মঙ্গলবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২১; ৩:০৯ পূর্বাহ্ণ


…হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণ

বস্তুত একটি দেশের উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন সামাজিক সম্প্রীতি। সুষ্ঠু রাজনৈতিক সংস্কৃতিই কেবল পারে সমাজের স্থিতিশীলতা আনতে। প্রতিহিংসার বদলে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ সুষ্ঠু রাজনৈতিক সংস্কৃতির ধারা গড়তে সাহায্য করে। রাজনৈতিক শক্তিকে একচ্ছত্র ব্যবহার করে ক্ষমতা ও সম্পদ কুক্ষিগত করলে গণতন্ত্র বিপন্ন হয়। গণতন্ত্র বিপন্ন হলে সামাজিক সম্প্রীতিও বিনষ্ট হয়। আর তখনই দেশের অভ্যন্তরে দৃশ্যমান হয় নানা ষড়যন্ত্র, অনিয়ম, অব্যবস্থাপনাসহ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি। এরই অংশ হিসেবে দেশে আজ পরিকল্পিতভাবে সংঘটিত হচ্ছে রাজনৈতিক কর্মী হত্যা-গুম, বিদেশি হত্যা, পুলিশি হত্যা, শিয়া সম্প্রদায়ের ওপর হামলা ও হুমকির ঘটনা ঘটছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন।

রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সৌহার্দ্যপূর্ণ সৌজন্যমূলক সংস্কৃতি চালু নেই বলেই আজ সামাজিক বিশৃঙ্খলা দেখা যাচ্ছে। এর ফলে সমাজে বড় ধরনের বিপর্যয় সৃষ্টি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। তা ছাড়া বাংলাদেশে এখন বড় ধরনের রাজনৈতিক সংকট চলছে তা কোনোভাবেই অস্বীকার করা যাবে না। এ কারণে বাংলাদেশের মানুষ আজ দারুণভাবে উত্কণ্ঠিত। এ পরিস্থিতিতে যেকোনো সময় যেকোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটতে পারে বলে বিশিষ্টজনদের অভিমত আছে। সে কারণে দৃশ্যমান রাজনৈতিক সমস্যা সমাধানে আমাদের সবার মানসিকতার পরিবর্তন হওয়া দরকার।

রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সমালোচনা থাকবে, তবে সেটা যে পরিমাণে অশ্রদ্ধাবোধ, প্রতিহিংসা ও গালাগালের সংস্কৃতিতে রূপান্তরিত হয়েছে, সেখান থেকে সবাইকে বেরিয়ে আসতে হবে। আবার ব্যাপক জনসংখ্যা অধ্যুষিত সমস্যাসংকুল এই ছোট্ট দেশটির সামাজিক পুঁজির খুব অভাব। সামাজিক পুঁজি গঠন, এর যথার্থ ব্যবহার, বিনিয়োগ করতে না পারলে সামগ্রিক উন্নয়ন ব্যাহত হবে। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টাই পারে এ সংকট থেকে উত্তরণ করতে।

আমাদের আয়ের পরিধি বাড়ছে। মধ্যবিত্তের পরিধি সম্প্রসারিত হচ্ছে কিন্তু সেই তুলনায় বিনিয়োগ বাড়ছে না। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তার অভাবই এর বড় কারণ। অনেক বিদেশি মানবাধিকার সংস্থার মতামতে বলা হচ্ছে, বাংলাদেশের সার্বিক মানবাধিকার পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। তারা এটাও বলছে, মুক্ত লেখালেখির মধ্যে যাঁরা জড়িত তাঁরাসহ তাঁদের বইয়ের প্রকাশকরাও আজ খুনের শিকার হচ্ছেন।

বিরোধী রাজনৈতিক আদর্শ বা ভিন্ন মতাবলম্বীরা তো গুম-খুনসহ জেল-জুলুম, হুলিয়া-নির্যাতনের শিকার হচ্ছে আরো বেশি। সেই সঙ্গে গণমাধ্যম আছে নানা চাপের মুখে। অনেকের মতে, বর্তমানে যা হচ্ছে বা চলছে এরশাদের স্বৈরাচারী শাসনের সময়ও এতটা ছিল না। রাজনীতিসহ বেসরকারি গণমাধ্যমগুলোর স্বাভাবিক কার্যক্রম অব্যাহত ছিল। বরং সে সময়ের তুলনায় এখন রাজনীতিবিদ, গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের স্বাধীন মত প্রকাশের সুযোগ ক্রমান্বয়ে সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে। যা গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিকাশের ক্ষেত্রে বড় অন্তরায় সৃষ্টি করছে। যার বিরূপ প্রভাব পড়তে শুরু করেছে আমাদের মূল্যবোধ, সংস্কৃতি, রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর।

বলাবাহুল্য, স্বাধীন মত প্রকাশ ছাড়া গণতান্ত্রিক সমাজ কল্পনা করা যায় না। একদিকে স্বাধীন মত প্রকাশের ক্ষেত্রগুলো সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে ধর্মীয় উগ্রবাদের বিস্তার, অসহিষ্ণুতা ও সহিংসতার বিস্তার ঘটছে; এগুলো বর্তমানে আমাদের প্রত্যক্ষ করতে হচ্ছে। সরকার যদি মনে করে সামাজিক যোগাযোগের ক্ষেত্রগুলোসহ গণমাধ্যম ও ভিন্নমত প্রকাশের পথ সংকুচিত করে বা ব্যাপকভাবে নিয়ন্ত্রণ করে সমাজে শান্তিশৃঙ্খলা ও আইনের শাসন ফিরিয়ে আনা সহজসাধ্য হবে, সেটি হবে মারাত্মক ভুল চিন্তা। বরং এ ক্ষেত্রে মত প্রকাশের স্বাধীনতা উন্মুক্ত করে দিলেই সমাজের অসংগতিগুলো বেরিয়ে আসার সুযোগ পাবে।

ক্ষমতালিপ্সা ও ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে দেশ ও জনগণের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া সবার কর্তব্য হওয়া উচিত। সাংবিধানিক সংস্থাসহ রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রমও ব্যক্তি তথা শ্রেণি-গোষ্ঠী বা দলীয় স্বার্থে পরিচালিত না হয়ে দেশ ও জনগণের স্বার্থে পরিচালিত হওয়া প্রয়োজন। এসব প্রতিষ্ঠান ব্যক্তি বা দলীয় স্বার্থে পরিচালিত হওয়ার কারণে সমাজে, জাতিতে আজ বিভাজন খুব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এ বিভাজনের সংস্কৃতি আমাদের কোন অন্ধকারে নিয়ে যাবে তা আজ ভাবার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সংসদে আজ শক্তিশালী বিরোধী দলের অভাবে শাসক দল একতরফাভাবে দেশ শাসন করছে। ফলে সরকার ও সংসদের বাইরের বৃহত্তম বিরোধী দলের মধ্যে দূরত্ব যেমন বেড়েছে তেমনি রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের অভাবে বিভাজনের রাজনীতির ক্ষেত্রগুলো আরো সম্প্রসারিত হয়েছে। অধিকন্তু রাষ্ট্র ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর সরকারের রাজনৈতিক ও আদর্শগত একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি বিকাশের অন্তরায় হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে। সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ভবিষ্যত্ নিয়ে আরো বেশি শঙ্কা তৈরি হচ্ছে। অথচ এ দেশে স্বাধীনতার সংগ্রাম থেকে শুরু করে প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের সম্পৃক্ততা এ কারণে ছিল যে দেশে পূর্ণাঙ্গ গণতন্ত্র, আইনের শাসন, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠিত হবে। সর্বোপরি নিশ্চিত হবে মানবাধিকার। রাজনৈতিক দলসহ রাজনীতিবিদরা জনগণকে এসব মূল্যবোধ দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করার প্রতিশ্রুতি দিলেও তাঁরাই এখন এ সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসেছেন। ফলে গণতন্ত্র আজ সংকটাপন্ন অবস্থায় নিপতিত হয়েছে।

বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে উন্নত বিশ্বসহ উন্নয়নশীল বিশ্বের অধিকাংশ দেশ এখন আর কোনো একটি একক মৌলিক সংস্কৃতির ধারক বা বাহক নয়। প্রতিটি সংস্কৃতি বিশ্বায়নের প্রভাবে তার নিজস্ব মূল্যবোধ, আদর্শ, প্রথা, বিশ্বাস, লোকাচার প্রভৃতি হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে, যাকে আমরা নেতিবাচক প্রভাব বলতে পারি। আবার বিশ্বায়নের ফলে স্থানীয় সংস্কৃতির ক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রভাবও পড়ে থাকে।

তবে আমাদের উচিত হবে নেতিবাচক প্রভাবগুলো বাদ দিয়ে ইতিবাচক প্রভাবগুলো গ্রহণ করা। তাহলেই কেবল শুদ্ধ সমাজ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে। তখন সমাজকে একটি সংগঠিত ব্যবস্থা হিসেবে গণ্য করে একটি নিয়মের মধ্যে সংযুক্ত করা যাবে। আর সামাজিক সমস্যা তখন উদ্ভূত হয় যখন সমাজবদ্ধ মানুষের প্রচলিত বিশ্বাস, ধ্যান-ধারণার মূলে নীতিহীন, অন্যায়-বিচারহীনতার সংস্কৃতি সর্বত্র দৃষ্টিগোচর হয়। তখন আদর্শ সমাজের পরিবর্তে নীতিগর্হিত সামাজিক আদর্শের প্রভাবে সামাজিক বিশৃঙ্খলা তৈরি হয় এবং রাষ্ট্রের বিপর্যয় ডেকে আনে।

পরিশেষে বলা যায়, আজ সব শ্রেণি-পেশার মানুষের মুখে একটি কথাই উচ্চারিত হচ্ছে তা হলো, রাজনীতি ও সমাজনীতি সব ধরনের অপসংস্কৃতি (অর্থাত্ সংস্কৃতির ক্ষতিকর দিক) থেকে মুক্ত হয়ে তথা সমাজে দৃশ্যমান অসংগতিগুলো দূর করে ভবিষ্যত্ প্রজন্মের জন্য একটি সুন্দর ও আলোকিত সমাজ গড়ে তুলতে হবে। এ বিষয়ে আন্তরিকতা নিয়ে রাজনীতিকসহ দেশের সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে একযোগে কাজ করতে হবে। একটা জ্ঞানভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিতে হবে।

বলাবাহুল্য, রাজনৈতিক দল, বিশেষ করে দেশের প্রধান দুটি রাজনৈতিক দলের সম্পর্ক শত্রুতায় পর্যবসিত হওয়ায় আজ গণতন্ত্র, উন্নয়ন হুমকির মুখে পড়েছে। এতে রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে সংঘাত-সহিংসতা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের উপায় হচ্ছে, পারস্পরিক সহনশীলতা ও সমঝোতার পরিবেশ সৃষ্টি করা। দেশে সমঝোতার রাজনীতি, সহনশীল আচরণ ও গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে হলে রাজনীতিবিদদের অবশ্যই আইন-নিয়মকানুনের প্রতি দায়িত্বশীল থেকে পরিচ্ছন্ন ও রুচিশীল মনমানসিকতার পরিচয় দিতে হবে। যার মাধ্যমে সমাজের ভুলভ্রান্তিগুলো সমাধান করে, সংশোধন ও পরিবর্তন করে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে পারি। আর তখনই কেবল অপসংস্কৃতির চর্চা রুদ্ধ হয়ে একটা শুদ্ধ, শান্তিময়, সুখকর সমাজব্যবস্থা গড়ে উঠবে—অন্যথায় নয়।

লেখক : চেয়ারম্যান, ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন