, ২০ জুন ২০২১; ৯:০৯ অপরাহ্ণ


আমার মনে হয় বাংগালীর পোষাক সচেতনতা ধ্বংস করার মূল হোতা জনাব শেখ সাদী মহোদয়! ঐ যে ছোটবেলায়, পাঠ্যবইতে একটা গল্প ছিল, পচা পোষাকের জন্য তাকে শুরুতে কম গুরুত্ব দেয়া হচ্ছিল। পরে উন্নত পোষাক পরার কারনে তাকে খুব খাতির করা হয়। এর ফলে তিনি তাকে সার্ভ করা সকল মুরগি মুসল্লম পকেটে পুরেন, গৃহকর্তাকে লজ্জা দেবার প্রয়াসে। পোষাকের কারনে উনি সম্মান পেলেন, তাই পোষাককেই খাওয়ালেন আর কি!

তো, বহুল পঠিত এই গল্পের মূল শিক্ষা হল,
মানুষকে পোষাকে নয়, তার যোগ্যতা দিয়ে বিচার করা ‘উচিত’।

আর আমরা এই ‘উচিত’ শব্দটাই ভালোবেসে ফেলি, এবং আজন্ম পোষাকের ‘কদর’ করার মানসিকতা হারিয়ে ফেলি। অথচ গল্পে দেখানোই হয়েছিল, আপনি যদি ‘মুরগি মুসল্লম’ খেতেই চান তবে আপনার পোষাক সুন্দর হওয়া বাঞ্ছনীয়!! জ্ঞান বিদ্যা বা কাব্যপ্রতিভার চাইতে ৯৯% মানুষ সবার আগে আপনার পোষাক বিবেচনা করবেই। এটা কোন ভাবেই বদলাতে পারবেন না। পোষাকের কদর না করলে আপনি পেশায় শত ভাগ সফল হবে না।

এই জন্য ইউনিফর্ম ব্যাপারটা এতো জরুরি। পুলিশ সৈনিক নার্স – ডিউটিতে সিচুয়েশন যাই হোক, ইউনিফর্ম সবাইকে মানতে হয়। হুজুর, পাদ্রি, ভিক্ষু, পুরুত – সবাইকে যার যার পোষাক ধারন করতে হয়। অভিনেতারা চরিত্র অনুযায়ী পোষাক ধারন করেন। একটা পারফেক্ট পোষাক, হাজার শব্দে নিজেকে ব্যখ্যা করার চাইতেও দামী।

চিকিৎসকদের পোষাক কি?!
এপ্রন? সেই সাথে –
মার্জিত রংগের শার্ট, রুচিশীল শাড়ি, কামিজ। টাই। বাহুল্য বিহীন গহনা। সাদামাটা কিন্ত আভিজাত্য পূর্ন সাজ।
কে ঠিক করে দিয়েছে, এসব? কোন আইন বা রীতিতে বলা আছে?!

নেই। কোথাও নেই। কিন্তু এটাই পাবলিক পারসেপশন। এটাই সফল যারা তারা ফলো করেন। একেবারে চোখ বন্ধ করে দেশের সব সফল ডাক্তারের কথা ভাবেন, অমার্জিত ময়লা শ্রীহীন পোষাকে কাউকে দেখবেন না।

বন্ধু তালিকায় প্রশাসন বা অন্য মোড়ল ক্যাডারের অফিসারের ছবি যখন দেখি, মোবাইল কোর্ট করছে পথে প্রান্তরে। ময়লা কিচেনে, গোপন গোডাউনে। ঘামে চিকচিক, কিন্ত ইস্ত্রী করা ফরমাল শার্ট আর প্যান্ট অটুট!! হয়ত দিন ব্যাপি মন্ত্রী মিনিস্টারের প্রটোকল দিচ্ছে, গ্রামে গঞ্জে বা ফাইভ স্টার হোটেলের সেমিনারে, দাঁড়িয়ে রইছে ঘন্টার পর ঘন্টা, জামদানী শাড়িটার ভাজ অক্ষুণ্ণ। সাজ সজ্জা অমলিন। কিভাবে পারে?!
কারন, পারতে হয়।

কারন, সে সব দপ্তরে শেখানো হয় ৯৯% লোকজনের সাথে ডিল করে তোমাকে চাকরি করা লাগবে। পোষাক তোমার সেকেন্ড স্কিন!! যদি ফার্স্ট স্কিন, মানে আল্লাহ প্রদত্ত চামড়া খানা বাঁচাতে চাও, পোষাকের কদর করো!!

বিসিএস চাকরি, বিসিএস অফিসার – এক অর্থের ভুজুং ভাজুং ছাড়া আর কিছুই নয়। দেশের চালক এই বিশাল সিস্টেম টিকেই আছে চেইন অভ কমান্ড, পোষাক, এটিটুডের ‘আন মান শান’ এর উপর! এবং আরো সহস্রাব্দ এই ব্যাপার গুলোর উপরেই টিকে থাকবে। তাই বিসিএস এ এলে পোষাকের কদর করুন।

এই যে আজকে নিউজফিড ভর্তি ৩৯ বিসিএস এর নবীনতম সহকর্মীদের জয়েনিং এর ছবিতে। কেউ ধলা মলা মোটা শুকনা স্মার্ট খ্যাত হলেও – আজকে কি সুন্দর সবাই! কারন, আজকে ছেলেরা সবাই স্যুট টাই পরেছে। মেয়েরা শাড়ি বা বেস্ট পসিবল ড্রেসটা পরেছে। হাসিখুশি, সপ্রতিভ সবাই!
এই রূপটাই যদি ৩৬৫ দিনের প্রতিদিন মেইন্টেইন করা যেত!!

হেইটার্সরা বলবেই,
আপনি আমাত্তে বেশি জানেন?! সাবসেন্টারে এভাবে কাজ করা যায়?! রোগি ভালো করা যায়?!!

আপনি যদি ভেবে নেন ‘রোগি ভালো করা’ই একজন বিসিএস কর্মকর্তার একমাত্র ডিউটি, তাহলে আলাপ এখানেই অফ। আর যদি আরো শুনতে চান তাহলে বলি,

ধরেন, মেডিকেল অফিসার প্রতিদিন স্যুট বা ফর্মাল শার্ট গায়ে অফিসে ঢোকে। তাকে দেখে আরএমও স্যার বাধ্য হবেন সুন্দর ড্রেস পরতে। বাকিরাও। স্যারেরা ভালো পোষাকে এসে অধস্তন রাও তাইই করবে। সবাই ভালো ড্রেস পরে এলে সুইপার বুঝবে ফ্লোর আর ময়লা রাখা যাবে না। বাথরুম আর অপরিস্কার রাখা যাবে না। বড় বাবু আর এদিক সেদিক পানের পিক ফেলবে না। স্যুট /শাড়ি পরা ডাক্তারের কাছে রোগি দেখাতে আউট ডোরে লাইন পরে যাবে! পথে ঘাটে লোকে ফিসফিস করবে, বাহবা! অফিসার স্যার। অফিসার ম্যাডাম। সালাম দুইটা বেশি পাবেন।

সালাম দিয়া কি হবে?!
অন্য ক্যাডার সালাম ধুয়েই নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছে। চিকিৎসক সমাজের সম্মান আছে, শ্রদ্ধা আছে, লোকের জেলাসি আছে, কিন্তু সালাম এর বড় অভাব। এটা বাড়ালে সব অধিকার অর্জন সহজ হয়ে যেত।

কিন্তু বাংলাদেশের গরমে পোষাক কেতাদুরস্ত হয়ে পরা কি সম্ভব?!
বাংলাদেশের গরমে আখিরাতের চিন্তায় যদি কেউ আপাদ মস্তক বোরকা আর হাত মুজায় নিজেকে ঢেকে ফেলতে পারে। চাকরির স্বার্থে ট্রাফিক পুলিশ পিচের রাস্তায় পুড়তে পারে, সৈনিক মোটা খাকি পোষাকে আট ঘন্টা মাঠে ঘাম ঝরাতে পারে, আপনি কেন পোষাক সুন্দর রাখার দায়িত্বটাকে গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন না?!
গুরুত্ব দিন, দেখবেন সব সহজ।
প্রফ পাস করার মত কঠিন তো কিছুই না! তাই না?!

বাচ্চাদের জন্যই লিখি। বড়দের জন্য না। শিশুদের মন এখনো কাদামাটির। গুড প্র‍্যাকটিস তাদের শুরুতেই মনে করিয়ে দিলে, উৎসাহ দিলে, সবার সম্মিলিত লাভ হবে একদিন।

আচ্ছা, আপু! তাহলে উত্তম পোষাকই কি সব?!
না, সব নয়। তবে উত্তম পোষাককে অবজ্ঞা করতে হলে আগে উত্তম পেশাজীবি হতে হবে। মহাকবি শেখ সাদী একজন শেখ সাদী ছিলেন বলেই তিনি উত্তম পোষাককে উচিত জবাব দিয়েছিলেন। আগে সে পর্যায়ে যান, এরপর না হয় উত্তম পোষাককে তুলোধুনা করা যাবে!
নবীন কর্মকর্তাদের অভিনন্দন।
দীর্ঘ এই যাত্রা শুভ হোক, গৌরবের হোক।

ডা. তাহসিনা আফরিন
৪৬ সিএমসি
২০০৩-২০০৪

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন