, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২১; ৯:২৭ অপরাহ্ণ


কার্ল মার্কস, ছবিঃ সংগৃহীত

বিংশ শতাব্দীতে যা বিশ্বে আলোড়ন তুলেছিল তার মধ্যে যেমন বিজ্ঞানের কয়েকটি সূত্র এবং আবিষ্কার ছিল, তেমনি ছিল কিছু মতবাদ। যার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে মার্কসবাদ। বিংশ শতাব্দী থেকে এই একবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত সম্ভবত(!) মার্কসবাদই সবচেয়ে আলোচিত মতবাদ।

মার্কসবাদ নিয়ে লিখবো তার আগে মার্কসবাদ নিয়ে আমার পূর্বের ধারনাটা পরিষ্কার করা জরুরি। মার্কসবাদ বলতে আগে আমি বুঝতাম সমাজতান্ত্রিকতা। অর্থাৎ ধনী গরীব বলে আলাদা কোন শ্রেণি থাকবে না। সবাই সমান সম্পদশালী হবে। কিন্তু মার্কসবাদ নিয়ে একটু গভীরভাবে চিন্তা করলে একটা ধাক্কা খেতে হবে। অর্থনৈতিক সুষমবণ্টন ছাড়াও মার্কসবাদ প্রকৃত অর্থে দর্শন আর বিজ্ঞানের উপর জোর দিয়েছে।

বিজ্ঞানের ‘থিওরি অফ রিলেটিভিটি’র মতোই জটিল এই মার্কস থিওরি। এই জটিলতার কারণেই রাশিয়া থেকে প্রাচ্যে মার্কসীয় দর্শন আসতে আসতে কিছুটা বিকৃত হয়ে গেছে। যার ফলে মার্কসবাদ নিয়ে আমাদের ভ্রান্ত ধারনা তৈরি হয়েছে। বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে মার্কস ইতিহাস ও দর্শনের পর্যালোচনা করে ইতিহাসের এক বিশেষ ব্যাখ্যা দাঁড় করান; এবং ইতিহাস ও দর্শনকে চিরপরিবর্তনশীল বিজ্ঞানের পর্যায়ভুক্ত করেন। যেই দৃষ্টিভঙ্গিতে মার্কস এই পর্যালোচনা করেন, সেটা মূলত অর্থনৈতিক। ইতিহাসের এই অর্থনৈতিক ব্যাখ্যার দ্বারা মার্কস দেখান, যে মানব সমাজ পূর্বে জমিদারি বা সামন্ত প্রথার নিয়ম কানুন অনুযায়ী চলতো, ক্রমশ তা ধনতন্ত্রে পরিণত হয় এবং পরবর্তীতে ধনতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা সাম্যবাদে পরিণত হবে বলে মার্কস বিশ্বাস করতেন। এটাই মূলত ইতিহাসের মার্কসীয় রূপ।

অর্থনৈতিক দিকটা দর্শন ও ইতিহাসের একটি বিশেষ ও প্রধান ভিত্তি। এই অর্থনৈতিক ব্যবধানই একটি সমাজকে আরেকটি সমাজ থেকে আলাদা করে দেয়। তাই বলা যায়, সর্বসাধারনের অর্থনৈতিক উন্নতিই হল সভ্যতার আধার। যে দেশ, যে সমাজ, যে মানুষ অর্থনৈতিক দিক দিয়ে পিছিয়ে আছে, সেখানে সাম্য, স্বাধীনতা, সভ্যতা, সংস্কৃতির কথাই উঠতে পারেনা বলে মার্কস মনে করতেন।

মার্কসের সহকর্মী ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস্‌ পল আর্নেস্টকে একটি চিঠিতে লিখেন, “মার্কস দর্শন বলে যে, প্রত্যেক অবস্থার ইতিহাসকে নতুনভাবে বিচার ও বিশ্লেষণ করতে হবে”।

মার্কসই প্রথম প্লেটোর মানববাদকে স্পষ্ট ও প্রত্যক্ষ করে তুলেন। মানুষই যে সমাজের মূল এবং সমাজব্যবস্থার ও সভ্যতার মাপকাঠি- প্লেটোর এই দার্শনিক পর্যালোচনা হল মার্কসের দর্শনের মূল ভিত্তি।

মার্কসবাদ কি?

মার্কসবাদ বলতে সাধারণত বুঝায় যে, এ এক বিশেষ ধরনের রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক সূত্রাবলি। যদিও রাজনীতি ও অর্থনীতি মার্কসবাদের অন্তর্গত, তথাপি এগুলো মার্কসবাদের অংশবিশেষ। তবে মার্কসবাদের একটি বিশেষত্ব আছে। মার্কসবাদ সংকীর্ণ নয়, না তো মার্কসবাদ একটি বদ্ধ আদর্শ, না তো শুধু একটা চিন্তাধারা; বরং মার্কসবাদ একটি বিশেষ প্রণালী। এই প্রণালী মূলত বস্তুতান্ত্রিক দর্শন। তবে মার্কসবাদ বুঝতে হলে দর্শনের সূত্র থেকেই শুরু করা উচিত।

তাহলে দর্শন কি? একেক পণ্ডিতের কাছে দর্শনের একেক রকম সংজ্ঞা পাওয়া যাবে। তবে দর্শনের ইতিহাস ঘাটাঘাটি করলে যে উপসংহারে পৌঁছানো যায় সেটা হচ্ছে, “পরিচিত সংজ্ঞা দিয়ে বিশ্বজগতের বিশ্লেষণই হচ্ছে দর্শন”। প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্যের দর্শনের ভিত্তি হচ্ছে যুক্তিবাদ। যুক্তি দিয়েই এই অঞ্চলের দার্শনিকরা সময়ের শিকল ভাঙ্গতে চেয়েছেন। তবে দর্শনের শুরুটা মানুষের স্থিতি ও তার সামাজিক পরিবেশের অর্থ নিরূপণের প্রচেষ্টাতেই। দর্শনের অধ্যয়নের সময় এই বিষয়টা খেয়াল রাখতে হবে পাশাপাশি যেন বিজ্ঞানেরও অধ্যয়ন হয়। কেননা, বৈজ্ঞানিক জ্ঞান ব্যতিরেকে পদার্থিক জগতের পরিবেশ ও তার মধ্যে অবস্থিত সমস্ত কার্যকলাপের পদার্থিক সংজ্ঞা দিয়ে কোন প্রকৃত ব্যাখ্যা দাঁড় করানো সম্ভব নয়, তাই আদিমকালে বিশ্বজগতের বিশ্লেষণের যে রীতি দাঁড়িয়েছিল, সেটা ব্যর্থ হতে বাধ্য।

দর্শনকে সকল জ্ঞানের আধার বা জননী বলা হয়ে থাকে। কিন্তু মনে রাখতে হবে ‘জ্ঞান’ তখনই স্বয়ংসম্পূর্ণ হবে যখন ‘জ্ঞান’ বিজ্ঞান দ্বারা সিদ্ধ হবে। আরেকটা বিষয়, পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন জ্ঞান দর্শন, যার যাত্রা শুরু হয়েছিল বিজ্ঞানের হাতে হাত রেখে। অর্থাৎ বিজ্ঞান আর দর্শন সমসাময়িক। এদের সহোদরও বলে যেতে পারে।

মনুষ্য স্বভাবের কারণেই মানুষ প্রত্যেকে ঘটনার পেছনে কোন না কোন কারণ খুঁজে বের করার চেষ্টা করে। যতক্ষণ না এই কারণ সে উদঘাটিত করতে পারে, সে ক্ষান্ত হবে না। ঠিক এই কারণেই মানুষ ধর্মের আশ্রয় নেয়, যা প্রমাণ করে মানুষ যুক্তিবাদী। তাই দর্শন ব্যাখ্যার করার সময়ও মানুষ যুক্তিবিদ্যার আশ্রয় নিয়ে থাকে। এখানেও সেই বিজ্ঞানের জয়জয়কার। যুক্তিবাদী দর্শন একমাত্র বিজ্ঞানের সাহায্যেই বহির্জগতের বিশদ বিবরণ দিতে সক্ষম। আর, দর্শনকে বর্ণনা দিতে গিয়ে যেখানে বিজ্ঞানের সাহায্য পাওয়া যায়নি, সেখানে দার্শনিকরা অতিন্দ্রীয় অনুমান করে দর্শনকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন। এই কারণেই কার্ল মার্কসের পূর্ববর্তী দর্শন একটা বিপাকে পড়েছিল। এই বিপাকে পড়ার যে সমূহ কারণ, সেটাও অলৌকিকতার সৌজন্যে। যে সমস্ত রহস্যের সমাধান দর্শন কিংবা বিজ্ঞান করতে পারে নি, সেসব রহস্যের ব্যাখ্যা হিসেবে অলৌকিকতাকে ব্যবহার করে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা হয়েছে। যারপরনাই, একটা সময় পুরাতন অলৌকিকতা থেকে বেড়িয়ে এসে নতুন এক অলৌকিক বিশ্লেষণের প্রয়োজন পড়েছে। এই ঘরনার দার্শনিকদের মধ্যে অন্যতম ইমানুয়েল কান্ট, যাকে আধুনিক দর্শনের জনক বলা হয়।

কিন্তু এই যে অলৌকিকতা, এর পেছনে কারণ কি ছিল? যেহেতু বিজ্ঞান দিয়েই দর্শনের ব্যাখ্যা হয়, তাই বিজ্ঞান নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে। আদতে তা নয়। বিজ্ঞান সুপ্রসারিত হওয়া শুরু করে বিংশ শতাব্দীর গোঁড়া থেকে। তাই দর্শনের অনেক তত্ত্বই বিজ্ঞান দ্বারা তাৎক্ষণিক সিদ্ধ করা সম্ভব হয়নি। কিন্তু মূল কারণ হচ্ছে জ্ঞানতত্ত্বের কিছুর মৌলিক সিদ্ধান্তের ত্রুটি। যা কিছু অপ্রয়োজনীয়, তা পরিহার করতে গিয়ে আধুনিক দার্শনিকরা চিন্তাশক্তি এবং মানসিক বিকাশের প্রভাবকে অস্বীকার করেন। এতে করে মানুষের জ্ঞানবর্জন কিভাবে হয় সেটার উত্তর খোঁজাতেই দার্শনিকদের অনুপ্রাণিত করে। আর এর কোন বৈজ্ঞানিক সমাধান না পাওয়ায় অদ্ভুত সব কাল্পনিক মতের সৃষ্টি হতে থাকে।

মার্কস দর্শনের অগ্রদূত হেগেলই প্রথম অলৌকিকতা থেকে বেড়িয়ে এসে বাস্তববাদী চিন্তাধারার উন্নতি ঘটান।

অনেকের মতে, মার্কসবাদী হতে হলে একমাত্র সমাজতান্ত্রিকতা ছাড়া অন্যকোন সমাজ ব্যবস্থায় বিশ্বাস রাখা যাবে না। কিন্তু মার্কস সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার কথা এই জন্যই বলেছিলেন যে, জমিদারি প্রথা থেকে বেড়িয়ে এসে যখন ধনতন্ত্র সমাজব্যবস্থায় কোন রাষ্ট্র উপনীত হতে পারে, সময়ের প্রয়োজনেই সেই ধনতন্ত্র সমাজব্যবস্থা থেকে সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় উপনীত হতে হবে। অর্থাৎ, সময়ের চাহিদায় সমাজব্যবস্থার রূপ পরিবর্তিত হতে পারে।

মার্কসবাদ কোন বিশেষ মতবাদ নয়, তা শুধু সমাজ ও জীবনের বৈজ্ঞানিক যুক্তিপূর্ণ ও পরিবর্তনশীল দৃষ্টিভঙ্গি। আজ যদি কোন কিছুর পরিবর্তনের প্রয়োজন হয় কিংবা মার্কসবাদের কিছু অংশ কিংবা সম্পূর্ণ মার্কসীয় মতবাদকেই যদি বাদ দিতে হয় তবে তাই করতে হবে। এটাই মার্কসীয় ঐতিহ্য। এই পরিবর্তনশীল বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির উপরই মার্কসবাদ প্রতিষ্ঠিত।

“মার্কসবাদ হল দর্শন ও ইতিহাসের বৈজ্ঞানিক রূপ, যুক্তিবাদ হল তার বনেদ”। যেহেতু বিজ্ঞান পরিবর্তনশীল, তাই মার্কসবাদও পরিবর্তন হতে পারে।

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন