, ১ আগস্ট ২০২১; ১১:৩১ অপরাহ্ণ


সানাউল হক সানি

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালিন পাকিস্তানী বাহিনীর ভীত কাঁপিয়ে দেয়া দু:সাহসিক, অভিনব, দেশপ্রেমে মাতোয়ারা একদল যুবকের পাগলাটে অভিযান। স্বাধীন বাংলাদেশের মানুষ হিসেবে গর্বে বুক ফুলে যাওয়ার মত ব্যাপার হলেও এমন সুইসাইডাল মিশন পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। নিশ্চিত মৃত্যুকে হাতের মুঠোয় নিয়ে কেবল বাংলাদেশ বাংলাদেশ নাম জপেই বাংলা মায়ের কয়েকজন নওজোয়ান বদলে দিয়েছিল স্বাধীনতাযুদ্ধের অনেক হিসেব, ভেঙে দিয়েছিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আস্থার মেরুদণ্ড।

ফ্রান্স, স্পেন, রোম, জেনেভা হয়ে ভারত! মাতৃভূমির ডাকে পালিয়ে এসেছেন পাকিস্তান নৌবাহিনীতে কর্মরত ৮ জন বাঙালি। নিশ্চিত মৃত্যু বা আজীবন জেলে পঁচে মরার ঝুকি নিয়েও তারা পালিয়ে এসেছিলেন কেবল দেশমাতৃকার টানে। পাকিস্তানি আর্মিতে এটাই বৃহৎ আকারের প্রথম বিদ্রোেহের ঘটনা। ফ্রান্সের উপকূলীয় শহর তুলনের ডকইয়ার্ডে পাকিস্তানি সাবমেরিন পিএনএস ম্যাংরোতে ৪৫ জন ক্রুর সঙ্গে প্রশিক্ষণে ছিলো ১৩ জন বাঙালি অফিসারও। সাবমেরিনার আবদুল ওয়াহেদ চৌধুরীর নেতৃত্ব নয়জন বাঙালি অফিসার নানা পদ্ধতি অবলম্বন করে পালিয়ে আসেন সাবমেরিন থেকে।
তবে ধরে পরে যান একজন। বাকিদের ধরিয়ে দিতে পুরস্কার ঘোষণা করে পাকিস্তান সরকার। বাকিরা ভিসাবিহীন পলাতক অবস্থায় প্রতিমুহুর্ত ধরা পরে যাওয়ার রিস্ক নিয়েই ফ্রান্স, স্পেন, রোম, জেনেভা হয়ে প্রবেশ করেন ভারতে। যোগাযোগ করেন মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে।

এরপর এই আটজনের নেতৃত্বেই গড়ে তোলা হয় ৪০০ জনের নৌ কমান্ডিং ফোর্সের। ১৯৭১ সালের ২৩ শে মে নদীয়া জেলার পলাশীর স্মৃতিসৌধের পাশে ভাগীরথী নদীর তীরে গোপন প্রশিক্ষণ ক্যাম্প খোলা হয়, যার সাংকেতিক নাম দেয়া হয় সি-টু-পি। নৌসেক্টর এর কোন সেক্টর কমান্ডার ছিলো না, তারা সরাসরি মুজিবনগর সরকারের অধীনে কাজ করতেন। দিনে ১৮ ঘণ্টা করে প্রায় ৩ মাস চলেছিল এই প্রশিক্ষণ। প্রশিক্ষণ শুরুর আগেই যোদ্ধাদের বলে দেয়া হয়েছিল যে এটি হতে যাচ্ছে আত্মঘাতী মিশন অর্থাৎ যে কোন মুহূর্তে প্রাণ দিতে হতে পারে। কমব্যাট(খালি হাতে যুদ্ধ) ইত্যাদি শিখতে হতো। আর জলযুদ্ধের প্রশিক্ষণের মধ্যে ছিল বিভিন্ন ধরনের সাঁতার যেমন—বুকে ৫-৬ কেজি ওজনের পাথর বেঁধে সাঁতার, চিৎ সাঁতার, কোনোমতে পানির ওপরে নাক ভাসিয়ে টানা দীর্ঘ সময় সাঁতার, পানিতে সাঁতরে ও ডুব সাঁতার দিয়ে লিমপেট মাইন ব্যবহার, স্রোতের প্রতিকূলে সাঁতার, জাহাজের কেবল ভাঙা ইত্যাদি কঠিন সব প্রশিক্ষণ দেওয়া হত তীব্র খরস্রোতা ভাগীরথী নদীতে। সকল যোদ্ধাকে একটানা ৪৮ ঘণ্টা পানিতে থাকার অভ্যাস করতে হত। এভাবে টানা প্রায় তিনমাসের প্রশিক্ষণের পর আগস্টের প্রথম সপ্তাহে এ প্রশিক্ষণ শেষ হয়।

অপারেশন জ্যাকপট কবে শুরু হবে তা এমনকি জেনারেল ওসমানীর কাছেও জানানো হয়নি। একই সঙ্গে একই সময়ে দুই সমুদ্র বন্দর ও দুই নদী বন্দরে আক্রমণ চালানোর জন্য চার সেক্টরের পরিকল্পনার সমন্বয় ঘটানো হয়। ১৪ই আগস্ট পাকিস্তান স্বাধীনতা দিবস পালন করবে তাই এই রকম একটা তারিখই আক্রমণের জন্য ধার্য করা হয়েছিল। দুটি বাংলা গানকে আক্রমণের নির্দেশ হিসেবে আকাশবাণীতে প্রচার করার কথা ছিল- প্রথম সংকেত ছিল “আমার পুতুল যাবে শ্বশুরবাড়ি” গানটি যার অর্থ ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে আক্রমণ করতে হবে বা আক্রমণের সময় কাছাকাছি। পঙ্কজ মল্লিকের গাওয়া “আমি তোমায় শুনিয়েছিলাম যত গান” গানটি ছিলো দ্বিতীয় সংকেত যার অর্থ আক্রমণের জন্য ঘাঁটি ত্যাগ কর। অর্থাৎ সুস্পষ্ট নির্দেশনা, আক্রমণ করতেই হবে। ১৩ ও ১৪ তারিখ গানদুটো বাজানো হয়। এই গান দুটিই যে সংকেত তাও শুধুমাত্র অপারেশনের কমান্ডাররাই জানতো।

চট্টগ্রাম বন্দরে অপারেশন পরিচালিত হয় ১৫ আগস্ট মধ্যরাতে । হরিনা ক্যাম্প থেকে আসা ৬০ জনের দলকে ২০ জন করে তিন ভাগে ভাগ করা হয়। ১ ও ২ নম্বর দল তাদের পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন পথ ধরে চট্টগ্রামের নির্দিষ্ট বেজ ক্যাম্পের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে এবং ১৪ আগস্ট তারা প্রথম গানের সংকেত পায়। এই সংকেত পাওয়ার পর তারা অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে কর্ণফুলী নদীর পূর্ব তীরে চরলক্ষ্যায় তাদের বেজ ক্যাম্পে পৌঁছায়। তৃতীয় দলটির তখনো কোন খবর পাওয়া যায়নি। ১৫ আগস্ট তারা ট্রানজিস্টরে চূড়ান্ত সংকেত পায় এবং অপারেশনের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করে। এ অপারেশনে ৩১ জন কমান্ডো অংশ নেয়। ১৬ আগস্ট প্রথম প্রহরে রাত ১টায় নৌ কমান্ডোরা অপারেশনের জন্য যাত্রা করে। রাত সোয়া ১টায় তারা পানিতে নেমে জাহাজের উদ্দেশ্যে সাঁতরানো শুরু করে এবং বেশ দ্রুত নিজ নিজ বাছাই করা টার্গেট জাহাজের গায়ে মাইন লাগিয়ে সাঁতার কেটে সরে পড়ে। রাত ১টা ৪০ মিনিটে প্রথম বিস্ফোরণ ঘটে। তারপর একে একে সব মাইন বিস্ফোরিত হয়। এ সফল অপারেশনে তিনটি বড় অস্ত্রবাহী জাহাজ ধ্বংস হয়।

২৭ জুলাই ৬০ জন নৌ কমান্ডো ও ২০০ জন বাংলাদেশি সিঅ্যান্ডসি বিশেষ কমান্ডো দল আমিনুর রহমান খসরুর নেতৃত্বে ভারতের কানিং মাতলার বন্দর থেকে মোংলা অপারেশনের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে। সুন্দর বনের গভীর জঙ্গল পাড়ি দিয়ে কমান্ডো দলটি ১৩ আগস্ট সন্ধ্যা ৬টায় মোংলা বন্দরে পৌঁছায়। ২৬০ জনের কমান্ডো দলটি মোংলা বন্দর ও ডাংমারি বিলের পেছনে পরিত্যক্ত জমিদার বাড়িতে অবস্থান নেয়। সেখান থেকে মোংলার দূরত্ব ডাংমারি বিলের মাঝ দিয়ে ৬ মাইল, নৌকায় পৌঁছাতে সময় লাগে ১ ঘণ্টা। ১৫ আগস্টে রেডিও মারফত অ্যাকশন গান বাজার পর তারা পরম করুণাময় আল্লাহর কাছে স্বাধীনতা যুদ্ধের শহীদদের ও যুদ্ধের সব অপারেশনের সাফল্যের জন্য বিশেষ দোয়া করেন।

ঠিক রাত ১২টায় কমান্ডোরা ১৫টি নৌকায় মোংলা বন্দরের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে। মোংলায় পৌঁছানোর শেষ সময় নির্ধারিত ছিল রাত ২টা। কিন্তু পথ পরিদর্শকের ভুল পরিচালনায় কমান্ডোরা নির্ধারিত সময়ের অনেক পরে মোংলা বন্দরে পৌঁছায়। ইতিমধ্যে অপারেশনের নকশা মাফিক বাংলাদেশের সব নদী ও সমুদ্র বন্দরে অপারেশন শেষ। এ অপারেশন শুধু জীবনের ঝুঁকিই ছিল না, বরং ১৬ আগস্টের ভোরের এই অপারেশন ছিল সরাসরি একটি সুইসাইড অ্যাকশান। সব বাধাবিপত্তি অতিক্রম করে ভোর সাড়ে চারটায় মোংলায় অপারেশন শুরু হয়। অপারেশন চলাকালে ২০০ জন সিঅ্যান্ডসি বিশেষ কমান্ডো দল, হেভি মেশিনগান, মেশিনগান, এনরগা সহকারে তিনজনের ছোট ছোট দল করে, ৬৬টি উপদলে বিভক্ত হয়ে নৌ কমান্ডোদের কভার দিতে মোংলা বাঁধের পেছনে অবস্থান নেন। অপারেশন চলাকালে সিঅ্যান্ডসি কমান্ডো দলের উপকমান্ডার রাজা ও খিজির জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নৌ কমান্ডোদের সহযোগিতায় মেশিনগান নিয়ে পশুর নদীর হাঁটু পানিতে নেমে আসেন। সময়ের অভাবে শুধু ২৪ জন নৌ কমান্ডো এই অভিযানে অংশ নেন। ৬টি উপদলে বিভক্ত হয়ে ২৪ জন নৌ কমান্ডো ৬টি বিদেশি জাহাজে মাইন লাগায়, ভোর সাড়ে ছয়টা থেকে নৌ কমান্ডোদের লাগানো মাইন বিকট শব্দে বিস্ফোরণ হতে শুরু করে। ৩০ মিনিটের মধ্যেই পাকিস্তান বিমানবাহিনীর চারটি বিমান মোংলা বন্দরের ওপরে ঘুরতে দেখা যায়। আক্রান্ত জাহাজগুলোর মধ্য একটি সোমালীয়, একটি মার্কিন ও দুটি চীনা, একটি জাপানি ও একটি পাকিস্তানি জাহাজ। এ অপারেশনে ছয়টি বিদেশি জাহাজই ধ্বংস হয় এবং ৩০ হাজার টন গোলা-বারুদ ও যুদ্ধের সরঞ্জাম পশুর নদীতে নিমজ্জিত হয়।

মোংলা অপারেশন কমান্ডার আমিনুর রহমান খসরুসহ আরও দুজন নৌ কমান্ডো এ অপারেশনে মোংলা বন্দরের অতিরিক্ত বাধা পার হয়ে অসীম সাহসিকতার সঙ্গে সোমালীয় ৭ হাজার টন অস্ত্রবাহী জাহাজ এস এস লাইটিংয়ে মাইন লাগিয়ে বিস্ফোরণ এবং এস এস লাইটিংকে ধ্বংস করেন। এই অপারেশনে দুজন মুক্তিযোদ্ধা নিখোঁজ হন, ধারণা করা হয় তারা স্রোতের টানে ভেসে গেছেন অথবা মারা গেছেন।
চাঁদপুর নদী বন্দর অপারেশনে ১৮ জন নৌ-কমান্ডো অংশ নেন। এ গ্রুপের ১৮ জনকে তিনজন করে মোট ৬টি ছোট দলে ভাগ করা হয়।এই অভিযানে মাইন বিস্ফোরণে ২টি স্টিমার, গমবাহী একটি জাহাজ সহ ছোট বড় আরও অনেকগুলো নৌযান ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়।
নারায়ণগঞ্জ নদী বন্দর অপারেশনে মোট ৪টি জাহাজ ও বেশ কয়েকটি নৌযান নৌ কমান্ডোরা ধ্বংস করেন। শহরের মাঝে এ অপারেশনে কমান্ডোরা বিশেষ সাহসিকতার পরিচয় দান করেন। এ অপারেশনে মোট ২০ জন কমান্ডো অংশ নেন।
আগস্ট-নভেম্বর মাসে নৌ কমান্ডোরা প্রায় ১২৬টি জাহাজ/কোস্টার/ফেরি নষ্ট বা ডুবিয়ে দিতে সক্ষম হন। জেটি ও বন্দর অকার্যকর করে দেওয়া হয় এবং চ্যানেলগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়। কোনো নিজস্ব সামরিক নৌযান না থাকা সত্ত্বেও নৌ কমান্ডোরা নৌ পথকে একরকম নিজেদের দখলেই রেখেছিল।

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন