রবিবার, ১২ জুন ২০২১; ৪:৪৭ অপরাহ্ণ


ছবিঃ আহমদ ছফা

সম্প্রতি আহমদ ছফার ইতিহাস ভাবনা নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন। আমি মনে করি লেখক ছফা নিঃসন্দেহে বাহবা পেতে পারেন। তবে ইতিহাসের নির্মোহ বিশ্লেষণের মানদণ্ডে দেখলে অনেকক্ষেত্রে একচক্ষু হরিণের মত আচরণ করেছেন তিনি।

ছফার ইতিহাস বিষয়ক লেখা পাঠ করতে গেলে তাই এ বিষয়গুলোতে দৃষ্টি দেয়াটা জরুরী। অন্যদিকে যারা ইতিহাস লিখেন সেটা নিছক একটা অতীত ঘটনার বিবরণ দিতে থাকেন এমন নয়, এটা নিজ জ্ঞানকেন্দ্রাভিমুখী বিশ্লেষণও বটে। তবে তিনি এখানে কি লিখবেন সেটা তথ্যসূত্র ও পদ্ধতিনির্ভর হয়েছে কিনা সেটা সবার আগে যাচাই করে দেখা উচিত। এদিক থেকে দেখলে ছফার চিন্তার অভিমুখ ভিন্ন, বাস্তবে তিনি তো মনে হয় ইতিহাস লিখতে চেষ্টাও করেন নাই। আর চেষ্টা করলে এমন লাইনের পর লাইন রেফারেন্সবিহীন ঢালাও গল্প তিনি লিখে যেতেন না। তাই তাঁর লেখাকে ইতিহাস ভেবে এত দুশ্চিন্তায় ঘুম হারাম করার প্রয়োজন আপাতত নেই।

আমার ধারণায়, ঐতিহাসিক বোধশক্তি সম্পন্ন কোনো মানুষ তো বটেই একজন বৃদ্ধি-বিবেকলুপ্ত কোনো ইতিহাসপাঠকও এমন মন্তব্য করার কথা নয় যে… [মুসলমানের মন যে এখনো আদিম অবস্থায়, তা বাঙালী হওয়ার জন্যও নয় এবং মুসলমান হওয়ার জন্যও নয়। সুদীর্ঘকালব্যাপী একটি ঐতিহাসিক পদ্ধতির দরুণ তার মনের ওপর একটি গাঢ় মায়াজাল বিস্তৃত হয়ে রয়েছে, সজ্ঞানে তার বাইরে সে আসতে পারে না। তাই এক পা যদি এগিয়ে আসে, তিন পা পিছিয়ে যেতে হয়। মানসিক ভীতিই এই সমাজকে চালিয়ে থাকে। দু’বছরে কিংবা চার বছরে হয়তো এ অবস্থার অবসান ঘটানো যাবে না, কিন্তু বাঙালী মুসলমানের মনের ধরণ-ধারণ এবং প্রবণতাগুলো নির্মোহভাবে জানার চেষ্টা করলে এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার একটা পথ হয়তো পাওয়াও যেতে পারে।]

হেনরি লুই মর্গানের সেই ধারায় আদিম সমাজের বিশ্লেষণের বাইরে কোনো বই পড়া দূরে থাক, প্রাক-ইতিহাসের ধারণাটাই আহমদ ছফা সাহেবের ছিল না। একজন মানুষের জন্য এত বিষয়ের জ্ঞান থাকাটা অবিশ্যি অমন জরুরী কিছুও না।

আমরা ইতিহাস পাঠ করতে গিয়ে দেখছি বাংলাই ভারতবর্ষের একমাত্র প্রদেশ যেখানে কোনো রাজবংশ ধারাবাহিক শাসন করতে পারেনি এই অঞ্চলের বিদ্রোহী জাতিসত্তা, রাজনৈতিক চেতনা আর ঐতিহ্যের পাশাপাশি আর্থিক সমৃদ্ধির কারণে। ছফা এগুলার ধার না ধেরে মুখস্থ মন্তব্য করে দিয়েছেন একটা ঐতিহাসিক পদ্ধতির দরুণ বাঙালির মনের ওপর একটি গাঢ় মায়াজাল বিস্তৃত হয়ে রয়েছে। এখানে উক্ত ঐতিহাসিক পদ্ধতিটিই কি আর ছফা বর্ণিত মায়াজালটাই বা কি তা অদ্ভুত মায়ায় এখানে অনুপস্থিত।

প্রতিটি প্রেক্ষাপট বাদ দেয়া যাক, অন্তত এদিক থেকে চিন্তা করলে সাহসের সঙ্গে বলা যায় ছফার বেশিরভাগ লেখার ইতিকেন্দ্রিকতা শূন্যের কোটায়। আমি উনার বাঙালি মুসলমানের মনকে নিছক একটা ইতিহাসকেন্দ্রিক দীর্ঘ প্রবন্ধ মনে করি, এটা নিয়ে ইসলামপন্থী কিংবা ইসলামবিদ্বেষী কারওই এত মাতামাতি করার কিছু নেই। অন্যদিকে এখানে এমন কোনো নতুন চিন্তাও নাই যা ইতিহাসকেন্দ্রিক গবেষকদের জন্য সুবিধা বা বিপত্তির কারণ হয়। সুলেখক ছফার অতি সুন্দর বর্ণনার এই বই বেশ শান্তি নিয়ে পড়ে শেলফে তুলে রেখে দিয়ে তাই সহজেই একজন পাঠকের দায় শেষ করা যায়। তাই সুলেখক এবং কবি ফারুক ওয়াসিফ যা বলেছেন, তার বক্তব্যের সঙ্গে কিছু কারণে আমি একমত। যেমন, তাঁর ভাষ্যে… [ বিশেষ করে তাঁর এই বইয়ের একটা দাবিও ইতিহাসের নির্মোহ যুক্তি ও তথ্য সমর্থন করে না। এদিক দিয়ে তিনি হুমায়ুন অাজাদেরই কাতারে। কিন্তু রাজনৈতিক অাপসহীনতা ও বাংলাদেশের সম্ভাবনায় অাস্থা তাঁকে ইতিহাসের কাঠগড়ায় হয়তো উত্তীর্ণ করবে।] এজন্যই আমি বলি ছফার লেখার আরও বেশি বেশি নিবর্তনমূলক পাঠ জরুরী। অন্ধ আবেগ নিয়ে ছফা পাঠ ঐতিহাসিক চিন্তার জন্য অনেক দিক থেকে বিপদজনকও বটে।

একই প্রবন্ধে ছফা আরও লিখলেন… [বাঙালী মুসলমান সমাজ স্বাধীন চিন্তাকেই সবচেয়ে ভয় করে। তার মনের আদিম সংস্কারগুলো কাটেনি। সে কিছুই গ্রহণ করে না মনের গভীরে। ভাসাভাসা ভাবে আনেককিছুই জানার ভান করে আসলে তার জানাশোনার পরিধি খুবই সঙ্কুচিত। বাঙালী মুসলমানের মন এখনো একেবারে অপরিণত, সবচেয়ে মজার কথা এ-কথাটা ভুলে থাকার জন্যই সে প্রাণান্তকর চেষ্টা করতে কসুর করে না। যেহেতু আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান এবং প্রসারমান যান্ত্রিক কৃৎকৌশল স্বাভাবিকভাবে বিকাশলাভ করছে এবং তার একাংশ সুফলগুলোও ভোগ করছে, ফলে তার অবস্থা দাঁড়িয়ে যাচ্ছে এঁচড়েপাকা শিশুর মতো। অনেক কিছুরই সে সংবাদ জানে, কিন্তু কোন কিছুকেই চিন্তা দিয়ে, যুক্তি দিয়ে, মনীষা দিয়ে আপনার করতে জানে না। যখনই কোনো ব্যবস্থার মধ্যে কোনরকম অসংগতি দেখা দেয়, গোঁজামিল দিয়েই সবচেয়ে বেশি আনন্দ পায় এবং এই গোঁজামিল দিতে পারাটাকেই রীতিমতো প্রতিভাবানের কর্ম বলে মনে করে। শিশুর মতো যা কিছু হাতের কাছে, চোখের সামনে আসে, তাই নিয়েই সে সন্তুষ্ট।]

লাইনের পর লাইন টানা পড়ে গেলেও এখানে কোনো রেফারেন্স কিংবা বিশ্লেষণের প্রবণতা চোখে পড়ে না। স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিক ছফা তাঁর যা ইচ্ছে লিখে গেছেন। এটা আপনি ইচ্ছে হলে পড়বেন না হলে না পড়বেন। তবে এটা থেকে যারা রেফারেন্স দিতে চাইবেন আমি আরেকদফা সাহস করে বলব আপনাদের ইতিহাসচিন্তা অনেকটা শূন্যের লেভেলে। নাহলে কি একজন লেখক এমনিভাবে তথ্যসূত্র বাদে লাইনের পর লাইন লিখে যেতে পারেন কোনো ঢালাও বিবরণ !!! বিশাল ক্ষোভ থেকে গণ্ডগ্রামের নারীরা যখন একে অন্যেকে উপযুক্ত বিষয় বাদ দিয়ে স্বামী সংসার আর চরিত্র নিয়ে গালাগাল দিতে থাকেন। এই লাইনগুলোতে তেমনি কিছু ক্ষোভের যুক্তিনির্ভর নয় বরং অন্ধ আবেগী বহি:প্রকাশ দেখা যাচ্ছে।

উত্তর-দক্ষিণ, পূর্ব-পশ্চিম না তাকিয়ে চোখ বন্ধ করে তিনি লিখে গেছেন অমিয় বাণী। এ বাণী ধর্মবিদ্বেষী মতান্তরে ইসলাম বিদ্বেষী গল্প উপন্যাসকেও হার মানাবে। …. [সমাজের নীচুতলার কৃষক জনগণকে সংগঠিত করার জন্য ধর্মই ছিল একমাত্র কার্যকর শক্তি। রাজনৈতিক দিক দিয়ে এই আন্দোলন দুটির ভূমিকা প্রগতিশীল ছিল সন্দেহ নেই, কিন্তু সামাজিক দিক দিয়ে পশ্চাদগামী ছিল, তাতেও কোনো সন্দেহ নেই। এই আন্দোলন দুটি ছাড়া, অন্য প্রায় সমস্ত আন্দোলন হয়তো ওপর থেকে চাপিয়ে দেয়া হয়েছে, কিংবা হিন্দু সমাজের উদ্যোগ এবং কর্মপ্রয়াসের সম্প্রসারণ হিসেবে মুসলমান সমাজে ব্যাপ্তিলাভ করেছে। সমাজের মৌল ধারাটিকে কোনো কিছুই প্রভাবিত করেনি। তার ফলে প্রাগৈতিহাসিক যুগের আদিম কৃষিভিত্তিক কৌমসমাজের মনটিতে একটু রংটং লাগলেও কোনো রূপান্তর বা পরিবর্তন হয়নি। মধ্যিখানে কয়েকটি শতাব্দীর পরিবর্তন কোনো ভাবান্তর আনতে পারেনি। বিংশ শতাব্দীতেও এই মনের বিশেষ হেরফের ঘটেনি। বাঙালী মুসলমানের রচিত কাব্য-সাহিত্য-দর্শন-বিজ্ঞান পর্যালোচনা করলেই এ সত্যটি ধরা পড়বে। কোনো বিষয়েই তাঁরা উল্লেখ্য কোনো মৌলিক অবদান রাখতে পারেননি। সত্য বটে, কাজী নজরুল ইসলাম, জসীম উদ্‌দীন প্রমুখ কবি কাব্যের ক্ষেত্রে অসাধারণ সাফল্য অর্জন করতে সক্ষম হয়েছেন। একটু তলিয়ে দেখলেই ধরা পড়বে, উভয়েরই রচনায় চিন্তার চাইতে আবেগের অংশ অধিক। তাছাড়া এই দুই কবির প্রথম পৃষ্ঠপোষক ও গুণগ্রাহী ছিল হিন্দু সমাজ, মুসলমান সমাজ নয়। মুসলমান সাহিত্যকদের রচনার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো হয়তো চর্বিতচর্বণ, নয়তো ধর্মীয় পুনর্জাগরণ। এর বাইরে চিন্তা, যুক্তি এবং মনীষার সাহায্যে সামাজিক ডগ্‌মা বা বদ্ধতাসমূহের অসারতা প্রমাণ করেছেন তেমন লেখক-কবি মুসলমান সমাজে আসেননি। বাঙালী মুসলমান সমাজ স্বাধীন চিন্তাকেই সবচেয়ে ভয় করে। তার মনের আদিম সংস্কারগুলো কাটেনি। সে কিছুই গ্রহণ করে না মনের গভীরে। ভাসাভাসা ভাবে আনেককিছুই জানার ভান করে আসলে তার জানাশোনার পরিধি খুবই সঙ্কুচিত।]

এই লেখার জন্য শত শত প্রশ্ন আমি আহমদ ছফা বেঁচে থাকলে করতাম। কিন্তু তার অন্ধ ভক্তদের সামনে বলার কিছু নেই। শুধু এটুকু বলব.. ছফার ইচ্ছে হয়েছে লিখেছেন। স্বাধীন বাংলাদেশে সবারই অধিকার আছে যা ইচ্ছা লেখার। এটা নিয়ে একাধারে বিরোধিতা কিংবা মাতামাতি দুটোর কোনোটাই করার সুযোগ নাই। চিন্তার শুরুটা যেখানে সুফিবাদ থেকে শুরু হওয়ার কথা, সেখানে ছফা হাউ-মাউ-খাউ শুরু করেছেন কৌম সমাজ থেকে।

একটা সহজিয়া ধারার মধ্য দিয়ে বাংলায় ইসলাম আগমণের যুগ থেকে যে বর্ণনা শুরু হওয়ার কথা তিনি সেটা খামচি দিয়ে ধরেছেন পাল-সেন আমলের কিছু আগের চিন্তা থেকে। সুতরাং লেখার নামে তিনি একটা রেলগাড়ি চালিয়েছেন। কিন্তু কোনটা রেললাইন আর কোনটা প্ল্যাটফর্ম এব্যাপারে তাঁর কোনো ধারণাই ছিল না। সুলেখক ছফার এই প্রবন্ধ তাঁর আবেগী অন্ধভক্ত কারও জন্য আবেগে অশ্রুপাত করার উপলক্ষ্য হতে পারে, তবে একজন চিন্তাশীল ইতিহাসপাঠকের জন্য এতে গ্রহণ-বর্জনের জন্য কিছুই নাই। 

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন