শুক্রবার, ২ জানুয়ারি ২০২১; ১১:৪৭ অপরাহ্ণ


জেনারেল কাসিম সুলাইমানি

// ড. যুবায়ের এহসান হক

কাসিম সুলাইমানি বর্তমান দুনিয়ার অন্যতম সেরা কুশলী সামরিক কমান্ডার। মধ্যপ্রাচ্যে ইরানি ছায়াযুদ্ধে সাফল্যের প্রধান রূপকার, সিরিয়ার শিয়া প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের ত্রাতা ও আইএস জর্জরিত ইরাকের পুনরুদ্ধারকারী এই জেনারেলের হত্যাকাণ্ড নিঃসন্দেহে একটি মহাঘটনা। এ মূহুর্তে এটি অবশ্যই যুক্তরাষ্ট্র ও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সাফল্য বলে বিবেচিত হবে। তবে সফলতা স্থায়ী হবে কিনা বুঝা যাবে, ইরানের প্রতিক্রিয়া কতটা ঝাঁঝালো হয়, তার ওপর।

কিন্তু কে এই সুলায়মানি?

মাত্র বিশ বছর বয়সে কাসেম সুলাইমানি সামরিক বাহিনীতে যোগ দিয়ে ইরাক-ইরান যুদ্ধে অংশ নেন। সামরিক দক্ষতা ও দৃঢ়তার কারণে পদোন্নতির এক পর্যায়ে 1998 সালে তিনি বিপ্লবী গার্ডের কুদ্স ব্রিগেডের কমান্ডার হন। তৎপূর্বে আফগান-ইরান সীমান্তে দায়িত্ব পালনের সময় মাদকপাচার নিয়ন্ত্রণে তিনি ভূমিকা পালন করেন।


সুলাইমানির ভূমিকা ইরানের বাইরে লেবানন, ইরাক ও সিরিয়ায় পরিব্যাপ্ত। 2008 সালে ইরাকি সেনাবাহিনী ও মুক্তাদা আল-সদরের অনুগত মাহদি বাহিনীর মাঝে যুদ্ধের উপক্রম হয়, তখন সুলাইমানি মধ্যস্থতার ভূমিকা পালন করেন।

২০১১ সালে সুলাইমানি মেজর জেনারেল হতে জেনারেল পদে উন্নীত হন। এ সময় আলি খামেনী তাকে জীবিত শহীদ উপাধি দেন।

মধ্যপ্রাচ্যে ইরানি প্রভাব বিস্তারের মূল কারিগর সুলাইমানি। তাকে হিজবুল্লাহ-এর সামরিক উইং-এর কার্যকরী প্র্ধান বলে গণ্য করা যায়। ২০১২ সালে তিনি সিরিয়ান হিজবুল্লাহ-এর নেতৃত্ব দিয়ে বাশার-বিরোধী সুন্নি বাহিনীগুলোকে নির্মূল করেন। আল-কাসির এর যুদ্ধে সুলাইমানিকে সরাসরি অংশগ্রহণ করতে দেখা যায়।

ইরাককে আইএসমুক্ত করার লড়াইয়ে সুলাইমানি ভূমিকা পা্লন করেন, বিশেষত মুসেল ও ফাল্লুজা পুনরুদ্ধারে। তাই এক ইরাকি মন্ত্রী স্বীকার করেছেন, সুলাইমানি না হলে হায়দার এবাদির সরকার প্রবাসী সরকারে পরিণত হত আর ইরাক হত অস্তিত্বহীন।

অতি সম্প্রতি মার্কিন নাগরিক হত্যার অজুহাতে যুক্তরাষ্ট্র ইরাক ও সিরিয়ার কয়েকটি হিজবুল্লাহ ঘাঁটিতে বিমান হামলা করে। এতে প্রায় ত্রিশজন নিহত হয়। জবাবে উত্তেজিত হিজবুল্লাহ সমর্থকরা বাগদাদের মার্কিন দূতাবাসে হামলা করে আগুন ধরিয়ে দেয়। এই উত্তেজনার সুযোগে মার্কিনীরা তাদের আপাতত বড় সাফল্য বাগিয়ে নিল। ৩ জানুয়ারি প্রত্যুষে বাগদাদ বিমানবন্দরের কাছে মার্কিন বিমান হামলায় জেনারেল সুলাইমানি নিহত হন।

বাংলাদেশের ফেসবুক ব্যবহারকারীদের অনেকে ইন্নালিল্লাহ লিখছেন, অনেকে আল-হামদুলিল্লাহ! সুলাইমানি আমেরিকার আতঙ্ক ছিলেন, কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু ইরাক-সিরিয়ার সুন্নি ভাইদের সাথে কথা বলার সুযোগ থাকলে জানতেন, তিনি আরব সুন্নিদের মহাত্রাস। ইরাকি জনমিতির হালনাগাদ তথ্য দেখুন, গত পাঁচ বছরের সুন্নিদের শতাংশ কী হারে কমছে। আইএস নির্মূল কি সেখানে সুন্নিনিধনে পরিণত হয়নি? সুলাইমানি তাঁর ইমাম খামেনির বিশস্ত সেনাপতি, তার দেশ ইরানের স্বার্থ সংরক্ষক। মধ্যপ্রাচ্যে সাংস্কৃতিক ও সামরিক ইরানের বিস্তারে তাঁর ভূমিকা অপরিসীম। কিন্তু তাঁর চেতনাকে নিখাদ উম্মাটিক চেতনা হিসেবে গণ্য করা দুষ্কর। এমতাবস্থায় তাঁর হত্যাকাণ্ডে খোশ ও নাখোশ যারা হচ্ছেন তাদের ভেবেচিন্তে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করা উচিত।

তবে মুসলমানদের লাভ-ক্ষতি কি হল সেটা তর্কসাপেক্ষ। ট্রাম্পের যে লাভ হয়েছে, তাতে কোন সন্দেহ নেই। কুড়ির নির্বাচনে তিনি নিশ্চয় এ মহাসাফল্যকে পুঁজি করবেন। অবশ্য এটি নির্ভর করছে ইরানের প্রতিক্রিয়ার ওপর। যা হোক না কেন্ নিকট ভবিষ্যতে ইরান আরেকজন সুলাইমানিকে পাবে, এমন কোন গ্যারান্টি নেই।

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন