, ১ জানুয়ারি ২০২১; ১২:৩৫ অপরাহ্ণ


bengalview-fair

 

“রোকেয়া হলের ইট দেখেছো, দেখেছি কি তার প্রাণ?

ভেতরে তার শতযুবা নারী, বাহিরেতে বুড়া দারওয়ান!” 

 

কাজী নজরুলের কবিতার প্যারোডি করতে করতে যখন রোকেয়া হল অতিক্রম করছিলাম তখনোই নজরে এল এক বিলবোর্ড। দক্ষিণ এশিয় নারীর মিশ্র গাত্রবর্ণ নিয়ে শতবর্ষ করে বানিজ্য করে যাওয়া সৌন্দর্য প্রসাধনীর বিজ্ঞাপন। সাম্রাজব্যবাদী বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান ইউনিলিভারের পণ্য ফেয়ার এন্ড লাভলি’র ডিজিটাল বিলবোর্ড। সৌন্দর্য পণ্যের বিজ্ঞাপনে পণ্য হয়েছেন আরেক সদ্যসাবেক মানবী।

 

Credit: Rokon Uzzaman

 

এরকম বিলবোর্ড এই বাজারের শহরে একটি স্বাভাবিক ব্যাপার হলেও এই বিশেষ বিলবোর্ডটি আমার কাছে একটি বড় সত্যের ইঙ্গিতবাহী। একটি সমাজকাঠামোয় চাপিয়ে দেওয়া মূল্যবোধ এখানে নগ্নভাবে ফুটে উঠেছে। এখানে দেখানো হয়েছে, ফেয়ার এন্ড লাভলি ব্যবহারের পূর্বে মেয়েটির মাথায় লাজুক ঘোমটা ছিল। বলতে পারেন হিজাবী ছিল। আর এই ছবির অর্ধেক অংশ যেখানে দেখানো হয়েছে মেয়েটি ইতিমধ্যেই ফর্সা হয়ে গিয়েছে সেখানে আর হিজাব নেই। ঝলমলে চুল এলোমেলো করে ‘আত্মবিশ্বাসী’ হয়ে উঠেছে। মানে ফেয়ার এন্ড লাভলি ব্যবহারের আগে প্র্যাকটিসিং মুসলিম আর পরে সেক্যুলার আধুনিক ব্যক্তি।

এই যে একটা নতুন সামাজিক মূল্যবোধ চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে আমাদের রন্ধ্রে রন্ধ্রে এটি একটি গুরুতর ষড়যন্ত্র। আচ্ছা, এই একই বিজ্ঞাপন কি সিরিয়ায় মানানসই হবে? কিংবা আমিরাতে? কিংবা মিশরে? যেখানে ফর্সা নারী স্বাধীন বিবেচনায় হিজাব বেছে নিয়েছে? আমার মনে হয় না। তবে বঙ্গীয় মুসলিম সমাজে এটা সম্ভব হয়েছে আমাদের গাত্রবর্ণের ইনফিরিওরিটি তৈরি করার মাধ্যমে। সেটার শুরু হয়েছে সুদীর্ঘকালব্যাপী ব্রিটিশ শাসনের মাধ্যমে।

এই মতামত ফেসবুকে প্রকাশের পর কয়েকজন বন্ধু তাদের মন্তব্য জানিয়েছেন। পাঠকদের সুবিধার্থে তাদের চিন্তাগুলো এখানে অন্তর্ভূক্ত করছি।

B B Al Mahadi মন্তব্য করেন- “ব্যাপারটা আমি পুঁজিবাদী সমাজের আধিপত্য হিসেবে দেখি।”

আমার উত্তর ছিল – “আমার মনে হয় আমাদের সবাইকে বোঝাচ্ছে আর কত দিন প্রোলেতারিয়েত হয়ে থাকবে এখন ফেয়ার এন্ড লাভলি মাখো আর পুঁজিপতি হও। ধীরে ধীরে কোন প্রোলেতারিয়েতই থাকবে না। একদিন সবাই তাদের ভোগ্যপণ্য ও একই লাইফ স্টাইল সবাইকে বিশ্বাস করাবে যে পুঁজিপতি আর প্রোলেতারিয়েতের মধ্যে কোন পার্থক্য নাই।”

Muhommad Al Fahad  এর মতে – “মেইনস্ট্রিম ইসলাম অথবা ইসলামি ফান্ডামেন্টালিস্টরা এখনো শ্রেণি হিসেবে ক্যাপিটালিজম এর কনজিউমার হয়ে ঊঠতে পারেনাই। এজন্য পুঁজিবাদীরা এই লম্বা পাঞ্জাবি আর হিজাব পড়া মানুষদের একটা গ্রুপে ফেলে নানা ট্যাগ দিয়ে হাজির করে। মিডিয়ার দালালদের সাহায্যে মূল্যবোধের জায়গা থেকে টেনে বের করে আনবার চেষ্টা করে। এরই একটা রুপ হচ্ছে ইউনিলিভারের এই ফেয়ার & লাভলির বিজ্ঞাপন।”

আমার প্রতিমন্তব্য ছিল – “পণ্য শুধু পণ্য না। হাতিয়ারও বটে। পণ্যের উপস্থাপনার ধরণ যেমন পণ্যকে মূল্যায়ন করে একই সাথে পণ্যের অন্তরালে আইডল, আইডিয়ার পূজাও চলে। কিন্তু ইসলাম যখন সকল ধরণের শিরক থেকে মানুষকে মুক্ত হয়ে পণ্যের অন্তরালে লুক্কায়িত ঈশ্বর বা ইলাহাকে, আহয়াকে পরিত্যাগ করতে বলে, তখন ইসলাম শত্রুতেই পরিণত হয়। কাকে ওরশিপ করা হচ্ছে তার উপর নির্ভর করে ব্যক্তির দ্বীন কী হবে। যদি পণ্যকে ওরশিপ করা হয় মানুষ নিজেকে পণ্যে বানানোর ধর্ম মেইনটেইন করবে এটাই স্বাভাবিক। পণ্যায়ন ধর্মের বিরোধীতা একমাত্র ইসলামই করে বলে ইসলামের সাথের পণ্যবাদীদের আদর্শিক দ্বন্দ্ব।”

Abu Prantor  এর মতে – “আমার কাছে মনে হয়, এটা সভ্যতার দ্বন্দ্ব। পুজিবাদ কিংবা সমাজতন্ত্রের বিষয় না। তাই মার্কসীয় দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে এটা বোঝা যাবে না। ব্যবসায়ীরা তাদের নির্দিষ্ট সভ্যতাকেই রিপ্রেজেন্ট করে। ব্যবসা শুধুমাত্র ব্যবসা না। এটার সাথে সভ্যতাগত একটা প্রকল্প থাকে। আমরা শুধুমাত্র পণ্য কিনি না, পণ্যের সাথে সভ্যতাগত মূল্যবোধও কিনি। এটা প্রত্যেক সভ্যতার ক্ষেত্রেই ঘটে।

মুসলিম সভ্যতায় ব্যবসায়ীদের মাধ্যমেও কিন্তু ইসলামের প্রসার ঘটেছে। যারা পণ্য তৈরী করে, তারা সাথে সাথে ভ্যালুও আরোপ করে। পণ্য ভ্যালু ফ্রি বিষয় না। পণ্য তৈরীর সাথে মুনাফা অর্জনের পাশাপাশি সভ্যতাগত প্রকল্প জড়িত থাকে।

আর আধুনিক অর্থে উক্তোক্তারাই সভ্যতা তৈরীর নিয়ামক বা অর্থের যোগান দেয়। মানব শিশুর মত ব্যবসাও একটা সভ্যতায় একটা পরিবেশে জন্মলাভ করে। ফলে ব্যবসায় ঐ সভ্যতার ও পরিবেশের প্রভাব পরিলক্ষিত হবে এটাই স্বাভাবিক। ছবিতে প্রকৃতপক্ষে একটা সভ্যতাকে আরেকটা সভ্যতা দিয়ে রূপান্তর ঘটানো হচ্ছে। আর লজিক হিসাবে দেখানো হচ্ছে একটা আরেকটা থেকে উৎকৃষ্টতা এবং সৌন্দর্যের বিচার শ্রেষ্ঠ। আর বোঝানো হচ্ছে মেয়েরা ওড়না পরিধান করে হীনমন্যতা এবং আত্মবিশ্বাসহীনতা থেকে। এই দুইয়ের বিলোপ ঘটাতে পারে শারিরিক সৌন্দর্য। আর এই দুয়ের বিলোপ ঘটলে হিজাব তখন অর্থহীন হয়ে দাঁড়ায়। বিজ্ঞাপনদাতা ইচ্ছা করলে সাংস্কৃতিক প্রেক্ষিতকে বিবেচনায় নিয়ে ওড়না বহাল রেখে মুখ ফর্সা করে দিতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করলেন না। কারণ ঐ যে বললাম সভ্যতাগত ও সাংস্কৃতিক দ্বন্দ্ব যেটা ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান ইনহেরেন্টলি প্রকল্প আকারে হাজির করে এবং বাস্তবায়ন করার প্রচেষ্টা চালায়।” 

B B Al Mahadi এর প্রতিমন্তব্য ছিল-  “সভ্যতা বা সাংস্কৃতিক ব্যবসা তারাই আধিপত্যের সাথে হাজির করতে পারে, যাদের কাছে মিনস অব প্রোডাকশন আছে। আর মিনস ওফ প্রোডাকশনের মালিকানার সাথে জড়িয়ে আছে আধিপত্য বিস্তারের সম্পর্ক। ইসলামের লোকগো মিনস অব প্রোডাকশন নাই। তাই যাকাত দেয়ার তৌফিকও নাই। তাই ইউরোপিয়রা হিজাবওয়ালাগো হিজাববীহিনতার জাকাত দ্যায়।”

তাহলে মানে দাঁড়াচ্ছে – বিজ্ঞাপন কেবল বিজ্ঞাপনই নয়, এর সাথে জড়িয়ে আছে উৎপাদন সম্পর্ক, সভ্যতা, ধর্ম, ও আধিপত্যের রাজনীতি। আমি মনে করি, আমাদের বাজার ব্যবস্থাকে ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। তা না হলে আমরা নিজেরা নিজেদের অজান্তেই শত্রুতে রূপান্তরিত হব।

 

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন