বৃহস্পতিবার, ১৬ জুন ২০২১; ৪:১৪ অপরাহ্ণ


ভারতের আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয়ে সাম্প্রতিক ছাত্র বিক্ষোভের সময় উত্তর প্রদেশ রাজ্যের পুলিশ ‘লাগামহীনভাবে’ মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছে বলে অভিযোগ করেছে একটি স্বাধীন তদন্তকারী দল।

ভারতের নাগরিকত্ব আইন সংশোধনের বিরুদ্ধে ছাত্র বিক্ষোভের সময় ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে যে সহিংসতা ঘটে, সেসময় পুলিশের বিরুদ্ধে ‘বর্বর আচরণ’ করার অভিযোগ করে এই দলটি – যাতে ছিলেন আইনজীবী, মানবাধিকার কর্মী এবং শিক্ষাবিদরা।

ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং টিমটি জানিয়েছে , ছাত্রদের ব্যাপক মারধর করার সময়ে পুলিশের মুখে ‘জয় শ্রীরাম’ ধ্বনি শোনা গেছে, ছাত্রদের ওপরে ব্যবহার করা হয়েছে ‘স্টান গ্রেনেড’ – যা সাধারণত সন্ত্রাসী হামলার সময়ে করা হয়ে থাকে থাকে। একজন ছাত্রের হাত কেটে বাদও দিতে হয়েছে।

তবে পুলিশ বলছে, ছাত্ররাই প্রথমে নিরাপত্তা বাহিনীকে আক্রমণ করেছিল এবং তারা ন্যূনতম শক্তি প্রয়োগ করেছে শুধু আত্মরক্ষার স্বার্থে।

সবশেষ খবরে জানা যায়, ভারতের রাজধানী দিল্লিসহ বিভিন্ন স্থানে বিতর্কিত নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ বুধবারও অব্যাহত ছিল।

এমাসের প্রথম দিকে পার্লামেন্টে পাস হওয়া আইনটিতে বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান থেকে আসা অ-মুসলিম অভিবাসীদের নাগরিকত্ব দেবার প্রক্রিয়া দ্রুততর করার কথা বলা হয়েছে।

মধ্যপ্রদেশ রাজ্যে হাজার হাজার লোক এর প্রতিবাদে এক সমাবেশ করে। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী কমল নাথ বলেন, তার সরকার ওই রাজ্যে কখনোই এ আইন প্রয়োগ করবে না।

আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৫ই ডিসেম্বর সংঘটিত ওই কথিত পুলিশী বর্বরতার তদন্তের জন্য ১৭ তারিখে সেখানে গিয়েছিল একটি তথ্য অনুসন্ধানী দল বা ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং টিম।

তারা বলছে, বিক্ষোভ শুরু হতেই প্রায় ২১ হাজার পড়ুয়াকে বিশ্ববিদ্যালয়ের হোস্টেল থেকে বার করে দেওয়া হয়। তারপরেই বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করে পুলিশ।

ওই তথ্যানুসন্ধানী দলের অন্যতম সদস্য, প্রাক্তন আমলা ও মানবাধিকার কর্মী হর্ষ মন্দার বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন, “আমরা যখন ঘটনার দুদিন পরে বিশ্ববিদ্যালয়তে পৌঁছাই, চারদিকে ধ্বংসের ছবি। আমরা জানতে পারি যে এক দিনের মধ্যে ২১ হাজার ছাত্রকে হোস্টেল থেকে বার করে দেওয়া হয়।”

“যে সহিংস ছাত্র বিক্ষোভের কথা বলা হচ্ছে, সেটা নিশ্চিত করা কঠিন। তবে যদি এটা মেনেও নেয়া হয় যে ছাত্ররা পুলিশের দিকে পাথর ছুঁড়েছিল, তাহলেও কি পুলিশকে ডেকে এনে এভাবে তাদের মার খাওয়াতে হবে?”

“সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ হলো স্টান গ্রেনেড ব্যবহার করা হয়েছে ছাত্রদের ওপরে – যা শুধুমাত্র কোনো সন্ত্রাসী হামলার সময়ে ব্যবহার করা হয়। কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে এটা কী করে করা হল?”, বলছিলেন মন্দার।

বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যখন তারা কথা বলেছিলেন, তাদের জবাব কী ছিল তা জানতে চাওয়া হলে মন্দার বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে মনে হয়েছে তারা ছাত্রদের নিরাপত্তা না দিয়ে উল্টা পুলিশ আর সরকারের সুরে কথা বলছে!”

“যদি বিশ্ববিদ্যালয়ে পুলিশ ডাকতেই হয়, তাহলেও তো যথেষ্ট সতর্কতার মধ্যে দিয়ে তাদের কাজ করা উচিত ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার উত্তর প্রদেশ পুলিশের একজন কর্মরত অফিসার। এটা কী ভাবে সম্ভব হয়?”

বিবিসির সংবাদদাতারা ওই ঘটনার প্রতিবেদন করতে গিয়ে যে ছাত্রদের সঙ্গে কথা বলেছিলেন, তারা জানিয়েছিলেন যে অন্তত ২৫ থেকে ৩০ জন ছাত্র গুরুতর আহত হয়েছিলেন সেদিন।

এদের মধ্যে একজন – মুহাম্মদ তারিকের হাতেই একটি গ্রেনেড শেল ফেটে যায়। তার হাত অপারেশন করে বাদ দিতে হয়েছে।

ওই ছাত্রর খুব প্রিয় বন্ধু মুহাম্মদ আরশাদ বিবিসি বাংলার সঙ্গে বুধবার যখন ফোনে কথা বলছিলেন, তখনও যে তিনি বন্ধুর ওই অবস্থা দেখার পর নিজেকে সামলিয়ে উঠতে পারেন নি, তা বোঝা যাচ্ছিল।

আরশাদ জানাচ্ছিলেন, “ঘটনার সময়ে আমি একটি বিয়ে বাড়িতে ছিলাম। সেখানেই বন্ধুর ওই অবস্থার খবর পাই। সঙ্গে সঙ্গেই হাসপাতালে ছুটে যাই। সেখানে আরো অনেক ছাত্র আহত হয়ে এসেছিল। তবে বন্ধুর হাতের আঘাতে আমি এতটাই বিচলিত ছিলাম, যে অন্যদের দিকে তাকানোর পরিস্থিতি ছিল না।”

“প্রাথমিক চিকিৎসার পরেই ডাক্তাররা বন্ধুর হাতের এক্সরে করাতে বলে। তারপরে তারিককে অপারেশনের জন্য নিয়ে যায়। চিকিৎসকরা পরে জানিয়েছেন যে তার হাতের একটা অংশ কেটে বাদ দিতে হয়েছে,” জানাচ্ছিলেন মুহাম্মদ আরশাদ।

পুলিশ অবশ্য তাদের ওপরে ওঠা অভিযোগগুলো মানতে চাইছে না। উল্টো ছাত্ররাই স্টান গ্রেনেড ছুঁড়েছে বলে মন্তব্য করেছে আলিগড়ের পুলিশ।

ওই ঘটনায় ২১ জন পুলিশ কর্মী আহত হয়, আর সেদিনের ঘটনায় জড়িত সন্দেহে ২৬ জনের বিরুদ্ধে খুনের চেষ্টার অভিযোগও দায়ের করা হয়। এদের মধ্যে অনেকেই বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের নেতাকর্মী।
সূত্র : বিবিসি

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন