মঙ্গলবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১; ৬:৪৫ পূর্বাহ্ণ


শশি থারুর। ছবিঃ সংগৃহীত

ভারতের কংগ্রেস দলের পার্লামেন্ট সদস্য ও সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শশি থারুর বিতর্কিত নাহরিকত্ব বিল নিয়ে এই নিবন্ধটি লিখেছেন যা ‘দ্য প্রিন্ট’ প্রত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। নিবন্ধটি পাঠকদের জন্য তুলে দেয়া হলো:

ভারতের সংসদে ৭ ঘন্টা বিতর্কের পর পাস হয়ে যায় নাগরিকত্ব বিল। সংখ্যাগরিষ্ঠতার মাধ্যমে এই বিল পাশ করিয়ে মোদি সরকার ভারতকে যে অন্ধকার পথে চালিত করতে সফল হলেন, সেখান থেকে ফিরে আসা খুবই কঠিন হয়ে যাবে। বিজেপি সরকারের এই বিল প্রত্যাশিতভাবেই বিতর্কের ঝড় তুলেছে। আসামে তো বটেই, যেখানে অসম গণ পরিষদ প্রতিবাদে রাজ্য সরকার থেকে পদত্যাগ করেছে। আসামে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা বৃদ্ধি পেয়েছে। সেখানে যেই ইস্যু সবচেয়ে ক্ষুদ্ধ করেছে মানুষকে তা হলো ১৯৮৫ সালের আসাম চুক্তি লঙ্ঘণ। ওই চুক্তির ব্যাত্যয় ঘটিয়ে ১৯৭১ সালের পরেও যারা আসামে অভিবাসী হিসেবে গিয়েছে তাদেরকেও ভারতের নাগরিকত্ব পাওয়ার সুযোগ করে দেয়া হয়েছে। তবে এই বিল নিয়ে আরও বড় ইস্যু রয়ে গেছে, যা নিয়ে যথেষ্ট আলোচনা হচ্ছে না। সেটি হলো এই বিল খোদ ভারতীয় জাতিসত্ত্বার সঙ্গে প্রতারণার সামিল।

নাগরিকত্ব (সংশোধিত) বিল মূলত ১৯৫৫ সালের একটি আইনের সংশোধন। এর ফলে আফগানিস্তান, বাংলাদেশ ও পাকিস্তান থেকে পালিয়ে আসা হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন ও খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের ভারতীয় নাগরিকত্ব পাওয়ার অধিকার দেওয়া হয়েছে। ভারতে এটিই প্রথম কোনো আইন যেখানে সুবিধাভোগীদের ধর্মীয় পরিচয় নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। এবং, একটি বিশেষ সম্প্রদায়ের নাম বাদ দেওয়ার বিষয়টি চোখে পড়ার মতো।

এই ৩০০০ বছরে ভারত বিভিন্ন দেশের নির্যাতিত মানুষকে আশ্রয় দিয়ে এসেছে। কখনও কোনো বিশেষ ধর্মের মানুষকে তো ভারত বাদ রাখেনি। কিন্তু এই আইনের সুরক্ষা থেকে মুসলিমদেরকে খুবই উদ্দেশ্যমূলকভাবে বাদ রাখা হয়েছে।

বিজেপিতে এই বিলের সমর্থকরা তাদের গোঁড়ামি নিয়ে কিন্তু রাখঢাক রাখেনি। ‘যদি হিন্দু জনগোষ্ঠী ভারতেই আশ্রয় না পায়, তাহলে কোথায় পাবে?’-এই হলো তাদের যুক্তি। অর্থাৎ এর মর্মার্থ হলো ভারত হিন্দুদেরই দেশ। মুসলিমদের অন্য দেশও আছে যাওয়ার।

এই যুক্তির আশ্চর্য্যজনক দিক হলো, এই গোঁড়ামিপূর্ন একখন্ড আইনের মাধ্যমেই ভারতীয় জাতীয়তাবাদের মৌলিক ভিত্তিকেই অগ্রাহ্য করা হলো। ১৯৪৭ সালে যখন ভারত দুই ভাগ হলো, পাকিস্তান তখন মুসলিমদের রাষ্ট্র হিসেবে সৃষ্টি হলো। তখন ভারতীয় জাতীয়তাবাদী, বিশেষ করে মহাত্মা গান্ধী ও জওহরলাল নেহরু ও তাদের অনেক সহকর্মী এই যুক্তির ফাঁদে পা দেননি যে, যেহেতু মুসলিমদের জন্য একটি রাষ্ট্র সৃষ্টি হয়েছে, বাকি অংশটুকু হিন্দুদের রাষ্ট্র। এই ভারতের ধারণাকে গ্রহণ করতেই যেই যুক্তিতে দেশভাগ হয়েছে তাকে প্রত্যাখ্যান করতে হয়েছিল।

আমি আগে যেমনটা বলেছি, ধর্মনিরপেক্ষতার অর্থ আমাদের জন্য এটাই ছিলো। পশ্চিমা ডিকশনারিতে ধর্মনিরপেক্ষতার সংজ্ঞা হয়তো দেওয়া হয়েছে ধর্মের অনুপস্থিতিকে। কিন্তু এমন সংজ্ঞা ভারতের কাছে অচেনা। আমাদের সকল সম্প্রদায়ের মধ্যে ধর্ম এতটা গভীরে প্রোথিত যে একে ভারতের নিজস্বতা থেকে সম্পূর্ণ দূরে রাখা সম্ভব নয়। ধর্মহীনতা আমাদের দেশে কখনও জনপ্রিয় হতে পারবে না। এমনকি কম্যুনিস্ট ও দক্ষিণের ডিএমকে’র মতো নাস্তিক দলও ধর্মের সঙ্গে একটা আপসরফায় এসেছে। যেমন, কলকাতায় দুর্গা পুজার সময় সবচেয়ে দৃষ্টিনন্দন পুজা মন্ডপ বানাতে কম্যুনিস্ট পার্টির মধ্যে প্রতিযোগিতা লেগে যায়। আমি এখনও মনে করতে পারি কলকাতার কথা, যেখানে আমি আমার শৈশব কাটিয়েছিলাম। সন্ধ্যার সময় মুয়াজ্জিন যখন আজান দিতেন, তখন আবার শোনা যেত হিন্দু শিব মন্দিরের মন্ত্র জপার শব্দ। সঙ্গে সঙ্গেই বেজে উঠতো শিখ গুরুদাওয়ারায় গ্রন্থ সাহিব পাঠের শব্দ। সুতরাং, ধর্মহীনতা কখনও ইস্যু ছিল না। বরং, প্রত্যেক ধর্মই ভারতে ছড়িয়েছে।

ভারতের মতো দেশে, আমাদের ঘরানার ধর্মনিরপেক্ষতায় আমাদের জনগণের বৈচিত্র্যকে স্বীকৃতি দেয়া হয়। আমাদের অব্যাহত অঙ্গীকারের স্বীকৃতি দেয়া হয় যে, কারও ধর্মীয় পরিচয় তার অসুবিধার কারণ হবে না, কিংবা বিশেষ কোনো খাতিরও দেবে না। কোনো ভারতীয়ের মনেই এই ভাবনা আসা প্রয়োজন নেই যে, কোনো বিশেষ ধর্মে তার জন্মের কারণে কোনো পেশা বা কার্যালয়ে তিনি অযোগ্য হয়ে গেলেন। যদিও ভারতীয় জনসংখ্যার ৮০ শতাংশই হিন্দু ধর্মাবলম্বী ও যদিও মুসলিমদের পৃথক রাষ্ট্রের দাবিতে দেশ ভাগ হয়েছে, তবুও ভারতের সাবেক ৩ জন প্রেসিডেন্ট মুসলিম ছিলেন। অসংখ্য গভর্নর, মন্ত্রী, মুখ্যমন্ত্রী, রাষ্ট্রদূত, জেনারেল, সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি ও প্রধান বিচারপতি মুসলমান ছিলেন।

১৯৭১ সালে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে হওয়া বাংলাদেশ যুদ্ধে ভারতীয় বিমান বাহিনীর উত্তরাঞ্চলীয় সেক্টরের নেতৃত্বে ছিলেন একজন মুসলিম- এয়ার মার্শাল লতিফ। সেনা কমান্ডার ছিলেন একজন পার্সি জেনারেল মানেকশ। বাংলাদেশে প্রবেশ করা যৌথবাহিনীর জেনারেল অফিসার ছিলেন একজন শিখ- লেফটেন্যান্ট জেনারেল অরোরা। আর যেই জেনারেল পূর্ববঙ্গে পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পন নিয়ে আলোচনা করতে গিয়েছিলেন, সেই মেজর জেনারেল জ্যাকব ছিলেন একজন ইহুদী। এটিই ভারতীয় ধর্মনিরপেক্ষতা।

শাসক দলের মধ্যে যারা এই ধর্মনিরপেক্ষতার সমালোচক, তারা আসলে সেই ভারতকে শেষ করে দিতে চান যেখানেই এই ধর্মনিরপেক্ষতার চর্চা হয়। সেই ১৯৫৮ সালে প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু আমাদেরকে হিন্দু সাম্প্রদায়িকতার বিপদ সম্পর্কে সতর্ক করে গিয়েছিলেন। তার যুক্তি ছিল, সংখ্যাগুরুর সাম্প্রদায়িকতা বিশেষভাবে বিপজ্জনক, কেননা দেখলে মনে হবে এটি জাতীয়তাবাদী। যেহেতু আমাদের বেশিরভাগই হিন্দু, সুতরাং হিন্দু জাতীয়তাবাদ ও ভারতীয় জাতীয়তাবাদের মধ্যকার যেই পার্থক্য তা সহজেই মুছে দেয়া যাবে।

সংখ্যাগুরুরা কোনো অবস্থাতেই বিচ্ছন্নতাবাদী হয় না, কারণ সংজ্ঞা অনুযায়ীই বিচ্ছিন্নতাবাদ চায় সবসময়ই সংখ্যালঘুরা। কিন্তু সংখ্যাগুরুর সাম্প্রদায়িকতা হলো একটি চরম মাত্রার বিচ্ছিন্নতাবাদ, কারণ এর মাধ্যমে আমাদের দেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ অন্য ভারতীয়দের খোদ ভারত রাষ্ট্র থেকে আলাদা করে ফেলার চেষ্টা করা হয়। সেটাই আমরা দেখছি যখন মুসলিম নাম যুক্ত স্থানের নাম পরিবর্তনের তোড়জোড় থেকে। এ কারণেই নেহরু বলেছিলেন যে, কোনো অবস্থাতেই হিন্দু পাকিস্তান হওয়া উচিত নয় ভারতের।

এই নাগরিকত্ব বিলের সমর্থকরা যেই যুক্তিতে কথা বলছেন ও এই বিলে যেই যুক্তিকে স্থান দেয়া হয়েছে তা পাকিস্তান সৃষ্টির যুক্তির সঙ্গেই মিলে যায়। হিন্দুত্ব আন্দোলন ১৯৪৭ সালের মুসলিম সাম্প্রদায়িকতারই পুনরাবৃত্তি। এই বাগাড়ম্বরকে প্রত্যাখ্যানের মধ্য দিয়েই ভারতের সৃষ্টি। সুতরাং, এটি যদি প্রতিষ্ঠা পায়, তাহলে ভারত রাষ্ট্রের যেই ধারণা, তার ইতি ঘটবে।

এই বিলের পক্ষে কথা বলতে গিয়ে বিজেপির সাবেক কংগ্রেসম্যান ও উত্তরপূর্বাঞ্চলে দলটির শীর্ষ কৌশলবিদ হিমান্ত বিশ্ব শর্মা ঘোষণা দেন যে, এই বিল প্রয়োজন যেন এই অঞ্চল জিন্নাহর পথে চলে না যায়। মজার বিষয় হলো, এই বিল আসলে জিন্নাহর কাছে আত্মসমর্পনেরই নামান্তর। ভারতকে একটি অমুসলিম রাষ্ট্র বানিয়ে এই বিল কার্যত পাকিস্তানের ধারণাকেই স্বীকার করে নিলো। যেই ভারতকে আমাদের কারও কারও কাছ থেকে ছিনিয়ে নেয়া হলো, তা আমাদের সকলের কাছ থেকেই ছিনিয়ে নেয়া যেতে পারে।

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন