শুক্রবার, ২ জানুয়ারি ২০২১; ১০:৫৩ অপরাহ্ণ


Photo: Youtube

আজ ২৬ এপ্রিল, ২০১৮। সারা বিশ্বের ন্যায় বাংলাদেশেও পালিত হচ্ছে ‘বিশ্ব মেধাসত্ত্ব দিবস’। এবারের প্রতিপাদ্য বিষয়-‘Powering Change: Women in Innovation and Creativity’ যার বাংলা করলে দাঁড়ায় এরূপ ‘পরিবর্তনের সূচনা: উদ্ভাবন এবং সৃজনশীলতায় নারী’)। মেধাসত্ত্বে সারাবিশ্বের নারীদের ভূমিকার স্বীকৃতি স্বরূপ ওয়ার্ল্ড ইন্টেলেকচুয়াল প্রোপার্টি অর্গানাইজেশন(WIPO)এবারের এই প্রতিপাদ্য দিয়েছে।

মূলত মানুষের মেধা থেকে উদ্ভূত বিষয়ের সত্ত্বই হল মেধাসত্ত্ব। একবিংশ শতাব্দীর প্রযুক্তি নির্ভর বর্তমান অর্থ-ব্যবস্থায় এর পরিধি ব্যাপক ও বিস্তৃতভাবে দেখা দিয়েছে। তাই মেধাসত্ত্ব রক্ষার গুরুত্বও প্রযুক্তিনির্ভর সমাজ ব্যবস্থায় অধিকতর গুরুত্ব পাচ্ছে।

সহজ কথায় মেধাসত্ত্ব হল মানুষ কর্তৃক উদ্ভাবিত কোন নব সৃষ্টি যার পরিধি শিল্প-সাহিত্য থেকে শুরু করে ঐতিহ্য-সংস্কৃতি হয়ে ব্যবসা পরিচালনাসহ আরও বহুবিদ দ্যোতনা দিয়ে আবদ্ধ। এজন্য মেধাসত্ত্বকে শরীরী ও অশরীরী (যা ছোঁয়া যায় না) দুভাবেই বিবেচনা করা যায়। সাধারণভাবে মেধাসত্ত্বকে ব্যাখ্যা করতে পারি কপিরাইট, পেটেন্ট, ট্রেড মার্ক, ভৌগলিক ইঙ্গিত (জিআই) প্রভৃতি বিভিন্ন আঙ্গিকে।

বিভিন্ন রকমের মেধাসত্ত্বের মধ্যে কপিরাইট কাজ করে শৈল্পিক বিষয় যেমন সাহিত্য, শিল্প, কলা প্রভৃতি নিয়ে এবং পেটেন্ট নির্ধারণ করে দেয় মালিকানা সত্ত্ব। ট্রেড মার্ক হল এমন এক নিদর্শন যা পণ্য বা সেবাকে অন্য পণ্য বা সেবা থেকে পৃথক করে। ভৌগলিক(জিআই) মেধাসত্ত্বের গুরুত্বপূর্ণ অনুসঙ্গে পরিণত হয়েছে ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি সুরক্ষার হাতিয়ার হিসেবে।

এবার আসা যাক উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ও মেধাসত্ত্ব সুরক্ষার বিষয়ে। বর্তমানে বাংলাদেশের উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা সমূহের  প্রধান উদ্দেশ্য হল তথ্যপ্রযুক্তি নির্ভর টেকসই উন্নয়ন যা জ্ঞানভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণে অগ্রণী ভূমিকা রেখে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়বে। তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে স্বল্প ব্যয় ও স্বল্প সময়ে সরকারের সেবাসমূহ জনগণের দোর-গোড়ায় পৌঁছে দিয়ে স্বচ্ছতা বিধানের মাধ্যমে দুর্নীতি ও অদক্ষতা কমিয়ে এনে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত দেশ গড়ার প্রত্যয় নিয়েই সরকারের রূপকল্প ও সপ্তম পঞ্চ বার্ষিকী পরিকল্পনা গৃহীত হয়েছে। এসব রুপকল্পের সাথে জাতিসংঘের সহস্রাব্দ লক্ষ্যমাত্রা সম্পন্ন করে যুক্ত হয়েছে ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা। এসব লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নে প্রয়োজন প্রযুক্তিনির্ভর প্রশাসনব্যবস্থা(ই-গভর্নেন্স), ব্যবসায়-বাণিজ্য(ই-কমার্স), শিক্ষাব্যবস্থা(ই-শিক্ষা), চিকিৎসা ব্যবস্থা(ই-চিকিৎসা), কৃষি ব্যবস্থাপনা(ই-কৃষি), পরিবেশ ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি।

যে কোন দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন নির্ভর করে তার জ্ঞানভিত্তিক সৃজনশীল উদ্ভাবনের উপর। মেধাস্বত্ব রক্ষা আইনের মাধ্যমে এসব উদ্ভাবনসমূহের সুরক্ষা সম্ভব হলে সৃজনশীল এসব কর্মকাণ্ড আরও অনুপ্রাণিত হবে বলে আশা করা যায়। আর এসব তথ্যপ্রযুক্তি ভিত্তিক সেবা প্রদানের জন্য প্রয়োজন ইন্টারনেট ব্যবহার উপযোগী ব্যাপক ভিত্তিক ডিভাইসের ব্যবহার (ইন্টারনেট অব থিংস-আইওটি)। যেমনঃ অ্যাপস তৈরি, ওয়েবসাইট উন্নয়ন, সফটওয়্যার উন্নয়ন প্রভৃতির জন্য দরকার ডোমেইন নাম, লোগো বা নব উদ্ভাবিত ব্যবসা মডেলের মেধাসত্ত্বের সুরক্ষা। এতে অসম-প্রতিযোগিতা ও অসৎ ব্যবসায়িক চর্চা রোধ করে সুষম প্রতিযোগিতার অবাধ ক্ষেত্র সৃষ্টির মাধ্যমে যেকোন প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক দক্ষতা বাড়বে যা অর্থনীতিকে টেকসই করতে সাহায্য করবে নিরন্তর।

মেধাসত্ত্ব সুরক্ষার সাথে বৈদেশিক বিনিয়োগের সম্পর্ক খুবই ইতিবাচক। মেধাস্বত্ব আইন প্রতিটি উদ্ভাবনকেই উদ্ভাবকের অমূল্য সম্পদ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এতে উদ্ভাবকের মালিকানা সত্ত্বের আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করা অনেকটাই সম্ভবপর হয়। তাই মেধাসত্ত্ব আইন দ্বারা সুরক্ষিত হলে দেশে বৈদেশিক বিনিয়োগ বাড়বে যা অর্থনৈতিক কর্মযজ্ঞকে দীর্ঘ মেয়াদে চালিয়ে নিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।     

বাংলাদেশে পাইরেটেড(নকল) পণ্য তৈরি ও বিক্রির প্রবণতা ব্যাপক। কপিরাইট, পেটেন্ট, ট্রেড মার্কসহ সব ক্ষেত্রেই হর-হামেশায় পাইরেসির ঘটনা ঘটছে। শৈল্পিক বিষয় যেমনঃ গান, সিনেমা ইত্যাদি ক্ষেত্রে পেটেন্ট রাইটস এর বালাই খুঁজে পাওয়াই মুশকিল। আর তথ্যপ্রযুক্তির এ যুগে মেধাসত্ত্বের সুরক্ষা আরও জটিল থেকে জটিলতর হচ্ছে।

স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের অভিপ্রায়ে বাংলাদেশ যেভাবে এগিয়ে চলছে তাতে ২০২৪ সালেই এদেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বের হয়ে আসবে। তখন বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের ‘সুবিধামূলক বাজার’ হারানোর পর সবচেয়ে বড় সমস্যায় পড়বে মেধাস্বত্বের অবাধ ব্যবহার নিয়ে।

এখনই সময় এসেছে এ বিষয়ে গুরুত্ব দেয়ার ও মেধাসত্ত্ব সুরক্ষার বিষয়টি এখন আরও বড় করে দেখার। অগ্রযাত্রার এ সময়ে অবৈধভাবে নকল পণ্য তৈরি ও বিক্রির ওপর চরম আঘাত হানার সময় এসেছে। পাইরেসি রাতারাতি দূর করা সম্ভব নয়, অব্যাহতভাবে এর বিরুদ্ধে আমাদের সবাইকে কাজ করে যেতে হবে। এজন্য মেধাস্বত্ব সংশ্লিষ্ট শিক্ষা জোরদার করতে হবে। জনগণের মাঝে সচেতনতা সৃষ্টির উদ্যোগ নিতে হবে। যেন জনগণ মূল্য দিয়ে নকল পণ্য নয় সঠিক পণ্যটিই গ্রহণ করে।

মেধাস্বত্ব বিষয় জনপ্রিয়করণের দিকে সরকারকে আরও সজাগ দৃষ্টি দিতে হবে। এ লক্ষে তৃণমূল হতে মেধাসত্ত্ব উদ্ভাবনী ক্ষেত্রগুলো চিহ্নিত করে ‘জাতীয় কাউন্সিল’ গঠনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবী। যা সংশ্লিষ্ট উদ্ভাবককে প্রয়োজনীয় সকল সহযোগিতা প্রদানের মাধ্যমে উদ্ভাবনগুলো যাচাই-বাছাই ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর নিবন্ধনযোগ্য উদ্ভাবনগুলো চিহ্নিত করে নিবন্ধনের ব্যবস্থা করবে এবং তা বাণিজ্যিকীকরণের ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।অধিকন্তু, মেধাসত্ত্ব শিক্ষার প্রসার ও এর ওপর সরকারী-বেসরকারি পর্যায়ে অধিকতর দক্ষতা বাড়ানোর জন্য ‘মেধাসত্ত্ব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান’ গড়ে তুলতে হবে। এই উদ্দেশ্যে জাতীয় বাজেটে পর্যাপ্ত বরাদ্ধের ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিও উঠছে সংশ্লিষ্ট মহল থেকে।

উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নে দেশের সব মানুষের মাঝে বিরাজমান সৃজনশীলতা কাজে লাগিয়ে মেধাসত্ত্বকে আইনি সুরক্ষার আওতায় এনে জ্ঞানভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণে এগিয়ে নিয়ে সমৃদ্ধ হবে বাংলাদেশ- এটাই প্রত্যাশা আজকের বিশ্ব মেধাসত্ত্ব দিবস থেকে।

 

 

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন