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২১; ২:১০ পূর্বাহ্ণ


অর্থনীতি বিভাগের চেয়ারম্যানের রুমের সামনে ডক্টর ফরীদি

দীর্ঘ আইনী লড়াইয়ের পর মহামান্য হাইকোর্টের রায়ের পরও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ফিরিয়ে দেয়নি ডক্টর রুশাদ ফরিদির শিক্ষকতার অধিকার। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া টেক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি করেছেন। শিক্ষকতা করেছেন ভার্জিনিয়া টেক, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য খ্যাতনামা বিশ্ববিদ্যালয়ে।

ডক্টর রুশাদ ফরিদী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের একজন স্বনামধন্য শিক্ষক। কিন্তু তিনি অন্য সবার চেয়ে একটু আলাদা। আসলে আলাদা হওয়ার কথা ছিল না। তাঁর পথটাই হওয়া উচিত ছিল সবার পথ। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে ছাত্রছাত্রীদের খেদমত করা। নিজের যোগ্যতা দিয়ে জাতির সেরা সন্তানগুলোকে লালন করা।

একজন ক্যাডেট রুশাদ ফরিদী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন মূলত সে নিয়তেই। বিশ্ববিদ্যালয়কে কিছু দিবেন, ছাত্রছাত্রীদের যোগ্যতর করে তুলবেন, নিজের আলোর পুরোটা ছাত্রছাত্রীদের দিয়ে জ্ঞানের ফেরিওয়ালা হিসেবে পথ চলবেন। নিজে শুরু থেকেই এই পথে হেঁটেছেন এবং অন্যদেরও হাটতে উৎসাহিত করেছেন।

কিন্তু যখন নিজের বিভাগের অন্যায় অবিচার ও অনিয়ম নিয়ে তিনি কথা বলা শুরু করলেন। তাঁর সহকর্মীদের ব্যক্তিগত কাজে বিভাগকে ব্যাবহার ও অপেশাদার আচরণের প্রতিবাদ করলেন তখনোই তিনি শিকার হলেন তাঁদের আক্রোশের। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিভাগ হিসেবে আক্রোশের বহিঃপ্রকাশ হতে পারত গণতান্ত্রিক ও মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে শ্রদ্ধা দেখিয়ে কিন্তু এটি রূপ নিল কাঁদা ছুড়াছুঁড়িতে।

প্রথমত, তাঁর বিরুদ্ধে তার সহকর্মী অভিযোগ আনলেন সবচেয়ে সংবেদনশীল ও নেক্কারজনক একটি বিষয়ে, যৌনতা। আসলে যৌন হয়রানি কিংবা কেলেংকারি নয়, অভিযোগ আনা হয়েছে তিনি এক নারী শিক্ষার্থীর সাথে সম্পর্কে লিপ্ত আছেন। এই ভিত্তিহীন অভিযোগ হয়তো শুরুতেই উড়িয়ে দেওয়া যেতো কিন্তু এই শিক্ষকের কতিপয় নারী সহকর্মী বিষয়টিকে তার পরিবার পর্যন্ত নিয়ে গিয়ে তার জীবন দূর্বিষহ করে তোলেন। এবং এই অভিযোগের ভিত্তিতে তাকে বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানো হয়।

প্রথম দফার এই বাধ্যতামূলক ছুটি কাটিয়ে তিনি আবারো বিভাগে ফেরেন এবং ক্লাস নেওয়ার প্লান শুরু করেন। কিন্তু এর মধ্যে তিনি দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকায় একটি কলাম লিখেন উলটো পথে কি শুধুই বাস? এই লিখার মাধ্যমে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লাল বাস যেভাবে ঢাকার রাজপথে ট্র্যাফিক আইনের তোয়াক্কা না করে উলটো পথে চলাফেরা করে তার প্রতিবাদ করেন। তাছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য অনিয়মও চোখে আঙ্গুল দিয়ে ধরিয়ে দেন।

এবারও তার সহকর্মীরা তার বিরুদ্ধে তৎকালীন ভিসি’র কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করে। ভিসি একতরফাভাবে কোন শুনানি না করেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে মিথ্যা প্রচারণার দায়ে আরেকদফা বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠিয়ে দেয়।

ডক্টর রুশাদ ফরিদী এর বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিট করে এবং দীর্ঘ আইনী লড়াইয়ে জয়ী হন। হাইকোর্ট এই ছুটির আদেশকে অবৈধ ঘোষণা করে এবং ডক্টর ফরিদীকে ক্লাসে ফিরে যাওয়ার সুযোগ দিতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেয়। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় হাইকোর্টের অর্ডারের তোয়াক্কা না করে রুশাদ ফরিদীকে ক্লাস নেওয়া থেকে বিরত রাখে।

এর প্রেক্ষিতে রুশাদ ফরিদী গত দুইদিন ধরে বিভাগীয় চেয়ারম্যানের রুমের সামনে প্রতিবাদস্বরূপ দাঁড়িয়ে থাকার কর্মসূচী ঘোষণা করে।

ডক্টর ফরীদির মুখ থেকেই শোনা যাক বিস্তারিত-

“ছবির প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়িয়ে ছিলাম অর্থনীতি বিভাগের চেয়ারম্যান মহোদয়ের কক্ষের সামনে। এক ফাঁকে অন্যদিকে গিয়েছিলাম। তারপর এসে শুনলাম তিনি এসেছেন শুনে দেখা করতে গেলাম। জিজ্ঞেস করার প্রয়োজন ছিল যে তিনি আমার গতকালকের রেখে দেয়া চিঠি পেয়েছেন কিনা।

দরজা ফাঁক করে উঁকি দিলাম। উনি বললেন কি বিষয়? আমি একটু ভেতরে ঢুকতে আমার প্ল্যাকার্ডে উনার চোখ পড়ল। উনি আমাকে ডাকলেন ভেতরে আসতে। আসতেই বললেন তুমি কেন বারবার আমার কাছে আসছো? এই প্ল্যাকার্ড নিয়ে তুমি কেন ভিসির অফিসে যাচ্ছো না? আমি কি করতে পারি?

আমি বললাম স্যার আপনাদের অভিযোগের উপর ভিত্তি করেই তো উনারা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তাই আপনারাই পারেন এর সুষ্ঠ সমাধান করতে। তাছাড়া বিভাগীয় প্রধান হিসেবে এই বিষয়টি নিয়ে সুষ্ঠ সমাধানের চেষ্টা করাটা আপনার দায়িত্বের উপরেও পরে।

এই ধরনের কথোপকথনের এক পর্যায়ে উনি হঠাৎ প্রচন্ড ক্ষেপে গেলেন। লাফ দিয়ে উঠে যেয়ে বললে তুমি আমার সাথে আসো। আমি পেছনে পেছনে গেলাম। উনি বিভাগের দু’একজন কর্মচারীকে বললেন বাকী শিক্ষক যারা যারা আছেন সবাইকে খবর দিতে।

তো খবর পেয়ে একজন দুইজন করে আসলো। প্ল্যাকার্ড হাতে আমাকে চিড়িয়াখানা থাকা কারো দিকে তাকিয়ে থাকার মতন করে তাকিয়ে কেউ কেউ চলে গেলেন। তবে একজন শিক্ষক পুরোটা সময় থাকলেন। তিনি সেই ২০১১ সাল থেকে আমার বিরুদ্ধে বিভিন্ন সত্য মিথ্যার প্রলেপ মিশিয়ে বিভিন্ন ভাবে বিভিন্ন শিক্ষক শিক্ষিকাকে উত্তেজিত করেছেন। আমাকে দুই দুইবার বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানোর পেছনে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন।

আট নয় বছরেও দেখলাম এই বিষয়ে উনার উৎসাহের বিন্দুমাত্র কমতি নেই। আমি উনার এই বিষয়টিতে এই রকম অধ্যবসায় দেখে বিমোহিত হলাম। হয়তো তিনি এইবারেও সফল কাম হবেন।

যাই হোক, কিছুক্ষণ পরে একজন সহকারী প্রক্টর আসলেন। এর মধ্যে চেয়ারম্যান স্যার বিভাগের কর্মচারীদের সামনে আমাকে প্রচুর বকাঝকা করলেন। এরপর সহকারী প্রক্টর , চেয়ারম্যান স্যার আর ওই প্রচন্ড উৎসাহী শিক্ষক মিলে অনেকক্ষণ চেয়ারম্যানের কক্ষে আলাপ আলোচনা করলেন। তারপর উনারা বেড়িয়ে গেলেন। আমিও আরো কিছুক্ষণ প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়িয়ে থেকে ফিরে আসলাম।

তো এর মধ্যে কিছু কিছু ছাত্র ছাত্রী এসে আমার পাশে দাঁড়ালো। আমি খুবই অবাক হলাম। কারণ আমি আমার বাধ্যতামূলক ছুটির বেশীর ভাগ সময়েই দেখেছি ছাত্র ছাত্রীরা আমার সাথে কথা বলতে খুবই অস্বস্তি বোধ করে। খোঁজ নিয়ে জেনেছি বিভাগে ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে যে আমার সাথে সোশাল মিডিয়া বা অন্য কোন ভাবে যোগাযোগ থাকলে ইট হ্যাজ কনসিকোয়েন্স। কি ধরনের সেটা নিশ্চয়ই খোলাসা করে বলে দিতে হবে না।

তো ওরা এসে আমার সাথে কিছু কথা বললো। আমি বললাম, তোমাদের দেখি অনেক সাহস! কারো কারো চোখে মুখে বিষাদ বেদনার ছাপ খুবই স্পষ্ট। একজন বলল স্যার, আমরা তো প্রতিবাদ করা ভুলেই গেছি। তাই আপনাকে দেখে খুবই অবাক লাগে। আরেকজন তো আমার পাশে অনেকক্ষণ দাড়িয়ে থাকল। তার চোখ ছল ছল। বলল, ভাবছি আমি আপনার পাশেই থাকি সারাক্ষণ।

আমি বললাম, দেখো এই নিয়ে তোমরা ঝামেলায় পড় সেটা আমি কোনমতেই চাই না। এইটা আমার একান্তই ব্যক্তিগত যুদ্ধ। এটা আমি একাই লড়ে এসেছি। হাতে গোণা কয়েকজন ছাড়া কাউকেই পাশে পাই নাই। এটা একা লড়তে লড়তেই আমি অভস্ত্য। এর জন্য আমি আমার ছাত্র ছাত্রীদের বিপদে ফেলতে চাই না।

বিদেশের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াতাম। তারপর এসে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ছিলাম। সেখানে থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। কেন?

আমাকে এইরকম একটাই প্রশ্ন আজকে আমি যখন প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়িয়ে ছিলাম, একজন ছাত্রী প্রশ্ন করেছিল? স্যার আপনি কেন এইখানে আছেন? কেন আপনি এরকম ভাবে সাফার করছেন?

আমি উত্তর দিলাম, আমি এইখানে আছি, সাফার করছি, যুদ্ধ করছি, সংগ্রাম করছি, তোমাদের জন্যই। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেছি ছাত্র ছাত্রীদের পড়াতে। তাঁদের শেখাতে, তাঁদের জীবনে সামান্য কিছু হলেও জ্ঞান, দক্ষতা এনে দিতে যেটা তাঁদের পরবর্তী জীবনের সহায়তা করতে। আমার কারণে যদি একটিও ছাত্র বা ছাত্রীর জীবনে পজিটিভ কোন পরিবর্তন আসে, এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কি হতে পারে?

আমার কাছে মনে হয় বাংলাদেশে এইটাই আমার জন্য সবচেয়ে মহত্তম কাজ। এর চেয়ে বেশী সন্তুষ্টির কাজ আমার জন্য এই দেশে আর নেই। তাই আমি এখানে মাটি কামড়ে পড়ে আছি। থাকব।”

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন