, ১ আগস্ট ২০২১; ১১:০৫ অপরাহ্ণ


—– আহমেদ সাব্বির

বাংলাদেশে ওয়াজিনদের বিতর্কিত কথা-বার্তা নিয়ে তুমল আলাপ চলছে ফেসবুকে। হাস্যকর চাপাবাজি, মূর্খতা পূর্ণ বক্তব্য প্রভৃতির ভিডিওতে সয়লাব হয়ে যাচ্ছে নিউজফিড। অনেকেই এটা নিয়ে তাদের অস্বস্তির কথা জানাচ্ছেন। কেউ কেউ প্রবল সমালোচনা করছেন। তবে বেশিরভাগ মানুষের কাছেই এটা হাজির হচ্ছে একটা বিনোদন হিসেবে যেটা মূলত ফেসবুক সংস্কৃতির একটা স্বাভাবিক দিক- সব কিছুকে বিনোদনের পণ্য হিসেবে দেখা। তবে যারা সিরিয়াস কমেন্ট করছেন, সমালোচনা করছেন, তাদের মধ্যেও বিষয়টিকে বৃহত্তর জায়গায় কানেকট করে দেখবার ব্যর্থতা লক্ষণীয়।

মূলত ওয়াজে হাজির হওয়া ভাড়ামি চাপাবাজি কিংবা সস্তা বক্তব্যের যে জোয়ার সেটাকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখাটা সমস্যার গোড়ায় যেতে বাধা তৈরি করে। বরং এটার সাথে পুজিবাদি অর্থব্যবস্থায় উৎপাদিত বিনোদন সংস্কৃতির কি সম্পর্ক সেটা পর্যালোচনা করা জরুরি। তবে তারও আগে বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে এই বিনোদন সংস্কৃতির সাথে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী মাহফিল সংস্কৃতির সম্পর্ক বিষয়ে একটু আলোকপাত করা যাক।

মাহফিল সঠিক দ্বীন বা ইসলাম প্রচারে কিংবা মানুষের আত্নশুদ্ধিতে কতটা ভূমিকা রাখে সেটা নিয়ে কথা বলা আমার উচিত হবেনা। এটা নিয়ে জ্ঞানী আলেমরা কথা বলবেন। আমি শুধু সাংস্কৃতিক দিকটাতে মনোযোগ দিতে চাই। আমরা যদি এদেশের পপুলার এন্টারটেইনমেন্টের দিকে তাকাই যার মধ্যে সমস্ত মেইনস্ট্রিম কালচারার প্রডাক্ট অন্তর্গত – গান, সিনেমা, নাটক -এটা কিন্তু পুরোপুরি সেকুলার ইন্ডাস্ট্রি। সেকুলার শব্দটি এখানে ব্যবহার করছি কালচার এর দৃষ্টিকোন থেকে।

ধর্মীয় অথরিটি আর বিধি-বিধান দিয়ে পারিচালিত হওয়ার দিক থেকে নয়। ধর্মীয় অর্থে গ্লোবাল এন্টারটেইনমেন্টের সমস্ত ট্রেন্ড স্থান-কাল- পাত্র ভেদে সেকুলার। কিন্তু বাংলাদেশের এন্টারটেইনমেন্ট ইন্ডাস্ট্রি শুধু ধর্মীয় জায়গায় না বরং সাংস্কৃতিক জায়গায় ও সেকুলার। কারণ এখানে ইসলাম, মুসলিম সংক্রান্ত যে কোন চিহ্নকে খুব সতর্কতার সাথে পরিত্যাগ করা হয়। এটা কিন্তু আপনি বলিউডে পাবেন না। ইভেন হলিউডেও পাবেন না।

ইন্ডিয়া তার হিন্দু ধর্মের চিহ্ন উপাদান নিজেদের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার হিসেবে খুব গর্বের সঙ্গে উপস্থাপন করে তাদের সিনেমা গান প্রভৃতিতে। কিন্তু বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক কর্মিদের কাছে আধুনিকতা আর সেকুলারিজম হাজির হয়েছে কেবল ইসলাম ধর্মের বিধি-বিধান ত্যাগ করার মধ্যে নয় বরং আরো একধাম অতিক্রম করে এর সমস্ত চিহ্নকে পরিত্যজ্য ঘোষণা করার মধ্যে। এখানেই মাহফিল কিংবা ওয়াজিনদের তাৎপর্য এবং প্রাসঙ্গিকতা ধরা পড়ে। এটাকে আমলে না নিয়ে ওয়াজিনদের যে কোন সমালোচনা শেষ পর্যন্ত অন্যয্য হতে বাধ্য।

মূলত মাহফিল সংস্কৃতিতে উপস্থিত জনপ্রিয় আলেমরা ইসলামিক জ্ঞান নিয়ে হাজির থাকুক বা নাই থাকুক অন্তত এন্টারটেইনমেন্টের ফর্মে ইসলামের চিহ্ন নিয়ে প্রবলভাবে হাজির। এটা কিন্তু অবহেলা করার বিষয় নয়। তারা কিন্তু এই ফর্মের মধ্য দিয়ে এলিট পপুলার ইন্ডাষ্ট্রির বিপরীতে বিশাল প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। আপনি যদি চিন্তা করেন একটা মেইনষ্ট্রিম গানের কনসার্টে যত না মানুষ হাজির হয় তার থেকে একটা মাহফিলে অনেক বেশি মানুষ হাজির হয়। এখানে কিন্তু মহিলাদেরও বিশাল অংশ গ্রহণ থাকে। আমরা বামপন্থীদের মুখে গ্রামসীর সাব অল্টার্ন বিষয়ে অনেক কথা শুনি- কিভাবে হেজিমনিক এলিট কালচারের বিপরীতে সাবঅল্টার্ন কালচার প্রতিরোধ গড়ে তুলে। এর উপর ভিত্তি করে ওপার বাংলার চিন্তকরা গড়ে তুলেছেন সাব অল্ট্রান স্টাডিজ। ওপার বাংলার সাব অল্টার্নের প্রতিভুরা মুসলিম কালচার এর উপর ভিত্তি করে এলিটদের প্রতিরোধের বিষয়কে খুব বেশি আমলে নেন না। একই ভাবে এ অঞ্চলের বাম পন্থীরাও মুসলিম প্রশ্নকে আমলে নেন না।

ইসলাম বিদ্ধেষের কারণে মাহফিলের মত একটা পপুলার কালচারকে তারা তাদের তৈরি করা লেন্স দিয়ে পর্যন্ত দেখতে অক্ষম হয়ে পড়েন। তাদের চোখে সাব অল্টার্ন কেবল তাদের মতই সমাজ এবং গণ মানুষের উপর প্রভাব বিহিন বয়াতিরা। এজন্যই এর আগে কোথায় যেন বলেছিলাম-বাংলাদেশ এতই ফকিন্নি একটা দেশ যে যারা এখানে নিজেদেরকে সাব অল্টার্ন বলে পরিচয় দেয় সেটা মূলত এলিট হবার বাসনা থেকে উদ্ভূত। সাব অল্টার্ন পরিচয় তাদের জাতে উঠার রাস্তা।এই সাব-অল্টার্ন স্টাডিজের লোকেরা আইডেন্টিটির আলাপ এনে মুখে ফেনা তুলেন। কিন্তু আপনি মুসলিম আইডেন্টেটির আলাপ তোলেন, দেখবেন তারা ওয়ার অন টেরর এর সহযোগী হিসেবে আবির্ভূত হবে আর আপনাকে শায়েস্তা করবার জন্য শাহবাগ কায়েম করবে।

এখন ওয়াজ-মাহফিলে সস্তা মার্কেটেবল কন্টেন্ট নিয়ে কথা বলি- সেকুলাররা যেটা খুব হাই-লাইট করেছেন। কিন্তু এর আগে চলেন তাদেরকে একটু স্মরণ করিয়ে দিই- আপনাদের মেইন স্টিম কালচারাল কন্টেন্টের কি অবস্থা? আপনারা টেলিভিশনে মোশাররফ করিম কিংবা চঞ্চল চৌধুরির সে সব নাটক দেখান তার কন্টেন্ট আলেমদের বয়ান করা কন্টেন্টের থেকে কতগুন বেশি ভালগার সেটা কি বলবেন? আপনারাতো আবার ওয়াজ-মাহফিলে নারী বিদ্ধেষ নিয়ে অনেক সোচ্চার কিন্তু আপনাদের নাটক সিনেমায় নারীর রিপ্রেজেন্টেশন এর কি অবস্থা? আইটেম সং এর ব্যাপারে কি বলবেন আপনারা? নারীকে যৌন কমডিটি আকারে প্রতিনিয়ত এভাবেই হাজির করা হচ্ছেনা?

এটা কেবল প্রকাশ্য দিক। পর্দার আড়ালের চিত্র কত ভয়াবহ মি টু মুভমেন্টের মধ্য দিয়ে কিছুটা হলেও আঁচ করা যায়। এখানে নারী শিল্পীদের বেশিরভাগকে মূলত দেহ বিকিয়ে বিকিয়ে উপরে উঠতে হয়। সস্তা কন্টেন্ট এর ব্যাপারে আরেকটা দিক খেয়াল রাখা দরকার- বাংলাদেশে ডিজিটাল কিংবা প্রিন্ট মিডিয়া মূলত ফেসবুক আর ইউটিউব আসার আগ পর্যন্ত সেকুলার সংস্কৃতির একচ্ছত্র দখলে ছিল। আর এর মধ্যে দিয়ে বানিজ্যিক লাভের উদ্দেশ্যে ঘরে ঘরে টেলিভিশন, রেডিও তে দীর্ঘকাল ধরে সমস্ত সস্তা কালচারাল কন্টেন্ট তৈরি করেছেন কিন্তু তারাই।

মাহফিলে সস্তা বিনোদন খোঁজা এই দর্শক শ্রেণি তৈরিতে কালচারকে কমোডিটি বানানোর এত বছরের তাদের নিরন্তন কর্মের কোন অবদান নাই বলছেন? মাহফিলে বানোয়াট আলাপ বন্ধে নিশ্চয়ই আলেমরা সোচ্চার হবেন, এ আশা রাখি। কিন্তু সেকুলারদের ক্ষোভ আর হিংসাকে পাত্তা দেবার কিছু নাই। তাদের ক্ষোভ মূলত তাদের পরাজয়ের চিহ্ন বহন করে। রাষ্ট্র তাদের হাতে, এলিট সমস্ত মিডিয়া তাদের হাতে। এ সব কিছু স্বত্ত্বেও ইসলামের সাথে অন্তত কালচারালি কানেক্ট হতে মানুষ মাহফিলে হুমড়ি খেয়ে পড়ছে। এটার অন্তরজ্বালা না বোঝার কারণ নাই। আশা করছি আলেম- সমাজ আরো বিজ্ঞতার পরিচয় দিবেন। নিজেদের মধ্যে ঝগড়া ফ্যাসাদ বন্ধ করবেন এবং তাদের আসল শত্রু কে চিনবেন। নিজেদের মধ্যে হেজিমনির লড়াই করে সেই শত্রুকেই শক্তিশালি করা হয়, এটা বোঝার মত বিচক্ষণতা তাদের আছে বলেই মনে করি।

লেখক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালের সাবেক শিক্ষার্থী। বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে বসবাস করছেন।

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন