, ১ জানুয়ারি ২০২১; ২:৩৬ অপরাহ্ণ


… ড. মিহির কুমার রায়

ব্যাংকিং খাত দেশের সার্বিক উন্নয়ন, ব্যবসায় প্রসার ও অভ্যন্তরীণ উৎপাদনে বিশেষ অবদান রেখে চলছে ক্রমাগতভাবে। তারপরও এই খাতটিকে নিয়ে ব্যবসা গবেষক, অর্থনীতিবিদ ও সমাজ সংস্কারকদের আলোচনার কোন শেষ নেই। অতি সম্প্রতি একটি প্রথম শ্রেণীর দৈনিক পত্রিকায় খবর এসেছে সরকারী ও বেসরকারী খাতে ২৩টি ব্যাংক খেলাপি ঋণের ভারে ন্যুব্জ যেখানে উল্লেখিত হয়েছে প্রতিটি ব্যাংকে খেলাপি ঋণের পরিমাণ এক হাজার কোটি টাকারও বেশি। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে বেশি করে খেলাপি ঋণে আক্রান্ত ব্যাংকগুলোর ব্যাপারে মনিটরিং জোরদার করা হচ্ছে এবং আদায় বাড়িয়ে খেলাপি ঋণের হার কমাতে নির্দেশনা দেয়া হযেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী দেশের খেলাপি ঋণের সঙ্গে অবলোপন কৃত ঋণের পরিমাণ যুক্ত করা হলে তা দাঁড়ায় ১ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকায়।

সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংকগুলোতে তারল্য সঙ্কট, সুদের হার নয় ছয়ে নামানো, ক্যাশ রিজার্ভ অনুপাত এক শতাংশ কমিয়ে ৫.৫ শতাংশ নিয়ে আসা ও বিএবি এর দাবির মুখে সরকারী আমানতের অর্ধেক বেসরকারী ব্যাংকে রাখা ইত্যাদি খুবই আলোচিত খবর। সরকারের সঙ্গে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর এই সকল আঁতাত সত্যিকারে অর্থে ব্যাংকের সার্বিক উৎপাদনশীলতায় কিংবা বিনিয়োগে কোন প্রভাব ফেলছে কি। এই বিষয়গুলোর ওপর যে সকল গবেষণা সময় সময় ব্যাংকিং খাতে বৃহত্তর গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম) করছে বা করে চলছে তাদের উপাত্তের প্রধান উৎসগুলো হলো বার্ষিক বিপোর্ট।

কিন্তু মাঠ গবেষণার ভিত্তিতে প্রাথমিক স্তরের বিভিন্ন পর্যায়ে অবস্থিত সুফলভোগী কিংবা গ্রামের ব্যাংকের কাছ থেকে সরেজমিনে তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত প্রতিবেদন তৈরি কিংবা উপস্থাপন না হওয়ায় ঋণ খেলাপীর মতো সমস্যাগুলোর প্রকৃতস্বরূপ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর হয়ে পড়েছে। এখন প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে দেশের মোট বিনিয়োগ বা ঋণের মাত্র ২ শতাংশ গ্রামীণ অর্থনীতিতে যায় যেখানে ঋণ খেলাপীর সংখ্যা খুবই সীমিত। এই চিত্র শুরু ব্যাংক কর্তৃক বিভিন্ন কর্মসূচীতে বিশেষত কৃষি ও পল্লী ঋণ কর্মসূচীর আওতায় প্রদেয় চিত্র। কিন্তু আমরা যদি ক্ষুদ্র ঋণের চিত্র দেখি তাহলে আদায় কিংবা শ্রেণী বিন্যাশকৃত ঋণের চিত্র খুবই পরিষ্কার যে, স্বল্প আয়ের কৃষক কিংবা উদ্যোগক্তারা কখনও ঋণ খেলাপী করে না।

অপরপক্ষে ঋণ খেলাপীর শীর্ষে থাকে সব সময় বৃহদাগার ঋণ গ্রহীতারা। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় সরকারী ৭টি ব্যাংকের মধ্যে বেসিক ব্যংকের ঋণ খেলাপী ৮ হাজার ৫৯৪ কোটি টাকা যা মোট ঋণের ৫৯ দশমিক ২২ শতাংশ, জনতা ব্যাংকের ঋণ খেলাপী মোট ঋণের ২২ দশমিক ৩৪ শতাংশ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের ২৩ দশমিক ৩৭ শতাংশ। আবার বেসরকারী ব্যাংকগুলোর মধ্যে এবি ব্যাংকের ৬ দশমিক ৬২, ন্যাশনাল ব্যাংকের ৬ দশমিক ১৭ শতাংশ, পূবালী ব্যাংকের ৯ দশমিক ২৮ শতাংশ ঋণ খেলাপী রয়েছে। যার বেশির ভাগই বৃহদাকার ঋণ যাকে বলা হয় কুঋণ যা আদায়ের সম্ভাবনা একেবারেই কম।

এই সকল আদায়ে যে সকল আইনী ব্যবস্থা রয়েছে তার মধ্যে পিড়ি আর এ্যাক্ট, অর্থঋণ আদালত, মানি লন্ডারিং আইন উল্লেখ্যযোগ্য। যা কেবল দীর্ঘস্থায়ীই নয় ব্যয়বহুলও বটে যা ব্যাংকের মূলধন খরচ বাড়িয়ে দেয়, লাভ কমায় এবং একটি স্থায়ী বোঝা হিসাবে ব্যাংকের কাছে ধরা দেয়। তার মাঝেও আদয়ের ক্ষেত্রে কিছু কিছু সুফল উদাহরণও রয়েছে যা উল্লেখ করার মতো। সম্প্রতি খেলাপী ঋণ সংক্রান্ত একটি টকশোতে আলোচনা কারি হিসাবে অংশগ্রহণ করে অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান বলেছিলেন খেলাপী ঋণ গ্রহীতাদের সঙ্গে কর্তৃপক্ষ সংলাপ শুরু করেছে। তাদের বিভিন্নভাবে নৈতিক কায়দায় বসে আনার চেষ্টা করা হয়েছে এবং ঋণের আশ্বাস দেয়ায় ঋণ আদায়ের শুভ সূচনাটা ভাল হয়েছিল। তাদের মতে একইভাবে গুণগত পদ্ধতিতে যদি আগানো যায় তাহলে দেশের ব্যাংকগুলোতে খেলাপী ঋণের যে জটের সৃষ্টি হয়েছে তার অনেকাংশে লাঘব হবে। এখন দেশে প্রচলিত খেলাপী ঋণের আদয়ের যে পদ্ধতি রয়েছে তা অনেকটা গতানুগতি তা থেকে বেরিয়ে আসার উদ্যোগ গ্রহণ করার সময় এসছে।

এ ব্যাপারে প্রতিবেশী দেশগুলোর অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো যেতে পারে যেমন নেপালের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য মতে দেখা যায় যে এই ক্ষুদ্রকায় দেশটিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কার্যক্রম বাংলাদেশের তুলনায় অনেক বেশি গতিশীল বিধায় খেলাপীর পরিমাণ মোট ঋণের মাত্র ২ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে ৩ দশমিক ০ শতাংশ । এর কারণ হলো খেলাপী ঋণকে এই দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক রাজনীতির প্রভাবমুক্ত রাখতে সক্ষম হয়েছে, দ্বিতীয়টি হলো খেলাপী ঋণদের তারা প্রত্যক্ষ তদারকির মধ্যে রাখতে সক্ষম হওয়া এবং বিভিন্ন ধরনের সুযোগের আশ্বাস দেয়া প্রচলিত নিয়মকানুনের মাধ্যমে যার মধ্যে ঋণ ফেরত দিয়ে পুনঃঅর্থায়ন, যৌক্তিক কারণে যদি ঋণ খেলাপী হয় যেমন কোন দুর্ঘটনা, ফসলহানি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ইত্যাদি তাহলে ক্ষেত্র বিশেষ মওকুপের ব্যবস্থা করা, ঋণ খেলাপীদের সঙ্গে মানবিক আচরণ করা এবং প্রযোজন বোধে আইনের আশ্রয় নেয়া।

ব্যাংক একটি বিধিবদ্ধ সংস্থা যা ব্যাংকিং কোম্পানি আইন দ্বারা পরিচালিত এবং এই ব্যবস্থায় অস্পষ্টতা থাকার কোন সুযোগ নেই। কিন্তু যারা বাস্তবায়ন করার প্রক্রিয়ায় জড়িত তাদের অসাধুতার কারণেই অঘোষিত লেনদেনের কারণে ঋণ গ্রহীতা ঋণ ফেরত দিতে আগ্রহী হয় না। আবার এই প্রক্রিয়ার বিতরণকৃত টাকা ব্যাংক শাখার তদারকিতেও তেমন স্থান পায় না। আরও তথ্য আসে যে এই ধরনের ঋণ অনুৎপাদন খাতে বেশি ব্যয়িত হয় এবং দেশের বাহিরে পাচার হয়ে যায়। ফলে মাঠপর্যায়ে ব্যাংক শাখা ব্যবস্থাপকগণ ঋণ খেলাপীর হয়ে যাওয়ার আতঙ্কে উৎপাদনশীল বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত বোধ করছে। ফলে বিনিয়োগ থেকে যে ব্যাংকে আয় তা তলানিতে চলে এসেছে অথচ আয় করতে লোন ও অগ্রণী ব্যাংকের সকল আয়ের খাতগুলোর মধ্যে অন্যতম। অথচ ব্যাংক বলছে তারা লাভে যাচ্ছে।

এখন প্রশ্নটি হলো কিভাবে? সেগুলো হলো নন ইনভেস্টমেন্ট আয় যেমন ফিডিং ব্যাঞ্চে ফান্ড স্থানান্তর, কমিশনিং, ডিসকাউনটিং অব বিলস, অভার ড্রাফট ইত্যাদি। সেগুলো হয়ত ব্যাংকের আয় বাড়ায় কিন্তু বিনিযোগ না করে আয় করায় দেশের উৎপাদশীল খাত ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে না সরাসরি দেশের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে নীতিবাচক প্রভাব ফেলছে যা সমর্থন যোগ্য নয়। বর্ণিত অবস্থায় খেলাপী ঋণ কমিয়ে ব্যাংকের মুনাফা বাড়াতে তাগিদ দিচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কিন্তু তা কিভাবে সংগঠিত হতে পারে। এই ব্যাপারে কোন সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থাপত্র নেই। এ পরিস্থিতিতে প্রয়োজন ঋণ বিতরণ ও আদায়ে সমতা বিধান করা।

ঋণ বিতরণ যদি স্বচ্ছতার সঙ্গে উৎপাদনশীল খাতে হয় তাহলে আদায়ের অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। এ ব্যাপারে ব্যাংকার কাস্টমারের নৈতিকতার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। যারা অসাধুতাকে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে পরিচালিত করে তারা উভয়ই সমান দোষী। এ ব্যাপারে প্রথমে ব্যাংকার দের সতর্ক হতে হবে এবং পরবর্র্তীতে গ্রাহকদেরও এই পথ অনুসরণ করতে হবে।

দেশের ৩৯টি বেসরকারী ও ৪টি সরকারী বাণিজ্যিক ব্যাংক সাধারণত আর্থিক বাজারের অংশ হিসাবে স্বল্প মেয়াদে গৃহীতাদের ঋণের চাহিদা পূরণ করার কথা। কিন্তু বাস্ততে দেখা যায় এই ব্যাংকগুলো দীর্ঘ মেয়াদে চার পাঁচ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ দিয়েছে যার বেশির ভাগ খেলাপী ঋণে পরিণত হয়েছে।

এখন বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো নিয়মনীতি ভঙ্গ করে ঋণ দেয়া এবং ঋণ খেলাপি হওয়ার মতো একটি যাতনাকে বয়ে বেড়াচ্ছে যার ফলাফল তারল্য সঙ্কট, মুনাফার ঘাটতি ও ইমেজ সঙ্কট। অথচ দীর্ঘ মেয়াদে বৃহদায়কার ঋণ প্রদানের জন্য বিশেষায়িত ব্যাংক যেমন বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক ( বিডিবিএল), বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক (বিকেবি), বেসিক ব্যাংক, রাকাব ইত্যাদি রয়েছে যারা সরকারী ব্যাংক হিসাবে সরকারের সাহায্যপুষ্ট হয়ে বেশি সময়ের অর্থায়নে অংশ নিতে পারে।

এই সঙ্গতিগুলো দূর করা প্রয়োজন। ব্যাংকিং খাতের বৃহদাকার ঋণগুলোর স্বচ্ছতার ভিত্তিতে মূল্যায়ন না হওয়ার অনেক অলাভজনক খাতেও ঋণ বিনিয়োগ হচ্ছে যা পরবর্তীতে খেলাপি ঋণে পরিণত হয়। আবার রাজনৈতিক বিবেচনায় অনেক লোন মঞ্জুর করা হয় যার বেশিরভাগ অনুৎপাদনশীল খাতে চলে যার পরিণতি হয় খেলাপি ঋণ।

ব্যাংকিং এর মতো সেবাধর্মী আর্থিক খাতটিকে রাজনীতি মুক্ত রাখা প্রয়োজন। ঋণ মওকুফ, ঋণের পুনঃতফসিলিকরণ, ঋণের অবোলপন ইত্যাদি বিষয়গুলো এখন খুবই ক্ষতিকর ও অলাভজনক। ব্যাংক ঢালাওভাবে সবাইকে সুযোগ দিতে পারে না। সর্বশেষ বলা যায় সরকার যদি সচেষ্ট হয় তবে সমাজিকভাবে এই সকল খেলাপি ঋণের মোকাবেলা করাও সম্ভব আবার প্রশাসনিকভাবেও সম্ভব। কর্তৃপক্ষ শিল্পের স্বার্থে আর্থিক খাতের এ সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধান করবে বলে আশা করা যায়।-

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন