, ১ জানুয়ারি ২০২১; ৩:১৪ অপরাহ্ণ


আডলফ হিটলার

কমলেন্দু সূত্রধর

“দ্য ন্যাশনাল সোশালিস্ট জার্মান ওয়ার্কার্স পার্টি” বা এক কথায় নাৎসি বাহিনী এবং তাদের নেতা হিটলার সম্পর্কে আপনাকে প্রশ্ন করা হলে আপনি উত্তর দেবেন সচরাচর যেসব জিনিস প্রচার করা হয়ে থাকে সেগুলোই, তার বাইরে খুব বেশি কিছু নয়। ইন্টারনেট ঘাঁটলে হিটলারকে আপনার চোখে পড়বে সবচেয়ে খারাপ মানুষ হিসেবে, এমন মানুষ যার কোনো ভালো দিক নেই। সে স্বৈরাচারী, অ্যান্টি-সেমিটিক, হত্যাকারী আরও কত কি। অন্তত হলিউডের মুভিগুলোতে যুগ যুগ ধরে এভাবেই প্রচার করা হচ্ছে, মিডিয়ায় বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার খরচ করা হচ্ছে শুধু আপনাকে বোঝাতেই যে হিটলারের মধ্যে সামান্য ভাল দিকও নেই। তো এমন কিছু জিনিসই বলা যাক যেগুলো আপনাকে কখনোই বলা হবে না।

অর্থনৈতিক উন্নয়ন

হিটলার যখন ক্ষমতায় আসলেন, জার্মানির সাধারণ লোকজনের পকেটে টাকা নেই, পেটে খাবার নেই, আয় করার মতো কোনো কাজও নেই। বাজারে বস্তাভর্তি ১০০ বিলিয়ন মার্ক নোট নিয়ে গেলেও হয়ত কয়েক টুকরো পাউরুটি মিলতে পারে। ঋণগ্রস্থ জার্মানদের ক্ষেত-খামার, বাসা-বাড়ি ধীরে ধীরে চলে যাচ্ছিল রথসচাইল্ড-রকফেলারদের মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর পকেটে।

রাইখসব্যাংকের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডক্টর হোরাস গ্রিলি তার ১৯৬৭ সালে প্রকাশিত “দ্য ম্যাজিক অভ মানি” বইয়ে লিখেছিলেন, “মার্কের হঠাৎ করে দাম পড়ে যাওয়া জার্মান সরকারের দোষে হয়নি, বরং এরকম নাটকীয় মুদ্রাস্ফীতি শুরু হয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যক্তিগত মালিকানাধীন হয়ে পড়ার পর!”

হিটলার ক্ষমতায় আসার পর রথসচাইল্ডদের আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা স্রেফ ছুঁড়ে ফেলে দেন। জার্মানিতে প্রবর্তন করেন জার্মানদের নিজস্ব ব্যাংকিং ব্যবস্থা, চালু হয় নতুন মুদ্রা “রাইখসমার্ক”, সাথে সম্পূর্ণ ঋণমুক্ত এসব মুদ্রার টিকিও আন্তর্জাতিক ব্যাংকগুলো ছুঁতে না পারার ব্যবস্থা করে দেন। হিটলারের এই সিদ্ধান্তের ফসল হিসেবে ইহুদীরা জার্মান পণ্য বয়কট করা শুরু করে। দুই বছরের মাথায় আবারও স্থিতিশীল এবং সম্পূর্ণ ঋণমুক্ত অবস্থায় নতুনভাবে শুরু হয় জার্মান অর্থনীতি।

ব্যাংক জাতীয়করণ করার পর হিটলার বেকার সমস্যার দিকে নজর দেন। “প্রতিটি মার্ক প্রচলন হওয়ার বদলে তার সমপরিমাণ কাজ সম্পন্ন করা কিংবা পণ্য উৎপাদন”- নীতিতে বিশ্বাসী হিটলার জার্মানির ১ লক্ষ বেকার যুবককে জার্মানির যাতায়াত ব্যবস্থা এবং অবকাঠামো উন্নয়নে নিয়োগ করেন। আর ঘরে বসে থাকা নারীদেরকে ক্ষুদ্র কুটির শিল্পে আত্মনিয়োগ করার জন্য ব্যাপকভাবে উৎসাহিত করা হতে থাকে।

(ছবিঃ- সাধারন নাগরিকদের সঙ্গে হিটলার)

জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং জীবহত্যা নিষিদ্ধকরণ

নাৎসি পার্টি ক্ষমতায় আসার ঠিক পরেই পুরো জার্মানিজুড়ে গবেষণার জন্য জীবহত্যা নিষিদ্ধ করা হয়। নাৎসি পার্টির কর্ণধার অ্যাডলফ হিটলার সহ হারম্যান গোয়ারিং, হাইনরিখ হাইমলার প্রাণী সংরক্ষণ সম্পর্কে বেশ সচেতন ছিলেন। হিটলার স্বয়ং একটা জার্মান শেফার্ড পুষতেন যার নাম ছিল “ব্লন্ডি”।

(ছবিঃ- হিটলার ও তাঁর পোষ্য ব্লন্ডি)

বর্তমান বিশ্বের প্রাণী হত্যা এবং প্রাণী অধিকার সংরক্ষণ আইনের বেশিরভাগই এসেছে নাৎসি আমলের এই আইন থেকে। ১৯৩৪ সালে হিটলার “দ্য রাইখ হান্টিং ল” নামে এক আইন প্রণয়ন করেন যেখানে নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয় বছরে সর্বোচ্চ কয়টি প্রাণী হত্যা করা যেতে পারে, সাথে শিকার করার মৌসুমও নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়। বর্তমানে পশ্চিমা বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশেই এই আইন মেনে চলা হয়। ঐ একই আইনেই প্রাণী অধিকার সচেতনতা বৃদ্ধির জন্যেও শিক্ষাখাতে বিনিয়োগ করা হয় যেন প্রাথমিক স্তর থেকে কলেজ স্তরের শিক্ষার্থীরাও তা সম্পর্কে সচেতন হতে পারে। কিছুদিন পরে মাছ এবং জলজ প্রাণীকেও এ আইনের আওতায় নেওয়া হয়। বলা যায়, এই আইন না হলে জার্মানির বন-জঙ্গল থেকে অনেক প্রাণীই বিলুপ্ত হয়ে যেত।

হারম্যান গোয়ারিং প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর তার এক বক্তব্যে বলেছিলেন, “প্রাণী হত্যা নিষিদ্ধকরণ শুধুমাত্র প্রাণীদের রক্ষার জন্য নয়, বরং মানবিকতার জন্য। এ কারণে জার্মানিজুড়ে প্রাণীহত্যা নিষিদ্ধ করা হলো এবং এই আইনের বিরুদ্ধাচরণ করা হলে তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

(ছবিঃ- হারম্যান গোয়ারিং-এর “জীবহত্যা নিষিদ্ধকরণ” ঘোষণার পর চিত্রিত ক্যারিকেচার, ১৯৩৩)

তখনকার শাস্তিমূলক ব্যবস্থাটাই ছিল কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে পাঠিয়ে দেওয়া। অদ্ভুত বিষয় হলো, একদিকে নাৎসিরা জীবহত্যা নিয়ে বেশ চিন্তিত ছিলেন, অপরদিকে ঠিক তাদের হাতেই ইহুদী, বিকলাঙ্গরা নিগৃহীত, নিষ্পেষিত হত!

১৯৩৩ সালে বিশ্বে প্রথম প্রাণী সংরক্ষণ আইন পাস হওয়ার ঠিক ছয় বছর পরেই জার্মানিতেই প্রথম পরিবেশ সংরক্ষণ প্রণয়ন করা হয়েছিল। হিটলারের মতে, “পরিবেশ সম্পর্কে জানা উচিৎ, এতে আমরা পরিবেশের নিয়ম মেনে চলতে পারব। পরিবেশের বিরুদ্ধে যাওয়া মানে স্বর্গের বিরুদ্ধাচরণ করা।”

তামাকবিরোধী আন্দোলন

নাৎসি ডাক্তাররা প্রথম ফুসফুস ক্যান্সারের কারণ হিসেবে তামাককে দায়ী করার পর জার্মানিতে হাসপাতাল, রেস্টুরেন্ট এবং যানবাহনসহ খোলা জায়গায় ধূমপান করা নিষিদ্ধ করা হয়। ৩০ এবং ৪০ এর দশকে অন্যান্য দেশে যখন তামাকবিরোধী আন্দোলন ব্যর্থ হচ্ছিল, তখন জার্মানিতে বেশ জোরেসোরেই শুরু হয় এই আন্দোলন। স্বয়ং হিটলার ধূমপানকে টাকার অপচয় বলে মনে করতেন এবং নিজের সামনে অন্য কাউকে ধূমপান করতে বাধা দিতেন। এর পরিপ্রেক্ষিতেই তামাকের উপর অতিরিক্ত কর বসানো হয়, বাজারেও সিগারেটের পরিমাণ নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়। নাৎসি সৈন্যদের ধূমপান করতে অনুৎসাহিত করার জন্য বেশ কয়েকটি সচেতনতামূলক অভিযানও পরিচালনা করা হয়।

(ছবিঃ- নাৎসি জার্মানির ‘তামাক বিরোধী’ কর্মকান্ডের পোস্টার)

যেখানে বছরে আমেরিকানরা ৩ হাজারেরও বেশি সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়তেন, সেখানে জার্মানিতে এর পরিমাণ ছিল মাত্র ৭৪৯!

ত্রাণ ব্যবস্থাপনা ও জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম

নাৎসিরা জার্মানিতে প্রচুর পরিমাণে জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম চালাত এবং তারা মনে করত প্রত্যেক জার্মানই ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার অধিকার রাখে। সাধারণ জার্মানরা যেন না খেয়ে কিংবা শীতবস্ত্রের অভাবে মারা না যায় সে কারণে প্রায়ই বিভিন্ন সামাজিক কার্যক্রমের আয়োজন করা হত। এ ধরণের কার্যক্রমগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত ছিল “শীতবস্ত্র ত্রাণ কার্যক্রম”। উচ্চপদস্থ নাৎসি কর্মকর্তা থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষও এ কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করতেন।

সাধারণ জনগণকে রাস্তার মোড়ে মোড়ে দানে উৎসাহিত করার জন্য পোস্টার লাগিয়ে রাখা হত। ত্রাণ ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতা করার জন্য রেডিও, টেলিভিশন নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকা গোয়েবলসও গণমাধ্যম ব্যবহার করতেন। সরাসরি ভিক্ষুকদের কাছে সাহায্য না দিয়ে বরং কর্তৃপক্ষের কাছে দান করার জন্য নির্দেশ দেওয়া হত।

তবে এই বিশাল ত্রাণ ব্যবস্থাপনার টাকা আসত কিভাবে? নাৎসিদের বিরুদ্ধাচরণ করা সাধারণ লোকজন এবং কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে পাঠিয়ে দেওয়া বন্দীদের বাজেয়াপ্ত করা সম্পদ দিয়ে এ সকল কার্যক্রমের খরচ উঠানো হত! জনগণের উপর চাপানো অতিরিক্ত করের বোঝাও কিছুটা সাহায্য করেছিল ত্রাণ খরচ উঠাতে।

ফোক্সওয়াগেন এবং অটোবান

ফোক্সওয়াগেন এর সাধারণ অর্থ করলে এর মানে দাঁড়ায় “জনগণের গাড়ি”- এবং সত্যিও তাই, মাত্র ৯৯০ রাইখমার্ক দিয়ে ফোক্সওয়াগেনের মালিক হওয়া অসম্ভব কিছু ছিল না। কিছুদিনের মধ্যেই জার্মানির রাস্তা দখল করে নেয় গুবরেপোকার আদলে তৈরি ফোক্সওয়াগেন গাড়িগুলো। কিন্তু যুদ্ধের শেষ দিকে গাড়ির কাঁচামালের দাম অত্যধিক হারে বেড়ে যাওয়ায় এত সুলভ দাম রাখা আর সম্ভব হয়নি।

(ছবিঃ- ফোক্সওয়াগেন নির্মিত গাড়িতে হিটলার)

ফোক্সওয়াগেনের মতো হিটলারের আরেকটি সুদূরপ্রসারী চিন্তাভাবনার ফসল ছিল অটোবান। পরিকল্পনাটি ছিল পুরো জার্মানি জুড়ে ফ্রি-ওয়ে অর্থাৎ গতিসীমাবিহীন রাস্তা তৈরি করা। ১৯৩৩ সালে নাৎসিরা জার্মানির ক্ষমতা নেওয়ার পরেই এ পরিকল্পনার বাস্তবায়ন শুরু হয়। যুগান্তকারী ফ্রি-ওয়ে সিস্টেম যুক্তরাষ্ট্র কিংবা যুক্তরাজ্যের চেয়ে অনেক আগেই জার্মানিতে শুরু হয়।

দক্ষ ইঞ্জিনিয়ারদের সহযোগিতায় রাস্তা বানাতে নেমে পড়ে হাজার হাজার বেকার যুবক। একইসাথে বেকারদের কর্মসংস্থান এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন জার্মানির অর্থনীতিতে ব্যাপক প্রভাব ফেলে। নাৎসি বাহিনীর অন্যতম বড় পরিকল্পনা ছিল সমগ্র জার্মানিকে একত্রিত করা এবং অটোবান প্রজেক্টের সাহায্যে সেটা সফলও হয়েছিল। অসাধারণ ইঞ্জিনিয়ারিং এর সাহায্যে ম্যানহোলবিহীন মসৃণ রাস্তায় রেসিং গ্রুপগুলো তাদের গাড়ি নিয়ে অনুশীলন করত, এমনকি ছোট প্লেনও অনায়াসে ল্যান্ড করতে পারত।

মহাকাশবিজ্ঞানের অগ্রদূত

মহাকাশ বিদীর্ণ করা রকেটের আবিষ্কারক কে তা প্রায় সবাই জানে। সেই ওয়ের্নার ভন ব্রাউনই ছিলেন নাৎসি পার্টির একজন সদস্য, একইসাথে সুৎসটাফেই (Schutzstaffel– জার্মান প্যারামিলিটারি)- এর একজন বড় মাপের অফিসার। হিটলারের নাম দেওয়া “ভেনজেন্স ২” বা সংক্ষেপে “ভি-২” নামের প্রথম লং-রেঞ্জ ব্যালিস্টিক মিসাইল আবিষ্কার করার পর মিত্রশক্তির বিরুদ্ধে এই মিসাইল ব্যবহার শুরু হয়। লন্ডন, অ্যান্টওয়ার্প এবং লিগা শহরে ভি-২ মিসাইল নিক্ষেপ করার পর প্রায় ৯ হাজারেরও বেশি মানুষ মারা যায়! আর এটি বানাতে বাধ্য করার সময় কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে মারা যায় আরও ১২ হাজার লোক!

(ছবিঃ- ভি-২ রকেট)

বিশ্বযুদ্ধে জার্মানির পতনের পর মিত্রশক্তিদের মধ্যে কাড়াকাড়ি পড়ে যায় ভি-২-এর প্রযুক্তি নেওয়ার জন্য। আমেরিকানরা মাফ করে দেওয়ার শর্তে ব্রাউনসহ প্রায় ১০০ জন জার্মান ইঞ্জিনিয়ারকে আমেরিকায় ধরে নিয়ে যায়। তবে যুদ্ধে হারানো ভি-২ এর ডিজাইন খুঁজে পায় সোভিয়েত সৈন্যরা। ব্রাউন রকেটের আবিষ্কারক হওয়ার পরেও সবচেয়ে বিখ্যাত ছিলেন নাসায় তার অবদানের জন্য, তার “স্যাটার্ন ফাইভ” বুস্টার রকেটের প্রযুক্তিই মানুষকে চাঁদের মাটিতে পা রাখতে সাহায্য করে। ব্রাউন মহাকাশে বিচরণের দুয়ার খুলে দিয়েছিলেন, সাথে পৃথিবীর ইতিহাসের অন্যতম ধ্বংসাত্মক অস্ত্রও!

সামাজিক এবং পারিবারিক মূল্যবোধ বৃদ্ধি

নাৎসিদের একেবারে কিছু মৌলিক নীতিবিধানের মধ্যে পারিবারিক মূল্যবোধ বেশ গুরুত্বপূর্ণ অংশ জুড়ে রয়েছে। হিটলার ক্ষমতায় আসার আগে জার্মানির জন্মহার মৃত্যুহারের চেয়েও কমে গিয়েছিল। ১৯৩৩ সালে হিটলার নতুন এক আইনের প্রবর্তন করেন যেখানে সদ্য বিয়ে করা জার্মানরা সর্বনিম্ন এক হাজার মার্ক ঋণ নিতে পারবেন বাড়ি গড়ে তোলাসহ পরিবার শুরু করার জন্য, সাথে প্রতিটি শিশু জন্ম নেওয়ার পর ২৫০ মার্ক রেখেও দিতে পারবেন ভরণপোষণের জন্য।

হিটলারের এই আইন বর্তমানে সুইজারল্যান্ডেও চোখে পড়ে। হিটলারের নেতৃত্বে জার্মানির প্রতিটি ঘরেই পারিবারিক মূল্যবোধ আরও শক্তিশালী হতে শুরু করে। নাৎসিরা আর যা-ই করুক, মেয়েদের সম্মান দিতে কখনো কার্পণ্য করত না।

ফিল্ম এবং মিউজিক

নাৎসিদের প্রোপাগান্ডার অন্যতম বড় অস্ত্র ছিল সিনেমা। আদপে, হিটলারের একটা ভাষণই ছিল ম্যাগনেটিক টেপে রেকর্ড করা প্রথম জিনিস এবং গোয়েবলস আরও নতুন ও জটিল কিছু আবিষ্কার করার জন্য চাপ দিচ্ছিলেন। নাৎসি প্রোপাগান্ডা ছড়িয়ে দেওয়ার উদেশ্যে বানানো “Triumph of the Faith” এর সিকুয়েল “Triumph of the Will” সিনেমা জগতের একেবারে প্রথম সারির গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। সিনেমাটির পরিচালক লেনি রাইফেনস্টল সিনেমায় প্রথম ক্রেন এবং রেইল-ট্র্যাক ব্যবহার করেন, যেটি এখনো সিনেমার চলমান দৃশ্য মসৃণভাবে ফুটিয়ে তুলতে ব্যবহার হয়। নাৎসিদের এসব কৌশল ব্যবহার করে শেষ পর্যন্ত তৈরি হতে থাকে একের পর এক হলিউড ব্লকবাস্টার।

(ছবিঃ-‘Triumph of Will’ এর পোস্টার)
(ছবিঃ- ‘Triumph of Will’ এর পরিচালক লেনি রাইফেন্সটলের সঙ্গে হিটলার)

ফিল্মজগতের মতো গানের জগতেও নাৎসিদের হারিয়ে যেতে দেরি হয়নি। ক্ষমতায় আসার কিছুদিনের মধ্যেই তৈরি হয় Reichmusikkammer বা স্টেট মিউজিক ইনিস্টিউট, যা মূলত তৈরি হয়েছিল কিংবদন্তী সুরকার বিঠোফেন, মোৎজার্ট, ওয়াগনারদের সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ করার জন্য। এছাড়াও তরুণদের গায়ক হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করতেও উৎসাহিত করা হত।

চিকিৎসাবিজ্ঞান

চিকিৎসাবিজ্ঞানে নাৎসিদের সবচেয়ে বড় অবদান সম্ভবত হাইপোথার্মিয়ার প্রতিকার। তবে এজন্য যেসব পদ্ধতির শরণাপন্ন হতে হয়েছিল তা সত্যিই গা শিউরে ওঠার মতো। ডাসাউ কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে বন্দীদের বরফশীতল জলে ডুবিয়ে রাখা হত, তারপর তাদের শরীরের তাপমাত্রা, হৃৎপিণ্ডের গতি, পেশির প্রতিক্রিয়া পরীক্ষা করে দেখা হত। প্রথমদিকে স্বেচ্ছাসেবক সৈন্যদের উপর পরীক্ষা করা হলেও শারীরিক ক্ষতি হবার ভয়ে পরবর্তীতে বন্দীদের উপর পরীক্ষা চালানো শুরু হয়। নাৎসিদের আবিষ্কার করা হাইপোথার্মিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের সাথে সাথে স্বাভাবিক তাপমাত্রায় নিয়ে আসার প্রক্রিয়া বা র‍্যাপিড অ্যাক্টিভ রিওয়ার্মিং প্রক্রিয়াই এখনো পর্যন্ত হাইপোথার্মিয়ার সবচেয়ে কার্যকরী প্রতিষেধক।

(ছবিঃ- নাৎসি ডাক্তাররা কন্সেন্ট্রেশান ক্যাম্পের বন্দির উপর পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাচ্ছেন)

ছবির সূত্রঃ ইন্টারনেট

Disclaimer: লেখার দৃষ্টিভঙ্গি এবং যাবতীয় দায়ভার লেখকের নিজস্ব, বেঙ্গলভিউ স্বাধীন মতামত প্রকাশে বিশ্বাসী।

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন