রবিবার, ১৯ জুন ২০২১; ৩:০৬ পূর্বাহ্ণ


রবিবার দুপুর ১২টা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের সিঁড়িতে জড়ো হয়েছেন অর্ধশতাধিক শিক্ষার্থী। তাদের কেউ অর্থনীতি বিভাগের, কেউবা অন্য কোনো বিভাগ থেকে আসা শিক্ষার্থী। অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক ড. রুশাদ ফরিদিকে ক্লাসে ফিরিয়ে নিতে এবং তার সমর্থনে সিঁড়িতে বসে এই ক্লাস করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। শ্রেণিকক্ষে দেড় ঘণ্টার ক্লাসের পর দুপুর দেড়টায় সিঁড়িতে ক্লাস শেষ হয়। দীর্ঘদিন ধরে ক্লাসে প্রবেশের সুযোগ না পাওয়ায় শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে প্রতিবাদস্বরূপ এই উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়।

২০১৭ সালে জুলাই মাসে অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক উপাচার্য থাকাকালীন সিন্ডিকেট সভায় রুশাদ ফরিদীকে বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল আসলে ‘প্রথম আলো’তে একটা লেখা লিখার দ্বায়ে।তিনি মনে করিয়ে দিতে চেয়েছিলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের আসল কাজ কী?

অতীতে এই বিশ্ববিদ্যালয় জাতিকে আন্দোলন-সংগ্রামে নেতৃত্বের জোগান দিয়েছে, রক্ত দিয়েছে, শহীদ দিয়েছে। কিন্তু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রাচ্যের এই অক্সফোর্ড যে বিশ্বের সেরা ৫০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকার মধ্যে থাকার যোগ্য হলো না, তার বিহিত কী? দুই বছর আগে ঢাবির ৯৬ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর পরপরই লিখেছিলেন,

‘পয়লা জুলাই হয়ে গেল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯৬তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। আর চার বছর পরেই সেঞ্চুরি হাঁকাবে আমাদের সবার প্রিয় এই বিশ্ববিদ্যালয়। এই দিনে প্রতিবছর বিশ্ববিদ্যালয়ে আলোকসজ্জা হয়, শোভাযাত্রা, বক্তৃতা, বিবৃতি ইত্যাদি চলে। আর প্রতিবছরই সেটি দেখে মনে হয়, এ সবই হচ্ছে মৃত্যুশয্যায় শায়িত একজন ব্যক্তির রোগযন্ত্রণা সব অগ্রাহ্য করে তাঁকে নিয়ে আনন্দ-উৎসবের এক প্রহসন। এগুলো বন্ধ করে বিশ্ববিদ্যালয়কে দ্রুত একাডেমিক শৃঙ্খলার মধ্যে ফিরিয়ে আনতে হবে। ডিন, উপাচার্য, সহ-উপাচার্য—এসব পদে নিয়োগ দিতে হবে সত্যিকারের মেধাবী ও যোগ্য অধ্যাপকদের। নয়তো আমাদের জাতীয় জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণার মানের এই তলানির দিকে যাত্রা দিনে দিনে আরও ত্বরান্বিত হবে।’ এর পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সহকর্মীদের সম্পর্কে ‘বাজে মন্তব্য’ করার অভিযোগে তাঁকে বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠায় বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেট বাধ্যতামূলক ছুটি মানে ওই সময়ে তিনি আংশিক বেতন পাবেন। এ জন্যই আগে বলা যে, উচিত কথার ভাত নেই। অধ্যাপক ফরিদী এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে রিট করেন। এ বছরের আগস্টে উচ্চ আদালত সিন্ডিকেটের সেই সিদ্ধান্তকে অবৈধ বলে রায় দেন। অন্যায় ব্যাপারটা এখানেই মিটে যাওয়া উচিত ছিল। কিন্তু এরপরও তাঁকে ক্লাসে ফিরতে দেওয়ার প্রশাসনিক ব্যবস্থা করা হয় না। তিনি হয়ে পড়েন অর্থনীতি বিভাগের বারান্দায় ঘোরাফেরা করতে পারেন কিন্তু ক্লাসে ঢুকতে পারেন না।

এ ঘটনার পর বিভাগের চেয়ারম্যানের কক্ষের বাইরে প্ল্যাকার্ড হাতে অবস্থান কর্মসূচি পালন করতে থাকেন। একে একে তাঁর পাশে দাঁড়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। সর্বশেষ বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার উদ্যোগে তাঁর উন্মুক্ত পাঠদানের ব্যবস্থা করা হয়। দৃশ্যটা অভিনব হলেও সুন্দর। সমাজ বিজ্ঞান অনুষদের চওড়া সিঁড়িতে একদল ছাত্রছাত্রী বসে আছে। তারা গভীর মনোযোগে একজন শিক্ষকের বক্তৃতা শুনছে, প্রশ্ন করছে। শিক্ষকের পাল্টা প্রশ্নে জমে উঠছে ক্লাস। অন্য বিভাগের শিক্ষার্থীরাও জ্ঞানের মজায় মেতে উঠছে। যাঁকে ঘিরে এসব তিনি সিঁড়ির তলার ধাপে, প্রায় রাস্তা ঘেঁষে বোর্ড টাঙিয়ে আনন্দে ক্লাস নিয়ে যাচ্ছেন।

কিন্তু এটাই কি হওয়ার কথা ছিল? বিশ্ববিদ্যালয়গুলো চোখের সামনে ধ্বংস হবে, সন্ত্রাসীদের বানানো খোঁয়াড় হবে, শিক্ষক রাজনীতি শিক্ষকতার দায়িত্বকে দলবাজি আর অর্থবাজির পদতলে সমর্পণ করবেন, কিন্তু কোনো প্রশ্ন তোলা যাবে না?

তাঁর প্রসঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বলছে, আদালতের রায়ের কপি পেলে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন আইনে বলা নেই, একজন শিক্ষককে ৯০ দিনের বেশি বাধ্যতামূলক ছুটিতে রাখা যায়।

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন