, ১ জানুয়ারি ২০২১; ১২:৫৬ অপরাহ্ণ


ছবিঃ শাহবাগ। (গণজাগরণ মঞ্চ)
  • আহমেদ সাব্বির

ইদানিংকালে মতাদর্শ নিয়ে আমরা বেশ আলাপ দেখছি। মতাদর্শিক হয়ে উঠবার ফলে কিভাবে মানুষ বাস্তব দেখতে বা বুঝতে অক্ষম হচ্ছেন সেটাকে দৃষ্টির গোচরে আনবার চেষ্টা করছেন কেউ কেউ। এর একটি প্রান্তিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে আমরা যে কোন মতাদর্শের বাইরে এসে রাজনীতি করবার ঘোষণা দিতেও দেখেছি একটি গ্রুপকে।

বড় দাগে এই মতাদর্শ বিরোধি বা মতাদর্শ নিয়ে আলাপের প্রেক্ষাপট হল- এক দশকের বেশি সময় ধরে চলমান এক ধরণের কর্তৃত্ববাদী শাসনামল যার ভিত্তি হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধকে মতাদর্শিক টুল হিসেবে ব্যবহার করা। বর্তমান শাসকগোষ্ঠি একদিকে মুক্তিযুদ্ধকে একটা মতাদর্শে রূপ দিয়ে এটাকে ব্যবহার করে একধরণের নীপিড়ক ব্যবস্থা কায়েম করেছে। অন্যদিকে বিরোধি মতকে দমন করতেও তারা বিরোধিদের মতাদর্শকেই হাইলাইট করছে।

এবং এটা এতটাই সফলভাবে করতে সক্ষম হয়েছে যে মতাদর্শের ঢাল ব্যবহার করে তারা যেমন তাদের সকল অপকর্মকে এক রকম বৈধতা দিতে সক্ষম হয়েছেন, অন্যদিকে বিরোধি মতাদর্শের দিকে আঙ্গুল তুলেই বিরোধিদের সকল নাগরিক অধিকার, কথা বলবার অধিকার, রাজনৈতিক কর্মযজ্ঞ চালাবার অধিকার বন্ধ করবার সমস্ত ব্যবস্থা করতে সক্ষম হয়েছেন। মতাদর্শ বিরোধি আজকের যে অবস্থান সেটাকে খুব উদার ও সহানুভূতির জায়গা থেকে দেখি তাহলে তাকে বিদ্যমান এ পরিস্থিতির একটা প্রতিক্রিয়া আকারে পাঠ করতে পারি।

তারা ঘোষণা করলেন- তারা কোন মতাদর্শিক রাজনীতি করবেন না। তারা কেবল মানুষের অধিকারের রাজনীতি করবেন। তাদের মধ্যে থেকেই যারা আবার নিজেদেরকে কিছুটা চিন্তক গোছের মনে করেন তারা আরো এক ধাপ এগিয়ে একটা সামগ্রিক আহবান জানাচ্ছেন- ‘মতাদর্শ মাত্রই পরিত্যাজ্য, তাই মতাদর্শের বাইরে এসে পৃথিবী দেখেন’। তাদের বক্তব্যের ভিত্তি হচ্ছে- যে কোন মতাদর্শই বাস্তবতাকে বিকৃত ভাবে উপস্থাপন করে। এই চিন্তার গোড়ায় প্রবেশ করলে দেখব তারা আইডিওলজিকে সংজ্ঞায়ন করেন মূলত বাস্তুবতা সম্পর্কে অলিক বা মেকি চৈতন্য হিসেবে।

অর্থাৎ তারা মনে করেন আইডিওলজি বা মতাদর্শ আমাদের চোখের সামনে একটি চশমা পড়িয়ে দেয় যার মধ্য দিয়ে বাস্তবের ধূসর দুনিয়া আমাদের কাছে রঙিন মনে হয়। সুতরাং বাস্তবতা সম্পর্কে এরকম মিথ্যা ধারণা পাওয়া থেকে রক্ষার উপায় হচ্ছে- এই আইডিওলজির চশমা খুলে ফেলা।

তাহলেই আমরা চর্মচক্ষে পৃথিবী ঠিক যেমন সেরকম দেখতে পাব। আজকের আলোচনায় এই যে আইডিওলজিকে প্রত্যাখান করে পোষ্ট-আইডোলজির জগতে প্রবেশ করবার ইচ্ছা বা আহবান সেটাকে কিভাবে ব্যাখ্যা করা উচিত সেটাই দেখবার চেষ্টা করব।

এ প্রসঙ্গে দুইটি বিষয় পরিস্কার করে নেয়া ভাল।

প্রথমতঃ আইডিওলজিকে ফলস কনশাসনেস বা মেকি চৈতন্য আকারে সংজ্ঞায়িত করেছেন কার্ল মাক্স। তবে তিনি এই পরিস্থিতি থেকে রক্ষা পাওয়ার উপায় কেবল আইডিওলজির চশমা খুলে ফেলা টাইপের এরকম সরলরৈখিক আলাপ করেননি। অন্যদিকে আইডিওলজি মানেই মেকি চৈতন্য কিনা কিনা সেটা নিয়েও যথেষ্ট দ্বিমত করবার সুযোগ একাডেমিক সাহিত্যেই রয়েছে। তবে আলাপ সহজ করবার স্বার্থে আজ আমরা সেদিকে যাব না।

দ্বিতীয় বিষয়টি হল, এটা অস্বীকার করবার উপায় নেই যে কোন নির্যাতনমূলক শাসনব্যাবস্থা তার জবরদস্তিমূলক শক্তির পাশাপাশি আইডিওলজিকাল বা মতাদর্শিক টুলকে ব্যবহার করে, ঠিক আলথুসার যেমনটা বলেছেন। অর্থাৎ রাষ্ট্র সম্মতি উৎপাদনের জন্য বড় অংশে মতাদর্শিক যন্ত্রের উপর নির্ভর করে। সুতরাং রাষ্ট্র বা এলিটদের তৈরি মতাদর্শিক কমপ্লেক্স এর বিরূদ্ধে লড়াই করাটা জরুরি।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে সেটার উপায় কি? রাজনীতিকে মতাদর্শের বাইরে নিয়ে যাওয়া? বা মতাদর্শ মাত্রই নির্যাতক, টোটালিটারিয়ান, ফ্যাসিস্ট প্রভৃতি অভিহিত করে মতাদর্শ পরিত্যাগ করার প্রস্তাব হাজির করা? উল্লেখ্য এই মতাদর্শ মাত্রই পরিত্যাজ্য এই রকম অবস্থান কিন্তু পুরোদুস্তর একটি উত্তর-আধুনিক প্রস্তাবনা। যেটার সাথে আপনি আবার মিল খুঁজে পাবেন- দ্বিত্বীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী আমেরিকা এবং ইউরোপের পলিটিকাল রাইটদের সাথে। যারা End of Ideology বা মতাদর্শের মৃত্যু ঘোষণা করে Neo-liberal বা নয়া-উদারনীতিবাদের বিশ্ব ব্যবস্থা তৈরি করেছিলেন।

তবে পার্থক্য হল- এই নিও-লিবারেল ব্যবস্থার পথিকৃৎরা নিজেদের এই অবস্থানকে মডারেট বা লিবারেল বলেন আর সেই একই অবস্থানকে উত্তরাধুনিক চিন্তকরা র‍্যাডিকাল মনে করে। অর্থাৎ যেই অবস্থানের আলোকে নিউ-লিবারেলরা অর্থনীতিকে প্রাধান্য দিয়ে পলিটিকাল হয়ে উঠবার প্রশ্নকে কবর দিতে চেয়েছেন, পোষ্ট মডার্ন লেফট-লিবারালরা সেই একই পজিশন নিয়ে নিজেদেরকে র‍্যাডিকালি পলিটিকাল বলে ঘোষণা করেন।

এখন মূল আলোচনায় প্রবেশ করা যাক।জর্মান কালচারাল থিওরিস্ট পিটার স্লটাকজিক দেখিয়েছেন অলিক চৈতন্য অর্থে যে আইডিওলজির কথা মার্ক্স বলেছেন সেটা কিভাবে সক্রিয় থাকে। তাঁর বক্তব্য হচ্ছে- আইডিওলজির টিকে থাকবার সবচেয়ে আধিপত্যবাদী অবস্থা হচ্ছে সিনিসিজম। অর্থাৎ সহজ করে বললে এটা হচ্ছে এমনই পরিস্থিতি যেখানে আমি আইডিওলজির স্বরূপ কি তা জানি; কিন্তু তারপরও সচেতনে অবচেতনে সেটাকেই মেনে চলি।

অর্থাৎ মার্ক্সের সাথে দ্বিমত করে বলেন আইডিওলজি টিকে আছে আমার অলিক চৈতন্যের কারণে না বা আমি জানিনা এই কারণে না। বরং তার প্রকৃত রূপ সম্পর্কে জানা স্বত্ত্বেও তাকে মেনে চলবার কারণে। এখন এটার সাথে মিলিয়ে দেখেন- আওয়ামীলীগ মুক্তিযুদ্ধকে মতাদর্শিকভাবে ব্যবহার করছে।

এটা দিয়ে সে তার সব অপকর্ম জায়েজ করছে, এটা দিয়ে সে বিরোধী মত ও রাজনীতিকে দমন করছে, এটা কে না জানে? সবাই জানে। কিন্তু তারপরও আওয়ামীলিগ টিকে আছে। কারণ কি? উত্তর এ বাস্তবতা জানা সত্ত্বেও এটাকে অনুমোদন করা। এটাই সিনিসিজম। আর এই ফর্মেই একটা নিপীড়ক আইডিওলজি সবচেয়ে কার্যকরভাবে টিকে থাকে।

সুতরাং অলিক চৈতন্যের যে আইডিওলজির কথা আমরা বলছি তার চশমা ছুড়ে ফেললেই নির্মোহ বাস্তবে পদার্পন করবার শর্ত তৈরি হয়না। বরং সেটাই উপরে বর্ণিত সিনিকাল বাস্তবতায় পদার্পণের দিকে নিয়ে যেতে পারে। এখানে আইডিওলজির চশমা পড়ে থাকা আর সিনিকাল বাস্তবতায় থাকা এ দুটোর পার্থক্য বোঝাটা জরুরি।

যখন কর্তৃত্ববাদী আইডিওলজির চশমা দিয়ে বাস্তব দেখি তখন বিভ্রম থাকে এক স্তরের। মার্ক্সের ভাষায় সেটা হল- তারা জানেনা তারা কি করছে। অথবা তারা একটা ভুল জিনিসকে সঠিক ভাবছে। অর্থাৎ একটা অলীক চৈতন্যের মধ্যে তারা বসবাস করছে।

কিন্তু আইডিওলজির চশমা ফেলে দিয়ে যদি আমরা সিনিকাল বাস্তবে পদার্পন করি, জিজেক দেখাচ্ছেন তখন আমরা দ্বিগুণ বিভ্রমে আক্রান্ত হই- সেটা হল আমরা জানি আমরা একটা বিভ্রমে আক্রান্ত কিন্তু তারপরও সেই বিভ্রমকেই সত্য মনে করে আমরা তার অনুসরণ করি।এবার উপরের তত্ত্ব অনুযায়ী যারা আমাদেরকে আইডিওলজির চশমা ত্যাগ করে বাস্তবতা দেখতে বলছেন তাদের আচরণকে পর্যালোচনা করেন। তারা আমাদেরকে বর্তমান কর্তৃত্ববাদী আওয়ামীলীগের মুক্তিযুদ্ধ কেন্দ্রিক মতাদর্শিক ফ্যাসিবাদ থেকে মুক্তি দিতে চান। বাংলাদেশের সেকুলারদের ইসলামবিদ্বেষের হাত থেকে মুক্তি দিতে চান।

কিন্তু তারাই হঠাৎ করে মুজিব ভক্ত হয়ে উঠেছেন। মুক্তিযুদ্বের গুণ-গাঁথা বর্ণনা করছেন। সেকুলার রাষ্ট্র তৈরির স্লোগান দিচ্ছেন। এমন কি কেউ কেউ শেখ হাসিনার সমালোচনা পর্যন্ত করতে নিষেধ করছেন। কেউ কেউ এটাকে প্রাগমেটিক রাজনীতি আকারে বর্ণনা করছেন। অর্থাৎ তারা জানেন যা বলছেন তা ঠিক নয়, কিন্তু তারপরও সেটাই প্রচার করছেন। অর্থাৎ বিভ্রমকে বিভ্রম জেনেই তাকে সত্য বলে প্রচার করছেন। কোরানিক মেটাফোর ব্যবহার করলে এটাই সে অবস্থা যখন কেউ- ‘দেখেও দেখেনা শুনেও শুনে না’ এরকম।

অতএব, আমরা মতাদর্শিক চশমা পড়ে আছি বলে আওয়ামী শাসন দীর্ঘায়িত হচ্ছে এটা ঠিক নয় বরং মতাদর্শের চশমা খুলে বসে আছি বলেই তা টিকে আছে।

কারণ একটা কর্তৃত্ববাদী মতাদর্শ জনগণকে তার মতাদর্শিক চশমা পড়ানো ছাড়াই বরং তার শাসন এবং শোষন অধিকতর কার্যকর ভাবে চালা্তে পারে যদি সে এক ধরণের সিনিকাল বাস্তবতার জন্ম দিতে পারে। আর এই সিনিকাল বাস্তবের বাইরে আসতে চাইলেই বরং আমাদের প্রতিরোধের মতাদর্শিক চশমা পড়বার দরকার পড়ে। মতাদর্শ পরিত্যাগ করা এখানে কোন সমাধান না।

এ জন্যই আপনি দেখবেন- A pervert guide to ideology ডকুমেন্টারিতে জিজেক একটি মুভি ক্লিপ কে সামনে রেখে দেখাচ্ছেন- মুভির প্রোটাগনিষ্ট অলিক মতাদর্শিক বাস্তবকে তখনই কেবল দেখতে পায় যখন সে প্রাচীন পরিত্যাক্ত চার্চের মধ্য থেকে আবিস্কার করা চশমা পরিধান করে। এবং সে যখন এই চশমা তার বন্ধুকে পড়াতে চায় তখন সে প্রতিরোধ করে। কারণ তার বন্ধু চশমা ছাড়া সিনিকাল বাস্তবে বসবাস করছে। আর এই সিনিকাল বাস্তবের বাইরে এসে সত্য কিংবা রিয়ালিটি আবিস্কার করাটা কষ্টকর। আর সেটা করতে সে রাজি নয়।

একই রকম মেটাফোর ইসলামি ট্রাডিশনেও পাবেন যেখানে একজন শিষ্য তার সুফি উস্তাজের রুমাল পরিধান করে হঠাৎ করে তার চতুর্পাশের মানুষদের শুকর আকৃতিতে আবিস্কার করে। আর এই কষ্টকর আবিস্কারের ধাক্কা না নিতে পেরে উন্মাদ হয়ে যায়। সুতরাং যারা মতাদর্শ মাত্রই পরিত্যাজ্য এমন ঘোষনা দিচ্ছেন কিংবা মতাদর্শের চশমা খুলে বাস্তব ধরবার আহবান করছেন তারা নিজেরা একটা সিনিকাল বাস্তবে ইতিমধ্যে পদার্পণ করেছেন। এখন আমাদেরকে ও এই বাস্তবে পদার্পণ করবার আহবান করছেন। বিভ্রমকে বিভ্রম হিসেবে জানা সত্ত্বেও সেটাকে সত্য মনে করে তাকে অনুসরণ করবার আহবান করছেন।

এ রাজনীতি বিদ্যমান অলিক মতাদর্শের শাসন থেকে মুক্তি ত্বরান্বিত করবার কোন ক্ষমতা রাখেনা বরং তাকে দীর্ঘায়িত করবার শর্ত তৈরি করে। আপনি দেখবেন তাদের আহবানের মধ্যে কর্তৃত্ববাদি শাসনের বিরূদ্ধে রুখে দাঁড়াবার কথা নেই। বরং অনেক ক্ষেত্রেই আওয়ামী ন্যারিটিভের অনেক কিছু আত্নীকরণের কথা তারা বলছেন। ঠিক এটাই হল সিনিসিজম এর চুড়ান্ত ফর্ম।

সুতরাং আইডিওলজি মাত্রই পরিত্যাজ্য এর থেকে সিনিকাল পজিশন আর হতে পারে না। আর এই সিনিকাল অবস্থাই একটা অলিক আইডিওলজির দ্বারা পরিচালিত নিপীড়ক ব্যবস্থা টিকে থাকবার প্রধান শর্ত।

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন