, ২০ জুন ২০২১; ১১:০১ অপরাহ্ণ


ভারতে নতুন নাগরিক আইন সিটিজেনশীপ এমেন্ডমেন্ট এক্ট বা (সিএএ) এবং নাগরিক পঞ্জি তথা ন্যাশনাল রেজিস্ট্রার অব সিটিজেনস বা (এনআরসি)র বিরুদ্ধে আন্দোলন একমাসেরও অধিক সময় ধরে চলছে। সরকার কিংবা আন্দোলনকারীদের কোনো পক্ষ থেকেই এখন পর্যন্ত ছাড় দেয়ার কোনো মানসিকতা দেখা যাচ্ছে না । বিশ্লেষকরা বলছেন ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপি সরকারের এই আইন শতভাগই সাম্প্রদায়িক এবং বিভেদপূর্ণ। বিশেষত মুসলিমদের বিরুদ্ধেই এই আইন তাতে কোনো রাখডাক রাখতে এখন যেন সরকার আর রাজি নয়।  প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং স্বররাষ্ট্র মন্ত্রী অমিত শাহ’র অনমনীয়তা সেটাই জানান দিচ্ছে বারবার।

সংসদে আইনটি যখন বিল আকারে উত্থাপন করা হয় তখনই নাগরিক মহলের বিভিন্ন স্তর থেকে প্রতিবাদ জানানো হয়েছিলো।  মুসলিমরা রাস্তায় নেমে এই আইনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানালেও শেষ পর্যন্ত বিলটিকে আইন হওয়া থেকে থামানো যায়নি। বরং সেকুলার চরিত্রের বিভিন্ন আঞ্চলিক দলও কেবল মাত্র নিজেদের ভোট ব্যাংকের রাজনীতির জন্য বিজেপির পাশে ছিলো।

তবে নিতিশ কুমার সিএএ সংক্রান্ত মতবিরোধে প্রশান্ত কিশোরের মত এ্যাসেটর দল ত্যাগের মত ঘটনাও ঘটেছে। সব কিছু মিলিয়ে ভারতের রাজনীতি স্পষ্ট বিভেদের মধ্য দিয়েই যাচ্ছে। যথার্ভাবে নরেন্দ্র দামোদর মোদীই নেতৃত্ব দিচ্ছেন এই বিভক্তির।

তবে এই বিভেদের মধ্যে আশার আলো দেখাচ্ছেন ভারতীয় তরুণরা । সিএএ এবং এন আর সি বিরোধী আন্দোলনে বিপুল মাত্রায় তরুনের অংশ গ্রহণ তাই ভারতীয় সমাজে বিজেপির খোলাখুলি ফ্যাসিবাদের সময়েও দক্ষিন এশিয়ার মানুষের মনে কিছুটা আশার আলো জ্বালিয়ে রেখেছে। জহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়, আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়, জামিয়া মিল্লিয়া বা দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের এসব তরুণরা কেবল আন্দোলনে অংশই নিচ্ছেন না বরং নিজ পরিসরে একে অপরের প্রতি সংহতি জানিয়ে নেতৃত্বও দিচ্ছেন নিজ নিজ পরিসরে। বিপদের মুহুর্তে একে অপরের পাশে দাড়াচ্ছেন, সংহতি জানাচ্ছেন এবং প্রতিরোধের শপথ নিচ্ছেন।

কোনো সন্দেহ নেই এটাই এই মুহুর্তের সব থেকে বড় ঘটনা। একই সাথে ভারতীয় সমাজে মুসলিমদের শক্তির জায়গাও।  মোট কথা এই তারুন্য ভারতীয় রাষ্ট্রযন্ত্র কর্তৃক চাপিয়ে দেয়া এই বিভাজনকে অস্বীকার করে অতিক্রম করে যেতে চাইছে এখন।

আজ মাসের অধিক সময় ধরে দিল্লির শাহীনবাগে অবস্থান করছে নারীরা। দক্ষিণ দিল্লীর ওখলার কাছে শাহীনবাগ নামের এক কলোনিতে আন্দোলন চলছে। নাগরিক আইন বিরোধী বিক্ষোভে  জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পুলিশি হামলা হলে নিজ সন্তান ছেলে মেয়েদের ওপর অত্যাচারের প্রতিবাদে নারীদের এক মিছিল বেরোয়। সেই মিছিল থেকেই আওয়াজ ওঠে, যতদিন না সিএএ ফেরত নেওয়া হবে ততোদিন আন্দোলন চলবে। এর পর থেকেই টানা জমায়েত চলছে। এমনকি অতীতের রেকর্ড ভেঙ্গে দিল্লির শীত ১ ডিগ্রিতে নেমে এলেও নারীদের মনোবল তাতে একটুও দমেনি। যা চলছে এখনো। সংহতিতে প্রতিদিনই যুক্ত হচ্ছেন অনেকে।  

পথ দেখাচ্ছেন শাহিনাগের নারীরা

এই বিক্ষোভের উদ্যোক্তা উপস্থিতি সকলেই নারী। ঘর সামলানোর পাশাপাশি আন্দোলনেও শামিল হচ্ছেন দূর দূরন্ত থেকে। তাদের দাবী সিএএ কে ফিরিয়ে নিতে হবে । দেখা গেছে অধিকাংশ নারী তাদের সন্তানকে নিয়েও হাজির হচ্ছেন শাহীনবাগে। প্রবল শীত আর আরএসএস বিজেপির হুমকি ধামকি কিছুই যেন তাদের গতিকে রোধ করতে পারছেনা। ইতোমধ্যে কয়েক দফা হামলার খবরও এসেছে শাহীনবাগের নারীদের উপরে। 

চলমান আন্দোলনে পুরুষদের পাশাপাশি নারীদের এই অংশগ্রহন কেবল ভারতীয় সমাজে নয় বরং দক্ষিন এশিয়া জুড়েই অনন্য নজির রাখছে। পুরুষের পাশাপাশি নারীরা কেবল সহযোগিতামূলক দায়িত্ব পালনের বাহিরে রাজপথের আন্দোলনেও সমান ভুমিকা রাখছে। বিভিন্ন স্থানে নেতৃত্ব দিচ্ছে সংগঠিত করছে। দলিত নেতা ভিম রাও আম্বেদকরের ছবি আর সংবিধান হাতে নিকাব আব্রু সহ নিজের মুসলিম পরিচয়কে উর্ধে তুলে নারীরাই এই আন্দোলনের পথে দেখাচ্ছে।

সমগ্র দক্ষিন এশিয়া জুড়েই নারীদের আর্থসামাজিক অবস্থা সন্তুষ্ট হবার মত কিছু নয়। তা সত্ত্বেও ভারতের মত সংখ্যালঘু সমাজের রক্ষনশীল চরিত্রকে অতিক্রম করে ঘর-পরিবারের পাশাপাশি শাহীনবাগের নারীদের প্রতিবাদের এই আওয়াজ নতুন অতীতকে পিছনে ফেলে এক নতুন সময়ের বার্তা দিচ্ছে। নারীদের কন্ঠেও যেন তারই পূর্বাভাষ। তাই প্লেকার্ডে লেখা ছিলো আল্লামা ইকবালের বিখ্যাত শায়েরি

নাশেমান পার নাশেমান ইস কাদর সে তামির হো যা

বিজলি ভি গিরতে গিরতে আপসে আপ বেজার হো যায়ে।

চন্দ্র শেখর আজাদরা মুসলিম-দলিত স্বপ্নের ঐক্যের আনজাম দিচ্ছেন

গত ২০ ডিসেম্বর চলমান আন্দোলনে যখন দিল্লি জামা মসজিদ থেকে বিক্ষোভের ঘোষনা করা হয়েছিলো তখন তরুণ দলিত নেতা ভিম আর্মির সুপ্রিমো চন্দ্র শেখরও  অংশ নেয়ার ঘোষনা দিয়েছিলেন। দিল্লি পুলিশ শেষ পর্যন্ত দলিতদের এই বিশাল জনসমাগমকে পথে থামিয়ে দিলেও পুলিশি বাধা পেরিয়ে সেদিন দিল্লির জামা মসজিদে হাজির হয়েছিলেন চন্দ্র শেখর আজাদ রাভান। ভারতীয় সংবিধানকে উচিয়ে ধরে যখন মুসলিমদের সাথে সমাবেত হয়েছিলেন হাজারো মুসল্লি হাতে হাত রেখে তাকে নিরাপত্তা দিচ্ছিলো।

মুসলিম দলিত সংহতির এই অভূতপুর্ব ছবিটি সকল মিডিয়ায় ফলাও করে প্রচারও হয়েছিলো। পরবর্তীতে আজাদ গ্রেফতার হলেও চলমান আন্দোলনে মুসলিমদের সাথে কাধে কাধ মিলিয়ে লড়াই করার প্রতিজ্ঞা করেছিলেন। তার ভাষায় “ বাবা সাহেবের ছেলে ( আম্বেদকরের লেগেসি বোঝাতে) পুলিশ হামলায় ভয় পাইনি। মুসলিম ভাইদের সাথে এই লড়াই এক সাথ হয়ে লড়বো।”

ভারতীয় সমাজে দলিত এবং সংখ্যালঘু মসলিমদের ভাগ্য উন্নয়নে এই শপথ এক ঐতিহাসিক গুরুত্ব রাখে । দীর্ঘকাল বর্ণ জাতিভেদের অভ্যন্তরে পিষ্ট হওয়া দলিত আদিবাসী এবং রাজনৈতিক ক্ষমতাহীন মুসলিমদের এই মৈত্রী স্থায়ী হলে ভবিষ্যত ভারতের ইতিহাস নিশ্চিতভাবে অন্য রকম হবে।

কানহাইয়া আছেন লড়ছেন

পশ্চিম বিহারের বাসিন্দা কানহাইয়া কুমার ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিআই) সর্ব কনিষ্ঠ জাতীয় পরিষদ সদস্য।  ইতোমধ্যেই তিনি ভারতের নিম্নবর্গের মানুষের মুখের ভাষা হয়ে উঠেছে। বিজেপি আর এস এসের সাম্প্রাদিয়ক রাজনীতির বিরুদ্ধে বিরোধীদের সাদামাটা প্রতিবাদের বাহিরে জোরালো লড়াকু মনোভাবের ফলে কানহাইয়া যেন নিজেই এক প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠেছেন। প্রতিনিয়ত মোদি – শাহের নীতিকে চ্যালেঞ্জ করছেন । দেশের এ প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে বেড়াচ্ছেন, মানুষের পাশে যাচ্ছেন।

জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে  পিএইচডি ডিগ্রি নেয়া কানহাইয়া বিগত লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির গিরিরাজ সিংয়ের কাছে বেশ বড় ব্যবধানে হারলেও তাতে মনোবলে যে সামান্য ছেদ পরেনি তার বার্তা দিয়ে চলছেন প্রতিনিয়তই। তাই চলমান নাগরিক আইনের বিরুদ্ধে আন্দোলনের অন্যতম প্রধান চরিত্র তিনি।

জেএনইউ ছাত্র সংসদের সাবেক সভাপতির উপরে অবশ্য রাষ্ট্রযন্ত্রের হুমকিও কম নয়। ইতোমধ্যে জেলও খেটেছেন রাষ্ট্রদ্রোহীতার মামলার জেরে। তবে তাতে আপাতত তিনি হার মানছেন না । আবার সনাতনী বামপন্থী রণকৌশলকে পাশ কাটিয়ে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের নিজ চরিত্রকে অক্ষুন্ন রেখেই এক হয়ে লড়াইয়ের বার্তা নিয়ে ছুটছেন । দলিত মুসলিম আদিবাসীদের কাছে তাই স্বভাবতই তিনি ভরসার জায়গা।

কানহাইয়ারই আরক সহপাঠীর উমর খালিদ । ছাত্র জীবন অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্ট এ্যাসোসিয়েশন এবং পরবর্তীতে ভাগাত সিং আম্বেদকর স্টুডেন্ট অর্গানাইজেশনের পাট চুকিয়ে এখন সকল ধরনের ঘৃনা- বিদ্বেষের বিরুদ্ধে লড়াই করছেন। রাষ্ট্রদ্রোহীতার মামলায় জেল খেটেছেন তিনিও। চলমান আন্দোলনেও গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখছেন । তরুণদের এই অপোষহীন অবস্থান উদ্দীপ্ত করছে তাই সচেতন সবাইকেই।

সংখ্যালঘুদের পাশে দাঁড়াচ্ছে সমাজের সুবিধাপ্রাপ্তরাও

নাগরিক আইন নিয়ে কম বেশি প্রায় সকল বিশ্ববিদ্যালয়েই বিক্ষোভ হয়েছে। হামলাও হয়েছে কোথাও কোথাও। জামিয়ায় পুলিশ লাইব্রেরীতে ঢুকে হামলা করেছে জেএনইউতে হামলা করেছে মুখোশধারী অজ্ঞাতরা। ছাত্রদের দাবী হামলাকারীরা বিজেপির সমার্থক। তবে এসকল হামলায় শাসক গোষ্ঠি বিজেপির লাভ হয়েছে সামান্যই। উলটো এর ফলে ভারত জুড়েই নিপীড়িত ছাত্রদের মাঝে বোঝাপড়া বেড়েছে। ফলে জামিয়ায় হামলা হলে এখন আর জে এন ইউ দিল্লি কিংবা যাদবপুর চুপ থাকছেনা । এই কাতারে যেমন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় গুলো আছে তেমন তুলনামূলক রাজনীতিকে এড়িয়ে চলা “এলিট” প্রতিষ্ঠান গুলোও আছে।

যেমন সেন্ট স্টিফেন কলেজের কথা আলাদা ভাবে বলা যায়। সর্বশেষ এই কলেজে অভ্যন্তরীণ বিষায়াশয় বাদে রাজনৈতিক আন্দোলন হয়েছে অর্ধ শতকের কম হবেনা । এর একটি কারন হলো সমাজের প্রভাবশালীদের ছেলে মেয়েরেয়াই এখানে পড়াশোনা করে। আলাদা করে উল্লেখ করার দরকার নেই হয়তো তাদের কাছে রাজনীতির উত্তাপ পৌছায় সামান্যই ।

কিন্তু সেই স্টিফেন কলেজেও গত ৮ জানুয়ারী শিক্ষার্থীরা ক্লাস বর্জন করে নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে ধর্মঘট করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অঙ্গিনায় বৃষ্টির মধ্যে ভিজে যখন তারা উর্দু কবি ফায়েজ আহমেদ ফায়েজের “ হাম দেখেঙ্গে” নজমের সাথে গলা মেলাচ্ছিলো তখন কেবল বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষ নয় বরং রাষ্ট্রের কাছে স্পষ্ট বার্তাই ছিলো এই তরুণরা আর বিভেদ মানছেনা। ফায়েজের কবিতার লাইনগুলিও সায় দিচ্ছিলো তাতে-

হাম দেখেঙ্গে, হাম দেখেঙ্গে

লাযিম হ্যায় কি হাম ভি দেখেঙ্গে;

স্‌ব তাজ উছালে জায়েঙ্গে

স্‌ব তখ্‌ত গিরায়ে জায়েঙ্গে

(আমরা দেখব, আমরা দেখব

নিশ্চিত জানি, আমরাও দেখব;

সকল মুকুট ছুড়ে ফেলা হবে

সকল সিংহাসন গুঁড়িয়ে দেওয়া হবে।) 

শিল্পী- সাহিত্যিকরাও আর নিরপেক্ষ থাকতে চাইছেন না  

ভারুন গ্রোভার বর্তমান প্রজন্মের প্রতিভাবান কবিদের মধ্যে অন্যতম। একাধারে গীতিকার, চিত্রনাট্য লেখক হলেও এই মুহুর্তে ভারতীয় তরুণরা তাকে চিনছে অন্য এক পরিচয়ে। চলমান আন্দোলনের অন্যতম পরিচিত মুখ ভারুন। বিতর্কিত নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে আন্দোলনের সংহতিতে লিখেছেন এই মুহুর্তের সবথেকে শক্তিশালী লাইনটি- “হাম কাগাজ নেহি দেখাইয়েঙ্গে”( আমরা কাগজ দেখাবো না!)

ভারুনের এই লাইনটি ইতোমধ্যেই সোশ্যাল মিডিয়ায় ঝড় তুলছে। কেবল তাই নয় ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে এই কবিতার লাইনের নামেই আন্দোলনের গড়ে উঠেছে। যেমন পশ্চিম বঙ্গে কৌশিক মুখপাধ্যায়, রুপম ইসলামের মত প্রখ্যাত শিল্পীরাও এই লাইনের সাথে গলা মেলাচ্ছেন। ইতোমধ্য বিভিন্ন ভাষায় সুর কিংবা কবিতায়ও বদলে গেছে ভারুনের লাইনটি।

কেবল কোলকাতায় নয় প্রতিবাদের আচ লেগেছে খোদ বলিউডেও। গ্যাংস অব ওয়াসিপুর ক্ষ্যাত অনুরাগ ক্যাশ্যাপ, রিচা চাড্ডা থেকে হালের ক্রেজ স্বরা ভাস্কর সকলই খোলাখুলি রকম এই আইনের বিরুদ্ধে নিজের মত রাখছেন। এটি যে কেবল মুসলিমদের একার ইস্যু নয় সেটা প্রকাশ্যই সমাবেশে বলেছেন । জে এন ইউ বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলার পরে ছাত্রদের দেখতে খোদ ক্যাম্পাসেই হাজির হয়েছিলেন দিপিকা পাডুকোন । লক্ষ্য করার মত বিষয় হলো সালমান খান শাহরুখ খানদের মত স্টাররা মুখে কুলুপ এটে রাখলেও অনেকেই এই পরিস্থিতিতে “নিরপেক্ষ” ভান ধরে থাকতে অস্বীকার করছেন।

প্রতিবাদের ভাষা হয়ে উঠছে কৌতুকঃ সালোনি গৌরের নাজমা আপ্পি সাথে কুনালও আছেন

কুনাল কামরা সম্ভবত এই সময়ের সব থেকে পরিচিত কমেডিয়ান। শাট আপ কুনাল নামে জনপ্রিয় কমেডি শো এর হোস্ট তিনি। তার পরিচিতি যতটা না তার কমেডির জন্য তার থেকে বেশি তার কৌতুকের রাজনীতি সচেতনতার জন্য। তবে এখন আপাতত তিনি খবরে আছেন ইন্ডিগো এয়ারের নিষেধাজ্ঞার জন্য। ঘটনাটি হলো কুনাল কামরা যে ফ্লাইটে বেনারস যাচ্ছিলেন সেই একই ফ্লাইটে যাত্রী হয়েছিলেন রিপাবলিক টিভির এ্যাংকর অর্নব গোস্বামীও। অর্নব ভারতীয় গনমাধ্যমে বিজেপি ঘনিষ্ট হিসেবেই পরিচিত। বিভিন্ন সময়ে তার টেলিভিশনে বিজেপির পক্ষ নিয়ে খোলাখুলি রকমের বিদ্বেষপূর্ণ পক্ষপাত জাহির করে থাকেন।

বিমানে কামরা তাকে সে ব্যাপারে কিছু প্রশ্ন করেছিলেন স্বভাবতই তার উত্তর অর্নব দেননি। দিয়েছে টাটা কর্পোরেশনের পরিচালনায় ইন্ডিগো এয়ার কর্তৃপক্ষ কামরাকে ছয় মাসের ফ্লাইং ব্যানের মাধ্যমে। যদিও গনমাধ্যমগুলো বলেছে কামরাকে লঘু পাপে গুরু শাস্তিই দিয়া হয়েছে। চলমান নাগরিকত্ব সহ বিজেপির সাম্প্রদায়িকতা নিয়ে কামরার প্রতিবাদী অবস্থান এবং তার কৌতুকে সেসবকে প্রশ্ন করায়ই সরকারের রোষানলে পরেছেন তিনি। এরপর থেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ট্রেন্ডিংএ আছেন তিনি। এমনকি কামরা এবং অর্নব যে ফ্লাইটে ভ্রমন করছিলেন তার ক্যাপ্টেনও দাঁড়িয়েছেন কামরার পক্ষে।

শুধু কুনালের মত প্রতিষ্ঠিত স্টান্ড আপ কমেডিয়ানরাই নন। কৌতুক প্রতিবাদের অস্ত্র হয়ে উঠছে সাধারনদের কাছে। আর সাম্প্রদায়িক রাজনীতি উলম্ফনের এই সময়ে বিভিন্ন কৌতুক চরিত্রেরো জন্ম হচ্ছে। সেক্ষেত্রে নাজমা আপ্পিকে না চিনলে আপনার চলবেনা।

নাজমা আপ্পি মূলত এরকই একটি কৌতুক চরিত্র। আদতে নাজমা আপ্পির পিছনের মানুষটার নাম সালোনি গৌর। বিশ বছরের এই তরুনী হারিয়ানার  নিবাসী হলেও দিল্লিতেই থাকেন। পড়াশোনা করেন দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে “ রাজনীতি এবং অর্থনীতি” নিয়ে যা সালোনির ভাষায় “ দুটোরই ভারতজুরে মন্দা চলছে।” তিনিই প্রথম সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ইন্সটাগ্রামে নাজমা আপ্পি নামে জনপ্রিয় চরিত্রের জন্ম দেন।

সালোনির নাজমা আপ্পি হয়ে ওঠার পিছনের গল্পটা মজার । হারিয়ানা থেকে দিল্লি আসার পরে দিল্লি ঘুরে দেখার সময়ে পুরোনো দিল্লির কোনো এক স্থানে সালোনি এই নাজমা আপ্পির সন্ধান পান। ব্যক্তির নয় ভাষার। তখন থেকেই সালোনি মনে মনে একটি চরিত্র তৈরী করেন যিনি কিনা পুরান দিল্লির এই ভাষায় কথা বলেন। এক সময়ে তার নামও দেন , নাজমা আপা। পরে নিজের বয়সিদের সংযোগেই আপা রূপ নেয় আপ্পিতে। সেখান থেকেই নাজমা আপ্পির শুরু।

নাজমা আপ্পির সরল ভঙ্গীতেই দুনিয়াকে দেখেন। রাজনৈতি অর্থনীতি সব কিছু নিয়েই তার নিজস্ব বক্তব্য আছে। তবে প্রত্যেকটাই তার জীবন এবং পরিবার ঘনিষ্ট। যেমন সিটিজেনশীপ এমেন্ডমেন্ট বিরোধী বিক্ষোভ অংশ নেয়া ছেলের পুলিশের লাঠির বাড়িতে গড়াগড়ি করে আসা জামা দেখে নাজমা আপ্পির বলে “ আবে ভাইয়ে ( এটা নাজমা আপ্পির বলার ধরন) তুমি তো লাঠি দিয়ে পিটেয়ে বাচ্চাছেলেদের রাস্তায় ফেলে দাও। ওদের জামা কাপড় ধুতে তো কষ্ট হয় আমার । একদিন তোমার ধোয়া লাগলে বুঝতা।”

আবার সিএএকে কেন্দ্র করে বিক্ষোভ নাজমা আপ্পির সরল মনেই জানায় “ লোকজন বলে আমাদের সাথে এরকম করে মোদীজি ঘুমায় কিভাবে? আবে ভাইয়ে উনি ঘুমায় না দেখেই ওনার মাথায় এরকম আইডিয়া ঘুরে, আজকে একে দেশছাড়া করে কালকা নোট ব্যান করে। এসব তো একমাত্র না ঘুমিয়ে থাকলেও সম্ভব। ” আবার বিক্ষোভকারীদের উপরে জলকামান নিয়ে বলছেন “ আরে ভাইয়ে কথাবার্তা ছাড়াই লোকজনের উপরে জানি মেরে দেন। আমি তো আমার বাচ্চাদের বলেছি মহল্লায় তো পানির সংকট তোমরা বরং বিক্ষোভেই যাও পানি মারলে গোসল করে নিও আর পারলে আমার জন্যেও এক বালতি নিয়ে আইসো।”

এভাবে কাশ্মিরে ইন্টারনেট বন্ধ , জেএন ইউ তে হামলার মত বিষয় নিয়েই নাজমা আপ্পির বয়ানে সালোনি গৌর নিজের ভাবনা ব্যক্ত করেন। হিন্দুত্ববাদ উগ্র আস্ফলনের যখন মুসলিমদের অপর করে দেখানো রাজনৈতিক ট্রেন্ড হয়ে উঠছে সেখানে নাজমা নামটি পছন্দ করাই রাজনৈতিক ভাবে তাতপর্যপুর্ন। সালোনি সেই চ্যালেঞ্জ নিয়েছেন। সংখ্যালঘুদের পাশে দাঁড়ানো সালোনির মত তরুণ তরুণীদের সংখ্যা বহু। যারা চলমান সাম্প্রদায়িক পরিচয়ের রাজনীতির বাহিরে নাজমা আপ্পি হয়ে উঠতেও প্রস্তুত।

খেয়াল করলে দেখা যাবে এসকল বিষয়ই রাজনীতি সংশ্লিষ্ট আর নাজমা আপ্পি সে সকলকেই নিজের প্রাত্যহিক জীবনের সাথে মিলিয়ে সরলভাবে দেখে থাকেন। কোনো তাত্ত্বিক কঠিনতা কিংবা জোর করে হাসানোর চেষ্টা নেই। এই গল্পটি যেন এরকম শত নাজমা আপ্পির যারা পরিবার আর সন্তানসন্ততির সাথে সমাজ এবং রাজনীতিকে মিলন ঘটিয়ে প্রতিনিয়তই সামনে যাচ্ছে। সে অর্থ নাজমা আপ্পি চরিত্রটি একই সাথে সে সকল নিম্নবর্গীয় আওয়াজও যাদের রাজনৈতিক ক্ষমতার বাহিরে রাখা হয়েছে যুগ ধরে। তবুও প্রতিদিনই তারা রাজনীতির সাথে নিজের আত্মসম্পর্ককে মিলিয়ে নিচ্ছে। আর সালোনির কাছে এটা এক ধরনের প্রতিবাদ বা সমাজের প্রতি তার দায় । একজন ধর্মীয় আবরনের বাহিরে একজন ভারতীয় হিসেবে তিনি অনুভব করেন।

বিজেপি টিকে আছে কেবল হিন্দুত্ববাদে

ভারতের অর্থনীতি অতীতে যেকোনো সময়ের থেকে শোচনীয় অবস্থায় আছে। সরকারী প্রতিষ্ঠান বিক্রি করা এখন আর ব্যার্থতা আকারে দেখা হচ্ছেনা। অর্থনীতির এই দূরবস্থা নোট ব্যান সহ আরো অনেক অযৌক্তিক সিদ্ধান্তে ভর করেই এখানে এসেছে। বিভিন্ন জরিপ বলছে লোকজন পাচ দশ টাকা মূল্যে খুচরো জিনিস কিনতেও অনিহা দেখাচ্ছে। তবে এসব বিজেপির বিপুল বিজয়ে বাধা দিচ্ছেনা ।

হিন্দুত্ববাদে সাওয়ার হয়ে বিজেপি ঠিকই টিকে যাচ্ছে। উপরে যাই হচ্ছেনা কেন নিচের সারিতে তারা এই বার্তা পৌছে দিচ্ছে যে “যা কিছু হচ্ছে তা হিন্দুরাষ্ট্র তৈরির জন্যেই”। এবং লোকজন তাতে বুদ হয়ে আছে ।

ভারতের বর্তমান যেদিক থেকেই বিশ্লেষণ করা হোক না হিন্দুত্ববাদের (ধর্ম আকারে নয়, যেমন এক নয় জুডাইজম ও জায়নবাদ) প্রবল উত্থানকে কেউ অস্বীকার করছেন না। এক দশক আগেও এটির রাজনৈতিক ভয়াবহতা সম্পর্ক যে অবহেলা ছিলো এখন আর তা নেই। সন্দেহ নেই এটি ঘটেছে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতক্ষ্য কিংবা পরক্ষ মদদ অথবা অসচেতনায়।

কংগ্রেস সহ অন্যান্য দক্ষিনপন্থী রাজনৈতিক দলগুলো তো এই কাতারে ছিলই অসচেতন। আত্মঘাতি রাজনৈতিক রণকৌশলে কুরবান হতে পিছিয়ে ছিলোনা বামপন্থীরাও। প্রমান হিসেবে ত্রিপুরার দূর্গ হারানোর সমীকরণ জটিল ঠেকলেও লোকসভা পশ্চিমবঙ্গে সিপিআই( মার্ক্সবাদী) ভোট ব্যাংকের বিজেপি মুখী হওয়াটা এখন আর কাউকে বিস্মিত করছেনা। নির্বাচন মুখী রাজনীতিতে বামপন্থীরা প্রত্যন্ত মানুষের সাথে সংযোগ হারিয়ে ফেলেছে। যেটুকু প্রতিরোধ বেঁচে আছে তা কেবল এখনো তরুনের বাহুতে। 

নাগরিকত্ব আইন আর এনআরসির বিরুদ্ধে তরুণ- তরুণীরা তার প্রমানও দিচ্ছেন। আন্দোলনকারীদের জাত-পাত  বর্ণ ও ধর্মবিশ্বাসের বৈচিত্র্যকে মেনে প্রত্যেক জায়গাই সংখ্যালঘুদের পাশে বুক চিতিয়ে দাঁড়াচ্ছেন। সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ক্ষেত্রকে প্রসারিত করছেন।

তবে এই লড়াইকে যদি যদি গ্রামীন স্তরে ছড়িয়ে না দেয়া যায় নিম্ন বর্গীয় হিন্দুদের বিজেপি আরএসএসের প্রবল আগ্রসী হিন্দুত্ববাদের মোহ থেকে বের না করে আনা যায় তাহলে এই ত্যাগের হতাশাজনক সমাপ্তি ঘটলেও অবাক হবার মত কিছু থাকবেনা। বলা বাহুল্য মুরব্বিদের এই সর্বত্র ব্যার্থতার সময়ে এই দায়িত্বও তরুণ- তরুণীদেরও নিতে হবে।

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন