বৃহস্পতিবার, ১৬ জুন ২০২১; ৪:৫৬ অপরাহ্ণ


ছবিঃ সংগৃহীত

ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ সোমবার লোকসভায় বিতর্কিত নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল পেশের সময় এর পক্ষে সাফাই গাওয়ার সময় একটি প্রধান দাবি হিসেবে বলেছেন যে ধর্মের ভিত্তিতে কংগ্রেস ভারতকে ভাগ করেছিল এবং এই দেশ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল অমুসলিমদের আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে। তার এই দাবি মিথ্যা।

নাগরিকত্ব সংশোধনী বিলে অবৈধ অভিবাসীদের বিষয়টি ভারত কিভাবে বিবেচনা করবে, সে বিষয়টি পরিষ্কার করার চেষ্টা করা হয়েছে। তবে এতে কার্যত পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও আফগানিস্তান থেকে নথিহীনভাবে প্রধান প্রধান অমুসলিম গ্রুপগুলোকে ভারতে প্রবেশ অনুমোদন করা হয়েছে।

যেভাবে খসড়াটি প্রণয়ন করা হয়েছে তাতে করে (উদাহরণ হিসেবে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতনের কথাও স্বীকার করা হয়নি) পরিষ্কার হয়ে গেছে যে মুসলিমদের বাদ দেয়ার জন্যই তা করা হয়েছে। এটি কেন বৈষম্যমূলক নয়, তার অনেক ব্যাখ্যা দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে বিজেপির পক্ষ থেকে।

তবে অমিত শাহ বিলটির পক্ষে প্রধান যে যুক্তিটি দিয়েছেন, তার বলেই এসব যুক্তি বাতাসে ভেসে যায়।

অমিত শাহ বলেছেন, কেন এই বিলের প্রয়োজন তা বলছি। এই বিলের প্রয়োজন কারণ কংগ্রেস ধর্মের ভিত্তিতে এই দেশ ভাগ করেছিল।… কে করেছিল? কংগ্রেস ধর্মের ভিত্তিতে দেশকে ভাগ করেছিল। কাজটি করেছিল কংগ্রেস।… এটিই ইতিহাস।

অমিত শাহ ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশদের ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি দেশ গঠনের ঘটনার উল্লেখ করেছেন। ওই সময় বিপুলসংখ্যক লোক নিহত ও অভিবাসন ঘটে।

দেশ ভাগের ওই স্মৃতি উস্কে দিয়ে অমিত শাহ দুটি দাবি করেছেন:

প্রথমত, কংগ্রেসই ধর্মের ভিত্তিতে ভারত ও পাকিস্তানকে ভাগ করার জন্য দায়ী এবং দ্বিতীয়ত, ভাগ হয়েছে স্বয়ংক্রিয়ভাবে, তথা মুসলিমদের জন্য পাকিস্তান এবং অন্য সব ধর্মের লোকজনের জন্য ভারত।

তার কোনো দাবিই সত্য নয়।

অমিত শাহের দ্বিজাতি তত্ত্ব

দ্বিজাতি তত্ত্বে বলা হয় যে হিন্দু ও মুসলিমেরা আলাদা ‘জাতি’। এ কারণে তাদের আলাদা দেশ প্রয়োজন। এই দাবি জোরালোভাবে উপস্থাপন করেছিল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর মুসলিম লিগ। এটিই শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশ ভারতবর্ষ বিভক্তির ভিত্তি হলেও কংগ্রেস কখনো এই তত্ত্ব গ্রহণ করেনি। বরং দলটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলগুলোকে আলাদা রাষ্ট্র হিসেবে গ্রহণ করে নিয়েছিল এই যুক্তিতে যে তারা যদি আলাদা হতে যায়, তবে হোক।

অর্থাৎ কংগ্রেস কখনোই হিন্দু ও মুসলিমদের জন্য আলাদা দেশের ধারণাকে সমর্থন করেনি।

এটা কেন গুরুত্বপূর্ণ? কারণ অমিত শাহ ভুল যুক্তি দিয়েছেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দাবি করছেন যে কংগ্রেস ধর্মের ভিত্তিতে ভারত ভাগ করলেও তারা পাকিস্তান থেকে পর্যাপ্তসংখ্যক অমুসলিমকে জায়গা দেয়নি।

বিলে কেন মুসলিমদের বাদ দেয়া হয়েছে এবং অন্য সম্প্রদায়ের সদস্যদের কেন অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, তার ব্যাখ্যা হিসেবে তিনি এ কথা বলেছেন। সমস্যা হলো এই যে এখানে ভারতকে অমুসলিমদের দেশ হিসেবে মনে করা হচ্ছে, ঠিক যেমন পাকিস্তানকে ধরে নেয়া হয়েছে ইসলামি দেশ।

অমিত শাহের হিন্দু পাকিস্তান

হিন্দু উগ্রপন্থীরা চায় ভারত পরিণত হোক হিন্দু পাকিস্তানে। কিন্তু ১৯৪৭ সালে জন্ম হওয়া দেশটির বেলায় তা সত্য হতে পারে না। ভারতীয় সংবিধানে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে ভারত একটি সেক্যুলার দেশ। এই দেশ ধর্মের ভিত্তিতে কোনো বৈষম্য করে না, মুসলিমরা ভারতে না আসতে পারার কোনো যুক্তি নেই।

ধর্মের ভিত্তিতে কেন ভারতীয় নাগরিকত্ব নির্ধারিত হবে? অমুসলিমদের জন্য ধর্মের ভিত্তিতে ভারত প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ব্রিটিশ শাসিত দেশের ধারাবাহিকতায় ভারত আত্মপ্রকাশ করেছে এবং এই দেশ এখনো বিশ্বের সবচেয়ে বেশি মুসলিমদের বাসপূর্ণ দেশের একটি।

বিভক্তির সময় পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে পার্থক্য ছিল এই যে পাকিস্তান ছিল প্রকাশ্যেই ধর্মীয় দেশ, আর ভারত ছিল সেক্যুলার দেশ।

বিভক্তির সময়কার অন্যায় সংশোধনের ইচ্ছা থাকলে এর জন্য সবচেয়ে ভালো উপায় ছিল এই ব্যবস্থা করা যে, কেউ যদি ধর্মীয় রাষ্ট্রে না থাকতে চায়, সে যেন ভারতে আসতে পারে সে ব্যবস্থা করা, তার ধর্ম যাই হোক না কেন, এতে কোনো বাধা হবে না। ভারত যদি এই ব্যবস্থা করত, তবে পরিস্থিতি হতো ভিন্ন।

অমিত শাহ কেবল ইতিহাসের পুনঃলিখনই চাচ্ছেন না, সেইসাথে তিনি জিন্নাহর দ্বিজাতি তত্ত্ব পুরোপুরি গ্রহণ করেই তা করতে চাচ্ছেন। অথচ তিনি কাজটি করার সময় পুরো দায় চাপাচ্ছেন কংগ্রেসের ঘাড়ে।

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন