, ১ জানুয়ারি ২০২১; ১২:০৩ অপরাহ্ণ


নেপাল ‘দৃঢ়চেতা’ জাতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে। ভারতের নতুন রাজনৈতিক মানচিত্রে বিতর্কিত কালাপানি এলাকাকে ভারতের অংশ হিসেবে দেখানোর প্রতিবাদে সম্প্রতি নেপালে যে জোরালো প্রতিবাদ হয়েছে, সেটা নেপালের দৃঢ়চেতা মানসিকতার লক্ষণ বহন করে। কমিউনিস্ট প্রধানমন্ত্রী খাড়গা প্রাসাদ শর্মা ওলির অধীনে নেপালের এই উত্থান ঘটছে।

নেপালের পর্যবেক্ষকরা বলছেন, ৫৬ বছরের পুরনো সীমান্ত বিবাদের বিষয় নিয়ে নেপাল ভারতের বিপক্ষে আগে কখনও এতটা আগ্রাসী হয়নি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও নেপাল সময়ের প্রধান সম্পাদক মুনুরাম খানাল বলেন, যে সময়টাতে নতুন রাজনৈতিক মানচিত্র প্রকাশ করা হলো, সেটা প্রশ্নের উদ্রেক করে।

খানাল সাউথ এশিয়ান মনিটরকে বলেন, “২০১৫ সালে ভারত অনানুষ্ঠানিকভাবে নেপালের উপর অবরোধ আরোপের পর থেকে নেপাল আর ভারতের সম্পর্কের অবনতি শুরু হয়েছে। ওই অবরোধে নেপালে জরুরি পণ্যের সরবরাহ থমকে গিয়েছিল। চলতি বছরের অক্টোবরে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংএর কাঠমাণ্ডু সফরের পর থেকে নেপাল-ভারত সম্পর্ক স্পিডব্রেকারে আটকা পড়েছে”।

নরেন্দ্র মোদি সরকার নতুন মানচিত্র প্রকাশের জন্য এ সময়টাকে প্রাসঙ্গিক মনে করেছে, কারণ জম্মু ও কাশ্মীর এবং লাদাখকে পৃথক করে সম্প্রতি তারা নতুন কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল গঠন করেছে।

কিন্তু কালাপানি সীমান্ত ইস্যু যেখানে আগে থেকেই বিতর্কিত ছিল, সেখানে ভারতের এই সিদ্ধান্ত সমস্যাকে আরও উসকে দিয়েছে। তাছাড়া বিতর্কিত কালাপানি এলাকা ছাড়াও এই মানচিত্রে পাকিস্তান শাসিত কাশ্মীরকে জম্মু ও কাশ্মীরের অংশ, এবং গিলগিট-বালটিস্তানকে লাদাখের অংশ দেখানো হয়েছে।

বিবাদ

খানাল বলেন, কালাপানি ইস্যুতে ভারত আর নেপালের মধ্যে মূল ভিন্নমতের বিষয়টি হলো মহাকালী নদীর উৎস নিয়ে।

নয়াদিল্লী বলে আসছে যে, এই নদীর উৎস হলো কালাপানি, যেটা ভারতের উত্তরখাণ্ড রাজ্যের পিথোরাগড় জেলার অংশ বলে দাবি করে আসছে তারা। অন্যদিকে, কাঠমাণ্ডু বলে আসছে যে, নদীর উৎস হলো ভারত, নেপাল ও তিব্বত/চীনের ত্রিদেশীয় সংযোগ পয়েন্টের কাছাকাছি অবস্থিত লিপুলেখ।

খানাল উল্লেখ করেন, “চীন ও ভারত যদিও লিপুলেখ ইস্যু নিয়ে আলোচনা করেছে, কিন্তু নেপালকে সেখানে আলোচনার জন্য ডাকা হয়নি”।

তিনি আরও বলেন যে, ১৮২৬ সালে, ভারতের ব্রিটিশ জরিপকারী লিপু নদীকে মহাকালী নদী নামে উল্লেখ করেন এবং ১৮৫৬ সালে ভারতের সার্ভেয়র জেনারেল একটি মানচিত্র প্রকাশ করেন, যেখানে লিপু নদীকে কালি নদী নামে অভিহিত করা হয়, যেটা এখন মহাকালী নদী নামে পরিচিত।

কালাপানি কৌশলগত সামরিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা, এবং ১৯৬২ সালে ভারত-চীনের যুদ্ধের সময় থেকে ভারতের ইন্দো-টিবেটান বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্সেস এই জায়গাটির নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে।

কালাপানি এলাকাতে সীমান্ত নির্ধারণ করেছে মহাকালী নদী। কিন্তু ভারত আর নেপাল যেহেতু নদীর উৎসকে ভিন্ন ভিন্ন মনে করে, সে কারণেই এই সঙ্ঘাত।

ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ১৮১৬ সালে নেপালের সাথে সুগাউলি চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল। চুক্তি অনুযায়ী, কালি – এখন মহাকালী নামে পরিচিত – নদীটি ভারতের সাথে নেপালের পশ্চিম সীমান্ত নির্ধারণ করবে।

মহাকালী নদীর বেশ কতগুলো উপনদী রয়েছে, যেগুলোর সবগুলোই কালাপানিতে এসে মিলিত হয়েছে। নেপালি মিডিয়ার মতে যেটা নেপালের দারচুলা জেলার অংশ ছিল। কিন্তু ভারত ২ নভেম্বর যে নতুন রাজনৈতিক মানচিত্র প্রকাশ করেছে, সেখানে এই অঞ্চলকে উত্তরখাণ্ডের পিথোরাগড় জেলার অংশ দেখানো হয়েছে।

নয়াদিল্লী দাবি করেছে যে, নদীর শুরু হয়েছে কালাপানি থেকে কারণ উপনদীগুলো এখানেই একত্রিত হয়েছে। কাঠমাণ্ডু বলেছে যে, নদীর উৎস হলো লিপুলেখে, কারণ সেখান থেকেই অধিকাংশ উপনদীগুলোর শুরু।

“কিন্তু মানচিত্রে যেহেতু একটা শৈলশিরা ছিল, পরবর্তীকালে ব্রিটিশ জরিপকারীরা অ-ঘনবসতিপূর্ণ ওই পার্বত্য এলাকার যে মানচিত্র তৈরি করেছিল, সেখানে তারা দেখিয়েছিল যে, কালি নদী অন্য উৎস থেকে এসেছে”।

খানাল বলেন, “নেপালের সীমানার মধ্যে তিনটি প্রত্যন্ত গ্রাম – গাঙ্গি, নাভি ও কুলটি – ছিল, যেগুলো ভারতের নিয়ন্ত্রণে ছিল। এই মতভেদের কারণে দুই দেশের মধ্যে সীমান্ত বিবাদ শুরু হয়েছে”।

১৯৭৮ সালে নেপালের সার্ভেয়ার জেনারেল পুর্নিয়া প্রাসাদ ওলি দেখতে পান যে, লিপুলেখ অঞ্চলের এই প্রত্যন্ত তিন গ্রামের বাসিন্দাদেরকে ভারতীয় নাগরিক হিসেবে নিবন্ধিত করা হয়েছে।

নেপালের রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন যে, ওলি এবং তার ক্ষমতাসীন নেপালি কমিউনিস্ট পার্টি ভারতপন্থী নেপালি কংগ্রেস পার্টিসহ বিরোধী দলগুলোর তীব্র চাপের মুখে রয়েছে। তারা চায় কালাপানি ও সুস্তা সীমান্ত বিবাদের মতো অমীমাংসিত ইস্যুগুলোর ব্যাপারে সরকার যেন ভারতের বিপক্ষে শক্ত অবস্থান নেয়।

২০১৮ সালে হিমালয় অঞ্চলের এই দেশটির ক্ষমতায় নাটকীয়ভাবে ফিরে আসেন ওলি। ‘কট্টর-জাতীয়তাবাদী’ প্রচারণা এবং তাকে বহিষ্কারের জন্য ভারতের মদদপুষ্ট শক্তির ভূমিকার বিষয়টি নিয়ে প্রচারণা চালিয়ে নির্বাচনে জয়লাভ করেন তিনি।

বিবাদ শুরুর কয়েক সপ্তাহ পরে, এবং কাঠমাণ্ডুতে বিরোধী নেপালি কংগ্রেস পার্টির জোরালো বিক্ষোভের পর ওলি বলেন: “আমাদের দেশপ্রেমিক সরকার নেপালের ভূখণ্ডের এক ইঞ্চি জায়গায় কারো কাছে ছেড়ে দেবে না। প্রতিবেশী ভারতের উচিত কালাপানি এলাকা থেকে তাদের নিরাপত্তা বাহিনীকে সরিয়ে নেয়া”।

যদিও ঐতিহ্যগতভাবে দুই দেশের মধ্যে ঘনিষ্ঠ ও অনন্য সম্পর্ক চলে আসছে, কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে সম্পর্কের মধ্যে একটা সমস্যা মাথাচাড়া দিয়েছে এবং নেপালের রাজনৈতিক দল এবং নেপালের জনগণের মধ্যে ভারত-বিরোধী মনোভাব ক্রমেই বাড়ছে।

১৯৫০ সালে যে সেকেলে ও অসম ইন্ডিয়া-নেপাল পিস অ্যান্ড ফ্রেন্ডশিপ ট্রিটি স্বাক্ষরিত হয়, সেটার পাশাপাশি কাঠমাণ্ডুর অভ্যন্তরীণ বিষয়ে সবসময় নয়াদিল্লীর নাক গলানোর কারণে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কটা অস্বাভাবিক হয়ে উঠেছে। নেপালের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা এ কথা বলেছেন।

খানাল আরও বলেন, “নেপালীদের দেশপ্রেম অত্যন্ত প্রবল এবং ক্ষুদ্র রাষ্ট্র হিসেবে নেপাল বড় অবন্ধুসুলভ প্রতিবেশীর ব্যাপারে ভীত। নেপাল সে কারণে ভারসাম্য রক্ষার জন্য চীন কার্ডের ব্যবহার অব্যাহত রাখবে”।

কালাপানি বিবাদের মীমাংসার জন্য দুটো উপায় রয়েছে: হয় পররাষ্ট্র মন্ত্রী পর্যায়ে কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে এটার সমাধান করতে হবে, অথবা ট্র্যাক-টু কূটনীতির দিকে যেতে হবে।

কাঠমাণ্ডুর রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলেছেন যে, দ্বিপাক্ষিক বিশেষজ্ঞ গ্রুপ ভারত ও নেপালের প্রধানমন্ত্রীদ্বয়ের কাছে যে সুপারিশ করেছে, সে অনুযায়ী অবশ্যই পদক্ষেপ নিতে হবে।

খানাল উল্লেখ করেন যে, ১৯৫০ সালের পিস অ্যান্ড ফ্রেন্ডশিপ ট্রিটিসহ সকল দ্বিপাক্ষিক চুক্তি, সমঝোতার ক্ষেত্রে সেগুলো আপডেট বা সংশোধনের যে প্রয়োজন রয়েছে, সে বিষয়ে সামগ্রিক রিপোর্ট তৈরির দায়িত্ব দেয়া হয়েছে এমিনেন্ট পার্সন্স গ্রুপ অব নেপাল-ইন্ডিয়া রিলেশান্সের উপর।

বিবাদ উসকে ওঠার পর থেকে বিগত চার সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রী ওলিসহ ক্ষমতাসীন নেপাল কমিউনিস্ট পার্টির বেশ কয়েকজন নেতা ভারতের তাদের পরিচিতদের সাথে যোগাযোগ করেছেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রীর অফিসের সাথেও যোগাযোগ করা হয়েছে বলে কাঠমাণ্ডু পোস্টের এক রিপোর্টে বলা হয়েছে।

নেপালের পর্যবেক্ষকরা বলেছেন, সীমান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য এখনই পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের একটি সংলাপ মেকানিজম তৈরির যে দাবি কাঠমাণ্ডু করেছে, নয়াদিল্লী এখন পর্যন্ত সে দাবিতে সাড়া দেয়নি।

নেপাল চীনের কাছাকাছি হওয়ার কারণে নয়াদিল্লীর মধ্যে যে অস্বস্তি রয়েছে এবং ভারত ও নেপালের মধ্যে যে জটিলতা আগে থেকেই রয়েছে, সেটা আরও জটিলতর হবে – এটা নিশ্চিতভাবে বলা যায়।

সূত্রঃ সাউথ এশিয়ান মনিটর 

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন